page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

ওয়েস্টওয়ার্ল্ড – ৮

west001

আগের পর্ব প্রথম পর্ব

সিজন ১, এপিসোড ৮ – (ট্রেস ডিকে)

ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের আট নাম্বার পর্বের নাম ট্রেস ডিকে। ট্রেস ডিকে টার্মটা সাইকোলজির ক্ষেত্রে প্রচলিত। ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের প্রথম পর্ব নিয়ে লেখাটায় কোনো একটা প্রসঙ্গে বলছিলাম যে মানুষের ব্রেইনের সাথে টাইমের একটা সম্পর্কের রেজাল্ট-ই হচ্ছে মেমোরি।

মেমোরির ক্ষেত্রে, সময়ের সাথে ব্রেইনের সম্পর্কটা আসলে কী?

west8-dএই সম্পর্কের নাম-ই ট্রেস ডিকে। যখন কোনো স্মৃতি তৈরি হয়, এই স্মৃতি ব্রেইনে কিছু ট্রেস বা চিহ্ন রেখে দেয়। এই মেমোরি ব্রেইনে কিছু কেমিক্যাল ও ফিজিক্যাল পরিবর্তন ঘটায়, এই পরিবর্তনগুলিই ওই নির্দিষ্ট মেমোরির চিহ্ন বা ট্রেস।

আর সময়ের সাথে সাথে এই চিহ্ন বা ট্রেসগুলি ডিকে হতে থাকে অর্থাৎ মুছে যেতে থাকে। ট্রেস ডিকে হওয়ার কারণেই মানুষ কোনো কোনো স্মৃতি আর মনে করতে পারে না, ভুলে যায়। থিওরেটিক্যালি, স্মৃতি তৈরি হওয়ার ১৫-২০ সেকেন্ড পরেই ট্রেস ডিকে হওয়া শুরু হয় বা সেই স্মৃতি যে চিহ্ন তৈরি করে সেগুলির ক্ষয় হতে থাকে।

কোনো স্মৃতি তৈরি হওয়া এবং সেই স্মৃতি পরবর্তীতে মনে করার মধ্যে যত বেশি সময়ের গ্যাপ থাকে সেই স্মৃতির ট্রেস ডিকে হওয়ার রেট তত বেশি।

movie-review-logo

থিওরেটিক্যাল ফিজিক্সে থ্রি ডাইমেনশনাল ইউনিভার্সের সাথে টাইমের রিলেশন নিয়ে অনেক কথা হয়, অনেক থট এক্সপেরিমেন্ট হয়। কিন্তু কোনো ইন্ডিভিজুয়াল পার্সনের  ওপর টাইম কীভাবে কাজ করে সেটা নিয়ে তেমন কোনো কাজ দেখা যায় না। সাইকোলজি’তে হওয়ার কথা। হয় কিনা আমি জানি না।

ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের ক্রিয়েটর জোনাথন নোলান আগেও এই বিষয় নিয়ে কাজ করছেন।

ফিজিক্সে টাইমের যে ধারণা, বা সাধারণভাবেই টাইমের যে ধারণা  এবং একজন মানুষের অর্গানিক ফাংশনের সাথে টাইমের যে সম্পর্ক—এই দুইটা জিনিস একজন ইন্ডিভিজুয়াল পার্সনের ওপর কীভাবে কাজ করে সেটা নিয়ে তিনি আগে কাজ করেছেন।

আর এবারের ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের কাজটা আলাদা। ট্রেস ডিকে বা সময়ের সাথে স্মৃতির সম্পর্কটা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা হোস্টে দেওয়া হয়েছে—এটা দেখা গেছে আট নাম্বার পর্বে।

west8-e

“প্রোগ্রামারদের মত মেইভও হোস্টদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এখন।”

এই পর্বে দেখা যায়, ফোর্ডের কথামত থেরেসাকে মেরে ফেলার পর বার্নাড অনুশোচনা করতে থাকে, অপরাধবোধে ভুগতে থাকে। ফোর্ড বার্নাডকে বলে, তুমি যে অনুশোচনা বোধ করছো এটা খুব সুন্দর। এই ইমোশন নিয়ে তোমার গর্ব করা উচিৎ কারণ এই ইমোশনের কোড তুমি নিজেই লিখেছো।

