page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

গয়নার বাক্স (২০১৩)

goynar-bakso-231

অভিনেত্রী ও চিত্রপরিচালক অপর্ণা সেনের ছবি ‘গয়নার বাক্স’ তিন প্রজন্মের নারীর গল্প।

সিনেমা বানানোর ১৯ বছর আগে পরিচালক অপর্ণা সেন এই গল্পটি নিয়ে সিনেমা বানাতে চেয়েছিলেন কিন্তু কোনো প্রোডাকশন হাউজ রাজি হয় নি। ছবিটি বানানোর জন্য যখন কোনো উপায় পাচ্ছিলেন না তখন অপর্ণা সেন লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে অনুরোধ করেছিলেন গল্পটির সিনেমা স্বত্ব যেন আর কাউকে না দেন তিনি। যখনই হোক যেভাবেই হোক তিনি গল্পটি নিয়ে সিনেমা বানাবেনই।

প্রায় দেড় যুগেরও পরে অপর্ণা সেন তার সেই স্বপ্নের ছবিটি বানাতে পারলেন। ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মুক্তি পায় ‘গয়নার বাক্স’ ছবিটি ।

অপর্ণা সেন বলেন,‌ “১৯৯৩ সালে যখন আমি প্রথম গয়নার বাক্স  বইটি পড়ি সে সময়ই আমি মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিলাম গল্পটিকে ছবি বানাবো বলে কিন্তু কেউ অর্থলগ্নি না করায় এত দেরি হলো।”

গয়নার বাক্স ছবির পোস্টার।

১.
১৯৫৩ সালে, অনেক বছর পরে মিত্র বাড়িতে কোন বাচ্চার জন্ম হল। বাচ্চা অবিকল তার পিসি ঠাকুমা রাশমনির (মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়) মতো দেখতে।

অনেক বছর পর জন্ম, তাই বাচ্চার আদরের কমতি নেই। চৈত্র মাসে জন্ম তাই নাম হলো চৈতালী। বাচ্চা চৈতালীকে নিয়ে মায়ের খুব দুঃশ্চিন্তা।

সবাই চৈতালীকে পিসি ঠাকুমার মতো দেখতে বললেও আসলে চৈতালীর সবটুকুই, এমনকি ঠোঁটের নিচের তিলটাও পিসি ঠাকুমার ডুপ্লিকেট। চৈতালীর (শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়) মা (কঙ্কনা সেন শর্মা) তো বাচ্চা চৈতালীকে দেখে বার কয়েক `পিসিমা’ `পিসিমা’ বলেও ডেকে উঠতেন। পয়মন্ত মেয়ে বলে চৈতালীর সুনাম সবার মুখে মুখে।

movie-review-logo

চৈতালী মিত্রবাড়িতে বাবা, মা, কাকা, কাকি, ঠাকুরদা, ঠাকুমার সাথে থাকলেও আরো একজনকে দেখতে পেত। তিনি চৈতালীর পিসি ঠাকুমা রাশমনি। তবে তিনি আর দশজনের মতো মানুষ নন, তিনি হচ্ছেন ভূত। ঠাকুমাকে চৈতালী ছাড়া আর কেউ দেখতে পায় না, চৈতালীর জন্মের আগে অবশ্য তার মা রাশমনি ভূতকে দেখতে পেতেন। কিন্তু চৈতালীর জন্মের পর ভূত রাশমণিকে দেখার সুযোগ বা দায়িত্ব হাতছাড়া হয়ে যায় চৈতালীর কাছে।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখা গল্প থেকে গয়নার বাক্স  ছবিটি অপর্ণা সেনের চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় এবং শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে।

ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মৌসুমী চ্যাটার্জি (রাশমনি), কঙ্কনা সেন শর্মা (সোমলতা) এবং শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায় (চৈতালী); গয়নার বাক্স ঘিরে তিন প্রজন্মের নারীর সামাজিক অবস্থান উঠে এসেছে ছবিটিতে।

রাশমনি ও লতা

২.
দেখতে দেখতে চৈতালী বড় হয়ে গেল। পূর্ববাংলা থেকে বহু শরণার্থী মানুষ এপারে (পশ্চিমবঙ্গ) আশ্রয় নিল। ওপারে (ইস্ট পাকিস্তান) তখন ১৯৭১-এ যুদ্ধের আগুন জ্বলছে।

