page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

চৌমুহনীর পূর্ণিমায় চাঁদের বুড়ির সিক্রেট

আম্মু-আব্বু ও সোনিয়ার সঙ্গে নবনিযুক্তা বৌ। - লেখক

কয়দিন আগে ঈদ করতে ফেনী গিয়া আম্মু আর সোনিয়ারে ঘরপলায়ন-এর প্রথম দুইটা কিস্তি পইড়া শোনাই (তখন পর্যন্ত দুইটা কিস্তিই প্রকাশিত ছিল)। প্রথম কিস্তি ‘লাকসাম রেলকলোনিতে টিটিইর বাসায় একরাত’-এ নিজেদের ছবি দেইখা তারা বেশ আন্দোলিতও হইল, পাশাপাশি আমার নবনিযুক্তা বৌয়ের সামনে সেই সময়কার আরও কয়েকটা ‘ঘরপলায়ন’ স্টোরি ফাঁস করল। আর, সপ্তাহ দুই আগে আব্বু ঢাকায় আসলে তার কাছে ‘সন্ধ্যার পর পর প্রিয়াঙ্কাদের বাসায়’ কিস্তির নেপাল আঙ্কেলের খোঁজ করলাম।

জানা গেল নেপাল আঙ্কেল এখন আশুগঞ্জে থাকে, আশুগঞ্জে একটা থাকা খাওয়ার হোটেল চালায়। আব্বুর কাছ থেকে আমার ঘরপলায়ন সমস্যা নিরসনে সেই সময় দারস্থ হওয়া আরও কয়েকজন পীর হুজুরের সন্ধানও মিলল।

tanimlogo2

যাই হোক, তারপর পুলিশের এক ছেলের জন্য আমি ঘর পালাইলাম। ছেলের নাম মসহিন। তার বক্তব্য অনুযায়ী—পারিবারিক নির্যাতনে সে ছিল অতীষ্ঠ। বাপ তো পুলিশ বটেই, মাও সঙ্গদোষে প্রায়পুলিশ অবস্থার মুখোমুখি। উভয়েই তাকে ধরে খুব মাইরধর করে বইলা একদিন সে আমারে জানায়। পরিস্থিতি এতই নাকি খারাপ ছিল যে, তার তখন এই সন্দেহও জাগে, সে আসলে ওই পুলিশ দম্পতির আসল সন্তান কিনা। এমন তো হইতেই পারে প্রথমে সন্তানাদি না হওয়ায় তারে হয়ত কোনওখান থেকে টোকাইয়া নিয়া আসছিল, বাট পরবর্তীতে নিজেদেরই সন্তান হওয়ায় (মহসিনের ছোটভাই) টোকাইয়া পাওয়া সন্তান হিসাবে তার আর দাম থাকে নাই। মহসিনরে আমি সান্ত্বনা দিলাম।

আর বললাম, দেখ ভাই পরিবারে তোমার আদর যত্ন আমি ফিরায় দিতে হয়ত পারব না, কিন্তু আমি একটা বুদ্ধি দিতে পারি, যেটার মাধ্যমে, অন্তত নিজে তুমি বুঝতে পারবা আসলেই তুমি টোকাইয়া পাওয়া সন্তান নাকি তাদের নিজেদেরই সন্তান। সেজন্য যেটা করতে হবে, সেটা হল ঘর পালানো।

