page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

করটিয়া কলেজে চার বছর (৪)

korotia-4

আগের কিস্তি । প্রথম কিস্তি

১৩. ছাত্র সংসদ নির্বাচন
স্বাধীনতার পর বিভিন্ন কারণে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হতে পারে নি। মকবুল-মনসুর পরিষদের বয়স হয়েছিল প্রায় চার বছর। দেশের বিভিন্ন কলেজে অশান্ত পরিবেশের পরিপ্রেক্ষিতে কলেজ কর্তৃপক্ষ নির্বাচন দিতে সাহস পায় নি।

পরীক্ষার ফি নিয়ে কেলেঙ্কারী করার পরিণামে সংসদের প্রায় সবাই তখন আত্মগোপন করে আছে। মকবুল ও মনসুরের ধারণা হয় পুলিশ তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে ধরার জন্যে। রাতের অন্ধকারে এসে তারা আমার পা চেপে ধরে বসে থাকে, বলে আমাদের রক্ষা করুন। আমি তাদের পুলিশে না দেওয়ার আশ্বাস দিলাম কিন্তু ছাত্রদের পাওনা টাকা যদি তারা ফেরত চায়, আমি কী করে তাদের বাঁচাবো?

এই সময়ে টাঙ্গাইল অঞ্চলে গণবাহিনীর কার্যক্রম অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল। গণবাহিনী ছিল জাসদ সমর্থিত একটি গুপ্ত সসস্ত্র বাহিনী। আওয়ামী লীগের যেমন ছিল রক্ষীবাহিনী। তফাৎ শুধু এই গণবাহিনী পুলিশের চোখে একটি অবৈধ বাহিনী আর রক্ষীবাহিনী ছিল সরকার কর্তৃক স্বীকৃত এবং সম্পূর্ণ দলীয়কৃত একটি বাহিনী।

korotia-4bশোনা যায় করটিয়া কলেজের ভূতপূর্ব ভি পি খন্দকার বাতেন এই গণবাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। মনসুর মকবুলেরও এই বাহিনীর সাথে যোগাযোগ ছিল। তাদের মুখরোচক স্লোগানের একটি ছিল পুলিশ বিডিআর ভাই ভাই, রক্ষীবাহিনীর রক্ষা নাই।

আমার সহকর্মীদের কেউ কেউ পরামর্শ দিলেন এই মুহূর্তে ছাত্র সংসদকে পুনরুজ্জীবিত করা উচিৎ হবে না। তাদের মতে ছাত্রনেতারা যত দিন গা ঢাকা দিয়ে থাকে ততদিন মঙ্গল। স্লোগান নাই, সংসদ খাতে কাজে-অকাজে খরচ দেখিয়ে টাকা মারার ঝকমারি নাই, প্রিন্সিপালের ওপর অহেতুক প্রেসার সৃষ্টির উদ্যোগ নাই, ভালোই তো।

আমি দেখলাম, এই মুহূর্তে ছাত্রদের তরফ থেকে নির্বাচনের জন্যে কোনো চাপ না থাকলেও সব সময় এ অবস্থা থাকবে না। ছাত্র সংসদ নির্বাচন ছাত্রদের একটি মৌলিক অধিকার। এজন্যে তারা ইউনিয়ন ফি দিচ্ছে। সেই টাকা দিয়েই তারা ক্রীড়া, নাটক প্রভৃতি অনুষ্ঠান করে থাকে। তাদের এই আনন্দ থেকে বঞ্চিত করে এবং ব্যস্ততা থেকে অবসর দিয়ে আমার বা কলেজের লাভ কী?

আমার মতে তাদেরকে এই সব দায়িত্বশীল কাজ থেকে অব্যাহতি দিলে তারা নিরানন্দ বোধ করবে এবং নিরানন্দ থেকে মুক্তি পাবার জন্যে এমন কিছু করতে পারে যা সমাজের জন্যে ক্ষতিকর হতে পারে। রাজপথে কিছু স্লোগান দিলে যদি তাদের মনের ক্ষোভ মিটে, দেক না কিছু স্লোগান। এই স্লোগান দেওয়া নিঃসন্দেহে গণবাহিনীর মতো গোপন দল গঠনের চেয়ে অনেক ভাল। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই যেখানে দমন নীতি চরমে পৌঁছেছে এবং বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে সেখানেই গোপন বাহিনী গড়ে উঠেছে এবং বিপ্লব সাধিত হয়েছে।

আমি প্রথমেই শিক্ষক সমিতির নির্বাচন দিলাম এবং পরে বিভিন্ন হোস্টেলের সুপারেন্টেন্ডেন্টদের নিয়োগ নির্বাচনের মাধ্যমে সম্পন্ন করলাম। আগে এসব পদে প্রিন্সিপাল নিজে যাকে খুশি নিয়োগ দিতেন, তাতে বিভিন্ন সময়ে হোস্টেল সুপারের সামান্য দোষ ত্রুটির জন্যেও প্রিন্সিপালকে অহেতুক চাপের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

