page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

কোকো ভাই

koko2

কোকো ভাই যখন মেলবোর্ন আসছিল লেখাপড়ার জন্য, খালেদা জিয়া তখন বিরোধী দলের নেত্রী। এরশাদ পাওয়ারে। কোন সাল সেইটা? হয়তো ৮৮ নাইলে ৮৯।  তখনও বোধহয় পল কিটিং অস্ট্রেলিয়ার প্রাইম মিনিস্টার হন নাই। সেইবার বাংলাদেশে বন্যা হইছিল আর আমরা এইখানে অনুষ্ঠান করছিলাম বাংলাদেশে টাকা পাঠানোর জন্য। ওইটার রিহার্সেলে দেখছিলাম উনারে প্রথম। সেইদিন মোনাশ ইউনিভার্সিটির কোনো একটা ঘরে রিহার্সেল হইতেছিল।

সিঁড়িতে উঠে একটা টানা বারান্দা পার হয়ে যাইতে হইত রিহার্সেলের ঘরে। নিচের থেকেই গানবাজনার শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। মানুষের কথাবার্তা, হাসাহাসি। আমি সিঁড়িতে উঠতে উঠতে দেখলাম উপরে রেলিংয়ের উপরে একটা ছেলে বইসা আছে। তারে ঘিরে ফয়সল ভাই, মিকি ভাই, বাবু ভাই আর কে কে জানি। রেলিংয়ে বসা মানুষটাই কোকো ভাই। কালো রঙের একটা লেদার জ্যাকেট গায়ে ছিল আর নীল জিন্স। অথবা সেইদিন হয়ত অন্য কিছু ছিল তবে পরে এই কাপড়ে উনারে এতবার দেখছি, এখন মনে হইতেছে এইরকমই ছিল বোধহয়।

দেইখা খুব খেয়াল যে করছিলাম তা না। তেমন একটা চোখ টানে নাই প্রথম দেখায়। তবে অনেকেই বলাবলি করতেছিল উনি জিয়াউর রহমানের ছেলে, তাই আমিও দেখার চেষ্টা করতেছিলাম। আমি স্কুলে পড়তাম, টিনেজার তখন, বোধহয় তেরো-চৌদ্দ। উনিও বেশি বড় ছিল না, বিশ-একুশ। তখন অবশ্য মনে হইছিল অনেক বড়।

একটা গ্রুপ নাচে কোকো ভাইও ছিল। চারটা জুটি ছিল এইটুকু মনে আছে শুধু, আর কারো নাম মনে নাই। আমারে সবাই বলছিল গান বেছে দিতে। দেশাত্ববোধক। আমি প্রথমে বললাম ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, বড়রা সেইটারে না কইরা দিল, ওইটা আওয়ামী গান, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’ও আওয়ামী। পরে কোন গানটা যে বাছা হইছিল! কিন্তু মনে আছে নাচটায় ঘুরে ঘুরে হাততালি দেয়ার স্টেপ ছিল। আর যে শিখাইতেছিল সে বারে বারে বলতেছিল ‘ওয়ান-টু-থ্রি-ফোর’ ‘ওয়ান-টু-থ্রি-ফোর’। কোনো একজন আন্টি বোধহয়।

মায়ের সঙ্গে কোকো

কোকো ভাইরে মনে হইতেছিল খুব নরম আর ভদ্র মানুষ, যেমনে শিখাইতেছিল ওইভাবেই স্টেপগুলা তোলার চেষ্টা করতেছিল। আমি রুমের অন্য পাশে তখন গানের রিহার্সাল দিতেছি, সেইদিনই প্রথম জামিল আঙ্কেলকেও দেখছি। উনি তবলা বাজাইতেছে, আমি আর আরেকজন কে জানি গাইতেছিলাম ‘আনন্দলোকে মঙ্গল আলোকে’। কিন্তু আমাদের লয়ে মিলতেছিল না। জামিল আংকেল বারে বারে লয়ের ভুল ধরাইয়া দিতেছিল আর আমি মনে মনে বলতেছিলাম ‘এই তবলচিটার এত ঢং কেন!’ আড়চোখে নাচের গ্রুপে তাকাইতেছিলাম, দলের অন্যদের চাইতে কোকো ভাইরে লম্বা মনে হইছিল অনেক।

