page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

গাছতালীয়

“আমার বড় চাচা যখন মইর‍্যা গেছে লগে লগে বাড়ির একটা গাছও মইর‍্যা গেছে। হুনছিলাম ঐ গাছটায় নাকি গজাল লোহা দিয়া বান মারা আছিলো” এতটুক বলতেই জুয়েলের শরীর কেপে ওঠে। বর্ষাকালের নিকষ অন্ধকার রাত। এক পশলা বৃষ্টিও হয়েছে। বাইরে দমকা হাওয়া, কারেন্ট চলে গেছে বেশ আগেই। হারিকেনের সলতে দুলছে—কখনও নিভু নিভু কখনও দপ করে জ্বলে। সাদা দেয়ালে ধুসর ছায়া কিলবিলিয়ে খাবি খায়। আমরা যারা শুনছিলাম তাদেরও বুক কাপে।

‘বান মারা’র কাহিনী আধা-ভৌতিক। পুরোটা শোনার জন্য মরিয়া হয়ে উঠি। বৃষ্টি-বাদলার এমন রাতে ভৌতিক গল্পের আসর বসতো মাঝেমাঝে আমাদের বাসায়। ১৯৯৩ বা ৯৪ সালের কথা। বরিশালের সরকারী যে কলোনিতে আমরা থাকতাম সেখানে গাছের আধিক্য ছিল। অনেকগুলো দোতালা পুরানো বাড়ি। অর্ধেকরও বেশি পরিত্যক্ত। আমরা যে বিল্ডিংটাতে থাকি তার বাকি তিনটা ফ্লাটই খালি। বাসার চারপাশে গাছ। একটা গাছের ডাল বারান্দায় ঝুলে পড়েছে। গাছে গজাল লোহা দিয়ে বান মারার কাহিনী শুনে চট করে সেদিকে দৃষ্টি চলে যায়। গা শিউরে ওঠার মতই।

জুয়েল বলে চলে, “চাচা মইর‍্যা যাওয়ার মাসখানেক পরে গাছটা আমরা ভালো দামে বেইচ্চা দেই। গাছটা যেমন মোডা তেমন লম্বা আছিল। কিন্তু গাছ কাটার সময় ভিত্তরে একটা লম্বা গজাল লোহা পাওয়া গেল! কেমনে হাইন্দা ছিল সেইটার কোনো কুলকিনারা আমরা হরতে পারলাম না।”

বান এক ভয়ঙ্কর অস্ত্র হিসাবেই বরিশালে প্রচলিত। অনেক মানুষ বিশ্বাস করে। আমরা তো তখন করতামই। লোকজন বলত একটা শব্দ ‘কুফুরি কালাম’ —এর মাজেজা কী আমরা জানতাম না, তবে যারা এটা জানে তারা বান মারতে পারে বলেই অনেক মানুষকে বিশ্বাস করতে শুনতাম।

তারা বলত, কিছু কিছু হুজুর বা ফকির আছে যারা এইসব গুপ্ত কুফুরি কালাম জানে। এই কালাম কাগজে বা গাছের পাতায় বা লোহায় বা তামায় বা এমন কিছুতে লিখতে হয়, তারপর যার উপরে প্রয়োগ হবে বা যার ক্ষতি করা হবে তার আশেপাশে কোথাও রাখতে হবে। কখনও কখনও এই গুপ্ত মন্ত্র লেখা কাগজ ধুয়ে পানি খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। বা আরো অনেক খাদ্যদ্রব্যের সাথে এটা টার্গেট ব্যক্তির পেটে চালান করার ব্যবস্থা করা হয়। এবং এভাবে বান মারার ফলাফলের কাহিনী বরিশালের লোকমুখে ফেরে। কিন্তু গাছে বান মারার কাহিনী আমরা শুনি নি আগে।

ফলে সবাই জুয়েলের কথা শুনে একটু নড়চড়ে বসলাম। টান টান উত্তেজনার মধ্যে জুয়েল জানালো ঐ গাছের মধ্যে লোহা জাতীয় কিছু ঢুকে আছে। না কেটে কোনো অবস্থাতেই কোনো লোহা গাছের ভেতরে ঢোকানো সম্ভব না।

বাইরে কোনো আঁচড়ের দাগ নাই। লোহার সাথে পাওয়া গেল একটা চিরকূটও। সেখানে কুফুরি কালাম লেখা।

এলাকায় শোরগোল পড়ে গেল। বিশাল গাছটা নাকি তিনমাস আগে থেকে পাতাশূন্য হতে থাকে। তখন অনেক বুড়োবুড়ি নাকি সন্দেহ করেছিল গাছটা মরে যাবে। তারপর ঠিক যেদিন জুয়েলের কাকা মারা গেল ঠিক সেদিন গাছটাও মরে গেল। এটা ঐ বানের অ্যাকশন ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।

এরপরে ঐ বাড়ির সব গাছ কাটা হয়। এবং আরো একটা গাছে গজাল লোহা আবিষ্কার হয়। দেখা গেল সেই গাছটাও অর্ধমৃত। সাথে সাথে আবিষ্কার হল ঐ মৃত চাচার স্ত্রী প্রায় দুইমাস যাবৎ অসুস্থ্। যেদিন গাছটা কেটে লোহাটা বের করে ফেলা হয় তারপর থেকে কাকি আম্মাও আস্তে আস্তে সুস্থ্ হয়ে ওঠেন।

About Author

কৌশিক আহমেদ
কৌশিক আহমেদ

চুয়াত্তরে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে জন্ম। ইংরেজি সাহিত্য ও ব্যবসা প্রশাসনে পড়াশুনা। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত। বাংলাদেশের ব্লগ, সামাজিক গণমাধ্যম, নতুন মিডিয়া এবং এর সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত ও প্রভাব নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত। ব্লগ: বিপদজনক ব্লগ