শিক্ষক নির্বাচনের  পর পরই সবার সাথে আলোচনা করে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে দিলাম।

নির্বাচনের আগের দিন ভিপি পদের জন্যে দুই প্রার্থী সৈয়দ মাজেদুল হক (মাজেদ) এবং মোহাম্মাদ সামচুল হক (সামচু) দু’জনকেই আমার বাসায় চা খেতে বললাম। সামচু আওয়ামী লীগ সমর্থক আর মাজেদ জাসদ সমর্থক।

আমি জানতে চাইলাম ওদের নিজেদের ধারণা কী, দু’জনের মধ্যে কে ভিপি হচ্ছে? দু’জনেই তাদের দলের উজ্জ্বল দিক এবং অপেক্ষাকৃত কম উজ্জ্বল দিকগুলো তুলে ধরলো। তাদের কথায় কোনো ঔদ্ধত্যের লক্ষণ না দেখে খুব ভাল লেগেছিল দু’জনকেই।

korotia-4u

লন্ডনে টেমস নদীর তীরে। ১৯৭০ বা ‘৭১-এ। লেখক ও স্ত্রী সুলতানা রুশদী।

আমি সরাসরি বললাম তাদের দু’পক্ষেরই কলেজের বাইরের শক্তির সাথে যোগাযোগ রয়েছে। হাত বাড়ালেই তারা সাহায্য পাবে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। বাইরের শক্তি বা বাহিনীর জোরে নির্বাচন কলুষিত হউক আমি তা চাই না, আর যদি হয় তাহলে এই কলেজে আমার দিন শেষ। তারা কি আমার জন্যে তাদের এই হাত বাড়ানোর লোভ সামলাতে পারবে?

মাজেদ ও সামচু উভয়েই আমার পা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করলো তারা বাইরের বা ভিতরের কোনো শক্তিই প্রয়োগ করবে না। তারা বাংলাদেশের ইতিহাসে এই স্বাক্ষর রাখতে চায় যে স্বাধীনতার পর তারাই সর্ব প্রথম কেলেঙ্কারী না করে কলুষমুক্ত ছাত্র নির্বাচন করেছে।

আমি আনন্দে তাদের উভয়ের সাথে বুক মিলালাম।

তারা তাদের কথা রেখেছিল। কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কোনো কলেজে এই প্রথম কলহমুক্ত নির্বাচন হলো। ঐ নির্বাচনে মাজেদ ও তার দল নির্বাচিত হয়েছিল কলেজ সংসদে কিন্তু নৈতিকতা ও গণতন্ত্রের মাপ কাঠিতে মাজেদ ও সামচু দুজনেই ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল।

ছাত্র শিক্ষক ও কর্মচারীদের আন্তরিক ভালবাসায় সিক্ত হয়ে সে রাত্রে আর আমার ঘুম হয় নি। শিক্ষকদের অনেকেই সেই রাতে আমার সাথে আমার বাসায় এসেছিলেন এবং অধিক রাত্রি পর্যন্ত আমার সাথে বসে আনন্দ উপভোগ করেছিলেন।

১৪. কলেজ পরিচালনা পরিষদে প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ
আমি সা’দত কলেজে যোগদানের পর কলেজ পরিচালনা পরিষদে প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ সাহেবকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম। বহুদিন পর নিজের প্রতিষ্ঠিত কলেজের ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব পেয়ে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন।

আমি যতদিন ছিলাম তিনি প্রত্যেকটি বোর্ড মিটিংয়ে উপস্থিত থাকতেন। একবার ওনার ধানমণ্ডিস্থ দখিন হাওয়াতে (বাসার নাম) গেলাম ওনাকে মিটিংয়ের আমন্ত্রণ জানানোর জন্যে। তিনি আমাকে চা অফার করলেন।

আমি বললাম, দরকার নাই স্যার।

তিনি হেসে বললেন,  আজ না হয় বিনা দরকারেই খান।

আমি বললাম, আচ্ছা।

তিনি তখন জিজ্ঞেস করলেন করটিয়ায় গেলে ওনাকে কী খাওয়াবো। আমি বললাম, আমি হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট সাহেবের কাছে জেনেছি আপনি কী ধরনের খাবার পছন্দ করেন, আমি ব্যবস্থা করবো।

তিনি জানতে চাইলেন হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট কে?

আমি বললাম নওশের আলী সাহেব।

শুনে তিনি বললেন বাহ! হেড ক্লার্ক না বলে আপনি হেড অ্যাসিস্টেন্ট বলছেন, ওয়ান্ডারফুল!