পরে একবার আমি বারান্দা দিয়া হাঁইটা যাইতেছিলাম, কোকো ভাই আর আরো কয়েকজন আড্ডা দিতেছে তখন। শুনি যে উনি সেই নাচ শিখানো আন্টির ভয়েস নকল কইরা বলতেছে ‘ওয়ান-টু-থ্রি-ফোর’, আর অন্যরা হাসতে হাসতে বিষম খাইতেছে। আমি থাইমা যাওয়ায় চোখাচোখি হইল আর আমিও হাইসা দিলাম, উনিও। তারপরে আরো বেশ কিছুদিনের রিহার্সেলেই বন্ধুত্ব হইল উনার সাথে। শেষের দিকে আমাদের একটা গ্রুপ ছিল, প্রতি রিহার্সেলেই আমরা একসাথে ঘুরতাম।

কোকো ভাই, ফয়সল ভাই আর আরো কয়েকজন একটা বাসা শেয়ার কইরা থাকত। এইটা নিয়া ফয়সল ভাই বেশ গর্বিত ছিল মনে আছে। আমারে একবার বলছিল, ‘কোকোরে আমি প্রথম দেখছিলাম টিভিতে!’ বলার সময় উনার গলা কাঁইপা গেছিল খুশিতে। প্রথম যখন ওই বাসায় উঠছে, কোকো ভাই নাকি মেঝেতে বিছানা পাইতা শুইত, এইটাও সবাই উনার গুণ হিসাবে বলাবলি করত।

আমার সারাজীবনের স্বভাব হইলো সবচেয়ে অবভিয়াস প্রশ্নগুলা করা। আমি একবার তারে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কি জিয়াউর রহমানের ছেলে?’

মানে আমার মাথায় তখন ঘুরতেছে ছোটবেলায় টিভির খবরে দেখা জিয়াউর রহমানের মুখ, একটা কোদাল হাতে, গেঞ্জি পরা ছবি ছিল না উনার? তারপরে যেবার আশুফুপুর বাসায় বেড়াইতে গেছিলাম কুমিল্লায়, আমার তখন বোধহয় পাঁচ-ছয় বছর বয়স। সবার চোখ উঠতেছিল সেই বছর, আমারও উঠছিল। ওই চোখ নিয়াই একদিন কই জানি বেড়াইতে নিয়া গেছিল আমারে ফুপু, তখন খবর পাইল জিয়াউর রহমানরে মাইরা ফেলা হইছে। কেমন অস্থির লাগছিল সবাইরে তখন, জলদি বাসায় ফিরা রেডিওর নব ঘুরায়ে ঘুরায়ে খবর শুনতে চেষ্টা করতেছিল সবাই। কেমন থম থম করতেছিল চারপাশ। আমার বেশ হতভম্ব লাগছিল, আমার স্মৃতিতে জিয়াউর রহমান ছাড়া অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট ছিল না, আর আমি জানতাম প্রেসিডেন্ট হইল এমন এক লোক, যারে সারাক্ষণ টিভিতে দেখায়। সেই লোক যে আবার মারাও যাও, তারে মাইরাও ফেলা যায় সেই ঘটনা বেশ অবাস্তব মনে হইছিল তখন আমার।

তাই কোকো ভাইরে করা আমার প্রশ্নটা যতই গাধার মতন হোক, এইটা আসলে একটা আনরিয়েল ভাবের থিকা করছিলাম। উনি হাসা শুরু করছিল, তারপরে বলল, “হুম, লোকে তো সেইরকমই সন্দেহ করে।” তারপরে স্বভাব মতন আমারে একটু টিজ করল, গণ্ডার ডাকল। কারণ উনার সাথে বন্ধুত্ব হইয়া যাওয়ার এতদিন পরে এই প্রশ্ন আমার মনে আসছে।

অনুষ্ঠানের দিন কোকো ভাই মঞ্চে উইঠা কিছুক্ষণ কথা বলছিল। কী বলছিল মনে নাই, তবে মঞ্চে উনারে দেখতে অন্যরকম লাগতেছিল, এমনিতে আমাদের সাথে আড্ডা দেয়ার সময় উনারে কোকো ভাই ছাড়া আর কিছু মনে হইত না, মজার মজার কথা বলত, সবাইরে হাসাইত, দাঁত উঁচা ছিল কিন্তু চোখ অনেক সুন্দর থাকায় উঁচা দাঁত খেয়াল করতাম না। ভাল্লাগতো তারে আমার। তো মঞ্চে তারে একটু একটু জিয়াউর রহমানের মতন লাগতেছিল। ওইরকম সানগ্লাস ছিল উনার। মঞ্চে কি সানগ্লাস পইড়া ছিল? না বোধহয়। ওইরকম হইলে তো হাসি আসত নিশ্চয়ই। তবে প্রথমেই ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলছিল মনে আছে। এইটা মনে আছে কারণ, উনি নাইমা আসার পরে অনেক মহিলারা উনারে বলতেছিল উনি নাকি ঠিক উনার আব্বার মতন কইরা বক্তৃতা শুরু করছেন, এতে সবাই খুশি হইছিল। কোকো ভাই লাজুক লাজুক হাসতে হাসতে সবার প্রশংসা শুনতেছিল।

অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরেও আমাদের বন্ধুত্ব ছিল। উনি একটা পার্টটাইম চাকরি করত হান্টিংডেল-এর পিজা হাটে। আমাদের বাসার খুব কাছে। মাঝে মাঝে বাসায় আসত। পিজা হাটের লাল টি-শার্ট আর কালো টুপিতে উনারে দেখা অভ্যাস হইয়া গেছিল আমাদের। গরমের দিনে উনার ডিউটি শেষে বাসায় আসলে মাঝে মাঝে সবাই একসাথে মুভি দেখতাম। মাঝেমাঝে বেশ কয়েকজন মিলা ব্যডমিন্টন খেলতে যাইতাম। দৌড়াইতে না পারলে বলত, “কীরে দুর্বল লাগে? সাগু খাবি?”

ভালো ড্রাইভ করত। সবচেয়ে ভাল লাগত যেইটা, এখন ভাইবা বাইর করলাম, উনি খুব স্বাভাবিক থাকত সবসময়, যে কোনো জায়গাতেই কমফোর্টেবল মনে হইত। নার্ভাস ছিল না আবার অ্যারোগেন্টও না। তাই যে কোনো গ্রুপ সিচুয়েশনে উনি চুপচাপ থাকলেও লিডারশিপ উনার কাছেই আসত। আর উনিও এইভাবে চালাইয়া নিত যে বোঝা যাইত না চালাইতেছে। মাঝে মাঝে আমারে বলত, “তোরা এত ইনোসেন্ট ক্যান?” উনার বলার ভঙ্গিতে মনে হইত ইনোসেন্ট হওয়াটা বেশ দোষের একটা কাজ।

আরো অনেক কিছু বলত ছোটো ছোটো ভাল লাগা, খারাপ লাগা। কৈশোরের প্রেম, এইগুলা। উনার ঘরে, বিছানার পাশের দেয়ালে একটা মেয়ের ছবি ছিল বড় প্রিন্ট কইরা ল্যামিনেট করা। একটা উপন্যাস লেখা শুরু করছিল কোকো ভাই। ওইটার শুরুটা মনে আছে, একটা ছেলে প্লেনে কইরা নামে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে, মানে নিজেরে নিয়াই লিখছিল, বেশ কাঁচা লেখা, এখন মনে হয়। আসলে ডায়রিই ছিল। ওইখানে নিজের বাবার নামে বিমানবন্দরে নামতে কেমন লাগে তার বর্ণনা ছিল।

আরাফাত রহমান কোকো

তো এইসব ঘটতে ঘটতেই এরশাদের পাওয়ার গেল। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসলেন। তখন বুঝি নাই, এখন মনে হয় সেইটা বিশাল ঘটনা ছিল আসলে। জিয়াউর রহমান মারা যাওয়ার দশ বছর পরে আবার বিএনপি ক্ষমতায় আসল। কোকো ভাইও নিশ্চয়ই এই পরিবর্তন টের পাইছিল। অথচ উনার চলাফেরায় বা আমাদের সাথে মেলামেশায় সেইরকম কিছু বুঝতে পারা যায় নাই। আমরা তখনও আগের মতনই ব্যাডমিন্টন খেলতাম, মুভি দেখতাম, বিচে বেড়াইতে যাইতাম। শুধু বাংলাদেশীদের মধ্যে উনার খাতির বাইরা গেছিল। অনেক দাওয়াত পাইত। আর সেইসময় মেলবোর্নে বাংলাদেশী কমিউনিটি এত বড় ছিল না। সবাই প্রায় সবাইরে চিনত। দেখা যাইত আমাদের দাওয়াতগুলা কমন পড়তেছে। তো দাওয়াতেও আমরা আমরাই আড্ডা দিতাম। আর কোকো ভাইয়ের জনপ্রিয়তা নিয়া উনারে ক্ষেপাইতাম। ততদিনে উনি পিজা হাটের চাকরি ছাইড়া দিছিল, প্লেন চালানোর লেসন নিতে শুরু করছিল।