পূর্ব পাকিস্তান তাদের মাতৃভাষাকে সম্বল করে চায় আলাদা সত্তা। তাদের দাবি স্বাধীন বাংলাদেশের।

চৈতালীর বয়স ১৮ পেরিয়ে ১৯ বছর হলো। চৈতালীর মা তার ১৯ বছরের জন্মদিনে একটা বাক্স দিলো তার হাতে। চৈতালী অবাক হয়ে বলল, ‘এটা কী।’

মা বলল, ‘‘তোমার এক ঠাকুমার গয়নার বাক্স এটা। দেখে নাও এক রত্তি এদিক-ওদিক হয়নি কো। তোমার ঠাকুমার নিজ হাতে করা গয়নার হিসাবে মিলিয়ে নাও। তোমার জিনিস তোমাকে দিয়ে দিলাম।’’

বাক্সে থাকা সেকালের ৫০০ ভরি সোনার জবরজং গয়নার প্রতি কোন আগ্রহ ছিল না চৈতালীর। সে রেখে দিতে বলল বাক্সটি। যদিও চৈতালীর জন্মের পর পিসি ঠাকুমার ভূতকে আর দেখতে পান নি চৈতালীর মা কিন্তু তিনি বুঝতেন পিসিমাকে আর কেউ না দেখতে পেলেও চৈতালীর সাথে ভূত ঠাকুমার কথা হয় নিয়মিত। এই বাক্সভর্তি গয়নার পিছনে রয়েছে চৈতালীর মা, পিসি ঠাকুমা আর পুরো বাড়িটাকে নিয়ে অনেক ঘটনা।

গয়নার বাক্স  ছবিতে উল্লেখযোগ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় (চন্দন) , মানসী সিংহ (চৈতালির ঠাকুমা) ও পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (চৈতালীর দাদা)।

৩.
আগাগোড়া গল্পে মোড়া গয়নার বাক্সটার গল্প শুরু পিসি ঠাকুমার বিয়ে থেকে। চৈতালীর ঠাকুমা রাশমনির ১১ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল। তখন তারা থাকতেন পূর্ববাংলার ফরিদপুরে। আর বিয়ে হয়েছিল বরিশালের প্রতাপপুর গ্রামে। বাপের বাড়ি থেকে যৌতুক হিসেবে পেয়েছিলেন ৫০০ ভরি গয়না। ১২ না পেরোতেই বিধবা হলেন পিসি ঠাকুমা।

“আয়লো সখি আয়….কন্যা সাজে লো বিহাই…কইন্যা লাজে মইরা যায়” ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের সাথে সাথে রাশমনিকে (মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়) বিধবার সাজে সাজায় সবাই মিলে। ছবিতে দেখা যায় ১২ বছরের বিধবা রাশমনির গয়না খুলে ফেলছেন বাড়ির মেয়ে-মহিলারা…পরনের রঙিন শাড়িটাও খুলে বিধবার সাদা থান পরিয়ে দেয়া হয়। আয়নার প্রতিবিম্বে ছবির এই অংশটা দেখা যায়। তখন ঠাকুমা রাশমনির চুল ছিল পা পর্যন্ত লম্বা।

রাশমনি মারা গেছেন কিনা পরীক্ষা করে দেখছে লতা, কিছুক্ষণ পরেই ভূত হয়ে যাবেন রাশমনি।

রাশমনির কাকুতি-মিনতি সত্বেও বিধবার সাজে সেই চুল ছেলেদের মতো ছেটে দেওয়া হল। সেই থেকে রাশমনি বাপের বাড়িতে ছিলেন। আর কখনো শশুর বাড়িতে যান নি।

বিধবা হলেও বয়সকালে ডাকসাইটে সুন্দরী ছিলেন রাশমনি। রূপের দেমাগও ছিলো খুব। ওই বয়সে বিধবা বলে ভাইয়েরা বোনকে তোলা তোলা করে রেখেছিলেন বরাবরের মতোই। পিসি ঠাকুমার মেজাজ সব সময় তিখরে থাকত। সারাদিন ঘরে বসে বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া গয়নাগুলি দিয়ে সাজতেন আর খেতে ডাকলে রেগে বলতেন, ‘‘বাড়া ভাত নিয়ে বইসা আছে… ডাকাডাকির বহর যেন পঞ্চব্যাঞ্জন সাজাইয়া বইসা আছে, দিব তো ভাতের পাতিল দুইটা কাচকলা সিদ্ধ, তার আবার ডাকাডাকি!”