আম্মু-আব্বু ও সোনিয়ার সঙ্গে নবনিযুক্তা বৌ।  - লেখক

আম্মু-আব্বু ও সোনিয়ার সঙ্গে নবনিযুক্তা বৌ। – লেখক

আমি ওরে কয়েকদিনের জন্য ঘর পালানোর পরামর্শ দিলাম, আর বললাম, এর আগে যেন একটা দুখি দুখি চিঠি লিইখা সুবিধামত এমন কোনও একটা জায়গায় রাইখা যায়, যেটা তারে পাওয়া না যাইতে শুরু করলে পরে বাসার লোকেরা পাবে। “মোটকথা ঘর পালানোর পর তোমার আব্বু আম্মুর কী প্রতিক্রিয়া হয় সেইটা দেখবা।” উদাহরণ দিয়া তারে বুঝাই, যেমন ধরো আমি যখন ঘর পালাই, ফিরা আইসা কী দেখি? দেখি যে, আমার ঘরের সবাই এ ঘটনায় অনেক চিন্তিত। তাদের খাওয়া ঘুম সব বন্ধ হইয়া যায়। এতে প্রমাণ হয় যে তারাই আমার আসল আব্বু আম্মু, আমিই তাদের আসল সন্তান। এখন তোমার আব্বু আম্মু যদি তুমি ঘর পালাইছো সত্ত্বেও ঠিকঠাক মত তাদের খাওয়া দাওয়া কাজকর্ম চালাইয়া যায়, বুঝতে হবে তুমি তাদের টোকাইয়া পাওয়া সন্তান।

আমার যুক্তি অকাট্য ছিল, ফলে মহসিনেরও এ পরামর্শ ফেলায় দেওয়ার উপায় ছিল না । সে রাজি হইল। কিন্তু কয়েকটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আইসা দাঁড়াইল, সেগুলো হচ্ছে: ঘর পালাইয়া কয়েকদিনের জন্য মহসিন কোথায় থাকবে, দুই. পলানো অবস্থায় বাবা মায়ের প্রতিক্রিয়া সে কীভাবে টের পাবে। এবং তিন. তার বাবা যেহেতু পুলিশ, পলানো শেষে ঘরে ফিরার পর মহসিন যদি পরামর্শক হিসেবে আমার নাম ফাঁস কইরা দেয়, সেক্ষেত্রে কী হবে?

প্রথমেই মিজান ময়দানের মসজিদে নিয়া গিয়া কোরআন শরিফ ধরাইয়া তারে কসম কাটাইয়া নিলাম যে, পরিণতি যাই হোক—কোনও অবস্থাতে কখনওই ঘটনার ইন্ধনদাতা হিসেবে আমার নাম সে ফাঁস করবে না। যদি ফাঁস করে, সেক্ষেত্রে সে আর মুসলমান থাকবে না। কসম যথেষ্ট মজবুত হইছে ভাইবা আমি পরবর্তী প্ল্যানে মনোনিবেশ করলাম।

সিদ্ধান্ত হইল, তার এক দূর-সম্পর্কের চাচি থাকে চৌমুহনীতে—সেই চাচিদের বাড়িতে গিয়া উঠবে সে। সেটা ছিল চাচির বাপের বাড়ি, চাচা মারা যাওয়ার পর চাচি একমাত্র ছেলেরে নিয়া তার বাপের বাড়িতে থাকে। মহসিনদের কাছাকাছি ফ্যামিলির কেউই ওই চাচির সঙ্গে যোগোযোগ রাখে না। (আর তখন তো মোবাইল ফোনও ছিল না ঘরে ঘরে)। এসব কারণে, চৌমুহনীর ওই চাচির বাড়িই ছিল বেশি নিরাপদ। আর ঠিক হইল, পরের দিন স্কুল থেকে বাসায় ফিরে স্কুল ড্রেস বদলাইয়া বিকালে খেলতে বাইর হওয়ার নাম কইরা সে বাইর হবে। এবং রাতে আর বাসায় ফিরবে না। তার পরের রাতেও ফিরবে না। এর পরের দিন সকাল সকাল ফিরা আসবে।

এখন কথা হচ্ছে, ফিরে আসার পর বাসায় সে কী বলবে—এ দুইদিন সে কোনখানে ছিল?

মহিপাল বাসস্ট্যান্ড, ফেনী

মহিপাল বাসস্ট্যান্ড, ফেনী

সিদ্ধান্ত হইল, এ পর্যায়ে মহসিন একটা বানানো ঘটনা বলবে তার বাসায়। সেটা হল, ওইদিন সন্ধ্যার দিকে খেইলা টেইলা বাসায় ফিরার সময় ছেলেধরারা তারে ধইরা নিয়া গেছিল। গাড়িতে কইরা কোথাও একখানে নিয়া অন্ধকার একটা ঘরে দুইদিন আটকায় রাইখা আজকে সকালেই আবার গাড়িতে কইরা ট্রাংক রোডে নামাইয়া দিয়া গেছে। আর, যেহেতু ওই চাচির সঙ্গে হুঁট করেই ফ্যামিলির যোগাযোগ স্থাপন হবে না, ফলে তার চৌমুহনী ভ্রমণের কথাও কেউ জানবে না। অনেকদিন পর কখনও জানলেও—দুইটা আলাদা ঘটনার দিন তারিখ মিলাইয়া যোগসূত্র বাইর করতে পারবে না।

