page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

গোয়েন্দা শবর দাশগুপ্ত

বাংলা সাহিত্যে শবর দাশগুপ্ত নামে যে একজন গোয়েন্দা আছেন, এ কথা সম্ভবত ডিটেকটিভ কাহিনির ভক্ত পাঠকদের অনেকেরই জানা নেই। এক্ষেত্রে অন্যদের অজ্ঞতার ব্যাপারে আমি অবলীলায় দায়িত্ব নিচ্ছি। নিচ্ছি কেননা, গোয়েন্দা সাহিত্যের একনিষ্ঠ পাঠক হওয়া সত্ত্বেও আমি নিজে মাত্র কয়েক মাস আগে শবর দাশগুপ্তের খোঁজ পেয়েছি। আমি কোথাও কোনো তালিকায় শবরের নাম পাই নি।

গোলাম কিবরিয়া নামে এক কলিগের মুখে আমি প্রথম শবরের নাম শুনি। তিনি আমাকে শবরের একটি বই পড়তে দেন। কিছুটা কৌতূহল নিয়ে আমি উপন্যাসটি পড়ি। এবং পড়ে চমকে উঠি। আমি শবরের একনিষ্ঠ ভক্তে পরিণত হই। এ এক অচেনা মহাদেশ আবিষ্কারের মতো।shibbratalogo

আমার মতে, শবর বাংলা সাহিত্যের এক সার্থক হার্ড-বয়েল্ড ডিটেকটিভ ক্যারেকটার। আমি বাজারে খোঁজ করতে থাকি, শবরকে নিয়ে কী কী উপন্যাস আছে।

লালবাজার, কোলকাতা পুলিশ হেডকোয়ার্টার

লালবাজার, কোলকাতা পুলিশ হেডকোয়ার্টার

শবর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটি চরিত্র। তিনি কলকতা শহরে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের একজন ইনস্পেক্টর। লালবাজারে তার কর্মস্থল।

লন্ডন শহরে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড বলতে যা বোঝায়, কলকাতায় লালবাজার বলতেও সেই একই অর্থ প্রকাশ করে। আমরা শবরকে টেলিফোনে বলতে শুনি, ‘লালবাজার থেকে বলছি।’

দাপ্তরিক কাজের সূত্রে এক একটি কেস নিয়ে নামতে হয় শবরকে। আবার অনেক সময় দপ্তরকে পাশ কাটিয়ে নিজ উদ্যোগেও তাকে আনঅফিশিয়ালি রহস্য সমাধানের কাজে নামতে দেখা যায়।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটা কোনো হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু হয় ঘটনা। শুরুতে ঘটনাটা সরল বলেই মনে হতে থাকে। কিন্তু যতোই শবর খুঁড়তে থাকেন, ততোই চরিত্রগুলোর মধ্যে স্তরের পর স্তর বের হয়ে আসতে থাকে। অনেকেরই মধ্যে আমরা লুকানো অতীত দেখি। একটি খুনের অনেকগুলি সম্ভাব্য মটিভ বের হয়ে যায়। সামনে চলে আসে অনেকগুলো সম্ভাব্য খুনি।

sadhor3

শবরকে আমরা কোনো প্রোসিডিউরাল বা প্রাযুক্তিক কৌশল অবলম্বন করতে দেখি না। ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশ্লেষণ করা, ব্লাড বা ডিএনএ স্যাম্পলিং–এসবের বালাই নেই। তার কোনো বিশেষ ডিডাকটিভ ফ্যাকাল্টিও দেখি না আমরা, যেমন ধরা যাক সিগারেটের ছাই দেখে সিগারেটের ব্র্যান্ড বলে দেওয়া ইত্যাদি।

আমরা শবরের মধ্যে কেবল একটিই বিশেষ গুণ দেখতে পাই। তিনি মানুষকে জেরা করতে পারেন। জেরায় জেরায় জেরবার করে দেন তিনি একেকজনকে।

কাল্পনিক গোয়েন্দা ইন্সপেক্টর ম্যাগ্রের এই মূর্তির আবরণ উন্মোচন করেন চরিত্রের স্রষ্টা জর্জ সিমেনো, ১৯৬৬ সালে। মূর্তির এই ভৌগলিক অবস্থানেই তিনি লেখা শুরু করেছিলেন ম্যাগ্রের কাহিনি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নানা দেশের ম্যাগ্রে চরিত্রে অভিনয়কারী চরিত্রগণ।

কাল্পনিক গোয়েন্দা ইন্সপেক্টর ম্যাগ্রের এই মূর্তির আবরণ উন্মোচন করেন চরিত্রের স্রষ্টা জর্জ সিমেনো, ১৯৬৬ সালে। মূর্তির এই ভৌগলিক অবস্থানেই তিনি লেখা শুরু করেছিলেন ম্যাগ্রের কাহিনি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নানা দেশের ম্যাগ্রে চরিত্রে অভিনয়কারী চরিত্রগণ।

এ দিক থেকে আমরা ইন্সপেক্টর ম্যাগ্রের সঙ্গে শবরের কিছুটা মিল পাবো। ইন্সপেক্টর ম্যাগ্রে জর্জ সিমেনোর সৃষ্ট একজন গোয়েন্দা, যার কর্মস্থল ত্রিশ আর চল্লিশের দশকের প্যারিস শহর। একটি উপন্যাসে আমরা প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে ম্যাগ্রেকে কেবল জেরা করে যেতে দেখি।

শবরের উপন্যাসগুলোতেও আমরা এক একটি দীর্ঘ অধ্যায় জুড়ে কেবল ডায়ালগ পাই: শবর জেরা করছেন। আর প্রজাপতির মৃত্যু ও পুনর্জন্ম উপন্যাসে তো পুরো কাহিনিটিই সংলাপে বলা।

