page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

“একজন হুমায়ূন আহমেদ হুমায়ূন আহমেদই থাকেন।” — হুমায়ূন আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদের সাক্ষাৎকার

সাক্ষাৎকারটি ১৯৯৪ সালের মার্চ মাসে ‘ভোরের কাগজ’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। সাক্ষাৎকার গ্রহণ: সাজ্জাদ শরিফ ও ব্রাত্য রাইসু


হুমায়ূন আহমেদ

কী বলবো?

ব্রাত্য রাইসু

কিছু একটা বলুন।

হুমায়ূন

কোন প্রসঙ্গে?

সাজ্জাদ শরিফ

আপনার ফিল্ম প্রসঙ্গেই বলুন।

হুমায়ূন

অনেকদিন থেকেই ছবি তৈরি করার একটা শখ ছিল আমার। আমাদের দেশে এত বড় একটা যুদ্ধ হয়ে গেল, এতগুলো মানুষ মারা গেল, স্বাধীন একটা দেশ হল, কেউ একটা ভালো ছবি বানাতে পারল না। এটি আমাকে সবসময় অসম্ভব রকম কষ্ট দিত। এরশাদ সরকার যখন ছবি তৈরির কথা ভাবলেন, তখন আমি ছবির স্ক্রিপ্ট তাদেরকে দিতে চাইলাম, আমার মুক্তিযুদ্ধের একটি উপন্যাস—১৯৭১-এর। তারা সে ছবিটি করতে রাজি হলেন না।

বাংলাদেশ সরকার চাচ্ছিলেন এমন একটি ছবি যেখানে এই মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারগুলো থাকবে না। এখানে অনেক বিতর্কিত ব্যাপার আছে যেগুলো নিয়ে ছবি করার সাহস সম্ভবত সে সরকার অর্জন করতে পারেন নি। যে কারণে আমাকে শঙ্খনীল কারাগার-এর স্ক্রিপ্ট দিতে হল। এ ছবিটি বানাতে অনেক টাকা পয়সা লাগে। সে টাকা পয়সার জন্য অনেক ধনী ব্যক্তির কাছে হাত পেতেছি।

আমি একা না, আমি তো ধনী মানুষদের বেশি চিনি না। ধনী মানুষদের চেনে আসাদুজ্জামান নূর। নূরকে সঙ্গে নিয়ে আমি এদেশের অনেক ধনী লোকের কাছে গিয়েছি। কেউ টাকা-পয়সা দিতে রাজি হয় নি। কিন্তু আমি স্ক্রিপ্ট তৈরি করেছি প্রায় তিন বছর হল। আমি কোন ফিল্মমেকার না। গাদাগাদি ছবি তৈরি করবো না। আমি একটিই ছবি বানাবো। মুক্তিযুদ্ধের ছবি। এক পর্যায়ে আমি একটি মিটিং করে আমার প্রকাশকদেরকে বললাম আমার স্বপ্নের কথা। তাদের সাহায্য চাইলাম। আমার বিশজন প্রকাশক আছে। তাদেরকে বললাম, আপনারা ছবির প্রযোজক হয়ে যান। ২ লাখ টাকা করে আমাকে দেন। তারা বলল, হ্যাঁ ঠিক আছে। এই প্রথম ভরসা পেলাম যে, না, ছবিটা আমি করতে পারব। টাকার অভাবে আমি আটকে থাকব না।

সাজ্জাদ

আপনি তো প্রথমে ১৯৭১ নিয়ে ছবি করতে চেয়েছিলেন, পড়ে তাহলে ১৯৭১-কে বাদ দিয়ে আগুনের পরশমণি নিয়ে করার কারণটা কী?

হুমায়ূন

এর কারণটা আগুনের পরশমণি-র পুরো ব্যাপার একটা ঘরের ভেতরে ঘটে। এতে আমার টাকা-পয়সা অনেক কম লাগবে ছবিটি বানাতে। ১৯৭১-এর যে বিশাল পটভূমি তাতে আমার জন্য জিনিসটা অনেক ব্যয়বহুল হয়ে যাবে। এবং অনেক জটিলও হয়ে যাবে।

সাজ্জাদ

এবং একটা মিষ্টি প্রেমের ব্যাপারও আছে এতে, তাই না?