মাঝে মাঝে যখন ব্যাডমিন্টন খেলতে যাইতাম, উনি গিয়া একদম অপরিচিত সাদা লোকেদের সামনে দাঁড়াইয়া বাংলায় কথা বলতে থাকতেন, ওরা কিছুই না বুইঝা হাসত, এইটা যে কতবার করছে! একবার মনে আছে, খেলার ব্রেকে বাইরের পাবলিক ফোন বুথ থেকে ফোন করতেছিল। আমিও সাথে আসছিলাম। পিছনে দাঁড়াইয়া শুনতেছিলাম। কারে জানি বলতেছিল উনার এক বন্ধুর কথা। যে কোনো একটা ব্যবসার বিষয়ে দেখা করতে চায় প্রধানমন্ত্রীর সাথে। কোকো ভাই বলতেছিল ‘আম্মাকে বলবেন, আমার বন্ধু বলে কোন স্পেশাল ফেভার করার দরকার নাই…।’

আমার মজা লাগতেছিল দেখতে। একটা মানুষরে দুই রকম দেখতেছিলাম। সেই সময়টা মনে আছে, আমরা মোনাশের স্পোর্টস অ্যান্ড রিক্রিয়েশন সেন্টারের সামনের উঠানে দাঁড়ায় ছিলাম। মানে আমি দাঁড়ায়ছিলাম, আর উনি তখনও ফোনবুথে, কত মানুষজন আসতেছিল যাইতেছিল, কেউ উনারে চিনে না। যে কোনো একটা ছেলেই উনি হইতে পারতেন তাদের কাছে।

দেশে ফিরা যাওয়ার আগে আমাদের বাসায় যখন বিদায় নিতে আসল কোকো ভাই, আমি জানতাম উনারে বিদায় দেয়া অন্য বন্ধুদেরকে বিদায় দেয়ার মতন না। দেশে গেলে উনি তো আর কোকো ভাই থাকবে না, আরাফাত রহমান কোকো হইয়া যাবে। হইতে থাকা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাদের সাথে কি আর বন্ধুত্ব হয়? পেপারে খবর পড়তে হয় তাদেরে নিয়া। যেমন আজকে পড়তেছি উনার মারা যাওয়ার খবর। এই মানুষটারে শুধু এমনি একজন মানুষ হিসাবেই চিনতাম তো আমি, তার জন্য ব্যক্তিগত শোকের স্পেস আছে কিনা কে জানে…।

সাম্প্রতিকে পড়ুন: লুনা রুশদীর আরো লেখা

About Author

লুনা রুশদী
লুনা রুশদী

জন্ম ২৪ অক্টোবর, ১৯৭৫, করোটিয়া। শৈশব কেটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টার্সে। ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলে লেখাপড়া নবম শ্রেণী পর্যন্ত, তারপর ১৯৮৯ থেকে সপরিবারে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে লা-ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক, পরবর্তীতে বৃত্তি নিয়ে ক্রিয়েটিভ রাইটিং এ স্নাতোকত্তর লেখাপড়া সিডনির ইউ.টি.এস বিশ্ববিদ্যালয়ে। ব্যাংকিং সেক্টরে চাকরি নিয়ে দশ বছর নিউজিল্যান্ড থাকার পর বর্তমানে মেলবোর্ন প্রবাসী। মেলবোর্নে স্থানীয় পত্রপত্রিকায় লেখার মাধ্যমে লেখালেখির শুরু - প্রথম বাংলাদেশি পত্রিকা ‘অঙ্কুর’ সম্পাদনা ছাত্রজীবনে। বাংলায় প্রথম প্রকাশিত কবিতা কলকাতার ‘দেশ’ পত্রিকায় ১৯৯৪ সালে। এরপর বিভিন্ন বাংলাদেশি ও ভারতীয় পত্রিকায় লেখালেখি। প্রথম প্রকাশিত ইংরেজি গল্প নিউজিল্যান্ডের ‘লিসেনার’ পত্রিকায় ২০১১ সালে। প্রকাশিত অনুবাদগ্রন্থ অরুন্ধতি রায় এর ‘দ্যা ব্রোকেন রিপাব্‌লিক’ (২০১২), উপন্যাস ‘আনবাড়ি’ (২০১৩) প্রকাশক শুদ্ধস্বর।