page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

ঘোড়াশাল থেকে ভৈরব—একটি দুঃস্বপ্ন অর্জনের ঘটনা

ghor polayon 6h

আমাদের নানুবাড়ি ছিল ঘোড়াশালে (এখনও আছে)। ছোটবেলায় নানুবাড়ি যাওয়ার মত আকর্ষণীয় ব্যপার আর দুইটা ছিল না। সাধারণত, বছরে একবার কি দুইবার যাওয়া হইত সেখানে।

একটা যাওয়া ছিল বার্ষিক পরীক্ষার পর, এটা কমন। ডিসেম্বরে আব্বু, আম্মু ও বোনদের সহ রাত বারোটার ঢাকা মেইলে চইড়া আমরা ফেনী থেকে ঘোড়াশালের উদ্দেশ্যে রওনা দিতাম। আরেকটা যাওয়া ছিল বিশেষ কোনও কারণে, বছরের মধ্যবর্তী সময়ে। আত্মীয় স্বজনদের কেউ হয়ত মারা গেল, কিংবা গুরুতর অসুস্থ হইল, অথবা এমনকি কারও হয়ত বিয়ে শাদি লাগল সমাজে—এরকম নানা ইস্যুতে আর কি।

mill bush

টেক্সটাইল মিলের জঙ্গল ২০১৪। ছবি. লেখক

ঘোড়াশাল যাওয়ার জন্য সারা বছর এতই উদগ্রীব থাকতাম যে, ডিসেম্বরের কমন ট্যুর শেষে মন যখন খুবই খারাপ—অন্তত এই আশায় বুক বানতাম তখন—যে, বছরের মাঝামাঝিতে কেউ হয়ত মারা যাইতে পারে! তাও সে রকম বছর তো আর সবসময় আসত না, কালেভদ্রে কেউ মারা-টারা যাইত। মৃত্যুর খবর পাওয়া সাপেক্ষে মাইক্রোবাস ভাড়া কইরা হল থেকে আব্বু বাসায় চইলা আসত, আর আমাদেরকে বলত ‘দ্রুত রেডি হও সবাই।’

ঘোড়াশাল যাওয়ায় মূল আকর্ষণের অভাব ছিল না। বলতে গেলে, সবই প্রায় ‘মূল আকর্ষণ’ ছিল। খালাত মামাত ভাই বোনদের মহাসম্মেলন, সারাক্ষণ হৈ হুল্লোড় করতে পারার মত নানান আইডিয়া, শীতলক্ষ্যা নদীতে দল বাইন্ধা ডুবাডুবি, টেক্সটাইল মিলের জঙ্গলে একা একা সারা দুপুর কী যেন খুঁজতে থাকা সহ মোটামুটি বড়দের নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটা ধারণার অপর নাম ছিল ঘোড়াশাল।

tanimlogo2

কিন্তু আমার তো একটা সমস্যা ছিল, সেটা হল উৎসবের মধ্যে একা হইয়া যাওয়া। মোটের ওপর, একটা পর্যায় আইসা এমন লাগত যে, হায় রে! জগতের আনন্দযজ্ঞে সকলের সহিত একাধারে আমিও কি ভেসে যাব তবে? তা কী করে হয়! বরং আমার তো মন খারাপ, আর সেই অনুপ্রেরণায় অন্য কী করা যাইতে পারে—দরকার, সেই সম্ভাবনাকে খতিয়ে দেখা। ফলে সকাল সকাল ঘুম জাইগা জাউ-ভর্তার হট্টগোল, দল ভাগ কইরা ক্রিকেট, কেরাম, লুডু ও ফুল ভলিউমে হিন্দি গান বাজতে থাকা উঠানে বেহুদাই আনন্দিত মনের দাসত্ব ত্যাগ কইরা হঠাৎ আমি নিজের মত কইরা উধাও।

এগুলারে ঠিক ঘরপলায়ন বলা যাবে কিনা নট শিওর, বরং কাউকে না বইলা বাইর হইয়া যাওয়া বললে সেটা বেশি পারফেক্ট। তো, বাইর হইয়া যাইতাম। দেখা গেল, খেয়াঘাটে গিয়া নদীতীরবর্তী বিশাল এক বটগাছের শিকড়ে সারাদিন বইসা রইলাম। ইচ্ছা হইলে আট আনা দিয়া নৌকাযোগে নদী পার হইলাম, ওইপারের নদীতীর ধইরা এক দেড় কিলোমিটার পথ হাঁইটা হয়ত ফেরিঘাট চইলা গেলাম, আর ফেরিতে তো নদী পারাপার পুরাই ফ্রি। এমনও দিন ছিল, সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি শুধু ফেরিতেই বইসা থাকছি, আর গুনছি দিনে কতবার এপার-সেপার করে ব্যাপারটা।