হুমায়ূন

আগুনের পরশমণি মূলত একটি প্রেমের উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধটা সেখানে পটভূমি হিসেবে কাজ করছে।

রাইসু

আপনার কি মনে হয় যদি ১৯৭১ নিয়ে ছবি করতেন তাহলে দর্শক একটু কম পেতেন ।

হুমায়ূন

দর্শক বেশি পেতাম কি কম পেতাম এটা কিন্তু আমার মাথার মধ্যে ছিল না। আমার মাথায় ছিল কোনটাতে টাকা কম লাগবে। আমার প্রধান সমস্যাটা হচ্ছে অর্থ। কোন ফিল্মমেকার যদি তার পুরো ক্ষমতা ব্যবহার করতে চান তাহলে আসলে তার উচিত ১৯৭১ নিয়েই ছবি করা। আর আমার অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতা তো একটা রয়েই গেছে।

humayun-113

‘আগুনের পরশমণি’ ছবির দৃশ্য।

রাইসু

বড়ো পর্দায় আপনার ভীতি কী কী?

হুমায়ূন

বড়ো পর্দায় আমার ভীতি তেমন কিছু নেই। আমি মানুষটা ছোটখাটো হলেও আমার সাহসের অভাব কোনো কালেই ছিল না। টেলিভিশন কিছুই না, আসল জিনিস হচ্ছে বড়ো পর্দা। ভীতির কথাবার্তা অনেকে বলেন, আমি তার কোনো রকম কারণ দেখি না। দুটোই ক্লোজআপ মিডিয়া। বড়ো পর্দার ডেপথ অফ ফিল্ড অনেক বেশি। এ ব্যাপারটি ছোট পর্দায় নেই। বড়ো পর্দাটা ৩৬০ ডিগ্রি এঙ্গেলে কাজ করে। টেলিভিশন ক্যামেরা ঘোরে ১৮০ ডিগ্রিতে।

রাইসু

আপনার নাটক থেকে ছবিটাকে আলাদা করবেন কীভাবে?

হুমায়ূন

নাটক থেকে ফিল্মকে আলাদা করার কোনো প্রয়োজন দেখি না। আসলে তো এটা একটা শিল্পমাধ্যম। ‘খাদক’ নামে আমি একটি গল্প লিখলাম। এই গল্পকে আমি ট্রান্সফার করলাম টেলিভিশন পর্দায়। এই গল্পকেই আমি নিয়ে এলাম বড়ো পর্দায়। এই নিয়ে আসার ব্যাপারটি ঘটে যাচ্ছে সেখানে। এছাড়া বাকি যেগুলো সেগুলো তো টেকনিক্যাল ব্যাপার।

সাজ্জাদ

কিন্তু আপনি যখন লিখছেন তখন কাজ করছেন ভাষা নিয়ে, যখন আপনি টিভিতে যাচ্ছেন আপনার চোখটা তখন অংশগ্রহণ করছে।

হুমায়ূন

লেখার ব্যাপারে একটা সুবিধা হল কী, আমি যখন লিখি, যাদেরকে নিয়ে লিখছি ওদেরকে আমি দেখাচ্ছি না। পাঠক একটা সুবিধা পাচ্ছে, সে নিজের মতো করে ওদের কল্পনা করতে পারছে। কিন্তু যখন ওদেরকে আমি পর্দায় দেখাচ্ছি তখন পাঠককে সীমাবদ্ধ করে ফেলছি। আমি যেরকম জিনিসটাকে উপস্থিত করেছি পাঠককে সেরকমই দেখতে হবে। এর বাইরে সে যেতে পারছে না।

সাজ্জাদ

আপনার মিসির আলীকে নাটকে নিয়ে আসা উচিত হয় নি সেক্ষেত্রে। আপনি তাকে খুন করেছেন।

হুমায়ূন

হ্যাঁ। মিসির আলীকে নাটকে নিয়ে আসা একটা সমস্যার তৈরি করেছে। এটা মিসির আলী না হয়ে প্রফেসর শঙ্কু হয়ে গিয়েছে।

সাজ্জাদ

লিখতে লিখতে হঠাৎ করে আপনার অডিও-ভিস্যুয়াল মিডিয়ার প্রতি আগ্রহটা জন্ম নিল কেন?