আমি লজ্জামিশ্রিত কণ্ঠে বললাম, তিনি সত্যিই আমাকে অনেক অ্যাসিস্ট করছেন।

তিনি বললেন, বিলক্ষণ! সাহায্য করার জন্যেই তো উনি বা ওনার সম মর্যাদার লোকজন থাকেন। কিন্তু সেই অ্যাসিস্ট্যান্সের স্বীকৃতি ক’জন দিতে জানে বলুন? আপনি স্বীকৃতি দিচ্ছেন, আপনার ভালো হবে। তিনি বললেন, বৃটিশদের সময়ে তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীদের প্রধানকে বলা হতো হেড ক্লার্ক। পাকিস্তান হওয়ার পর এদের নাম দেওয়া হলো অফিস সুপারেন্টেনডেন্ট, পরে আমেরিকান ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের আওতায় এদের নতুন নাম করা হল সেকশন অফিসার। কাজের পরিমাণ ও পরিধি অপরিবর্তিত থাকা সত্ত্বেও নতুন নামকরণের ফলে কর্মকর্তাদের দায়িত্ববোধ বেড়েছে অনেক। প্রমোশনের সুবিধা থাকার ফলে অধিকতর দায়িত্ব নেয়া ও কাজ করার আগ্রহ বেড়েছে অনেক। একটা স্বাধীন দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্যে কর্মকর্তা কর্মচারীদের এই কর্মস্পৃহা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। পরিচালনা পরিষদের সভায় বসেও তিনি হেড ক্লার্ক সাহেবের এই নতুন নামকরণের প্রশংসা করেছেন অনেক।

tajuddin-ahmed-3

তাজউদ্দীন আহমদ (১৯২৫ – ১৯৭৫)

১৫. গদিতে আগুন দিয়ে লাভ কী?
আমি করটিয়ায় থাকাকালীন এক সময়ে তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেব টাঙ্গাইল গিয়েছিলেন জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ক সেমিনারে প্রধান অতিথি হয়ে।

আমি সেই সেমিনারে মূল বিষয়ের ওপর প্রবন্ধ পেশ করেছিলাম। ডায়াসে আমি ওনার পাশেই বসা ছিলাম। বাইরে তখন জাসদের ছেলেরা স্লোগান দিচ্ছিল “শেখ মুজিবের গদিতে, আগুন জ্বালো একসাথে।”

তাজউদ্দীন সাহেব আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন, “গদিতে আগুন দিয়ে লাভ কী? গদিটা অক্ষত থাকলে তো আমাদের পরে যারা আসবে তারা বসতে পারবে।”

বড় ভাল লেগেছিল ওনার এই বক্তব্য আমার কাছে। পরবর্তীকালে আমি ছাত্রনেতাদের সাথে এ ব্যাপারে আলাপ করেছিলাম।

তাদের বক্তব্য হচ্ছে শুধু কথায় কাজ হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত আমাদের ইতিহাসে বিরল।

১৬. সাবাস সিরাজ মিয়া
কলেজের ঝাড়ুদার, নাম সিরাজ। বয়স ষাট কি বাষট্টি। একটু কুঁজো হয়ে গেছে বয়সের ভারে, তবে কাজ চালিয়ে নেবার মত শক্তি আছে এখনো।

কয়েকদিন আগেই খুব সকাল বেলা খেজুরের রস নিয়ে এসেছিল বাসায়।

বললাম, এই শীতের সকালে কেন কষ্ট করে এসেছো? রস খেতে হলে তো আমরা বারেককে পাঠিয়ে কিনেও আনতে পারি।

সিরাজ বললো আপনারা আমাদের বাপমা। আপনারা আছেন বলে কলেজ থেকে বেতন পাচ্ছি, বেঁচে আছি আমরা। আপনারা আসবার আগে যে আমাদের কী অবস্থা ছিল! তারপর বললো, চালের দাম, ডালের দাম সব কিছুর দাম তো বেড়েই চলেছে, আমাদের বেতন তো আর বাড়ে না স্যার। কিছু কি বাড়িয়ে দেয়া যায় না স্যার?

আমি বললাম, তোমার একার বেতন তো আর বাড়ানো যাবে না। বাড়ালে সবার বেতনই বাড়াতে হবে। অত টাকা যে কলেজের নাই। সিরাজ আর কথা বাড়ায় নি, চলে গিয়েছিল সেদিন।

কয়েকদিন পরের ঘটনা। পরের দিন শুক্রবার, কলেজ বন্ধ। আমি যোগদানের পর থেকে জেলা প্রশাসক শাহ ফরিদের সাথে পরামর্শ করে শুক্রবারেই কলেজ বন্ধ রাখা হতো। সরকারী অফিস অবশ্য তখনও রোববারেই বন্ধ থাকতো।

ফজরের নামাজের পর অফিস ঘরেই বসে আছি। জানালার ফাঁক দিয়ে রাস্তার আলোর দিকে তাকিয়ে ভাবছি সিদ্দিক এখনো স্ট্রিট লাইটগুলি নিবোয় নি। কী অপচয়! আজ আসলে তাকে একটা ধমক লাগাতে হবে।

এই সময় সিরাজ একটা ছালার ব্যাগ হাতে নিয়ে জানালার পাশে এসে সালাম দিল। আমি বললাম, কী ব্যাপার সিরাজ, এত সকাল বেলা?