কাঙ্ক্ষিত সেই দিন আমি মহিপাল বাসস্ট্যান্ডে (ফেনীস্থ ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে) যাই মূলত—মহসিনরে বাসে তুইলা দিতে। সুগন্ধা পরিবহনের প্রায়-ফাঁকা একটা বাসে ওরে সহ আমিও উঠি, প্ল্যান হচ্ছে বাস ছাইড়া দেওয়ার মুহূর্তে আমি নাইমা পড়ব। এর মধ্যে পাশেই জামে মসজিদে আছরের আজান দিয়া বসে। মহসিন বলল সে নামাজটা পইড়া নিতে চায়। কন্ডাক্টরের কাছে সে জানতে চাইল নামাজ পইড়া আসার সময় পাওয়া যাবে কিনা। কন্ডাক্টর জানাইল যাত্রীতে পরিপূর্ণ হইলে পরেই এ বাস ছাড়বে। অর্থাৎ অনায়াসেই নামাজ পইড়া আসা যাবে, যেহেতু তখন পর্যন্ত আমি আর মহসিন ছাড়া হাতেগোনা আর দুয়েকজন যাত্রীই শুধু ছিল বাসে। মহসিন আমারেও নামাজ পড়তে বলল। আমি প্যান্ট নাপাকের দোহাই দিয়া বরং সিট দেইখা রাখার কাজে বাসেই রইয়া গেলাম। সে নাইমা গেল নামাজ পড়তে।

এর মধ্যে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় যাত্রীরা বাসে উঠতে শুরু করল। আর সর্বোচ্চ দশ মিনিটের ব্যবধানেই বাস কানায় কানায় পূর্ণ হইয়া গেল। সেন্টার চেয়ারে নিজে আমি বসা, উইন্ডো চেয়ারটা মহসিনের উদ্দেশ্যে ফাঁকা। কয়েকজন যাত্রী ওই চেয়ারটায় বসতে চাইলে তাদেরকে আমি বললাম, ‘লোক আছে।’

বাসে ড্রাইভার উইঠা পড়ল, ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। কন্ডাক্টরকে আমি মনে করাইয়া দিলাম যে, মহসিন নামাজ পড়তে গেছে, সে না আসলে ছাড়তে পারেন না।

কিছুক্ষণ তার জন্য অপেক্ষা কইরা এক পর্যায় বাস ছাইড়া দিল। আমি উইন্ডো চেয়ারটায় গিয়া বসলাম। সত্যি বলতে কী, আমার যে নাইমা পড়া উচিৎ সর্বতোভাবে সেটা আমার মনে থাকলেও মূলত লজ্জাবশত সে কথা আমি কন্ডাক্টর বা ড্রাইভারকে বলতে পারলাম না। আমার মনে হইছিল, আমার আর মহসিনের জন্য এমনিতেই বাসটাকে অনেক লেটে ছাড়তে হইল। মহসিন আসতেছে বইলা কয়েকজন যাত্রীকেও আমি ফাঁকা চেয়ারটাতে বসতে দিই নাই। এখন যদি নিজেও নাইমা পড়ি—স্পষ্টই একটা অশোভন আচরণ হবে এইটা।

সুগন্ধা পরিবহনের মুড়ির টিন মার্কা বাসটা রীতিমত উড়তে শুরু করে। আর আমি মহসিনের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে করতে জীবনে প্রথমবারের মত চৌমুহনী তথা নোয়াখালি অঞ্চলে প্রবেশ করি। বুঝতে বাকি থাকে না, কেন পুলিশ বাবা আর প্রায়পুলিশ মা মহসিনকে পারিবারিকভাবে নির্যাতন করতে বাধ্য হয়! মাগরিবের পর পর চৌমুহনীতে গিয়া পৌঁছাই।