হুমায়ূন

৭১/৭২ সালের কথা। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ সময়কার ছাত্র। সেসময় আনিস সাবেত ছিল আমার বন্ধু।

সাজ্জাদ

আপনারা তো পরিকল্পনা করেছিলেন যে বিয়ে করবেন না।

হুমায়ূন

আমি, আনিস সাবেত এবং আহমদ ছফা আমাদের তিনজনের একটা পরিকল্পনা ছিল যে আমরা বিয়ে-টিয়ে কিছুই করবো না। আমরা সাহিত্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করবো। এদের মধ্যে আমি বিয়ে করে ফেলেছি।

রাইসু

আর একজন বিয়ে করার সুযোগ পান নি।

হুমায়ূন

আর একজন মারা গেলেন বিয়ে করার আগেই, আনিস সাবেত। ছফা ভাই এখনো করেন নি। অবশ্য আনিস সাবেত বিয়ের বয়স পার করেই মারা গেছেন। আনিস সাবেতের ছবির প্রতি অসম্ভব আকর্ষণ ছিল। সেসময়ে ছবির শর্ট কোর্স দেওয়া হত, সেগুলো তিনি সব নিতেন। আমার কাছে টাকা-পয়সা ছিল না। সে সমস্ত কোর্স নেওয়ার সঙ্গতি আমার ছিল না। উনার আমার চেয়ে বেশি টাকা-পয়সা ছিল, উনি টাকা-পয়সা দিয়ে ঐ কোর্সগুলি নিতেন। বইপত্র আনতেন। কোর্সের সময় অনেক রকম জিনিসপত্র সাপ্লাই করতো সেগুলি তিনি নিয়ে আসতেন।

যেহেতু আমরা পাশাপাশি রুমে থাকি সেজন্যে রাত ৯টা বা ১০টার পরে বসে বসে সব আলাপ আলোচনা করতাম। আমরা ঠিক করতাম কীভাবে ছবি বানাবো। এই ছিল আমাদের সেই প্রথম যৌবনের কল্পনা। আনিস সাবেত যখন বিদেশে, কানাডায়, ছবি বানালেন একটা। আমাদের যে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল তিনি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করলেন। তিনি একটি শর্ট ফিল্ম বানালেন। ফিল্মটির নাম হচ্ছে মন মোর মেঘের সঙ্গী। রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গানটি তিনি পিকচারাইজশন করলেন। সেটি জার্মানির ফিল্ম ফেস্টিভালে অনারেবল মেনশন পেলো। কাজেই আনিস সাবেত তার কথা রাখলেন। আর এই মিডিয়ার প্রতি আমার আগ্রহের কারণ হল আমি দীর্ঘদিন টেলিভিশন নিয়ে কাজ করেছি। ওখানে দেখেছি অনেক সমস্যা আছে, অনেক মজার ব্যাপারও আছে ।

সাজ্জাদ

আপনি নাকি রাগারাগি করেন নাটক করার সময়?

হুমায়ূন

না, রাগারাগি না—আমার বদনাম আছে যে, আমি ‘খুব’ রাগারাগি করি। আসলে আমি খুব সফট…

সাজ্জাদ

কোথাও হেঁটে যাচ্ছেন বা বসে আছেন তখন ভক্তদের নিয়ে নানারকম ঝুটঝামেলা নিশ্চয়ই হয়। মাঝে মাঝে নিশ্চয়ই বিরক্তিও লাগে। তখন আপনার রাগ হয় না, উল্টাপাল্টা কিছু করেন না?

হুমায়ূন

রাগ আসে। রাগ আসলে রাগটা চেপে রাখতে হবে এ কথা মনে থাকে না আমার। রাগ আসলে রাগটা চেপে রেখে একটা ভালো কিছু করতে হবে, আমার এ কথা মনে হয় না। আমি অবশ্যই রাগ করি।

রাইসু

কীভাবে?