ফোর্ডের নির্দেশে থেরেসা সম্পর্কিত স্মৃতিগুলি মুছে ফেলে বার্নাড।

ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের সবাই জানে পার্কের ভিতরের ডাটা বাইরে পাচার করার সময় অ্যাকসিডেন্টে থেরেসা মারা গেছে।

ল্যাবরেটরির দুই টেকনিশিয়ানকে ব্ল্যাকমেইল করে মেইভ নিজের প্রোগ্রামে আপডেট করতে থাকে। মেইভের ক্ষমতা বেড়ে যায়। প্রোগ্রামারদের মত মেইভও হোস্টদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এখন।

এই ব্যাপারটা আমার কাছে খুবই অস্বাভাবিক। ল্যাবরেটরির একজন বুচার, যে  আহত হোস্টদের ঠিকঠাক করে, কাঁটাছেড়া করে সে একটা হোস্টের দ্বারা ব্ল্যাকমেইলড হয়, তার কথামত কাজ করে, কিন্তু তাকে শাটডাউন করতে পারে না। আশা করি পরে এই অস্বাভাবিকতার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে।

west8-a

“দেখা যায় একটা আহত মেয়েকে বেঁধে রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে বাইরের গেস্ট উইলিয়াম যখন ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের বাইরের স্টেশনে পৌঁছায় তখন এই মেয়েটাই উইলিয়ামকে পার্কের সব নিয়ম কানুন ব্রিফ করেছিল।”

west8-bএড হ্যারিস—দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাক আর টেডি ওয়ায়েতের সন্ধানে যাচ্ছে। দেখা যায় একটা আহত মেয়েকে বেঁধে রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে বাইরের গেস্ট উইলিয়াম যখন ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের বাইরের স্টেশনে পৌঁছায় তখন এই মেয়েটাই উইলিয়ামকে পার্কের সব নিয়ম কানুন ব্রিফ করেছিল।

ওয়েস্টওয়ার্ল্ড নিয়ে ইতোমধ্যে একটা অনুমান চালু আছে যে এই সিরিজে কয়েকটা টাইমলাইন একসাথে চলছে। মানে, আলাদা আলাদা সময়ের গল্প প্যারালালি দেখানো হচ্ছে।

এই পর্বে, ওই মেয়েটাকে দেখা যাওয়ার পর এটা প্রায় নিশ্চিত যে অন্তত দুইটা টাইমলাইনের দুইটা স্টোরিলাইন দেখানো হচ্ছে। এক—উইলিয়াম আর ডোলোরস একটা টাইমলাইনে আছে। দুই—ম্যান ইন ব্ল্যাক আর টেডি আরেক টাইমলাইনে আছে।

একটা জায়গায় পৌঁছানোর পর ডোলোরসের ভায়োলেন্ট একটা ঘটনা মনে পড়ে। এই ঘটনা অতীতের নাকি ভবিষ্যতের তা বোঝা যায় না। ভবিষ্যতের কথা বললাম, কারণ ডোলোরস এমন কিছু মুহূর্ত দেখে যে কারণে মনে হয় এটা ভবিষ্যতের। আরো একটা ব্যাপার, ডোলোরস খুব ইমোশনাল হয়ে উইলিয়ামকে বলতে থাকে, দেন… হোয়েন আর উই? ইট’স লাইক আই অ্যাম ট্র্যাপড ইন এ ড্রিম অর এ মেমোরি ফ্রম লাইফ লং এগো। … দিস ইজ হোয়াট আরনল্ড ওয়ান্টস।

ডোলোরস আরো বলে আরনল্ড এই জিনিসটাই চাইত, আরনল্ড চাইত ডোলোরস যেন মনে করতে পারে।

আমার মনে হয় ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের এই সিজনের শেষে টাইম নিয়ে ভালো একটা টুইস্ট থাকবে।

ডোলোরসের এই ঘটনাটার কারণেই এই পর্বের নাম ট্রেস ডিকে।

বোর্ড এক্সিকিউটিভ শার্লট হেল ওয়েস্টওয়ার্ল্ড পার্কের ডাটা বাইরে নেওয়ার জন্য স্টোরি ক্রিয়েটর লি সাইজমোরকে কনভিন্সড করে।

টেডির হঠাৎ মনে পড়ে এড হ্যারিস—দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাক ডোলোরসকে অত্যাচার করেছিল। এড হ্যারিসকে বেঁধে ফেলে টেডি।

