page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

ওয়েস্টওয়ার্ল্ড – ৩

আগের পর্ব প্রথম পর্ব

সিজন ১, এপিসোড ৩ – (দ্য স্ট্রে)

ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের তিন নাম্বার পর্বে আসার পরে মনে হয় এই টিভি সিরিজটাতে আসলে কয়েকটা স্টোরি লাইন একসাথে চলতেছে।

এবং এই কয়েকটা স্টোরি লাইন কোনোটাই একটা আরেকটার ওপর সিরিয়াসভাবে নির্ভর করতেছে না।

অন্তত তিনটা স্টোরি লাইন আলাদাভাবে সমান্তরালে চলছে।
১. ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর ও প্রোগ্রামারদের স্টোরি লাইন। তারা হোস্টদের কীভাবে দেখে, তাদের পরিকল্পনা কী ইত্যাদি।

২. বাইরের গেস্টদের স্টোরি লাইন। তাদের কাছে পুরো ওয়েস্টওয়ার্ল্ড বিনোদন বা গেমের বেশি কিছু না, তারা হোস্টদেরকে অত সিরিয়াসভাবে দেখেও না।

৩) ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের হোস্টদের স্টোরিলাইন। ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের হোস্টদের জটিলতা, আগের প্রোগ্রাম বিচ্ছিন্নভাবে মনে পড়া ইত্যাদি। তবে এই তিন নাম্বার স্টোরিলাইনের ভিতরেই আবার ছোট ছোট কয়েকটা স্টোরিলাইন তৈরি হচ্ছে।

এই প্রধান তিনটা স্টোরিলাইনের যোগসূত্র একটাই। ওয়েস্টওয়ার্ল্ড থিম পার্ক। এই প্রধান তিনটা স্টোরি লাইনের প্রতিটার সাথে প্রতিটার সম্পর্ক আছে, তবে একটা আরেকটাকে প্রভাবিত করে না।

তবে কাহিনি এরকম থাকবে না, যতদূর মনে হয়। এই তিনটা স্টোরিলাইনই একটা আরেকটার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠবে।

movie-review-logo

তবে ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের সবগুলি কাহিনিই একটা কমন আইডিয়াকে ফোকাস করে আগাচ্ছে। ওয়েস্টওয়ার্ল্ড টিভি সিরিজের দার্শনিক কেন্দ্র এটাই—হোস্টরা আসলে কতটুকু মানুষ বা কতটুকু হিউম্যান বিইং হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।

ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের প্রধান ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর রবার্ট ফোর্ড আপাতভাবে দাবি করছেন ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের হোস্টরা স্ট্যাটিক, প্রোগ্রামের এক চুল বাইরেও এরা যেতে পারে না, এরা মানুষের চেয়ে অনেক কম; অন্যদিকে হোস্টদের আচার আচরণ এবং বিভিন্ন কাজে সব সময়ই একটা ইঙ্গিত থাকে যে এদের প্রোগ্রাম যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে।

এখান থেকে অবশ্য আরেকটা পয়েন্ট সামনে চলে আসে, মানুষ ঠিক কোন জিনিসটার কারণে মানুষ? মানুষের চেতনা বা কনসাশনেস? এই কনসাশনেসের কারণেই কি মানুষ রোবট বা ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের হোস্টদের মত স্ট্যাটিক না? এই কনসাশনেসের কারণেই কি মানুষের আচরণ সীমাবদ্ধ না বা ডাইন্যামিক?—এই ধরনের প্রশ্ন ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের কাহিনিতে খুব সূক্ষ্মভাবে আছে।

বিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন যে খুব উন্নত ধরনের আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স মানব জাতির জন্য বিপদ বয়ে আনতে পারে।

westword3bএটা আসলে সত্য। একেবারে সম্পূর্ণ অটোনোমাস আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স অর্থাৎ সব কিছুই বুঝতে পারে এবং সব ব্যাপারে নিজে নিজেই চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এমন আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স যদি তৈরি করা সম্ভব হয়, তা নিশ্চয়ই মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।

ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের হোস্টেরা কি এমন ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছে যেখানে এদের প্রোগ্রামাররা আর এদের প্রোগ্রাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেছে না? ইনটেলিজেন্সের বিবেচনায় ভবিষ্যতে কি আসল মানুষের সাথে তাদের আর কোনো পার্থক্য থাকবে না?