মহসিন নিজেও তার চাচিদের ওই বাড়ি ঠিকঠাক মত চিনত না বিধায় চৌমুহনীতে নাইমা তার যা যা করবার ছিল—সিদ্ধান্ত নিই—আমিও তাই তাই করব। ফলে চৌমুহনী বাসস্ট্যান্ডে নাইমা আমি মহসিনের চাচির ভাইয়ের সরিষার তেলের পাইকারি দোকানটা (নাম মনে নাই) খুঁজতে শুরু করি, যেহেতু মহসিনকেও চৌমুহনীতে আইসা প্রথমেই দোকানটা খুঁইজা বাইর করতে হইত। ফেনী-সোনাপুর হাইওয়েতেই চৌমুহনী বাজার, বাসটাও আমারে সেখানেই নামাইয়া দিয়া যায়।

চৌমুহনী বাজার

চৌমুহনী বাজার

ঠিক যেখানটায় আমি নামি, প্রথমে সেখান থেকে সামনের দিকে যতদূর পর্যন্ত বাজার বিদ্যমান—দুইপাশে তাকাইয়া হাঁটতে থাকি। কিন্তু সরিষার তেলের পাইকারি দোকানটা তাতে দৃশ্যমান হয় না। আবার পিছনের দিকে আসতে থাইকা একপর্যায় যেখানে নামছিলাম সেখানে আইসা পৌঁছাই। দ্যান আরও পিছনে দুইপাশ পর্যবেক্ষণ কইরা কইরা হাঁটতে হাঁটতে কাঙ্ক্ষিত দোকানটা পাইয়া ফেলি।

স্লামালিকুম, আপনি কি মহসিনের চাচির ভাই?

মহসিন.. কোন মহসিন?

ওই যে ফেনীর, তার বাবা পুলিশ।

আরে হ্যা হ্যা, কী ব্যাপার বাবা?

আমি মহসিনের বন্ধু। আমরা একই স্কুলে পড়ি। মহসিনই আপনাদের ঠিকানা দিছিল আমারে।

আচ্ছা আচ্ছা, তা তুমি কি বেড়াইতে আসছিলা এদিকে?

হুম। মহসিন আমারে বলছিল পারি যদি চাচিরে দেইখা যাইতে। চাচির খবর নিয়া যাইতে।

সরিষার তেলের পাইকারি দোকানে বইসা কেক ফান্টা ইত্যাদির বন্যায় ভাইসা যাই আমি। চাচির ভাই মুগ্ধ হয় মহসিনের—তার চাচিরে এখনও মনে রাখার ঘটনায়। সেই মুগ্ধতার প্রাথমিক প্রতিদান আমার ওপর বর্ষিত হয়। রাতে চাচির ভাই আমারে তার মোটরসাইকেলের পিছনে বসাইয়া তাদের বাড়িতে নিয়া যায়।

শহর চৌমুহনী থেকে খানিকটা বাইরে ছিল তাদের বাড়ি। ছিল পূর্ণিমা রাত। মনে আছে, কমানো আলোর হেডলাইট জ্বালাইয়া মোটরসাইকেলটা যখন ধানখেতের মাঝখানের আইল দিয়া যাচ্ছিল; খেতের মধ্যেই গর্তমতন একটা জায়গায় পানি ছিল—তাতে প্রতিবিম্বিত চাঁদটারে একনজর দেখলাম আমি। এতই শান্ত আর নিশ্চল সেই পানি, যে, মনে হচ্ছিল ওই গর্তে ঝাঁপ দিয়াই বুঝি চাঁদে পৌঁছানো যাবে! বলতে গেলে, বয়সের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বড়দের মত ভাবনা ছিল সেটা। এমন বিষয় প্রায়ই হইত, আর ভাবতাম, এমন কি বাকিদেরও হয়? নাকি আমিই আলাদা কিছু!