সিরাজ হাতের ব্যাগটা দেখালো, কথা বলতে পারছিল না। দস্তুরমত কাঁপতে ছিল সে। আমি দরজা খুলে ওকে ভিতরে আসতে বললাম।

সিরাজ ব্যাগের ভিতরে যা দেখালো তাতে আমিও যারপরনাই অবাক। ব্যাগের ভিতরে বিভিন্ন মানের প্রায় পনের হাজার টাকা, স্তরে স্তরে বান্ডেল করা।

আমি বললাম, কী সর্বনাশ! এত টাকা তুমি কোথায় পেলে?

সিরাজ বললো, অফিসে সিন্দুকের সামনে এটা পড়েছিল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি ওখানে কী করছিলে?

সিরাজ বললো, আজ শুক্রবার বলে কাল রাতে আর অফিস পরিষ্কার করি নি।

আমার তখন মনে পড়লো কাল রাতে তো কেউ আমাকে চাবি ফেরত দিয়ে যায় নি। আমি জানতে চাইলাম, রাতে ওর কাছেই চাবি ছিল কিনা।

সিরাজ বললো, জ্বী।

আমি মনে মনে আতঙ্কিত হলাম। রাতে যদি কেউ ওর কাছ থেকে চাবি ছিনিয়ে নিতো, তাহলে? আবার ভাবলাম, সিন্দুকের চাবি তো আর ওর কাছে ছিল না। তা না থাকুক। অফিসের কাগজপত্র, অ্যাকাউন্টস, বালাম বই সবই তো গোপনীয় জিনিস।

আমি সিরাজকে পাঠালাম হিসাব রক্ষক ও ক্যাশিয়ার হাফিজুর রহমানকে খবর দেবার জন্যে। সঙ্গে সঙ্গে বারেককে পাঠালাম ভাইস প্রিন্সিপাল, আখতার সাহেব ও হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট সাহেবকে খবর দেবার জন্যে।

সবাই আসবার পর আবার ক্যাশ মিলানো হলো। ঐ টাকার ব্যাগটি হাফিজুর রহমান সিন্দুকে তুলতে ভুলে গিয়েছিলেন। সিরাজের সততার জন্যে আমি এবং হাফিজুর রহমান সে যাত্রা বেঁচে গিয়েছিলাম।

সিরাজ মিয়ার সততার পুরস্কার হিসাবে ওকে তিনটা ইনক্রিমেন্ট বেশি দেওয়া হয়েছিল এবং ওর ছেলেকে কলেজে স্থায়ী চাকরি দেওয়া হয়েছিল। এর বেশি কিছু করা কলেজের সাধ্যের বাইরে ছিল।

পরের দিনের খবরের কাগজে বড় বড় হেড লাইন দিয়ে সংবাদ বের হয়েছিল “সাবাস সিরাজ মিয়া।” অভাবের সংসারে এতগুলি টাকা হাতে পেয়েও যে ব্যক্তির মনে সামান্যটুকু লোভের সঞ্চার হয় না সে সত্যিই মহান।

১৭. অগ্রণী ব্যাংক
অগ্রণী ব্যাংকের করটিয়া শাখা ছিল আমাদের কলেজের ভিতরেই একটা রুমে। আমি কলেজের দায়িত্ব নেওয়ার পরেই এই শাখাটি খোলা হয়েছিল। ব্যাংকের কাছ থেকে কলেজ কিছু ভাড়া পেত ঠিকই কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা ছিল করটিয়া বাজারে অবস্থিত অন্যান্য ব্যাংকে টাকা জমা দিতে যাওয়া এবং ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে আনা ছিল রীতিমত ঝুঁকিপূর্ণ। কলেজের ভিতরেই এই ব্যাংকের শাখা স্থাপনের ফলে আমরা অনেকটা চিন্তামুক্ত হতে পেরেছিলাম।

আমাদের কলেজ়ে সাপ্তাহিক বন্ধ ছিল শুক্রবার। অন্যদিকে ব্যাংকের সাপ্তাহিক ছুটি ছিল শনি রবিবার। ফলে প্রতি সপ্তাহে আমাদের ব্যাংকিং হতো মাত্র চার দিন, সোম থেকে বৃহস্পতি। এমনি কোনো এক সোমবারে আমি পঞ্চাশ হাজার টাকার একটা চেক পাঠালাম ব্যাংকে ক্যাশ করার জন্যে। কলেজের পক্ষ থেকে প্রধান বেয়ারা বাবু মিয়াই টাকা জমা দেওয়া ও টাকা উঠানোর কাজটি করতো। অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে সে একাজ করে আসছে বহু দিন ধরে।