এভাবেই বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত বাক্সবন্দি গয়না নাড়াচারা আর খাতাকলমে হিসাব করে দিন কাটাতেন রাশমনি ঠাকুমা। তার বাবা মারা যাবার পর ভাইয়ের সংসারে দিব্যি উপরতলার তিনটি ঘর দখল করে থাকতেন এই গয়নার জোরে। ভাইয়ের ছেলে, ছেলের বউ সবাই ভাগারের শকুনের মতো ওৎ পেতে আছে, রাশমনি চক্ষু বুঁজবে আর গয়নার ভাগ বাটোয়ারা শুরু হয়ে যাবে!

বয়স বাড়ার সাথে সাথে পিসি ঠাকুমার রাগও বাড়তে থাকে উর্ধ্বগতিতে। রাশমনি ঠাকুমার ভয়ে তটস্থ থাকত ভাইয়ের বউরা।

৪.
রাশমনির সেই গয়নার বাক্স কীভাবে চৈতালীর হাতে আসলো সেটা এক লম্বা কাহিনি।

ভূত পিসি ঠাকুমা বেঁচে থাকতে মানে মানুষ অবস্থায় গয়নার বাক্স কক্ষনো হাতছাড়া করেননি। গয়নার এত দাবিদার সত্বেও এগুলি কী করে চৈতালীর হলো সে অনেক লম্বা ভূতুরে ইতিহাস।

তখন ১৯৪৯ সাল। ভারতের স্বাধীনতার দু’বছর পরের ঘটনা। পশ্চিমবঙ্গ আর পূর্ব পাকিস্তান দুই আলাদা দেশ। চৈতালীর ঠাকুরদারা সবে পূর্ব পাকিস্তানের ফরিদপুরের পৈত্রিক ভিটে ছেড়ে এপারের (ভারত) বাড়িতে উঠেছেন। এই সময় চৈতালীর মা সোমলতা নতুন বউ হয়ে মিত্রবাড়িতে এলেন।

নিজেদের ঘরে লতা ও চন্দন

“লখী আইলো ঘরে… লখী আইলো ঘরে”…  নতুন বউ সোমলতার আলতা পায়ে, দুব্বাধানে গৃহপ্রবেশ হলো।

চৈতালীর বাবা চন্দন মিত্রবাড়ির ছোট ছেলে। দাদার বিয়ের পরে তার বিয়ে হলো গরীব ঘরের মেয়ে লতার সঙ্গে। গৃহপ্রবেশের পর লতা আর চন্দনকে নিয়ে চৈতালীর ঠাকুরদা, তার ছোট বোন রসু অর্থাৎ রাশমনির কাছে গেল। নতুন বউ দেখে রাশমনির মনে তেমন খুশি দেখা গেল না। উল্টা রাগান্বিত স্বরে একটা সাদা বিড়ালকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “আপদটারে তাড়া তো, আবার আমার ঘরে ঢুকছে! চৈতালীর বাবাকে ধমকে বললেন, ওই চান্দু বিয়া করছোস বইলা কি দশটা হাত গজাইছে তোর! বিড়াল তাড়া, তাড়া, তাড়া এক্ষনি তাড়া।’’ চন্দন পিসির ভয়ে বরের সাজেই খাটের নিচে ঢুকে হুশ হুশ করে বিড়াল তাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ততক্ষণ নতুন বউ কাঠ হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

লতা  পিসি ঠাকুমাকে প্রণাম করতে গেলে রাশমনি চন্দনকে বলেন, ‍”হারে চান্দু, তুই নাকি হা ঘরের মাইয়া বিয়া কইরা আনছোস?’’

চন্দনের মুখে ঠেসে মিষ্টি গুজে দিয়ে নতুন বউকে তার পালঙ্কে বসতে বলে লতার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘আবুইদ্দা বলদ, মায়ে সম্বন্ধ করলো বুঝি? দেহি মুখখান… গায়ের রঙটা আসল নাকি পমডার মাখছো?”