হুমায়ূন

চিল্লাচিল্লি, হৈ-চৈ করি। একটা ঘটনা বলি। আমরা টেকনাফ থেকে ফিরছি মাইক্রোবাসে। বাসটি প্রায় ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার বেগে যাচ্ছে। আমাদের সামনে সামনে যাচ্ছে একটা পাজেরো। পাজেরো গাড়ি তো খুব দ্রুত স্পিড নিতে পারে, তো আমাদের চেয়ে বেশি স্পিডেই যাচ্ছে। আমরা নিরাপদ দূরত্ব রেখেই যাচ্ছি। হঠাৎ করে পাজেরো জিপটি রাস্তার মাঝখানে ব্রেক করে থেমে গেলো।

আমার ড্রাইভারের নিজের গাড়িটিকে থামাতে অসম্ভব রকম বেগ পেতে হল। যেহেতু সে ছিল খুবই এক্সপার্ট একজন ড্রাইভার, সেহেতু গাড়িটা বাঁচাতে পারল। পাজেরো জিপের ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করা হল সে এরকম করলো কেন। সে বলল, যা করছি, ঠিক করছি। আসল কারণ হচ্ছে ঐ গাড়িটায় এক জাপানি ভদ্রলোক যাচ্ছিল। বড়ো কর্তাব্যক্তি একজন। সেই জাপানী কর্তা ব্যাক্তি রাস্তায় দেখতে পেয়েছে তার পরিচিত লোক, ড্রাইভারকে সে গাড়ি থামাতে বলেছে। আর ড্রাইভারের হয়েছে কি, এত্ত বড়ো একজন লোককে সে সঙ্গে নিয়ে ঘুরছে- একটা মাইক্রোবাসের একজন লোককে তার পাত্তা দেওয়ার কি আছে! তো ড্রাইভার তখন উল্টাপাল্টা কথা বলছে। আমার সঙ্গে যারা ছিলেন তারা চাচ্ছেন ঝামেলাটা চলে যাক।

আমি অনেকক্ষণ চুপ করে রয়েছি। হঠাৎ মনে হল, না এটা তো হতে দেওয়া যায় না। কী হয়েছে আরোহী জাপানী বলে। আমি গাড়ি থেকে নেমে আসলাম। তখন কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা। টেকনাফে জাহাজ থেকে লাফ দিয়ে নামার সময় কোমরে ব্যথা পেয়েছি। আমি বাঁকা হয়ে নেমে আসছি। হঠাৎ জাপানি দেখল, বাঁকা একটা লোক গাড়ি থেকে নেমে আসছে আমি তাকে বললাম, এই ড্রাইভারটিকে আমরা থানায় নিয়ে যাবো। এই বদ ড্রাইভারকে। জাপানি ভদ্রলোক আমাকে বলার চেষ্টা করলেন, আমার তো কোনো দোষ নেই।

শুরুতে পাত্তাই দিলেন না জাপানি ভদ্রলোক। তারপর আমি তাকে কঠিনভাবে বললাম, জানেন, মস্তবড় মেজর এক্সিডেন্ট হতে যাচ্ছিলো? এ লোকটি সেটি উপেক্ষা করেছে। সে দেখেছে যে এতো স্পিডে একটি গাড়ি আসছে, তারপরও সে অশালীন ব্যবহার করছে। আমি একে ছাড়ব না। আমি একে ধরে নিয়ে যাবো থানায়। এই সময় একদল ম্যাজিস্ট্রেট যাচ্ছিলেন পথ দিয়ে। ম্যাজিস্ট্রেট হলে তো হুমায়ূন আহমেদকে চেনার কথা। অবস্থা তখন নিতান্তই নাকি জোরালো। আমি তো কিছুতেই ছাড়ব না। জাপানিকে সুদ্ধ ধরে নিয়ে যাবো থানায়।

রাইসু

আপনি বার বার থানায় যেতে চান কেন?

