page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

ক্যান বিএনপি ডু সামথিং

বিভিন্ন সময়েই বন্ধু-পরিজনেরা ঠাট্টাচ্ছলে বলেন, বিএনপিরে দিয়া কিছু হবে না, এরা পারে না, বিএনপি শেষ।

তাদের তাচ্ছিল্যের মুখে আমি প্রশ্ন করতাম, এটা তো ভালো খবর না। বিএনপি আসলে কী করবে বা না-করবে তার চাইতে বড় বিষয় সরকার-বিরোধী একটা ফোর্স তো সমাজে থাকা দরকার। তা সে যেই ফর্মেই হোক। একটা জল যখন প্রবাহের মধ্যে থাকে তখন তাতে অনেকেই ভর করতে পারে।

কিন্তু প্রবাহ না থাকলে কী হবে! সবার জন্যেই তো বিপদ। বিএনপির কিছু করতে না-পারার বিকল্প কী? আছে কিছু?

সমালোচকেরা এসব প্রশ্নের মোটামুটি আস্থা পাওয়া যায় এমন উত্তর দিতে পারেন নাই।

এছাড়া আন্দোলন মানে কী? স্ট্রিট ফাইট তো? গুলির সামনে দাঁড়ানোর ব্যাপার তো? নাকি আন্দোলন বিষয়ে আপনের অন্য কোনো আইডিয়া আছে?

তাতেও নিরুত্তর বিএনপির নিন্দুকেরা।

 

কিন্তু আমি প্রশ্ন করতে ছাড়ি না। ধরেন বিএনপি আন্দোলন করতে নামলো, গুলি খাইল, মরল তাদের নেতা-কর্মীরা। এর দায় কে নিবে? এর বিচার করার জন্য আপনে কতটা আন্দোলনে রাজি আছেন?

এবারও জবাব নাই।salahuddins1

বিএনপিরা মরুক আর তার বিনিময়ে আপনেরা সরকার বদলকালীন নানা সুবিধা নিতে থাকেন, সেই মনোবাঞ্ছার আক্ষেপ বিএনপিরে নিয়া হাস্য-মশকরার মধ্য দিয়া সারতে চান কেন? এসব শুনে তারা আমার প্রতি কিছুটা আক্রমণাত্মক হন বৈকি। আমি তাদের বুঝাইতে চেষ্টা করি এই বইলা যে, বিএনপি আন্দোলনে না পারুক, কিন্তু তারা যেন বেঘোরে মারা না-পড়ে এইটা নিশ্চিত করার নাগরিক দায়িত্ব তো আপনিও পালন করেন না।

নির্দলীয় কেউ মরলে দেখা যায় বামের বুদ্ধিজীবীরা আর এনজিওওয়ালারা কর্মসূচি দেন। কেন, বিএনপি করাটা কি সমাজের জন্য একটা অন্যায় ঘটনা? সেটা যদি হয়ই তাইলে বিএনপির পারা না-পারা নিয়া এত টেনশন কেন? তারাই মরে, তারাই মারে, আপনে এইসব মারামারির মধ্য বাঁইচা থাকা আদমি আছেন, থাকেন। বিএনপির পারলেই যা না-পারলেও সই আপনের জন্যে।

কিন্তু এতে তাদের স্বস্তি হয় না। কারণ তিনি পলিটিক্যালি ইনভল্ব থাকতে চান। নিজের আশপাশের অনেক রকম অবদমন বা হয়রানির একটা প্রতিকার তো তারা আসলেই চান।

এদের এক দল মনে মনে আওয়ামী লীগ করেন। ফলে বিএনপির সমালোচনা তাদের জন্য জায়েজ। আরেক দল আছেন ‘দুই দল সমান’ এই তত্ত্বের মধ্য দিয়া আওয়ামীপণায় নিজেদের সমর্পন করেন। কিন্তু পলিটিক্যাল মুভমেন্ট করতে এরা চান না, এরা স্ট্রিট ফাইটের লোক না, ফলে ‘বিএনপিও একই’ বলে আওয়ামী লীগকে শান্তিতে থাকতে দেয়া, আবার নিজের আলেম-এলেম জাহির করতে পারা, বুদ্ধিবৃত্তিক বাহাদুরি দেখানো, নিজেরে ‘ভালো’ প্রমাণের শস্তা চেষ্টা তাদের জন্য ফলদায়ক বটে।

বৃষ্টির ভয়ে নাকাল নাগরিক আশ্রয় নিয়েছে সরকারি প্রচারণার তলায়। ছবি. রিচার্ড রোজারিও

বৃষ্টির ভয়ে নাকাল নাগরিক আশ্রয় নিয়েছে সরকারি প্রচারণার তলায়। ছবি. রিচার্ড রোজারিও

এবার বিএনপি মরুক, ছোট হোক, আগামীবার আওয়ামী লীগের একই দশা হবে, এদের পাপে-তাপে এই দুই দল শেষ হইলে পরে তারা জনগণের পক্ষের হয়ে ক্ষমতায় বসবেন — এদের রাজনৈতিক তত্ত্বটা মোটা দাগে এই বলে আমি বুঝতে পারি।

নিজেদের কোনো প্রকার অংশগ্রহণ ছাড়া বিএনপিরে সক্রিয় কিম্বা নিষ্ক্রিয় দেখতে চাওয়ার বুদ্ধিজীবীতা করুণ ঠেকে।