“চুলের গোছখান দেহি” বলেই লতার চুলের মুঠি চেপে ধরলেন। লতা ভয় পেলো কিছুটা। রাশমনি লতার চুল দেখে বললেন, “এ আর এমন কী, বিধবা হওনের আগে আমি চুল পাইত্তা বইসতে পারতাম, তা জানো?” উচ্চস্বরে চন্দনকে ডেকে বললেন, “চান্দু গেরেজের (সোকেস) উফর থেইক্কা ফুটোখান আনতো।”

চন্দন ছুটে এসে পিসিকে ফটো এনে দেয়। ফটোটা লতাকে দেখিয়ে রাশমনি বলেন, “এই দেহো আমার এগারো বচ্ছরের ফুটো (মাথা থেকে পা বিছানো খোলা চুল), ম্যাম ফুটোগ্রাফার বাড়ি এইসে উঠাই ছিলো বোজছো।”

রাশমনির কথায় কিছুটা অধের্য্য হয়ে রাশমনির দাদা বলে, “রাসু এইবার আসল কামটা…” রাশমনি বিরক্ত হয়ে বলে, “হ জানি জানি, তোমারে (লতার উদ্দেশ্যে) এক্ষন গওনা দেওন লাহবো তাই তো?”

লতা অবাক হয়ে ভয় ভয় স্বরে বলে, “নাহ… নাহ…।”

রাশমনি কটাক্ষ করে বলেন, “থাক থাক আর ন্যাকা সাইজো না।”

গয়না বাক্সটা খুলে গয়না হাতে নিয়ে নিয়ে ওজন দেখে তুলনামূলক কম ভারি দুটো বালা নিয়ে লতার হাতে দিয়ে বললেন, “বাপের ঘরে দেখছো কহনো এমন জিনিস? এই চুনিগুলো আমার ঠায়ুমার আছিলো। সাবধানে রাখবা বুঝলা? ওহন আসো গিয়া, আমার যেন আর কাম কাজ নাই।’’

রাশমনি তার গয়নার করা তালিকা থেকে আরো একটা গয়নার নাম কেটে সবাইকে বিদায় করলেন ঘর থেকে।

৫.
চৈতালীর দাদা-বাবারা তাদের জমিদারিত্ব বজায় রাখার জন্য কোন কাজ করতেন না। পশ্চিমবঙ্গে আসার পরও বসে বসে ঘরের আসবাবপত্র, জমি-জিরাত বেচাবিক্রি করে দিনপাত করেন মিত্রবাড়ির লোকেরা। আর ঘরের ছেলেরা ঘুরেফিরে মাছ ধরে আয়েসে দিনযাপনে ব্যস্ত। বাকিটা জীবনের ভাবনা তাদের মাঝে ছিল না।

লতার জা গয়নার অর্ধেক ভাগ চায়

চন্দনের বিয়ের খরচ করতে গিয়ে বার্মার খাট পালং কার্পেট উজার করতে হয়েছে। বিয়ের পর এসব দেখিয়ে লতার শাশুড়ি লতাকে চন্দনের ব্যাপারে তখনই সতর্ক হতে বলেন।

লতা খুব ভীতু, একটু তোতলা আর সাধারণ মেয়ে। স্বামীকে ভগবান হিসেবেই ভাবতে জানে, তাই ভগবানকে ঠিক পথে আনতে ভয়ে মরি মরি অবস্থা তার। চন্দন দিনে তবলা আর সন্ধ্যায় কমলা (‘বাজারি মেয়েলোক’) নিয়ে দিন কাটায় কিন্তু কোন কাজ করে না।

লতা চন্দনকে বিভিন্ন ভাবে বোঝায় কাজ করতে, তবু লাভ হয় না।

৬.
একদিন ছাদে ওঠার সময় লতা  পিসি শাশুরীর ঘরে ঢুকে পিসিকে ডাকলো। কিন্তু পিসি কোন সাড়া শব্দ না করে সটান হয়ে ‍শুয়ে আছে দেখে, লতা নাকের কাছে হাত নিয়ে শ্বাস দেখলো, পা ধরে দেখলো ঠাণ্ডা হয়ে আছে। লতা ভয় পেয়ে গেল, একটা আতস কাচ পিসি শাশুড়ির চোখে রাখলো। তাও রাশমনির কোন সাড়া না দেখে মারা গেছে বুঝে চিৎকার করে উঠলো লতা। ছুটে ঘর থেকে বের হতে গিয়ে ‍পিছন থেকে পিসি শাশুড়ির ডাক শুনে তাকাতেই লতা রাশমনির লাশের পাশে রাশমনির ভূতকে কথা বলতে দেখলো।