হুমায়ূন

কারণ আমাদের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আছে, ওরা দেখবে। আমি যদি ধরে মার দেই, তো চিল্লাবে ।

সাজ্জাদ

অনেক পাগলামি আছে আপনার মধ্যে।

হুমায়ূন

না, পাগলামি ঠিক না। যে কোনো লোকই এ পরিস্থিতিতে এরকম করবে।

রাইসু

সাহিত্যের কোনো ব্যক্তিত্ব দিয়ে কি আপনি মোহাবিষ্ট বা তার মতো হওয়ার কোনো ইচ্ছা আছে?

হুমায়ূন

কেউ তো কারো মতো হতে পারে না। একজন হুমায়ূন আহমেদ হুমায়ূন আহমেদই থাকেন। একজন হুমায়ূন আহমেদ কখনো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হবেন না।

রাইসু

না, ব্যক্তিজীবনের কথা বলছি।

হুমায়ূন

ব্যক্তিজীবনে? এ সমস্ত বড়ো বড়ো লেখকদের ব্যক্তিজীবন সবসময় যে খুব আকর্ষণীয়, তা কিন্তু না।

রাইসু

যেমন ধরুন রবীন্দ্রনাথ ঘুরছেন বেশ, নৌকায় করে।

হুমায়ূন

রবীন্দ্রনাথের এই অংশগুলো আমাকে প্রচণ্ড আকর্ষণ করে তো বটেই। যে কারণে অয়োময়-এর মীর্জা বজরাতে ঘুরে বেড়াতো। কী জন্যে? কারণ শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথেরও বজরা ছিল। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন জমিদার। অয়োময়-এর জমিদার চরিত্রটা তৈরি করার সময় আমার মাথায় ছিল শিলাইদহের রবীন্দ্রনাথ।

রাইসু

আচ্ছা আপনার প্রথম দিককার উপন্যাসের সঙ্গে এখনকার উপন্যাসের তো একটা পার্থক্য হয়েছে। এটা কী রকম?

সাজ্জাদ

নবনী থেকে আপনার লেখা নতুন একটা বাঁক নেয়া শুরু করেছে। জীবনের কুৎসিত দিক এখন আসছে প্রবলভাবে।

হুমায়ূন

আনতাম না হয়তো বলাটা ঠিক না। নন্দিত নরক-এ তো ছিল ।

সাজ্জাদ

আপনি পরোক্ষভাবে আনতেন।

রাইসু

আমার মনে হয় সবচেয়ে সাহসীভাবে নন্দিত নরকেই ছিল।

সাজ্জাদ

এবারে যে বইগুলো বেরিয়েছে সেগুলোর মধ্যে যখন গিয়েছে ডুবে পূর্ণিমার চাঁদ-এর কথা ধরা যাক। একটা চরিত্র আছে যে মর্বিড একটা চিন্তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পুরো উপন্যাসে। পড়ে মনে হয়েছে লিখতে গিয়ে আপনি নিজে সাফার করছেন। কারণ এতে আপনি অভ্যস্ত নন। সেজন্যে একদম শেষে ওর বাবার চরিত্রটা আসছে। আসলে বাবার চরিত্রটা এনে আপনি নিজে একটু রেহাই পেলেন।

হুমায়ূন

আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি মর্বিডিটি মানুষের অর্জিত একটা ব্যাপার। জন্মগতভাবে মানুষ মর্বিড না। একটা মানুষকে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মর্বিড দেখানোর আমি পক্ষপাতি না। আমি মনে করি শুদ্ধতম চেতনা নিয়ে আমরা পৃথিবীতে এসেছি। যেসব মর্বিডিটি আমরা পাচ্ছি, সেগুলো আমরা সঞ্চয় করেছি। আমাদের মধ্যে সেগুলো দিয়ে পাঠানো হয় নি। যে জিন নিয়ে আমরা এসেছি তার মধ্যে কোনো মর্বিডিটি ছিল না ।

সাজ্জাদ

বিভিন্ন ছেলেরা পড়ছে, তাদের ওপর প্রভাব পড়ছে আপনার। আপনি কি দায়িত্ব অনুভব করেন না যে আপনার কলমের ওপর এতোগুলো ইয়াং জেনারেশনের রুচি নির্ভর করছে? চাপ অনুভব করেন না লিখতে গিয়ে?