নোয়াখালি অঞ্চলে বিরহের কিছু গান আছে (মানে এটা ফেনী অঞ্চলেও ছিল)। আত্মীয়স্বজন কেউ মারা গেলে ঘরের মহিলারা লাশের আশেপাশে বইসা সেসব গান গাইতে গাইতে কানত। আমারে দেইখা এবং ভাইয়ের কাছ থেকে বৃত্তান্ত শুইনা মহসিনের চাচি আমারে জড়ায়ে ধইরা সেই কান্দা শুরু করল। সত্যি বলতে কী, এতই বিরহের ছিল সেই গান, যে, একপর্যায় আমিও কাইন্দা ফেললাম। চাচির হয়ত হারানো চাচার কথা মনে পড়ছিল। আর সেইসূত্রে জড়িত আরও কত সম্পর্ক, জানি না, কোনও কারণে হয়ত চাচার মৃত্যুর পর সম্পর্কগুলা আর যথাযথ থাকে নাই; নয়ত চাচিরে তার বাপের বাড়িতে আইসা থাকতে হয় কেন! কান্নাকাটি শেষে, সারা বাড়িতে সে এক দেখার মত ব্যস্ততা। সন্ধ্যায় নিরুদ্বিগ্ন মনে খোঁয়াড়ে ফেরা মুরগিগুলার কোনও একটারে হতভম্ব চিৎকার চেঁচামেচিসহই জবাই দেওয়া হইল। সে ব্যাপারে একটু মনও খারাপ হইল, বাট সেটারে তেমন পাত্তা না দিয়া মহসিনের চাচাত ভাইসহ পূর্ণিমা রাতের পুকুর ঘাটে বইসা কত কীসব গল্পে মাইতা উঠলাম। বেশিরভাগই বানোয়াট।

Like shamprotik on Facebook

একটা কমন গল্প ছিল আমার, যে, আমার এক মামা, আপন মামা; সে হচ্ছে নাসায় চাকরি করে, প্রায়ই এ প্রয়োজনে সে প্রয়োজনে তাকে চাঁদে যাইতে হয়। তো চাঁদে গিয়া সম্পূর্ণ পেশাগত কারণে মামারে কী কী করতে হয়, সেসব নিয়া গল্প। গল্প শুইনা তো চাচাত ভাই পুরাই বেতবা হইয়া গেল। আমারে বসা থাকতে বইলা একদৌড়ে সে আরও কয়েকজন সমান বয়সী পোলাপান নিয়া হাজির হইয়া রিক্যুয়েস্ট করল, “আপনের মামার চাঁদে যাওয়ার কাহিনীটা আবার প্রথম থেকে বলেন।”

চাঁদের মাটি হচ্ছে চুন দিয়া লেপানো অবস্থায় থাকে। বুঝলা?

চুন! পানের চুন?

ঠিক ধরছো। বলো তো কেন চুন দিয়া লেপা হয়?

আগেই শুনছিল বিধায় মহসিনের চাচাত ভাই বলে, কেন আবার! চাঁদের বুড়ি তো পান খায়, পান মুখে নিয়া সেই বুড়ি চাঁদ ঘইষা চুন মুখে দেয়।

ঠিক। তো আমার মামা তো নাসায় চাকরি করে। নাসা চিনো?

আবারও মহসিনের চাচাত ভাই বলে, ওই যে মকাহাশে রকেট পাঠায় যে কোম্পানি। চাঁদে, মঙ্গলগ্রহে।

ঠিক। তো চাকরির প্রয়োজনে মামারে প্রায়ই চাঁদে যাইতে হইত। সবসময় তো জুতা পিন্দাই নামত চাঁদে। একবার হইল কী, মহাশূন্যে মামার জুতা হারাইয়া গেল। সেবার খালি পায়ে চাঁদে নাইমাই মামা বুঝতে পারল এগুলা হচ্ছে চুন।

তারপর?

তারপর গোপনীয়তা ফাঁস হইয়া যাওয়ায় চাঁদের বুড়ি আসল মামার কাছে। অথচ দেখ, এর আগে মামা নিজেই অনেক চেষ্টা কইরাও বুড়ির সাক্ষাৎ পায় নাই।

বুড়ি কি মামারে বাইন্ধা ফেলল রাগের চোটে?

আরে না! বুড়ি নিজেই নাসার লোকজনদের ভয় পাইত। বরং বুড়ি আসছিল এই রিক্যুয়েস্ট করতে, মামা যেন নাসায় এটা বইলা না দেয় যে, চাঁদ মূলত তার পান খাওয়ার চুন দিয়া লেপা অবস্থায় থাকে।

ও! কিন্তু কেন? বইলা দিলে সমস্যা কী?