বিএনপির না-পারার সুযোগ নিতে চাওয়াটা তো ভালো না। এই দল বিনে তো অন্য কেউ পারার নাই দেশে। ফলে এরা পারবে। দেশের বাইরের বিভিন্ন পক্ষও এদের পারাবে। দেশের ভিতরের জনতাও এদের পক্ষে নামবে। সেই নামানামি কতটা ভয়াবহ হবে, ক্ষতিকর হবে তা ঠাহর করা মুশকিল।

কেউ নামবে না পরিস্থিতি কামনাকারী নাগরিকরা বরং আশঙ্কার কারণ। সংঘাতময় সময়ে এরা নিজেদের ঘর খুঁজে নিতে পারবে সহজেই। অন্য সময়ে একটু রবীন্দ্রসঙ্গীতে যাবে কিনা, লেখক-শিল্পী পরিচয়ে মানববন্ধন করবে কিনা তা নিয়ে দ্বিধায় থাকে। গণ্ডগোলের সময় এ সবের বালাই নাই। অফিস-ঘর, জীবন তখন তাদের জন্য সহজ হয়ে ওঠে। বিএনপির কিছু না-পারার মুহূর্তে তারা বুইঝা পায় না কী করবে এখন। বিএনপি হরতাল ডাকলে বরং সুবিধা, ঘরে বইসা টিভি দেখা যায়।

তাদের এমন ভালো থাকায় আপত্তি করা যায় না। কিন্তু আলাপটা তো আসলে পলিটিক্যাল ইনভল্বমেন্ট যখন ঘটে সেই সময় নিয়া। পলিটিক্যাল বক্তব্য হিসাবে এত বড় একটা দলরে খাটো করার চেষ্টার মনোজগতটা কোথায় সেই হদিস করা আর কি।

কেউ কেউ বলেন, অ্যাজ অ্যা পার্টি বিএনপি ইজ অ্যাবসার্ড। তাদের গ্রন্থগত বিদ্যার দৌড় দেখাটাও একটা উদ্দেশ্য বৈকি। এসব আলাপ শুনলে মনে হয় যেন বা বই পইড়া পইড়া দুনিয়ায় দল গঠন করা হইছে।

বিএনপি ফলে নানা কারণেই সমাজের একটা অংশের অস্বস্তির কারণ।

যে কারণে তার বিষয়ে আলাপও দরকারি। বিএনপি নামের একটা দলের যে বিপুল জনসমর্থন আছে, তারা ক্ষমতায় ছিল দীর্ঘ সময়, স্বাধীনতার পর সবচেয়ে আলোচিত দল। আওয়ামী লীগ মোকাবিলার কার্যকর দাওয়াই। তো সেই দল রাতারাতি একেবারে যে অকর্মণ্য হয়ে যাবে এমন ভাবনা ক্ষতিকর, এ জন্যই তর্কটা করা।

বরং সমাজে যে মত এবং চিন্তার আন্দোলন নাই, কর্মসূচি নাই — বিএনপির না-থাকার চাইতে এই না-থাকার প্রতিক্রিয়া অধিক ক্ষতির। সে জন্যই সমাজরে এমন বিএনপি মূল্যায়ন বিষয়ে সতর্ক করে দেয়া।

বিএনপি না-পারার কারণ নাই তেমন। এইটা সহজে অনুমেয়।

সবসময় একটা জনমত থাকে যারা সরকারবিরোধী, এটারে ঠেকায়া রাখা সহজ হয় না। একই সঙ্গে আমাদের দেশে আওয়ামী লীগ বা বিএনপি উভয় দলেই নেতৃত্ব সংকট আছে, প্রো-পাবলিক কর্মসূচির অভাব আছে।

সরকারে থাকা দল বেশি বেশি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ব্যবহার ঘটায়, রাষ্ট্রীয় বাহিনী যখন পিপলের বিপক্ষে দাঁড়ায় তখন সেটা বড় ঘটনা। রাষ্ট্র এভাবে দিনের পর দিন চলতে পারে না। সরকারি দল নিজের সংগঠন এভাবে টিকাইতে পারে না। নিজেদের নিরাপত্তা নিয়া ভয় পায়। ফলে বাংলাদেশে পরিবর্তন আসবেই। সেটা বিএনপি ছাড়া আর কার হাত দিয়া আসবে?

বিভিন্ন সময়ে নাগরিক সমাজ এই সরকারের বিরোধীতা করেন। তারা সুশীল, ক্ষতে মলম লাগাইলে তাদের চলে। কিন্তু বিপ্লবের নামে ক্ষতে মলম লাগানোর সুশীলীয় আচরণকারীরা অদ্ভুতভাবে সমাজে বিপ্লবী বা মার্ক্সানুসারী হিসাবে জনপ্রিয়তা পান কেন কে জানে? ফলে তারাও কেবল বিচার চান। কিন্তু মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, অধিকার খর্বকারী সরকারের পদত্যাগ চান না। নির্বাচন চান না। চাইলেই তো তাতে বিএনপির স্বরে স্বর মিলে যায়।

এসব তো পলিটিক্যাল কিপটামি। ক্ষমতায় না-যাওয়ার রাজনীতি।

এখনকার বিপ্লবীদের দৌড় টক শো পর্যন্ত। বিএনপির না-পারার আলাপ হইল তারই প্রয়াস মাত্র। বরং সরকারবিরোধীতার মধ্য দিয়া বিএনপির লগে দেনদরবারে যাইতে পারলে অধিক শান্তির সমাজ আমরা পাইতে পারতাম।

তা সেই টনক কে নাড়াবে। দুই দলকেই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দানের মধ্য দিয়া নাগরিক কার্য সমাধা করার স্বভাব তো আমাদের পুরানা বলতে গেলে।

 

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।