কিছুক্ষণ পর ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজার আসলেন আমার অফিসে। সেদিন ব্যাংকের ম্যানেজার উপস্থিত ছিলেন না। ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজার জানালেন কলেজের হিসাবে অত টাকা নাই, তবে তিনি আমার সম্মানার্থে চেকটি ক্যাশ করে দিচ্ছেন।

আমি ম্যানেজারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, কেন? আমি তো মাত্র কয়েক দিন আগে তিন লাখ টাকা জমা দিলাম। তিনি বললেন, কিন্তু ব্যাংকের বালামে তার উল্লেখ নাই।

শুনে আমি হতবাক!

আমি বাবু মিয়াকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার?

বাবু মিয়ার ভাষার মধ্যে কিছুটা আদি ঢাকাবাসীদের ভাষার মিল ছিল। সেই ভাষার সংমিশ্রণে বাবু মিয়া বললো, আমি আপনার নিমক খাই স্যার, আমি নিমকহারাম নই। এই বলে সে অফিস থেকে এনে ব্যাংকের সীল মোহরযুক্ত রিসিট বই দেখালো।

আমি ম্যানেজার সাহেবকে রিসিটগুলি দেখালাম। তিনি শনাক্ত করলেন রিসিটগুলির ওপরে ব্যাংকের ম্যানেজারই দস্তখত করেছেন।

ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজার আমাকে অনুরোধ করেছিলেন, আমি যেন ঘটনাটি ওপরওয়ালাদের না জানাই। কারণ ব্যাংকের ম্যানেজার যিনি এই ঘটনার জন্যে দায়ী তিনি একজন এমপির ছোট ভাই।

আমি জানতে চাইলাম আমার চেক ক্যাশ করার জন্যে যে পঞ্চাশ হাজার টাকা তিনি আমাকে দিচ্ছেন তা ব্যাংকের হিসাব বইতে কী হিসাবে দেখাবেন?

তিনি তখন চিন্তায় পড়ে গেলেন। বললেন, এই টাকা সম্পর্কে যদি ব্যাংকের খাতায় কিছুই না লেখা হয় তাহলে তিনি বিপদে পড়তে পারেন।

আমি বললাম, আর যদি অ্যাডভান্স হিসাবে দেখানো হয় তাহলে আমি স্বীকার করে নিচ্ছি যে কলেজের অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নাই। তার মানে আমি বিপদে পড়তে পারি। আমি আর কোনো দ্বিরুক্তি না করে জেলাপ্রশাসক শাহ ফরিদকে সমস্ত ঘটনা জানিয়ে দিলাম।

ঘটনার তদন্তে জানা গেল ব্যাংকের ম্যানেজার ওপরওয়ালাদের না জানিয়ে নিজ দায়িত্বে করটিয়া বাজারের কিছু ব্যবসায়ীকে স্বল্প মেয়াদে টাকা ধার দিতেন এবং লাভের টাকা নিজে আত্মসাৎ করতেন। কোনো কারণে কোনো ব্যবসায়ী ঠিক সময়ে টাকা ফেরৎ না দিতে পারলে তখন তিনি অন্য অ্যাকাউন্ট থেকে অন্যায় ভাবে টাকা উঠিয়ে সময় সারতেন। এই তদন্তের ফলে তিনি তার চাকরি হারিয়েছিলেন। তার এম পি ভাই তার চাকরি রক্ষা করতে পারেন নি কিংবা রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন নি।

১৮. প্রভিডেন্ট ফান্ড
কলেজের জন্মলগ্ন থেকে প্রায় অর্ধ শতাব্দী কাল শিক্ষক কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ তহবিল বা প্রভিডেন্ট ফান্ডে যত টাকা জমা হওয়ার কথা ছিল তার এক টাকাও সেই তহবিলে ছিল না।

সেই যে বাংলা প্রবাদে আছে ‘সকালে খেয়ে ফকির নাচে, বিকালের জন্য আল্লাহ আছে’—এই ছিল কলেজের অবস্থা।

আমি কলেজের দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখা গেল শিক্ষক কর্মচারীদের প্রায় দশ বার মাসের বেতন বাকি পড়ে আছে অথচ প্রভিডেন্ট ফান্ডে টাকা নাই। অসুখে বিসুখে নিজের কিংবা পরিবারের অন্য কারও চিকিৎসার জন্যেও তাদের কোনো উপায় ছিল না। চলতি মাসের বেতন থেকে দশ টাকা বিশ টাকা অগ্রীম নেওয়ার জন্যেও প্রিন্সিপালের কাছে স্লিপ নিতে আসতে হতো।