শবরের সঙ্গে ম্যাগ্রের প্রধান পার্থক্য: ম্যাগ্রে অনেক বেশি পুলিশ অফিসার। তার সঙ্গে আমরা আরও অন্তত তিনজন ডেপুটি পাই, যাদেরকে ম্যাগ্রে নানান জায়গায় অ্যাসাইন করেন। কিন্তু শবর একেবারে নিঃসঙ্গ। তাকে আমরা একাই চলাফেরা করতে দেখি। গোয়েন্দা বিভাগে চাকরির উল্লেখ ছাড়া আমরা পুলিশের আর কোনো সংশ্রবই পাই না শবরের মধ্যে।

উপন্যাসগুলোতে শবর সম্পর্কে আমরা কোনো বর্ণনাই প্রায় পাই না। তাকে আমরা পরিবারে পাই না (সম্ভবত তিনি অবিবাহিত), কোথাও আড্ডা দিতে দেখি না। এমনকি দপ্তরেও আসীন অবস্থায় আমরা তাকে পাই না। তার সম্পর্কে আমরা টুকরো দুয়েকটি তথ্য পাই অন্য দুয়েকটি চরিত্রের মুখ থেকে। ডিপার্টমেন্টে তার খ্যাতি আছে বোঝা যায়। একবার ডিপার্টমেন্টেই আরেকজন কলিগের ব্যাপারে তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল (সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে)।

দুটি ক্ষেত্রে শবর অপরাধীকে শনাক্ত করার পরও তাকে পুলিশের হাতে তুলে না দিয়ে ছেড়ে দেন (সিঁড়ি ভেঙে ভেঙেতীরন্দাজ)।

শবরের দৈহিক গঠনের একমাত্র বিবরণ: ছোটখাটো, ছিপছিপে তবে বলিষ্ঠ গঠনের।

শবরের মধ্যে যে আবেগহীন নিরাসক্তি দেখি, তার সঙ্গে ফিলিপ মার্লোর কিছুটা মিল কেউ কেউ পেতে পারেন। রেইমন্ড চ্যান্ডলারের এই গোয়েন্দা চরিত্র চল্লিশের দশকে লস অ্যাঞ্জেলেসে তৎপর ছিলেন। গঠনবিন্যাসের দিক থেকে ম্যাগ্রের চেয়ে মার্লোর কাহিনিগুলোর সঙ্গেই শবরের কাহিনির বেশি মিল।

কাল্পনিক গোয়েন্দা ফিলিপ মার্লো, লেখক রেইমন্ড চ্যান্ডলার।

কাল্পনিক গোয়েন্দা ফিলিপ মার্লো, লেখক রেইমন্ড চ্যান্ডলার।

 

এসব কাহিনি আবর্তিত হয় শহুরে নাগরিক জীবনের নৈতিক স্খলন, প্রতারণা, গোপন প্রণয়, দ্বিচারিতা, অযাচার, ব্ল্যাক মেইলিং, প্রতিহিংসা ইত্যাদিকে ঘিরে। তাছাড়া সমাজের উঁচুতলার মানুষের প্রতি নিচু তলার মানুষের ঘৃণাও কিছু কিছু কাহিনির বিষয়। ম্যাগ্রের কাহিনির ধরন বরং কিছুটা ক্লাসিক্যাল যুগের।

শীর্ষেন্দুর উপন্যাসগুলোর মলাটে কোথাও উল্লেখ থাকে না এটি শবরের কাহিনি। ফ্ল্যাপ পড়ে কখনও কখনও আঁচ করা যায় বটে। যেসব ক্ষেত্রে ফ্ল্যাপ থাকে না, সেগুলোয় জানার কোনো উপায় নেই। আমি খুঁজে-টুজে মাত্র পাঁচটি উপন্যাস জোগাড় করতে পেরেছি। সেগুলো হলো:
১. ঋণ
২. সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে
৩. আলোয়-ছায়ায়
৪. তীরন্দাজ
৫. প্রজাপতির মৃত্যু ও পুনর্জন্ম

এর বাইরে আরো শবর কাহিনি থাকতে পারে। আমার জানা নেই।

গোয়েন্দা শবরের স্রষ্টা র্শীষেন্দু মুখোপাধ্যায়।

গোয়েন্দা শবরের স্রষ্টা র্শীষেন্দু মুখোপাধ্যায়।

শীর্ষেন্দু নিজে এই চরিত্রটির প্রতি কতোটা মায়া বোধ করেন, আমার সন্দেহ আছে। আমি তাঁর কোনো সাক্ষাৎকারে কোথাও শবরের উল্লেখ পাই নি। শবরকে নিয়ে তিনি সম্ভবত কোনো উচ্চাভিলাস পোষণ করেন না।

বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের কোনো তালিকাতেও আমি শবরের নাম পাই নি।

তবে আমি শবরে মুগ্ধ। আমার মতে, এ মুহূর্তে বাংলার জীবিত গোয়েন্দাদের মধ্যে শবরই শ্রেষ্ঠ। তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী মিসির আলির মৃত্যু ঘটেছে অতি সম্প্রতি, ২০১২ সালের ১৯ জুলাই।

২৪/৫/২০১৪

ওয়েব লিংক

এবার শবর (২০১৫) – ইউটিউবে সিনেমা

About Author

শিবব্রত বর্মন

কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক। জন্ম : ১৯৭৩, ডোমার, নীলফামারী। প্রকাশিত গ্রন্থ : ছায়াহীন; মিগুয়েল স্ট্রিট (অনুবাদ) ভি এস নাইপল; কদর্য এশীয় (অনুবাদ) সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ; পাইয়ের জীবন (অনুবাদ) আয়ান মার্টেল