page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

চা, রুটি, কলা, চারুকলা, ছবির হাট এবং একটি চেয়ার

chhobir-haat-1

ছবির হাটে কেউ চেয়ারে বসেন না। চেয়ারে বসা লাগে না এমন সব জায়গাই আমার ভারি পছন্দ। ছবির হাটও আমার ভারি পছন্দ। তারপরও কয়েকটা কারণে আমার ওখানে তেমন যাওয়া হয় না।

একটা কারণ অবশ্যই আমার হিংসা। আমি একটুও ছবি আঁকতে পারি না। আর যাঁরা পারেন তাঁদের এই দক্ষতার প্রতি আমার পেটভর্তি হিংসা কাজ করে। সেই কারণে আঁকিয়েদের আমি প্রধানত এড়িয়ে চলি যাতে তাঁরা আমার হিংসার খবর না পান। তারপরও প্রধান কারণ হলো ঢাকা নগরীর যাতায়াত বিভ্রাট ও আমার ঘরকুণো স্বভাব। ছবির হাট জমে ওঠার আগে থেকেই আমি উত্তরায় থাকি, সাভারে রুটি-রুজির কাজে যাই। আর আমার পেটভর্তি আলসেমি। সব মিলে আমার আর যাওয়া হয়ে ওঠে না।

হিংসা থাকলেও আমি ছবির হাট নিয়ে বেশ কিছু উদ্যমও টের পাই বটে। আমার এমনিতেও সে সকল জায়গার প্রতি উৎসাহ প্রবল যেখানে চেয়ারে না বসে মাটিতে বসার প্রচল বেশি। ছবির হাট নিয়ে অন্যান্য উৎসাহেরও কারণ রয়েছে। পরিচিত প্রিয় মানুষদের অনেকেই এখানে নৈমিত্তিক আসা-যাওয়া করেন। তাঁদের কাউকে বা একাধিক জনের সঙ্গে মুলাকাত করতে চাইলে অনায়াসেই ওখানে গিয়ে হাজির হলেই চলে।

নানাবিধ যেগুলোকে সৃজনশীল কাজকর্ম বলা হয় সেগুলোর একটা প্রাণবন্ত সমারোহ এই ছবির হাট। নামে কেবল ছবি থাকলেও চিত্রাঙ্কনকারী থেকে চিত্রনির্মাতা বা গায়ক ও বিরুদ্ধধারার রাজনীতিকর্মী সকলেরই একটা সংমিশ্রিত ঠিকানা ছবির হাট। আমার তেমন যাওয়া না হলেও এগুলোর একজন নিবিড় গ্রাহক হিসেবেই দূরে থাকছিলাম আমি।

অন্তত দুটো ঐতিহাসিক কারণে চারুকলার সঙ্গে আমার বন্ধন। তখন তো ছবির হাট ছিল না। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হবার পর নানান কারণে বেশ লম্বা একটা বেকার কাল ছিল। একেই বেকার কাল, তার উপরে ঢাকাতে কখনোই সঠিকমতো একটা বাসস্থান না থাকার কারণে দিনের বেলাটা যাবার কোনো জায়গা ছিল না। পাবলিক লাইব্রেরি আর চারুকলার আশপাশ তখন খুব নিশ্চিত একটা বেকারদের জায়গা। পাবলিক লাইব্রেরির সিঁড়ি, চারুকলার সামনের ফুটপাত, নজরুলের কবরের সামনের ফুটপাত, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাঠ, বড়জোর টিএসসি। সব মিলে ভরপুর বেকার সম্মেলন ছিল।

টিএসসি একটু এড়িয়েই চলতাম আমি। চারুকলা আর পাবলিক লাইব্রেবির একটু কোণাকুণিতে একটা বিশাল বটগাছ ছিল। তার নিচে চায়ের দোকানে। সেই দোকানে বিরাট মাপের একটা বাটারবন পাওয়া যেত। বহু দুপুরে সেখানে বসে চা আর রুটি খেয়ে কিংবা চা, রুটি আর কলা খেয়ে বসে থাকতাম। খুবই আপন এক জায়গা আমার।

অন্য ঐতিহাসিক সম্পর্কটা আমার দাড়ি-চুল, বালা-দুল ইত্যাদির সঙ্গে সম্পর্কিত। যদিও নামজাদা আঁকিয়েদের মধ্যে এক শিশির ছাড়া আদৌ কারো দাড়ি আছে কিনা মনে পড়ছে না, চুল আমার নিজেরই বিশেষ আর নেই, দুল-বালা তো বড় আঁকিয়েরা পরেনই না, তারপরও গত ২০-২৫ ধরে আমাকে রাস্তাঘাটে লোকজন খুবই নিয়মিত ‘চারুকলা’র লোক মনে করে থাকেন। এই আবিষ্কারে আমার গর্ব ও অসহায়বোধ দুই-ই হয়। গর্ব হয় মানে আমাকে চিত্রকর মনে করাতে আমি কল্পনায় চিত্রকরের গরিমা নিয়ে থাকি দুচার মিনিট। অসহায়বোধ হয় আমি মাঝারি মানের একটা বিড়ালও আঁকতে পারি না বলে।