ঘোড়াশাল রেলস্টেশনটা ছিল কম গুরুত্বপূর্ণ, দুয়েকটা মেইল আর কয়েকটা লোকাল ট্রেন ছাড়া অন্য কোনো ট্রেন সেখানে থামে না। একটাও কোনো আন্তঃনগর ট্রেন ঘোড়াশাল স্টেশনে থামে না জন্য ছোটবেলা থেকেই আমার রেলমন্ত্রী হওয়ার শখ, যদিও তখন অবধি সেই মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। আন্তরিক ইচ্ছা ছিল, মন্ত্রী হওয়ার পর ঘোড়াশাল স্টেশনে সবধরনের আন্তঃনগর ট্রেনের স্টপেজ দিব।

ঘোড়াশাল টান ইষ্টিশন ২০১৪ । ছবি. লেখক

ঘোড়াশাল টান ইস্টিশন ২০১৪ । ছবি. লেখক

ঘোড়াশালে হচ্ছে আবার দুইটা স্টেশন, একটা ঘোড়াশাল টান ইস্টিশন, আরেকটা ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ ইস্টিশন। আন্তঃনগর ট্রেনগুলিরে ঘোড়াশালে স্টপেজ দেওয়ার ব্যাপারে নানান পরিকল্পনা করতে করতেই তখন সময় ঘুমাইতাম আমি। পরিকল্পনাগুলি ছিল এরকম, মহানগর প্রভাতী (তখন মনে হয় উর্মি ওড়না নাম ছিল) থামবে ফ্ল্যাগ ইস্টিশনে, মহানগর গোধূলি থামবে টান ইস্টিশনে, একই ইস্টিশনে মহানগর পূরবীও থামবে, আর তূর্ণা নিশিথা দুটির একটি ফ্ল্যাগে ও অপরটি টানে থামবে—এরকম।

ঘোড়াশালে গিয়া সবচে বেশি সময় মনে হয় ফ্ল্যাগ ইস্টিশনেই বইসা থাকছি জীবনে। বইলা রাখা ভালো, এটা একটা আড়াই তলা বিশিষ্ট স্টেশন। মূল লোকালয় থেকে পাহাড়ের মত একটা উচ্চতায় প্রথম থেকেই বিরাজিত সে। সিঁড়ি বাইয়া স্টেশনে ওঠা লাগে। শোনা যায়, কোন জমিদার নাকি তার ফ্যামিলি মেম্বারদের ট্রেনে ওঠার সুবিধার্থে মূল স্টেশনের বাইরে এই স্টেশনটা বানাইছিল। মানে জমিদার বাড়ি থেকে টান ইস্টিশনটা ছিল একটু দূরে। জমিদার মানুষ—মনে চাইছে, কাছেধারেই আরেকটা স্টেশন বানাইয়া নিছে—সামান্য স্টেশন!

ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ ইস্টিশন ২০১০। ছবি. লেখক

ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ ইস্টিশন ২০১০। ছবি. লেখক

এমনই ভাবে একদিন ফ্ল্যাগ ইস্টিশনে বইসা আছি, অত্যন্ত স্লো ভঙ্গিতে একটা আন্তঃনগর ট্রেন ব্রিজ পার হইয়া স্টেশন অতিক্রম কইরা আগাইয়া যাইতে থাকল। তাৎক্ষণিক ভাবে, স্টেশনে অপেক্ষমান কিছু যাত্রী সেই ট্রেনের পিছু পিছু ছুটতে শুরু করল। ঘটনা কী?

ঘটনা হইল সৌভাগ্যবশত টান ইস্টিশনে এই ট্রেনের ক্রসিং পড়ছে। মানে এমনিতে থামে না যদিও, কিন্তু আরেকটা ট্রেনকে সাইড দেওয়ার জন্য এখন থামবে। আর এ ব্যাপারে থামার জন্য টান ইস্টিশনের বিকল্প নাই, কেননা ফ্ল্যাগ ইস্টিশনে একটাই মাত্র লাইন। অথচ টান ইস্টিশনে একাধিক।

তড়িৎ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে লোকেদের সাথে আমিও ছুটতে শুরু করলাম। এবং আধা কিলোমিটার দৌড়াইয়া টান ইস্টিশনে গিয়া অন্য সবার সাথে আমিও ট্রেনটারে ধরতে পারলাম। ট্রেনে ওঠা মাত্রই পাশের লাইন দিয়া আরেকটা ট্রেন ঝড়ের গতিতে পার হইয়া গেল। বুঝলাম, একে সাইড দিতে গিয়েই এনাকে থামতে হইছে।