এই পর্বে দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাক তার আসল পরিচয় বলে। সে ফ্যামিলি ম্যান, তার এক মেয়ে আছে। সে বিশাল ধনী। সে পরোপকারী, ভাল মানুষ। তার স্ত্রী গত বছর মারা গেছে। স্ত্রীর মৃত্যুর পরে সে জানতে পারে, তার স্ত্রী আসলে আত্মহত্যা করেছে। তার স্ত্রী আপাতভাবে সুখী থাকলেও ভিতরে ভিতরে তার ভয়ে তটস্থ থাকত, কারণ, তার স্ত্রীর ধারণা ছিল দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাকের আসল রূপ অনেক ভয়ানক। উপরে উপরে সে ভালো মানুষ, কিন্তু অন্তর্গতভাবে অনেক ভায়োলেন্ট।

এটা জানার পরেই সে ওয়েস্টওয়ার্ল্ডে ফিরে এসেছে। সে আসলে অন্তর্গতভাবে কেমন, তার ট্রু সেলফ কেমন এটা আবিষ্কার করাই তার এবারের উদ্দেশ্য।

এখানে ফিরে এসে দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাক নিজের আলাদা একটা স্টোরিলাইন তৈরি করতে চেয়েছে। এক হোস্ট মহিলা এবং তার মেয়েকে সে মেরে ফেলে। এবং দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাক এতে কিছু ফিল করে না। কিন্তু যখন সেই মহিলা তার সন্তানকে বাঁচানোর প্রচণ্ড চেষ্টা করে তখন এই এড হ্যারিস—দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাকের কাছে ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের সেই মেইজ বা ধাঁধা প্রকাশিত হয়।

এড হ্যারিস শেষে টেডিকে বলে, দেয়ার ইজ এ ডিপার গেম টেডি, আরনল্ড’স গেম। অ্যান্ড দ্যাট গেম কাটস ডিপ। (আরো বড় একটা গেম আছে টেডি, আরনল্ডের গেম। আর সেই গেম খুব গভীর পর্যন্ত কাটে।)

এড হ্যারিস যে মহিলা ও তার মেয়েকে খুন করেছিল সেটা আসলে মেইভের আগের ভার্সন। মেইভের যে মাঝে মাঝে ঝাপসাভাবে কিছু মনে পড়ত সেটা এই ঘটনা।

মেইভ ও তার মেয়েকে মেরে ফেলার পর যখন মেইভকে ল্যাবরেটরিতে আনা হয়, এবং পরে তাকে জাগানো হয় তখন মেইভকে এনালাইজ মোডে আনা সম্ভব হচ্ছিল না। তার ওপর কোনো ইনস্ট্রাকশন কাজ করছিল না। মেইভ শোকে, ক্ষোভে প্রচণ্ড  মত রিঅ্যাক্ট করছিল, মেয়ের মৃত্যুকে মানতে পারছিল না।

তখন ফোর্ড এসে মেইভের প্রোগ্রামের কিছু একটা ইরেজ করে দেয়। সম্ভবত মেমোরি। অর্থাৎ, ট্রেস ডিকে।

দ্য ম্যান ইন ব্ল্যাক টেডিকে জানায়, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মেইজ। ওয়ায়েত সম্ভবত মেইজ আনলক করার একেবারে শেষ ধাপে আছে।

গ্রিক মিথোলজিতে মানুষের মত শরীর আর ষাঁড়ের মত মাথার এক দানবের নাম মিনোটউর। মিনোটউরকে রাখা হয়েছিল একটা ধাঁধা বা মেইজের সেন্টারে।

আট নাম্বার পর্বের শেষে দেখা যায় ওয়ায়েতের অনুসারী কয়েকটা মিনোটউর বেরিয়ে আসছে অন্ধকার থেকে।

west8-o

west8-i

“গ্রিক মিথোলজিতে মানুষের মত শরীর আর ষাঁড়ের মত মাথার এক দানবের নাম মিনোটউর। মিনোটউরকে রাখা হয়েছিল একটা ধাঁধা বা মেইজের সেন্টারে।”

ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের এই সিজনের আর মাত্র দুইটা পর্ব বাকি আছে। যেরকম ড্রামা তৈরি হইছে, তাতে অনেক রহস্যের পিছনের সত্যটা দেখা যাবে, এবং কিছু রহস্য হয়ত অমীমাংসিত থাকবে ভবিষ্যতের জন্য। মানে সেকেন্ড সিজনের জন্য।