আমি দেখলাম তাদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে টাকা থাকলে তাদের আর এই সামান্য টাকার জন্য নাকানি-চুবানি খেতে হতো না।

আমি প্রত্যেক শিক্ষক কর্মচারীর নামে ভিন্ন ভিন্ন প্রভিডেন্ট ফান্ড অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা করলাম পোস্ট অফিস সেভিংস ব্যাংকে। কোনো কর্মচারী কিংবা শিক্ষক যাতে ইচ্ছামত সব টাকা ওঠায়ে না নিতে পারে সেই জন্য প্রত্যেক হিসাব পরিচালনার জন্য প্রিন্সিপাল ও অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের দস্তখত বাধ্যতামূলক করা হলো এবং প্রিন্সিপাল সই করার আগে পাস বইয়ের ব্যালান্স চেক করার দায়িত্বে থাকলেন কলেজের হিসাবরক্ষক। সব হিসাব খোলা হয়ে যাওয়ার পর দুই বছরের মধ্যে আমি প্রভিডেন্ট ফান্ডের সমস্ত টাকা ফেরৎ দিতে পেরেছিলাম। আমি জানি কলেজের কর্মচারী ও শিক্ষকগণ আমার এই উদ্যোগের জন্যে প্রকাশ্যে এবং গোপনে আমার জন্যে অনেক দোয়া করেছেন।

আমি সব সময়েই বলতাম এবং এখনো বলছি আমি কলেজের জন্যে যেটুকু করতে সমর্থ হয়েছিলাম তা সম্ভব হয়ছিল সবার সহযোগিতার ফলে। প্রতি উত্তরে আমার সহকর্মীরা বলতেন সাবাই তো সহযোগিতা চায় না কিংবা নিতে জানে না।

১৯. ডিউটি ফান্ড
সা’দত কলেজের নিয়মানুযায়ী প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রী ভর্তির সময়ে দুই টাকা করে ডিউটি ফান্ডে চাঁদা দিতো। এই দুই টাকা আদায়ের পর ছাত্ররা কখনো ফিরে তাকায় নি এই দিকে আর কলেজ কর্তৃপক্ষও হিসাব রাখতো না কী ভাবে এই টাকা খরচ হলো।

অন্ততঃ আমার যোগদানের কয়েক বছর আগের অবস্থা তাই ছিল। আমি দেখলাম এই টাকার পরিমাণ নেহায়েৎ কম নয়। দশ হাজার ছাত্র প্রতি বছর বিশ হাজার টাকা করে দিচ্ছে এই ফান্ডে। এই ফান্ডের টাকা দিয়ে আমি প্রতি বছর প্রচুর বই কিনেছি লাইব্রেরির জন্যে এবং গরীব ছাত্রদের জন্যে। ছাত্র শিক্ষক সবাই আমার এ কাজে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন জানিয়েছিলেন।

korotia-4c

সা’দত কলেজের লাইব্রেরি ভবন।

২০. করটিয়া কলেজে থাকাকালীন আরও কিছু ঘটনা
সাবেক প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ এবং তোফায়েল আহাম্মদ্ দু’জনেই অত্র অঞ্চলের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সফর করতে যেতেন মাঝে মধ্যে।

উদ্দেশ্য ছিল স্কুল শিক্ষার্থীদের কলেজ শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট করা এবং স্কুল সমূহের সাথে সৎ ভাব রেখে কলেজের সাপ্লাই সোর্স চাঙা রাখা। আমার এই পূর্বসূরীদের অনুসরণে আমিও সময় ও সুযোগ পেলেই কোনো না কোনো স্কুল, কলেজ কিংবা কোনো জলসায় উপস্থিত থাকতাম।

আমার উৎসাহ দেখে প্রায়ই আমার ছাত্ররা কিংবা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ তাদের এলাকায় বিশেষ অনুষ্ঠানে আমাকে প্রধান অতিথি করে দাওয়াত দিত। আমি কদাচিৎ এসব দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করতাম।

এমনি একটি অনুষ্ঠানে একবার যোগ দিয়েছিলাম পাকুটিয়া কলেজে। পাকুটিয়া কলেজে যাওয়ার জন্যে তখনও কোনো রাস্তাঘাট সৃষ্টি হয় নি। কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথি আমি। সেখানে উপস্থিত হওয়ার জন্যে আগের রাতে নৌকা যোগে সা’দত কলেজের আরো পাঁচ ছয় জন শিক্ষক সহ আমরা রওয়ানা হয়েছিলাম পাকুটিয়ার পথে।