যাহোক, উত্তরকালে ছবির হাটের বৈশিষ্ট্য নিয়ে বলতে গিয়ে বড় বৈশিষ্ট্যটাই বাকি থেকে গেল। ঢাকা মহানগর তথা বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক অর্থে জনসম্মিলনের উপায়গুলো রুদ্ধ করে রাখা হয়। সেটাই এখানে প্রচলন। মানুষজন নিজেরা ঠেলেঠুলে খানিক জায়গাজমিন তৈরি করেন, রাষ্ট্র বা প্রশাসন সেগুলো আবার ভেঙে দেয়। হাইকোর্টের মাজার বা এসব জায়গা ভেঙে দিলে আমাদের নিকটজনেরা আলাদা করে ক্ষতিগ্রস্ত হন না। তবে ছবির হাটের মতো জায়গা ভেঙে দিলে ‘আমরা’ই ক্ষতিগ্রস্ত হই। তো ছবির হাট ঢাকা মহানগরের রাষ্ট্রীয় মানচিত্রের প্রতি একটা মৃদু প্রতিবাদ ছিল। অমান্য ছিল। ছবির হাট তাই ভারি আপন লাগত। লাগে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর চিত্রকলা পারঙ্গমতা আর, কাকতাল হবে, ছবির হাট ভেঙে দেয়া প্রায় একত্রেই জানা গেল। এতে বিস্ময়ের যে কিছু ঘটে নি তা তো বলাই বাহুল্য। বিশেষত গজামঞ্চ সংক্রান্ত নানান কিছুর পর এটা একেবারে অবশ্যম্ভাবী ছিল।

chhobir-haat-2

শিল্পীদের অবস্থান কর্মসূচি। এই ছবি ও কভার ইমেজ নেওয়া হয়েছে ছবির হাট ফেসবুক পেজ থেকে।

কিন্তু পুরো বিষয়টার গুরুত্ব একদম অন্য জায়গায় আমার জন্য। ছবির হাট ভেঙে দেবার খবর পেয়ে, যদিও ফেইসবুকে প্রধানমন্ত্রীর চিত্র তখন রীতিমতো বেস্টসেলারের মর্যাদায় উড়ে বেড়াচ্ছে, তারপরও প্রায় ম্যাজিকের মতো আমার মনে পড়ল একটা চেয়ারের কথা যে চেয়ারটা গণ জাগরণ মঞ্চের মাসে মিডিয়া সেলের সামনে ছিল। আসলে চেয়ার কিছুতেই একটা ছিল না। অনেকগুলো ছিল। কিন্তু ওই চেয়ারটা তার উপর বসমান মানুষটার কারণে স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছিল। মানুষটার কারণে, আবার তার বসবার ভঙ্গির কারণে। তার ভঙ্গিমা তাঁর, আবার তাঁর নয়, তাঁর প্রতিষ্ঠানের।

এখনই পড়ুন: সাম্প্রতিক ডটকমে মানস চৌধুরীর আরো লেখা

কেমন যেন সেই উচ্চকিত ঘোষণাপত্রের মতো বসে-থাকাটি গোটা রাজ্যের উপর কর্তৃত্বকামী। মানুষটা নিজে সরকারী বড় কর্মকর্তা। কিন্তু যেন গোটা সরকারের মতো বসে ছিলেন। মানুষটার সঙ্গে রাষ্ট্রের নানাবিধ গোয়েন্দা সংস্থার বিস্তর খাতির। বিশেষত, যেটাকে রঙ্গ করে অধিকতর সিভিল গোয়েন্দা বলা যায়। যেন তাঁর ওই বসে-থাকাটি তামাম রাষ্ট্রের গোয়েন্দাসংস্থার পেট উদলিয়ে প্রকাশ্যে বসে-থাকা। এক উৎকট দম্ভ। দেখলেই হাঁসফাঁস লাগে।

গণ জাগরণের ওই বিশাল জমায়েতের মধ্যে একটি মানুষের একটি চেয়ার আলাদা করে মনে পড়ার কথাই না। কিন্তু তখনও চেয়ারটা আমার চোখে পড়ছিল, বা মানুষটা, বা ভঙ্গিটা, বা কিছু একটা। আবার এখনো চট করে ওটাই মনে পড়ল।

জুন-জুলাই ২০১৪; ঢাকা, হিরোশিমা

About Author

মানস চৌধুরী
মানস চৌধুরী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টারি করে নির্বাহ করি। গল্প, কলাম ইত্যাদি লিখি। সুযোগ পেলে পর্দায় অভিনয়ও করি।