মরা পিসিমা ভূত হয়ে উঠে বসে লতাকে বললেন, “খাড়াও, সংবাদটা পরে দিলেও চলবে। শুইনাই তো সব হই হই কইরা লাফাইয়া জুটবো শকুনের পাল। তোদের মনে কি আছে তা আমি জানি না মনে করছোস? ভাবতে আছোস পিসিমা বিদায় হইছে এহন আইসা ঘরগুলানের দখল নিবি? আমার গহনার বখরা করবি? কোনটাই হইবো না। তোর বর ওই বলদটাকে কইয়া দিছ, এই ঘরে থাকনের মতলব করলে দশদিনের মধ্যে শ্বাস উইঠা মরবো।”

লতা এক দিকে ভূতের ভয় অন্যদিকে স্বামীর মৃত্যুর অশনিসংকেতে ভয়ে কাচুমাচু দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকে। রাশমনির ভূত রেগে বলে, ‘হা করে দেখছ কী? তাড়াতাড়ি কাম সারতে হইব, আইসা আমার লাশের গাট থেইক্কা চাবিটা খুলে সিন্দুক থেইক্কা গয়নার বাক্সটা বার কইরা লুকাইয়া রাখ। ভয় নাই, তোর গলা চিইপ্পা ধরুম না। কচু পোড়া, ভাবছোস তোরে দিমু এই গয়না? মরছি শুইনা সব লুটেপুটে খাইব তাই সরাই রাখতেছি। খবরদার একরতি যেন এদিক-ওদিক না হয়, আর আমার গয়না যদি গায়ে পরছ তোর বরের রক্ত চুইসা ছিবড়া কইরা খামু।”

লতা পিসি ভূতের ভয়ে, তার কথামত চাবি দিয়ে সিন্দুক থেকে গয়নার বাক্স বার করে এক নিঃশ্বাসে দৌড়ে নিজের ঘরে গিয়ে লুকিয়ে রাখে। লতাকে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় লতার জা কিছু একটা আচঁলের কোচে নিয়ে নামতে দেখে । কিন্তু বোঝে না কোঁচে কী ছিলো।

মৌসুমী চট্টোপাধ্যাযয়ের মরার পর ভূত হয়ে যাওয়াতেই শুধু ভূতের কাহিনিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং ভূত রাশমনির বৈষয়িক চিন্তা আর কাজকর্মের মধ্য দিয়ে রহস্য ও হাস্যরস আসে ছবিতে।

চন্দন লতাকে ডাকতে আসে পিসিকে শেষ প্রণাম করার জন্য। লতা ভয়ে ভয়ে গিয়ে পিসিকে প্রণাম করে। লাশের দিকে লতা তাকাতেই পিসির ভূত লতাকে চোখটিপি দেয়। তাই দেখে লতা আরো ভয় পেয়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। লতাকে বেশি বেশি কাঁদতে দেখে সবাই একটু অবাক হয়।

দোকানে লতা

পিসির শ্রাদ্ধ শেষ করেই সবাই কাছা মেরে গয়না খুঁজতে লাগে। কোনো ঘরে গয়নার বাক্স না পেয়ে পুলিশ এসে কাজের লোকদের ধরে নিয়ে যায়। তাও সন্ধান মিলে না গয়নার বাক্সের। হতাশ হয়ে  সবাই বাক্স খোঁজা সাময়িক ভাবে বন্ধ করে। কিন্তু লতার জা ধরে ফেলে লতার কাছেই গয়নার বাক্স আছে। লতাকে আধা আধা ভাগ দিতে বলায় রাশমনির ভূত লতার জায়ের জিভ এবং হাত পক্ষাঘাতে অচল করে দেন। যেন কাউকে কিছু বলে বা লিখে বোঝাতে না পারে!

কার কাছে গয়নার বাক্স — বহু জল্পনা কল্পনা করেও তা বার হয় না। ভূত রাশমনি গয়নার বাক্সের মালিকানা কাউকে দিতে চান না। মরার পরও তিনি গয়নার বাক্সের রক্ষণাবেক্ষণে ব্যস্ত। লতার সাথে বিভিন্ন ভাবে রাশমনির কথা চলতে থাকে। রান্নাঘর, পুকুরপাড়, ছাদ, শোবার ঘর সব জায়গায় রাশমনির ভূত লতার সাথে কথা বিনিময় করেন বিভিন্ন ব্যাপার নিয়ে। রাশমনি তার ছোটবেলার স্মৃতি, বিয়ে, শশুরবাড়ি, সারা জীবন বিধবা থাকার গল্প করে লতার সাথে। লতাও ভূতের ভয় আর পায় না। দুজনের মধ্যে সখ্য হয়। কিন্তু লতাকে গয়না পরার অনুমতি তিনি দেন না। রাশমনি বরং আরো সাবধান করে দেন গয়নার ব্যাপারে। কোনো গয়না খোয়া গেলে চন্দনকে মেরে ফেলার হুমকি দেন রাশমনি।