করটিয়া ছাড়ার পর বিশাল মাঠের মাঝখান দিয়ে নৌকা চলছে ধীর গতিতে। চার দিকে পানি আর পানি। আশেপাশে বাড়িঘরের কোনো চিহ্ন নাই। সঙ্গে নজরুলগীতির এক ওস্তাদ, বাঁশি, তবলা, হারমনিয়ামের সুরে আর আমার সঙ্গী সাথীদের আনন্দ উল্লাসে খুব ভাল লেগেছিল সেই নৌকাবিহার।

যে সব শিক্ষক আমার সহযাত্রী ছিলেন তাদের মধ্যে অরুণ প্রকাশ নিয়োগী, মুসফিকুর রহমান, সোহরাব হাসান, তোফাজ্জল হোসেন, আব্দুল মোমেন প্রমুখের কথা এখনো মনে পড়ে।

২১. প্রধান পরীক্ষক
১৯৭৪ ও ৭৫ সালে ঢাকা বোর্ডের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পর পর দুই বার আমি ইকনমিক্সের প্রধান পরীক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলাম। এই সুযোগে বোর্ডের অধীন সব কলেজের অর্থনীতির শিক্ষকদের সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছিল।

পরীক্ষার খাতা বিতরণের আগে সব পরীক্ষকদের সাথে প্রশ্নপত্রগুলি পার্ট বাই পার্ট আলোচনা করে একমত হয়েছিলাম প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তরে আমরা কী আশা করছি।

এই ভাবে বিভিন্ন পরীক্ষকদের দেয়া নম্বরের মধ্যে যেন খুব বেশি ব্যবধান না থাকে সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।

আমার অনুসৃত পদ্ধতি পরীক্ষকরা খুব পছন্দ করেছিলেন। এই প্রচেষ্টার ফলে মার্কিং-এর ব্যাপারে খাতা স্ক্রুটিনির সময় তেমন কোনো গরমিল চোখে পড়ে নি। পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন ডিগ্রী পরীক্ষার অর্থনীতি বিষয়ে প্রধান পরীক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলাম কয়েকবার। সেই কারণে অর্থনীতির শিক্ষকদের মধ্যে আমার একটা বিশেষ পরিচিতি গড়ে উঠেছিল।

ঐ বছর সা’দত কলেজ থেকেই বাংলার প্রফেসর খলিলুর রহমানকে প্রধান পরীক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল। ঢাকার বাইরের কলেজ থেকে এই প্রথম প্রধান পরীক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল। এই ভাবে অন্যান্য কলেজের তুলনায় সা’দত কলেজের একটা আলাদা ইমেজ তৈরি হয়েছিল।

২২. আন্তঃকলেজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা
সা’দত কলেজের খেলার মাঠে ঢাকা বোর্ডের আন্তঃ কলেজ প্রতিযোগিতা হয়েছিল পর পর দুই বছর ১৯৭৪ এবং ১৯৭৫। এই সময় প্রথম বারের মতো ড. খলিলুর রহমান আসেন করটিয়া কলেজে, অনেকটা আমাদের অজান্তেই।

আমি তড়িঘড়ি করে একটা সম্বর্ধনার আয়োজন করলাম। সম্বর্ধনায় বাংলা বিভাগের কল্যাণে হাতের লেখা একটা মানপত্র পাঠ করা হলো। আমি স্বাগত ভাষণ দিতে গিয়ে স্মরণ করলাম আমার অনার্স পরীক্ষার রেজাল্ট জানিয়ে ওনাকে চিঠি লিখেছিলাম লাহোর স্টাফ কলজে। প্রতি উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন ফুল ফুটানোর কী আনন্দ তা শুধু মালিই জানে আর শিক্ষক জানে একজন ছাত্রের সফলতায় কী আনন্দ!

আরও স্মরণ করেছিলাম সিলেট এম সি কলেজে থাকাকালীন তিনি ক্লাসে ঢুকেই প্রথমে আগের ক্লাসের অপরিষ্কার বোর্ড পরিষ্কার করতেন এবং যাওয়ার আগে আবার নিজের বোর্ড পরিষ্কার করে দিয়ে যেতেন। বলতেন, আমাদের প্রত্যেকের উচিৎ এই পৃথিবীটাকে যেমন পেয়েছি তার চেয়ে একটু ভালো অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেষ্টা করা।

প্রতি উত্তরে তিনি বলেছিলেন, মনে হচ্ছে তুমি সেসব কথা শুধু মনেই রাখো নি বাস্তবে রূপ দেওয়ারও চেষ্টা করছো।

korotia-4i

বর্তমানে লেখক, স্ত্রী সুলতানা রুশদীর সাথে। ক্যারাম বিচ, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া। ছবি. ২০১৩।

তিনি আন্তঃ কলেজ ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সা’দত কলেজের ব্যবস্থাপনা ও সহযোগিতায় বেশ খুশি হয়েছিলেন। কলেজের খেলাধূলার উন্নয়নের জন্যে তিনি বোর্ডের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য অনুদান দিয়েছিলেন।