ছাড়তে না ছাড়তেই টিকেট না কাইটা এবং অননুমোদিত স্টেশন থেইকা ট্রেনে ওঠার অপরাধে আরও কয়েক জনের সাথে আমিও আটক হইয়া গেলাম। সেটারে বলত মোবাইল কোর্ট, বিচার বিভাগ পৃথক না কী যেন একটা হইয়া যাওয়ার পর থেকে ট্রেনে ট্রেনে এই অত্যাচার বর্তমানে বন্ধ হইছে।

ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগে ওঠার সিঁড়ি (এক) ২০০৯। ছবি. লেখক

ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগে ওঠার সিঁড়ি (এক) ২০০৯। ছবি. লেখক

দেখলেই শিক্ষিত মনে হয় এমন একজনের নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ ও টিটিই আমাদেরকে আর্থিক জরিমানা কইরা দেয়, অনাদায়ে হাজতে যাইতে হবে—এমনই এক সঙ্কটাপন্ন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় ট্রেনের ভিতরে। আটক হওয়া আমাদেরকে নিয়া মোবাইল কোর্ট বাহিনী সারা ট্রেনে ঘুরতে লাগল, অন্যান্য টিকেটছাড়া যাত্রীদের খোঁজে। মোবাইল কোর্ট বাহিনীকে আমি রিক্যুয়েস্ট করলাম, যেন আমাকে কোথাও বসাইয়া রাইখা তারা তাদের কাজ করে। এ আবদারে দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেটের টনক নড়ে! আমার দিকে ফিইরা তাকায় সে।

কেন?

শরম লাগে এভাবে সবার সামনে হাঁইটা যাইতে।

ট্রেনের ওঠার সময় মনে ছিল না?

ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগে ওঠার সিঁড়ি (দুই) ২০০৯। ছবি. লেখক

ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগে ওঠার সিঁড়ি (দুই) ২০০৯। ছবি. লেখক

বুঝতে পারি নাই এমন হবে। আব্বু-আম্মু সহ আমরাও টিকেট কাইটা ট্রেনে চড়ি সবসময়।

আচ্ছা?

জ্বী আঙ্কেল, বিশ্বাস করেন। এখন যাদের সামনে দিয়া হাঁটাইয়া নিয়া যাচ্ছেন। আমরাও তাদেরই মত।

মানে সেই শ্রেণীগত বড় গলা আর কি। তবে তাতে কাজ হয়। একজন পুলিশকে দিয়া ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে—তার জন্য নির্ধারিত ফার্স্টক্লাসে পাঠাইয়া দেয়। আমারে একটা চেয়ারে বসাইয়া রাইখা পুলিশ তার বাহিনীতে ফিইরা যায়। কিছুক্ষণ পর ম্যাজিস্ট্রেট আইসা আমার পাশের চেয়ারে বসে। তারসাথে নিম্নোলিখিত কথাবার্তা হয়:

কোথায় যাচ্ছ তুমি, বাবা মা জানে?

জ্বী না আঙ্কেল। বাবা মা জানলে তো টিকেটই থাকত।

হুম।

আসলে, ট্রেনটা আইসা থামল, এমনিতেই উঠছিলাম আর হঠাৎই ছাইড়া দিল।

সর্বনাশ, আগে বলবা না? তখনই বললে তো ট্রেন থামানো যেত!

ভয় পাইছিলাম। আপনারা অ্যারেস্ট করলেন!

ওহো… দাঁড়াও আমি দেখি কী করা যায়—এই বইলা তিনি সামনের টেবিলে কিছু কাগজপত্র নিয়া বিজি হইয়া গেলেন। আমি জানালার পাশে বইসা—বাইরের ছুটন্ত ধানক্ষেত, মাটির সরু রাস্তা, বৈদ্যুত্যিক তার ও খুঁটি এবং তাতে বইসা থাকা পাখি ইত্যাদি দেখতে দেখতে ট্রেন জার্নি এনজয় (!) করতে লাগলাম।

শোন, তুমি ভৈরবে নেমে যাবা। আমি মাস্টারকে বলে দিব, এরপর ঘোড়াশালে থামে—এমন যেকোনও ট্রেনে তুলে দেবে তোমাকে। ওকে?

ওকে। কিন্তু তেমন ট্রেন আবার কয়টায়?

সন্ধ্যার দিকে ফোর ডাউন থাকার কথা।

তার আগ পর্যন্ত আমি মাস্টারের সঙ্গেই থাকব?

হ্যাঁ!