তিন নাম্বার পর্ব দেখার পর আমার কাছে এই অনুমানটা জোরালো হয়ে উঠছে। অথবা এই তিন নাম্বার পর্ব ‘দ স্ট্রে’তে এমন কিছু জিনিস আছে যার কারণে এই দিকে অনুমান করা সুবিধাজনক।

দুই নাম্বার পর্বে কাহিনি যে জায়গায় জমে উঠেছিল সেই রহস্যময় গেস্টের একটা মেজ খুঁজে বেড়ানো, এক হোস্টের গলায় দড়ি দিয়ে তার কাছে থেকে একটা নকশা বা মেজের সন্ধান চাওয়া—এই পর্বে কাহিনি আর সেদিকে আগায় না।

রবার্ট ফোর্ড এই পর্বে ডোলরসের প্রেমিক টেডির আগের স্টোরি বা মেমোরি কিছুটা এডিট করে দেয়। এতে ওয়েস্টওয়ার্ল্ড পার্কের গল্পে আরেকটা মোচড় যোগ হয়। ওয়ায়েত নামে একজন কুখ্যাত রহস্যময় চরিত্রের কথা মনে পড়ে টেডির। টেডি যখন আর্মিতে ছিল তখন ওয়ায়েত ছিল তার সার্জেন্ট, তার বন্ধু। হঠাৎ ওয়ায়েত বদলে যায়। টেডির ভাষায়, “হি কেইম ব্যাক উইদ সাম স্ট্রেন্জ আইডিয়াস।” ওয়ায়েতের স্ট্রেন্জ আইডিয়া হল, ওয়ায়েত দাবি করে এই জায়গার মালিক এখানকার পুরাতন বাসিন্দারা না, এখানকার নতুন বাসিন্দারাও না। ভবিষ্যতে এমন অদ্ভুত কিছু ঘটবে তা থেকে এই জায়গার মালিক কে তা নির্ধারিত হবে।

এই পর্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, একজন হোস্টের নিখোঁজ বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। এই কারণেই এই পর্বের নাম ‘দ্য স্ট্রে’ বা দলছুট। সেই হোস্টকে খুঁজে উদ্ধার করার জন্য দুই প্রোগ্রামার অ্যাশলে স্টাব ও এলসি হিউজেসকে পাঠানো হয়। সেই হোস্টের শখ ছিল বিভিন্ন জন্তুর ছোটো ছোটো ভাস্কর্য বানানো। সেই হোস্টের পরিত্যক্ত বাড়িতে গিয়ে অ্যাশলে ও এলসি অনেক ভাস্কর্যের মধ্যে একটা অরিয়ন বা কালপুরুষ নক্ষত্রের নকশা খুঁজে পায়। অথচ নক্ষত্রের ব্যাপারে আগ্রহ দেখানোর মত কিছু সেই হোস্টের ভিতরে প্রোগ্রাম করা নেই।

সেই হোস্টকে এক জায়গায় আটকে পড়া অবস্থায় খুঁজে পায় এলসি ও স্টাব। সেই হোস্টকে উদ্ধারের সময় একটা পর্যায়ে এলসিকে খুন করার চেষ্টা করে সে। অল্পের জন্য বেঁচে যায় এলসি, তাকে আঘাত করার আগেই কলাপস করে সেই হোস্ট।

westword3dআমার কাছে এই তিন নাম্বার পর্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা প্রধান ক্রিয়েটিভ ডিজাইনার রবার্ট ফোর্ড ও প্রধান প্রোগ্রামার বার্নাডের আলাপ। ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইনফরমেশন আছে এই আলাপে। এর আগে মানুষের কনসাশনেস ও হোস্টদের ভবিষ্যৎ ইন্টেলিজেন্স নিয়ে যে কথাগুলি বলেছিলাম সেটা দুজনের এই আলাপকে উদ্দেশ্য করেই।

বার্নাড ফোর্ডকে জানায়, প্রোগ্রামে সমস্যা হওয়া ওয়াল্টার নামের এক হোস্ট বার বার আরনল্ড নামের একজন কাল্পনিক লোকের সাথে কথা বলে। যতবারই ওয়াল্টারের প্রোগ্রাম এডিট করা হয়েছে এটা বন্ধ হয় নি।

ফোর্ড বলে, এই পার্ক চালু করার আগে, কোনো গেস্ট এই পার্কে পা রাখার আগে, বর্তমান প্রোগ্রামাররা এই পার্কে যোগ দেওয়ারও আগে টানা তিন বছর তারা হোস্টদের বানিয়েছে। রবার্ট ফোর্ড, একদল ইঞ্জিনিয়ার এবং ফোর্ডের একজন পার্টনার। সেই পার্টনার নিজেকে রেকর্ডে রাখতে আগ্রহী ছিলেন না। তার নাম আরনল্ড।

ফোর্ড বলে, শুরুর দিকের সেই বছরগুলি অসাধারণ ছিল। কোনো গেস্ট ছিল না, কোনো বোর্ড মিটিং ছিল না, ওই সময়টা ছিল পিওর ক্রিয়েশনের।