মহসিনের চাচাত ভাই রীতিমত খেইপা যায়, আরে বেকুব এটাও বুঝস না, এ কথা জানতে পারলে নাসা কোম্পানি যদি চাঁদ পরিষ্কার করতে সব চুন ধুইয়া ফেলে তাহলে তো বুড়ির আর পান খাওয়া হবে না।

আমি যোগ করি, এছাড়াও ঘটনা আছে। এই যে দেখ পূর্ণিমা হয়, চাঁদের আলোটা কেমন? টিউব লাইটের আলোর মত না?

হ্যা হ্যা!

চুনগুলা একবার যদি ধুইয়াই ফেলে, চাঁদের আলো তখন কেমন হবে?

মহসিনের চাচাত ভাই উত্তরটা বইলা দেয়, চাঁদের আলো তখন নরমাল বাল্বের আলোর মত হইয়া যাবে, মাইট্টা আলো। এরকম সাদা থাকবে না।

যথারীতি গল্প শেষে উপস্থিত পোলাপানদের এই মর্মে সাবধান কইরা দিই যে, খবরদার! এ সিক্রেট যে তোমরা জানো, কাউকে বলবা না। আমার মামা এখন পর্যন্ত এই সত্য নাসার কাছে গোপন রাখছে। স্কুলের আউয়াল বা জাহিদের মত (যাদের সাথে একই গল্প আমি করছিলাম) তারাও পৃথিবী ও চাঁদের ব্যাপারে এই ধরনের গোপন কথা জানতে পাইরা গর্বিত হয় এবং সেইসাথে গোপনীয়তা বজায় রাখার ব্যাপারে শতভাগ দায়িত্বশীলতার প্রতিশ্রুতি দেয়।

[ctt tweet=”চৌমুহনীর পূর্ণিমায় চাঁদের বুড়ির সিক্রেট http://wp.me/p5cjIO-4od” coverup=”bI6pl”]

সকালে চাচির ভাইসহ আবার চৌমুহনী বাজারে ফেরত আসি। আবারও কখনও বেড়াইতে আসার (পারলে মহসিনসহ) দাওয়াত সহকারে সে আমারে সুগন্ধা পরিবহনের একটা বাসে তুইলা দেয়।

সেবার ঘর পলানোর শাস্তি হিসেবে আব্বুর হাতে বেদম মাইর খাই আমি। কিন্তু তাতে মন তেমন খারাপ হয় না। স্কুলে মহসিনের সঙ্গে দেখা হইলে সে আমারে জানায়, নামাজ পড়তে পড়তেই সে তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছিল, আর মা বাবার অবাধ্য হইয়া ঘর পলানোর প্ল্যান যে সে করছিল, এ অপরাধের জন্যই আল্লাহর কাছে প্রচুর কান্নাকাটি কইরা সে বাসায় ফেরত গেছিল। কিন্তু ঘুনাক্ষরেও সে এটা ভাবতে পারে নাই যে, তার বদলে আমিই তার চাচির বাপের বাড়িতে চইলা যাব।

About Author

তানিম কবির
তানিম কবির

জন্ম ফেনী জেলার পরশুরাম-বিলোনীয়া এলাকায়। কবিতা ও গল্প লেখেন। প্রকাশিত কবিতার বই তিনটি, ‘ওই অর্থে’ (শুদ্ধস্বর ২০১৪), ‘সকলই সকল’ (শুদ্ধস্বর ২০১৫) ও 'মাই আমব্রেলা' (আদর্শ ২০১৬) এবং একটি গল্পের বই 'ইয়োলো ক্যাব' (ঐতিহ্য ২০১৬)। সম্পাদনা করেন দৈনিক ভোরের পাতার সাপ্তাহিক সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘চারুপাতা’। এর আগে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজ ও প্রিয়.কমে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রকাশিতব্য বই, ‘ঘরপলায়নসমূহ’ (ফেব্রুয়ারি ২০১৭) ফেসবুক পেজ: Tanim Kabir (Writer)