মানে, আমি চাইতেছিলাম যে, সবসময় তো ট্রেন থেকে দেখি, কখনও সরাসরি দেখি নাই। ভৈরব ব্রিজটা একটু দেইখা আসার সময় চাই।

না না, একদমই না। খুবই রিস্কি জায়গা।

কী আর করা, এভাবেই তবু ভৈরবে গিয়া পৌঁছাই। আবারও একজন পুলিশ সঙ্গে দিয়া ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে মাস্টারের রুমে পাঠায়, নিজে নামে না। নাইমা জানালা দিয়া তারে বিদায় জানাই, আর তাতে সে আমারে কাছাকাছি আসার নির্দেশ করে। জানালার ধারে গিয়া দাঁড়াইলে সে আমার হাতে পঞ্চাশ টাকার একটা নোট গুঁইজা দেয়। বলে, “কিছু খেয়ে নিও, তুমি তো আমার নিজের ছেলেই হতে পারতে।”

আমিও একমত হই। এবং টাকা নিয়া পুলিশ সহ মাস্টারের রুম পর্যন্ত যাওয়ার আগেই ট্রেন ছাইড়া দেয়। এ ঘটনায় হতভম্ব পুলিশরে আমি বলি, আপনি চইলা যান, ট্রেন ধরেন। আমি একটা ব্যবস্থা করে নিচ্ছি। ফলে কৃতজ্ঞ চাহনি সহ দৌড় দেয় পুলিশ। আর আমি পাই স্বাধীন বাংলা! 😀

ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগে ইশাখাঁ এক্সপ্রেস ২০১০। ছবি. লেখক

ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগে ইশাখাঁ এক্সপ্রেস ২০১০। ছবি. লেখক

রেললাইন ধইরা হাঁটতে হাঁটতে বিখ্যাত ভৈরব ব্রিজ যেখান থেকে আরম্ভ, সেখানে আইসা দাঁড়াই। এবং এর ব্যাপকতা দেইখা ডরাই। ফলে, চাইলেই যেমন যখন তখন ঘোড়াশাল শীতলক্ষ্যা রেলব্রিজে উইঠা পড়তাম—এখানে তা করার সাহস পাই না।

জায়গাটা ছিল কল্পনাতীত নির্জন। একটু দূরে, কিন্তু অনেক নিচে রাগী চেহারার মেঘনা নদীটাকে কিছুতেই বিশ্বাস করা যাচ্ছিল না। বরং তখন, মূল জনপদ থেকে বেশ উঁচুতে, পাহাড়মত জায়গায় বিছানো রেললাইনটাকেই বেশ হারামজাদা টাইপের লাগতেছিল। মনে হচ্ছিল অদৃশ্য শত্রুপক্ষের গোপন শ্বাস প্রশ্বাসের ওঠানামা টের পাইতেছি আমি। ঝিম মারা একটা দুপুর ছিল সেটা, চারপাশে মানুষজন নাই। যাদেরকে দেখা যাচ্ছিল, সবাই এত দূরে যে হুঁট করে কারও হেল্পই পাওয়া যাবে না—সহসাই এমন মনে হওয়ায়, ঘুইরা আবার স্টেশনের দিকে রওনা দিই আমি।

কিন্তু ফিরতে পথে অদ্ভুত এক আতঙ্কে সারা শরীর ঠাণ্ডা হইয়া ওঠে। জানি না কেন, হঠাৎই আমার মনে হইতে থাকে—রেললাইনে, ট্রেনে কাটা পড়া কোনও একটা লাশের সামনে পড়ব আমি। অথচ তখন পর্যন্ত এ জাতীয় কোনও দৃশ্যের সামনে পড়ার অভিজ্ঞতা আমার ছিল না। সেই অভিজ্ঞতা হয় সেবারই ফেনীতে ফিরে, ইয়াসমিন আপুর লাশ দেখার মধ্য দিয়ে। ইয়াসমিন আপুরা প্রান্তিদের বাসার তিনতলায় থাকত, আমরা থাকতাম নিচতলায়। আমাকে খুব আদর করত, আঁচার খাওয়াইত। আত্মহত্যা করছিল সে। কারণ তার প্রেমিক—ওকেও আমি চিনতাম, আওয়ামী লীগের ক্যাডার ছিল—পেটে আসা বাচ্চার দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানাইছিল।

যাই হোক, আতঙ্কগ্রস্ত জড়ানো পা টেনে টেনে স্টেশন পর্যন্ত যাওয়াটাই একটা চ্যালেঞ্জ হইয়া উঠছিল আমার জন্য। এরমধ্যে ব্রিজে ট্রেন ওঠার শব্দ শুনতে পাই, এবং ব্রিজ পার হইয়া সেই ট্রেন কাছাকাছি আসার অনেক আগেই আমি রেললাইন থেকে নাইমা পাশে দাঁড়াইয়া থাকি। উঁচু পাহাড়মত জায়গাটাতে খুব বেশি দূরে সইরা দাঁড়ানোর উপায় ছিল না। ঢালু হয়ে ব্যাপারটা লোকালয়ের দিকে নামছে বটে, কিন্তু সেই পর্যন্ত ঝোঁপঝাড়ের কোথায় যে কোন সাপ-টাপ বইসা আছে তা কে জানে!