প্রথম বছরেই হোস্টেরা টিউরিং টেস্ট পার হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আরনল্ড আরো বেশি কিছু চাইত। হোস্টদের প্রোগ্রাম অনুযায়ী কাজ করা দেখেই আরনল্ড খুশি ছিল না। সে বাস্তব কিছু চাইত। সে হোস্টদের মধ্যে কনসাশনেস তৈরি করতে চেয়েছিল।

আরনল্ড মানুষের অন্তর্গত বুদ্ধিবৃত্তিক গঠনকে একটা পিরামিডের মডেলে দেখত। পিরামিডের সবার নিচের স্তরে মেমোরি বা স্মৃতি, তার উপরের স্তরে ইম্প্রোভাইজেশন বা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, তার উপরের স্তরে সেলফ ইন্টারেস্ট বা নিজের ব্যাপারে আগ্রহ এবং সবার উপরের স্তরটিতে কি তা আরনল্ড পুরোপুরিভাবে বের করতে পারে নি। তারা ধারণা করেছে, সবার উপরের স্তরে—কনসাশনেস।

আরনল্ডের এই কনসাশনেস থিওরির সাথে প্রাচীন মানুষের আইডিয়াগত মিল আছে। প্রাচীণ মানুষ মনে করত তাদের কনসাশনেস হল ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর।

কনসাশনেসের এই আইডিয়া দিয়ে মানুষের অন্তর্গত বুদ্ধিবৃত্তিক গঠনকে থিওরেটিক্যাল ভাবে বা তত্ত্বীয় ভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

কিন্তু আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স তৈরির ক্ষেত্রে এটাকে কোনো টুল বা নকশা হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। ঠিক কোন জিনিসটার কারণে একটা আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স সম্পূর্ণভাবে অটোনোমাস হবে?

আরনল্ডের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ফোর্ড বলে, আরনল্ড এমনভাবে হোস্টদের অন্তর্গত বুদ্ধিবৃত্তিক ডিজাইন করতে চেয়েছিল যে সময়ের সাথে সাথে তাদের প্রোগ্রামই কনসাশনেসে পরিণত হবে।

ফোর্ড বলে, আরনল্ড দুইটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস বিবেচনা করে নি। এক, এই পার্কের ভিতরের হোস্টদের মধ্যে কনসাশনেস চাওয়াটা খুবই বিপদজনক। দুই, যে গ্রুপকে রেফারেন্স হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, অর্থাৎ, মানুষ, তারা নিজেদের কনসাশনেসকে তাদের সৃষ্টিকর্তার কণ্ঠস্বর হিসেবে বিবেচনা করে।

westword3c

ফোর্ড বার্নাডকে জানায়, তারা আরনল্ডের এই চিন্তা বাতিল করে দেয়।

তবে কিছু হোস্ট আরনল্ডের সেই কোডের কিছু বিচ্ছিন্ন অংশতে অ্যাকসেস পাচ্ছে। তাই তারা অদ্ভুত আচরণ করে।

ফোর্ড জানায়, এই পার্কেই আরনল্ড মারা যায়। তার ব্যক্তিগত জীবন শেষপর্যন্ত একটা ট্র্যাজেডি। তার এই কনসাশনেস খুঁজতে থাকার ব্যাপারটিকে তাকে পুরোপুরি গিলে খেয়েছে। শেষের দিকে সে কারো সাথে তেমন কথা বলত না, শুধু পার্কের হোস্টদের সাথে কথা বলত।

ফোর্ডের ভাষায়, সে হোস্টদের মধ্যে কিছু একটা দেখেছিল। হি স সামথিং দ্যাট ওয়াজ নট দেয়ার।

শেষে ফোর্ড খুব দৃঢ় ভঙ্গিতে বলে, দ্য হোস্টস আর নট রিয়াল। দে আর নট কনসাশ।—হোস্টেরা বাস্তব  না। তারা কনসাশ না।

ফোর্ড কি আসলেই এটা বিশ্বাস করে? নাকি তারও সন্দেহ আছে? বার্নাড আর দর্শকদেরকে কনভিন্স করাতে চায় যে সে আরনল্ডের চিন্তাভাবনা ভুল হিসাবে দেখে?

শেষপর্যন্ত ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হবে ফোর্ডের চিন্তাকে আংশিক বা পুরোপুরি সঠিক হিসেবে দেখানো। ফোর্ডের চিন্তা সম্ভবত আরনল্ডের থিওরির উপরেই থাকবে। জাস্ট অনুমান করলাম।

(পর্ব ৪)         

About Author

আশরাফুল আলম শাওন
আশরাফুল আলম শাওন

জন্ম টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।