আমার বাসায় চা খাওয়ার সময়টুকুতে সম্বর্ধনায় দেয়া হাতের লেখা মানপত্রটি টাইপ করে বাঁধাই করে আনা হয়েছিল। যাওয়ার সময় বাঁধাইকৃত মানপত্রটি হাতে পেয়ে বলেছিলেন, এই তো, এটাকে আমরা এক ঘণ্টা আগে যে অবস্থায় পেয়েছিলাম এখন তার চেয়ে অনেক ভালো অবস্থায় পাচ্ছি।

আমার সময়ে করটিয়া সা’দত কলেজকে ঢাকা বোর্ডের রিজিওনাল স্পোর্টস সেন্টার হিসাবে গণ্য করা হতো। বোর্ডের অধীনে এতদ অঞ্চলের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতো আমাদের খেলার মাঠে। এ ছাড়া বেশ কিছু বিষয়ে বোর্ডের ও ঢাকা ইউনিভার্সিটি পাস কোর্সের হেড এক্সামিনার নিয়োগ করা হতো আমাদের কলেজ থেকে। ফলে  এতদঞ্চলের ছাত্র-শিক্ষকদের জন্যে সা’দত কলেজ ছিল তীর্থস্থানের মতো। ব্যক্তিগতভাবে এটা ছিল আমার জন্যে অত্যন্ত গৌরবের ব্যাপার।

২৩. বাংলায় এম এ কোর্স
১৯৭৪ সালের শেষ দিকে অথবা ১৯৭৫ এর প্রথম দিকে, সঠিক তারিখটি এখন আর মনে করতে পারছি না, কলেজে বাংলায় এম এ কোর্স উদ্বোধন উপলক্ষে শিক্ষামন্ত্রী প্রফেসর মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর মতিন চৌধুরী এসেছিলেন সা’দত কলেজে। কলেজ অডিটরিয়ামে তাদের সম্বর্ধনা দেওয়া হয়। পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রী মান্নান সাহেবও উপস্থিত ছিলেন এই সম্বর্ধনা সভায়। দুইজন মন্ত্রী ও এক জন ভাইস চ্যান্সেলরের উপস্থিতি কলেজের জন্যে একটা অসামান্য গৌরবের ব্যাপার ছিল।

ভাবতে ভাল লাগে আমিও এই অর্জিত গৌরবের অংশীদার ছিলাম।

২৪. করটিয়া কলেজের সরকারীকরণ
করটিয়া কলেজে থাকাকালীন সময়ে আমার মনে হয়েছিল আমি দায়িত্ব ছেড়ে দিলেই কিছু পুরানো মুখ তাদের পুরানো ফন্দি ফিকির নিয়ে আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে এবং কলেজটিকে আবার আগের মতো আর্থিক ও প্রশাসনিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেবে।

এই অবস্থা থেকে উত্তরণের এক মাত্র উপায় হচ্ছে এটিকে জাতীয়করণ করা। আমি আমার অপেক্ষাকৃত তরুণ সহকর্মীদের নিয়ে এই পথেই অগ্রসর হতে লাগলাম।

korotia-4y

১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে আমি কলেজ ছেড়ে চলে আসার আগেই শিক্ষা দফতর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আমাদের আবেদন পৌঁছেছিল।

সিলেট এম সি কলেজে আমার ইংরেজীর শিক্ষক প্রফেসর নোমান সাহেব তখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। মূলতঃ তিনিই আমাকে করটিয়ায় প্রিন্সিপাল হিসাবে পাঠানোর জন্যে দায়ী।

আমি স্যারকে বিশেষ ভাবে অনুরোধ করেছিলাম কলেজটির অগ্রগতি অব্যাহত রাখার স্বার্থে কলেজটিকে সরকারের নিজ দায়িত্বে নেবার জন্যে। অবশেষে ১৯৭৯ সালে কলেজটি সরকারীকরণ করা হয়, যার ফলে অভ্যন্তরীন কোন্দলের ছোবল থেকে কলেজটি রক্ষা পায়।

(সমাপ্ত)

About Author

আলী আহমাদ রুশদী
আলী আহমাদ রুশদী

ড. আলী আহমাদ রুশদীর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে করোটিয়ার সাদত কলেজে বেশ কয়েক বছর অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে সহযোগী-অধ্যাপক ছিলেন বহুদিন। ১৯৮৯ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে অবস্থিত Australian Competition and Consumers Commission এ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন প্রায় ১৫ বছর। সেখান থেকে অবসর গ্রহণের পরে ঢাকার AIUB ও নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কিছুদিন অধ্যাপনা করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে UNDP, ILO, World Bank ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কাজে গবেষণা করেছেন। বর্তমানে মেলবোর্নে অবসর জীবন যাপনের ফাঁকে তাঁর সময় কাটে অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখালেখি করে।