হুমায়ূন

লেখাটা কীভাবে তৈরি হয় আমি সেটার ব্যাখা করতে পারবো না। তৈরি হবার পদ্ধতিটি আমি নিজেও পরিষ্কারভাবে জানি না। একটা লেখা যখন আমার মধ্যে আসে তখন সমস্ত মাথা জুড়ে ঐ লেখাটাই থাকে। আর কিছুই থাকে না। শয়নে স্বপনে ঐ লেখাটাই মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে। যখন লেখাটা বের হয়ে চলে যায় তখন মনে হয় মাথার ওপর যেন কেউ বড় একটা পাথর চাপিয়ে রেখেছিলো, পাথরটা সরে গেলো। আমার লেখালেখির ধরণটা হলো কীভাবে পাথরটা সরিয়ে ফেলা যায়। এই পাথরটা সরানোর দিকেই আমার নজর থাকে বেশি। কে এটা নিয়ে কী ভাবছে, কোনো সমালোচক এটা নিয়ে কী বলবে, কে আমাকে ধুয়ে ফেলবে, কে বলবে এটা বাজে হয়েছে—এটা মাথার মধ্যে থাকে না।

রাইসু

কারো কথা মাথায় রেখে কি লেখেন?

হুমায়ূন

না, নিজের দিকে তাকিয়ে লিখি ।

সাজ্জাদ

চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান না?

হুমায়ূন

পুরোপুরি একাত্ম হয়ে যাই বলে মনে করি ।

সাজ্জাদ

তাহলে চরিত্রগুলো যে মেরে ফেলেন, খারাপ লাগে না?

হুমায়ূন

খারাপ লাগে তো বটেই। অনেক সময়েই খারাপ লাগে। কুসুম বলে একটা নাটক হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে আমি লিখি। নাটকটি যখন রেকর্ডিং হয় তখন আমার চোখে এতোই প্রবল পানি আসে যে ওখানে যারা ছিলেন তারা বললেন, হুমায়ূন আহমেদকে সরিয়ে নিয়ে যাও। খুব খারাপ লাগছিলো। এটা হয় চরিত্রগুলোর একাত্মতার কারণে। এটা শুধু আমার একার হয় না, আমি মনে করি সবারই হয়।

সাজ্জাদ

লেখার সময় তো বুঝতে পারেন যে চরিত্রটার নিয়তি এমন হয়ে যাচ্ছে। ইচ্ছে করলে তখন আপনি তার নিয়তি বদলে দিতে পারেন। কারণ আপনার হাতে কলমটা আছে। এরকম আবেগময় মুহূর্তে আপনাকে নিজের বিরুদ্ধে নিজের লড়তে হচ্ছে। আপনার একটা আবেগের সাথে আরেকটা আবেগ লড়াই করছে তখন।

হুমায়ূন

বলা হয়ে থাকে যে লেখকদের হাতে যেহেতু কলম থাকে, লেখক যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন। আসলে লেখক যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন না। ঘটনা যখন দাঁড়িয়ে যায়, চরিত্র যখন তৈরি হয়ে যায় তখন ওদের একটা নিজস্ব জীবন এসে যায়। ওরা নিজেদেরকে নিজেরা নিয়ন্ত্রন করে। আমার কোনো কিছু করার থাকে না। ইচ্ছা থাকলেও আমি পারি না।

রাইসু

অনেক উপন্যাস তো আপনি লিখেছেন। একেকটা চরিত্রের একেকটা জগৎ আছে আপনার কাছে। এদের প্রত্যেকের জগতই কি আপনি অনুভব করতে পারেন?

হুমায়ূন

না, কিছু কিছু আছে যেগুলো অনুভব করতে পারি না। সেগুলো লিখতেই বেশি আনন্দ পাই। যেমন সায়েন্স ফিকশনে অনুভব করতে পারি না। সায়েন্স ফিকশনের জগতটি কল্পনার। সেটি এই পৃথিবীর জগত দিয়ে অনুভব করতে পারি না। কল্পনা দিয়ে সেটিকে ছোঁয়া হয়। অনেক বেশি আকর্ষণীয় সেটি। সেখানে আমি অনেক বেশি স্বাধীনতা পাই। সেখানে আমি আমার কল্পনাকে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে পারি।

রাইসু

সায়েন্স ফিকশনে আপনাকে নিয়ন্ত্রন করে কে?