তারপর পাশ ঘেঁইষা ট্রেনটা চইলা যাইতে থাকল। আশ্চর্য যে, ট্রেনের ভিতর থেকে কেউ একজন ব্রা স্টাইলে কাটা ডাব ছুইড়া মারল, আর সেটা আইসা পড়ল আমার কাঁধে। ভাগ্যিস যে, সামান্য ব্যথা পাইলেও তা খুব বেশি ক্ষতির কারণ হয় নাই। কিন্তু এসমস্ত মিলে আমার মধ্যে এক গগনবিদারী ভয় ঢুকল।

ট্রেনের পিছু পিছু প্রায় দৌড় দিয়া আমি ছুটতে থাকলাম। স্টেশনের ঠিক আগে আগে ছোটমত একটা ব্রিজ আছে, নিচে রিকশা টেম্পুর রাস্তা। মেঘনা ব্রিজের দিকে যাওয়ার সময় অনায়াসে এই ব্রিজ আমি পার হইছিলাম। কিন্তু ফিরতি পথে ছোট সে ব্রিজই এক অনতিক্রম্য ব্যাপার হইয়া উঠল। কাঠের স্লিপারগুলিতে ননস্টপ কাঁপতে থাকল আমার পা, অথচ আগে এ মাপের ব্রিজ পার হইতে কখনওই আলাদা কইরা নিচের দিকে তাকাইতে হয় নাই!

ভৈরব মেঘনা রেলব্রিজ ২০১০। ছবি. লেখক

ভৈরব মেঘনা রেলব্রিজ ২০১০। ছবি. লেখক

ভাগ্য ভালো, ভৈরব জংশনে পৌঁছানো মাত্রই ঢাকার দিকের এবং ঘোড়াশালেও থামবে টাইপের একটা ট্রেন পাইয়া ফেললাম। ইশাখাঁ এক্সপ্রেস। কলা ওঠানো বা নামানোর একটা প্রক্রিয়া চলতেছিল ট্রেনটাকে ঘিরে। মনে হইল, আরে আমি না ব্রিজের দিকেই ছিলাম? এ ট্রেন কোন দিক দিয়া আসল, দেখলাম না তো! জানা গেল, এ ট্রেন আসে কিশোরগঞ্জ থেকে। ফলে এ ট্রেনকে ভৈরব ব্রিজ পার হয়ে আসতে হয় না। ভৈরব ব্রিজ পার হওয়ার দরকার না পড়া ট্রেন হিসেবে ইশাখাঁকে বেশ আপন লাগল আমার।

সন্ধ্যার আগেই ঘোড়াশাল পৌঁছাইলাম। আর, সে রাতেই জ্বর উঠল আমার। ভৈরব ব্রিজের পাশে আমার কাটাছেঁড়া লাশ পইড়া আছে—প্রথমবারের মত এই দুঃস্বপ্নটা দেখলাম সেদিন। নিয়মিত বিরতিতে যে দুঃস্বপ্নটা আমি এখনও প্রায়ই দেখি।

About Author

তানিম কবির
তানিম কবির

জন্ম ফেনী জেলার পরশুরাম-বিলোনীয়া এলাকায়। কবিতা ও গল্প লেখেন। প্রকাশিত কবিতার বই তিনটি, ‘ওই অর্থে’ (শুদ্ধস্বর ২০১৪), ‘সকলই সকল’ (শুদ্ধস্বর ২০১৫) ও 'মাই আমব্রেলা' (আদর্শ ২০১৬) এবং একটি গল্পের বই 'ইয়োলো ক্যাব' (ঐতিহ্য ২০১৬)। সম্পাদনা করেন দৈনিক ভোরের পাতার সাপ্তাহিক সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘চারুপাতা’। এর আগে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজ ও প্রিয়.কমে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রকাশিতব্য বই, ‘ঘরপলায়নসমূহ’ (ফেব্রুয়ারি ২০১৭) ফেসবুক পেজ: Tanim Kabir (Writer)