বাল্যবিধবা হ্ওয়ায় রাশমনির খুব দুঃখ ছিল। সংসার আর স্বামীর ভালোবাসার অভাব ছিল তার জীবনে। যুবতীকালে একদিন কাজের লোক রাম বিলাসকে রাতে ঘরে আনতে গেলে ধরা পড়ে যায় রাম বিলাস। আর বাড়ির পুরুষরা রাম বিলাসকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। ওই রাম বিলাস ছাড়া যুবতী কালে আর কোন বাইরের পুরুষ আসে নি রাশমনির জীবনে।

মৌসুমী চ্যাটার্জি ছবিতে ৭২ বছর বয়সী বুড়ি পিসিমার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি বলেন, “অপর্ণার জাপানিজ ওয়াইফ ছবিতে অভিনয় করে আমি ভীষণ মজা পেয়েছিলাম। সে ছবিতে অপর্ণা আমার বাংলা বলা শুনে খুব খুশি হয়েছিলেন। এবার আবার তার ছবিতে আমার কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। কে চায় না অপর্ণা সেনের মতো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করতে।’’

৭.
এক এক করে মিত্রবাড়ির সব আসবাবপত্র, সম্পদ বিক্রি হয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তখন পিসির গয়নার বাক্স থেকে একটা হার বন্দক রেখে চন্দনকে টাকা এনে দেয় লতা। শাড়ির দোকান করার জন্য। ভূতপিসি জানতে পেরে লতার চুলের মুঠি ধরে মারেন লতাকে। আর রেগে রান্নাঘরের সব কিছু ভেঙে দিয়ে চলে যান। লতা পিসিকে কথা দেয় তার গয়না বন্দক থেকে ছাড়িয়ে আনবে। চন্দনের শাড়ির দোকানের লাভের টাকা দিয়ে গয়না ছাড়িয়ে পিসিকে দেখায় লতা। পিসি খুশি হয়ে বলেন, এবারের মতো ক্ষমা করলাম। লতা তাদের দোকানের নাম ‘রাশমনি’ রেখেছে। সেটা শুনে পিসিমা তক্ষুনি দোকানে গিয়ে শাড়ি পরে পরে দেখতে থাকলেন।

তার নামে কেউ কখনো কিছু করবে ভাবেন নি রাশমনি, তাই সে আবেগে কেঁদে ফেলেন। ভূতেরও দুঃখ হয়, কান্না পায়। চন্দন আর লতার এই ‘রাশমনি শাড়ি স্টোর’ নিয়ে সবার জল্পনা-কল্পনার শেষ রইলো না। সবাই দুশ্চিন্তা আর হিংসায় কটাক্ষ করে দোকানের তীব্র নিন্দায় ব্যস্ত। জমিদারের ছেলে শেষ বেলায় বউয়ের বুদ্ধিতে দোকানদার! ছেঃ ছেঃ করতে লাগলো সবাই। চন্দনের বাবা ঘরে সালিশ ডাকলেন। ছোট বউ লতা কোথায় এতগুলি টাকা পেল ব্যবসার ক্যাপিটাল সেই বিচার করার জন্য। লতা তার বাপের বাড়ি থেকে আনা গহনা বেঁচে টাকা দিয়েছে বললে তা কেউ বিশ্বাস করলো না। উল্টা লতাকে জুতা দিয়ে পেটাবেন শাস্তি হিসেবে বলে ‍দিয়েছেন লতার শশুর। লতা ভয়ে কাঁদতে লাগলো। রাশমনি তখন লতাকে শিখিয়ে দিলেন সে যেন তার শশুরকে হুমকি দেয় শশুরের বাইরের মেয়ে মানুষ চামেলির কথা সবাইকে বলে দিবে বলে। আর ভাসুর ঠাকুর যে জুয়া খেলে টাকা নষ্ট করে সেটাও বলে দিবে। কিন্তু লতা ভয়ে তাও বলতে রাজি হয় না।

সমস্যা বেগতিক দেখে রাশমনি নিজেই লতার শশুর আর ভাশুরের কানে গিয়ে বলতে থাকেন ‘চামেলি’ ‘চামেলি’ ‘চামেলি’…. ‘জুয়ারি’ ‘জুয়ারি’ ‘জুয়ারি’।