হুমায়ূন

বিজ্ঞান। কোনো কোনো সময় কল্পনাও নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা মনে করি যে, বিজ্ঞান বোধহয় কল্পনাকে প্রশ্রয় দেয় না। বরং বিজ্ঞানই কল্পনাকে মুক্তি দেয়। রুপকথা লেখার যে আনন্দ আছে, আমার মনে হয় একজন সায়েন্স ফিকশন লেখক সে আনন্দটা পান।

সাজ্জাদ

সায়েন্স ফিকশন হচ্ছে আধুনিক সময়ের রূপকথা।

হুমায়ূন

বলা যেতে পারে একটি আধুনিক, অত্যন্ত আধুনিক রূপকথা। যে রূপকথা, রূপকথা নাও হতে পারে। আমরা জানি, দৈত্যের প্রাণ কখনোই ভোমরার ভেতর থাকবে না। কিন্তু সায়েন্স ফিকশনের যে দৈত্য আমরা পাই তার প্রাণ যদি ভোমরার মধ্যে থাকে, তাহলে আমাদের ধরে নিতে হবে এটা সম্ভব ।

সাজ্জাদ

আপনার নিজের তৈরি কোনো চরিত্রের মতো হওয়ার চেষ্টা করেন না?

হুমায়ূন

খুব সচেতনভাবে এটা নিয়ে চিন্তা করি নি। এখন মনে হচ্ছে, আমার মনে হয় না সেরকম। বরং যখন দেখি এই চরিত্রগুলোর দ্বারা কেউ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তখন আমার হাসিই পায়। কোনো ছেলে যদি রাত্রিবেলা এসে বলে যে, আমি হিমু, আমার কাছে মনে হয় এ ছেলেগুলো এরকম করছে কেন?

রাইসু

তাদের মধ্যে এরকম একটা ব্যাপার হয়তো আগেই ছিল। আপনি তাদের শুধু ধরিয়ে দিলেন।

হুমায়ূন

হয়তো আমাদের সবার মধ্যে একটা করে হিমু আছে।

রাইসু

আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? অবশ্য ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঐভাবে জিজ্ঞাসা করাও উচিত না। কারণ আপনার ভবিষ্যৎ তো আর অতো ক্ষুদ্র না। আরো অনেকদিন তো আপনি বাঁচবেন ।

হুমায়ূন

আমার ভবিষ্যৎ তো আর আমার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে না। আমরা ভবিষ্যতেও বাস করি না, অতীতেও বাস করি না। আমরা বর্তমানে বাস করি। আমি মনে করি আমি বাস করি বর্তমানে।

রাইসু

বলা যায় আমরা বর্তমানে বাস করে থাকি।

হুমায়ূন

আমার প্রতিটি মুহূর্তই বর্তমান। আমার জীবিত জীবনে এমন কোনো মুহূর্ত নেই যে মুহূর্ত অতীত বা ভবিষ্যৎ।

সাজ্জাদ

নিজের বিরুদ্ধে আপনার অভিযোগগুলো বলুন?

হুমায়ূন

আমার লেখার বিরুদ্ধে?

সাজ্জাদ

আপনার লেখার বিরুদ্ধে, আপনার নিজের বিরুদ্ধে?

হুমায়ূন

কিছু কিছু লেখাতে, আমি জানি, যদি আরেকটু সময় দেই, আরেকটু বেশি চিন্তা করি, আরেকটু ঠাণ্ডা মাথায় লিখি, খুব সুন্দর করে আমি শেষ করতে পারি। এমনও না যে সে সময়টুকু আমার নেই। এমন না যে আমার ইচ্ছার অভাব আছে। কিন্তু আমার সময়টুকু দিতে ইচ্ছা করে না। এক ধরনের অস্থিরতা অনুভব করি। এক ধরনের চাপ বোধ করি। পাথরের চাপটা বোধ করি। এবং দ্রুত শেষ করে ফেলি। একবার শেষ করে ফেলার পর মনে হয়, এটা কী করলাম?