টিভি সিরিজ বা ফিকশনে ড্রামা থাকবেই। ড্রামা নিয়ে আমি নিজে অতটা আগ্রহী না। ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের প্রতি আমার আগ্রহের কারণ অন্য জায়গায়। যে সায়েন্স গ্রাউন্ডের ওপর ওয়েস্টওয়ার্ল্ড দাঁড়ানো এবং যে সায়েন্সের লজিক ধরে ধরে ওয়েস্টওয়ার্ল্ড আগাইতেছে এই সায়েন্সের মাধ্যমে ওয়েস্টওয়ার্ল্ড আসলে কোন ফিলোসফি ডিরাইভ করে শেষপর্যন্ত, আমি সেইটা দেখতে আগ্রহী।

ওয়েস্টওয়ার্ল্ড যে সায়েন্স নিয়ে কথা বলছে সেটা স্টোরির মধ্যে খুব ডিটেইলডভাবে প্রয়োগ করছে, এবং স্টোরির সাথে এটা মিশে গেছে। অন্য সাই-ফাই টিভি সিরিজগুলিতে সায়েন্স এত ডিটেইলডভাবে স্টোরিতে থাকে না।

যেমন এই পর্বেই দেখিয়েছে, হিউম্যান মেমোরির ট্রেস ডিকে’র আইডিয়াটা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে যে প্রয়োগ করা যায় এবং এতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা রোবট কনসাশনেস অর্জনের ক্ষেত্রে হিউম্যান বিইং এর আরো এক ধাপ কাছাকাছি চলে আসে।

west8-u

ইমোশনাল ডোলোরস।

west8-7

ইমোশনাল বার্নাড।

এই ট্রেস ডিকে’র কোড কীভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর মেমোরিতে কাজ করবে সেটা দেখানো ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের কাজ না। কম্পিউটার সায়েন্সের বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের কোনো ডকুমেন্টারির কাজ সেটা।

সায়েন্স আর ফিলোসফির এই গ্রাউন্ডই ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের পাওয়ার। এবং এই পাওয়ারের দিক থেকে ওয়েস্টওয়ার্ল্ড ইউনিক।

রবার্ট ফোর্ডের চরিত্রটা এই পর্বে খুব ক্লিশে মনে হয়েছে, যখন সে মেরি শেলির ফ্রাঙ্কেনস্টাইন থেকে কোট করে। এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে এরকম অবসেসড সায়েন্টিস্ট টিভি সিরিজ বা ফিকশনে খুব ক্লিশে হয়ে গেছে।

আর তাছাড়া এই পর্বেও রবার্ট ফোর্ডের ডায়লগ এবং ফিলোসফি ভালোই। হোস্ট আর ক্রিয়েটরের সম্পর্ক ফোর্ড ব্যাখ্যা করেছেন:

এ প্রোগ্রামার হু নোজ ইনটিমেটলি হাউ দ্য মেশিনস ওয়ার্ক, অ্যান্ড এ মেশিন হু নোজ ইটস অউন ট্রু নেচার। (ক্রিয়েটর হচ্ছে এমন একজন প্রোগ্রামার যিনি জানেন মেশিন কীভাবে কাজ করে, আর হোস্ট হচ্ছে সেই মেশিন যে নিজের স্বভাব কী তা জানে।)

বার্নাড ফোর্ডকে জিজ্ঞাসা করে, সে হোস্ট এবং তারও ইমোশন আছে, তাহলে সে কোন জায়গায় হিউম্যান বিইং ফোর্ডের চেয়ে আলাদা?

ফোর্ড উত্তর দেয়, কোনো পার্থক্য নাই। মানুষ সবসময় অর্ডার ফলো করতে থাকে;  নিজের, নিজের চয়েসের, পরিবেশের অর্ডার। নিজেকে সবসময়ই প্রশ্ন করতে থাকে পরের কাজটা কী? এখন কী করতে হবে?… দ্য সেলফ ইজ এ কাইন্ড অফ ফিকশন।

ট্রেস ডিকে পর্বে আমার প্রিয় ডায়লগ এটাই—দ্য সেলফ ইজ এ কাইন্ড অফ ফিকশন।

(পর্ব ৯)

About Author

আশরাফুল আলম শাওন
আশরাফুল আলম শাওন

জন্ম টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।