শেষমেশ শশুর আর ভাশুর ভয় পেয়ে বলে দেন, ‘জাওগ্গা থাক, মাফ কইরা দিলাম।’

৮.
ব্যবসায় বিভিন্ন সমস্যায় রাশমনি লতাকে বিভিন্ন পরামর্শ দিতেন। লতা ঘরে থাকে, সে দোকানে কী কী হয় দেখতে পায় না। তাই লতাও চন্দনের সাথে দোকানে বসতে শুরু করে।

কঙ্কনা সেন শর্মাকে দৃশ্য বুঝিয়ে দিচ্ছেন অপর্ণা সেন

ব্যবসার লাভ বাড়তে থাকে। বাড়ির অবস্থার উন্নতি হয় দিন দিন। লতার উপর শশুর-শাশুড়ি সবাই খুব খুশি। এখন আর কেউ ব্যবসার ক্যাপিটালের সন্ধান খোঁজে না। ব্যবসা বাড়ানোর জন্য লতা চন্দনকে বোম্বে থেকে শাড়ি কিনতে পাঠায়। আর লতা একাই দোকানে কর্মচারীদের নিয়ে ব্যবসা চালায়।

চন্দন বোম্বে গিয়ে চিঠি পাঠায় সবার জন্য, শুধু লতার জন্য কিছু লেখে না। কোন যোগাযোগ করে না লতার সাথে। কষ্টে লতা ভেঙে পড়ে। একা একা কাঁদে। কেউ না বুঝলেও রাশমনির ভূত বোঝে। লতা যখন প্রতিদিন রাতে দোকান থেকে বাড়ি ফিরে একটা অপরিচিত লোক লতার পিছন পিছন এসে লতাকে দেখে আবার চলে যায়। লতা একদিন দাঁড়িয়ে লোকটাকে বকাঝকা করে, আর পিছন পিছন যেন না আসে বলে দিল। কিন্তু লোকটাকে রাশমনির খুব ভালো লাগে। একদিন ভোরে লতাকে রাশমনি ডেকে বলে, ‘‘শোনছোস ওই শোনছোস… অভাগীর বেটি ও আইছে, তোর লাভার। অমন মহিষের মত ঘুমাস ক্যান হাড়ামজাদি। হে আইসা ফোটকের কাছে খাড়াই আছে, যাবি না? বৃষ্টি ঝোইরা গেছে ভোর হইয়া আইছে। তাড়াতাড়া কর, আমি আর বেশিক্ষণ দেহ ধইরা থাকতে পারতেছি না। তোর অভিষেক আমি দেইকা যাই।’’

বুন্দিয়া বারসাতে আগান আগান… গানের ছন্দে লতা ছুটে গেল ছাদে। নিচে সেই মানুষটা একটা গোলাপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লতা নিচে নেমে ফটক খুলে বাইরে এসে দেখলো শুধু গোলাপটা গেটের সামনে রাখা, কিন্তু কেউ নাই। লতা চোখের পানিতে ফুলটা সাজিয়ে রাখে নিজের ঘরের ফুলদানিতে। রাতে যখন লতা বাড়ি ফিরছিল সেই স্বপ্নরাঙা চোখের মানুষটাকে দেখে থেমে গেল। লতা তার ভালোবাসা আর ফিরিয়ে দিতে পারল না। বাসার ফটকের কাছে এসে চন্দনকে বোম্বে থেকে ফিরতে দেখে, তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকল। চন্দন ভাবল অনেক দিন পর চন্দনকে দেখে কাঁদছে লতা। রাশমনি লতা আর চন্দনকে একসাথে দেখে রেগে একা একাই বলতে থাকেন, “মর মর মর হতভাগী মর! আবার গিয়া জুটছে ওই বলদটার লগে। মইরা যা সব মইরা যা!”