সাজ্জাদ

এ জন্যই বোধহয় কোনো কোনো চরিত্রকে আপনি পরে আরেকটা উপন্যাসে নিয়ে আসেন?

হুমায়ূন

হ্যাঁ, কাহিনীটা হয়তো পুরোটা বলা শেষ হয়নি, তখন আমার বলতে ইচ্ছা করে। একটা চরিত্রের জন্যে একটা উপন্যাস হওয়াই বাঞ্ছনীয়। একটা চরিত্রের জন্য চৌদ্দটা উপন্যাস হওয়ার কোনো মানে নেই। কিন্তু একটা চরিত্রের জন্য আমার চৌদ্দটা উপন্যাসই লিখতে ইচ্ছা করে। আমি যদি ঠিকঠাক মতো একটি হিমু লিখতে পারতাম, তাহলে চারটা-ছয়টা হিমু লিখতে হতো না। নিজের লেখা সম্পর্কে আরেকটা ব্যাপার আমাকে কষ্ট দেয়। সেটি হলো, একটা লেখা লেখার জন্য যে পরিমাণ প্রস্তুতি আমার থাকা দরকার, যে পরিমাণ পড়াশোনা নিয়ে আমার একটা লেখা লিখতে যাওয়া উচিত, ঐ জায়গাটা আমি অবহেলা করি। আমি মনে করি এটার দরকার নেই। হঠাৎ করে মনে হলো আর লেখা শুরু করলাম। কোনো রকম চিন্তাভাবনা নেই, কোনো রকম পরিকল্পনা নেই, কিচ্ছু নেই। ব্যস, লিখতে বসে গেলাম। যদি একটু পরিকল্পনা থাকতো, তাহলে অনেক ভালো হতো।

সাজ্জাদ

অনেকেরই অভিযোগ, আপনি নাক-উঁচু।

হুমায়ূন

আমি অপরিচিত লোকজনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে পারি না। একটা দূরত্ব বোধ করি। নিতান্ত পরিচিত মনে না হলে তাদের সঙ্গে রসিকতাও করি না। আমার রসিকতা সীমাবদ্ধ থাকে আমার অতি প্রিয়জনদের জন্যে। বাইরের লোকেরা আমার এই রসিকতার অংশটুকু জানে না।

আর দ্বিতীয়টি হতে পারে ইউনিভার্সিটিতে আমি মাস্টারী করি। সেখানে শুরু থেকেই যদি আমাকে ঔপন্যাসিক মনে করে নেয়, ধরে নেয় যে তার সঙ্গে ঠাট্টা-ফাজলামি করা যাবে, নাটক নিয়ে আলাপ করা যাবে তাহলে তো সমস্যা। আমি জটিল বিষয় পড়াই, কোয়ান্টাম মেকানিক্স। অমন হলে তো জটিল বিষয়ে যেতে পারবো না। আমি তাই গোড়া থেকেই অসম্ভব রকম সাবধান। ছাত্ররা আমাকে যমের মতো ভয় পায়। এ সমস্ত কারণেই মনে হয়। তা ছাড়া পরিবারের বড় ছেলে।

ছোটবেলা থেকেই বড় ছেলেদের মাথার মধ্যে থাকে যে তাদের ছোট ছোট ভাই বোন আছে। তাকে গম্ভীর হয়ে যেতে হয়। সবকিছু মিলে আমার ভেতরে নাক-উঁচু ভাব আছে বলে আমি মনে করি না। তবে নিজের লেখা সম্পর্কে আমার অহংকার অনেক বেশি।

সাজ্জাদ

আপনি তো সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না?

হুমায়ূন

যে পড়ে সমালোচনা করে তার সমালোচনা, কষ্ট লাগলেও, অত্যন্ত আনন্দের সাথে গ্রহণ করি।

১৯৯৪

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক
সাম্প্রতিক ডেস্ক