৯.
চৈতালীর জন্মের পর রাশমনি আর দেখা দেন নি লতাকে। চৈতালীর জীবনে একজন বিশেষ মানুষ আছে সেটা শুধু রাশমনি জানতেন। সে মিত্রবাড়ির কাজের লোক রাম খিলোনের নাতি বেনু। ছোট বেলা থেকে একসাথে বেনু আর চৈতালী বেড়ে উঠেছে। সেই থেকে প্রেমের শুরু। চৈতালী বেনুকে খুব ভালোবাসে কিন্তু বিয়েতেই প্রেমের পরিণতি, এমনটা সে মনে করে না। বেনু একজন স্বদেশী। পত্রিকা অফিসে চাকরি করে বেনু। কাজের লোকের ছেলে হলেও শিক্ষিত। ১৯৭১ সালে পূর্ববাংলার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল বেনু। যুদ্ধে আহত পশ্চিমবঙ্গে আসা ব্যক্তিদের সেবা, চিকিৎসা ও যুদ্ধের অস্ত্র-সস্ত্র জোগার করে দিয়ে সাহায্য করে বেনু ও তার বন্ধুরা। তাদের আখড়া ছিলো রফিক কবির বাড়ি। সেখানেই বেনুর সাথে দেখা করতে যেত চৈতালী। চৈতালীও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করত। আগত যোদ্ধাদের সেবা করত।

ছবির বাইরে মা ও মেয়ে: অপর্ণা সেন ও কঙ্কনা সেন শর্মা

একদিন চৈতালী রফিক কবির বাড়িতে গেল বেনুর খোঁজে, সেখানে রফিক কবির ডায়রি থেকে জানতে পারলো, যেই হিন্দু মহিলার প্রেমে পাগল হয়ে রফিক কবি আত্বহত্যা করেছে সে চৈতালীর মা লতা। ইস্ট পাকিস্তানে মুক্তিযোদ্ধাদের পর্যাপ্ত অস্ত্র পাঠাতে টাকার প্রয়োজন। রাশমনি চৈতালীকে বলেন, “আমার গয়নাগুলো তো আছে লইয়া যা।”

চৈতালী লতার আলমারিতে থাকা গয়নার বাক্স থেকে রাশমনির ৫০০ভরি গয়না নিল। গয়নার বাক্সে মায়ের জন্য একটা চিরকূট আর লতাকে নিয়ে লেখা রফিক কবির কিছু কবিতা লেখা পাতা রেখে দিল। গয়নাগুলি নিয়ে চৈতালী বেনুর কাছে চলে যায়। চিরকূটে মায়ের জন্য চৈতালী লিখেছিলো, ‘‘মা আমার জিনিস আমি নিলাম, তোমার জিনিস তোমাকে দিলাম। এতো ভালোবাসা অবহেলায় ফিরিয়ে দিয়েছিলে মা!’’

‘‘সিমন্তিনী তোমাকে ডেকে পাইনি সাড়া। দুয়ার ঘিরে ছিলো হাজার কাঁটার বেড়া। কেন ভরে বনের পথে সিমন্তিনী। কেন তবে কুয়াশায় সিমন্তিনী।…  একলা এলে কেন তবে বনের পথে, আমায় তুমি পথ ভোলালে…’’  কবিতার লাইনগুলি পড়তে পড়তে চোখের পানি ফেলেতে থাকে লতা। প্রিয় কাফের তোমার প্রেমে আজো বিভোর।…

রাশমনি পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে লতাকে দেখতে দেখতে মিশে যায় পুকুরের জলে। ‘‘মাঝখানে আজ বহমান পানি রচে ব্যবধান, রচে ব্যবধান তোমার আমার রচে ব্যবধান দুই বাংলার…. তাই কি এলে ওপারের মেয়ে সব কাজ ফেলে।….’

১০.
গয়নার বাক্স একটি বহুমাত্রিক চলচ্চিত্র। হাস্যরস কৌতুকের মাধ্যমে একদিকে সেকালের মেয়েদের অসহায়ত্ব, পরাধীনতা ও স্বামীকে ভয় করে থাকার গল্প রয়েছে। সেইসাথে স্বাধীনচেতা চৈতালীর স্কুটার চালিয়ে কলেজ যাওয়া, ছাদে ভূত ঠাকুমার সাথে সিগারেট খাওয়ার কাহিনিতে মেয়েদের প্রজন্ম বদলের ছাপ প্রকাশ পেয়েছে।

একটি গয়নার বাক্সকে কেন্দ্র করে মানুষের সামাজিকতা, দুঃখ-কষ্ট, প্রেম, ব্যর্থতা, দীনতা, যুদ্ধ,শান্তি এসবের মাঝে দিনযাপনের ঘটনা উঠে এসেছে সিনেমাটিতে।


ইউটিউবে গয়নার বাক্স।

About Author

নওয়াজ ফারহিন অন্তরা
নওয়াজ ফারহিন অন্তরা

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গনযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ছেন। জন্ম- ঢাকা, মে ১৯৯৩।