page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

ট্রাম্প — আমেরিকার বাজিকর

তখন আমরা আমেরিকায় থাকতাম। আটলান্টিকের পাড় ঘেঁষে ছোট্ট একটা শহরে। আগের দিন এসে নতুন বাসায় উঠছি, সারাদিনের ক্লান্তি শেষে রাতে একটা লম্বা ঘুম দিলাম। সকালে ঘুম ভাঙল—পোড়া গন্ধে।

চোখ খুলে দেখি আগুনের লেলিহান শিখা। বাসার ঠিক উলটো দিকের তিনতলা বাড়িটা থেকে।

শুভ’র যাওয়ার কথা খুব ভোরে এজেন্সি থেকে আমাদের গাড়ি আনতে। কখন গেছে টের পাই নি। তীব্র গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে আগুন। একদৌড়ে ঘরের চাবিটা হাতে নিয়ে নিচে নেমে গেলাম যে আমাদের বৃদ্ধ বাড়িওয়ালিকে সেফ করতে হবে। তিনি একা খুব সহজে মুভ করতে পারেন না। ঘুমের ওষুধ খেয়ে দুপুর বারোটা পর্যন্ত ঘুমান।

যে মেয়েটা তাকে দেখাশোনা করে সে সন্ধ্যায় আসে রাতে চলে যায়। আগের দিনই আমাদেরকে এজেন্সি বিস্তারিত বলেছে তার সামনে। আমাদের ফোনে তখনো কানেকশন লাগে নাই। তার ফোন থেকেই ফায়ার সার্ভিসে ফোন দিব, প্রয়োজনে।

asha-naznin-logo

সিঁড়ি থেকে নেমে দরজা খুলতেই দেখি পুলিশ। ফায়ার সার্ভিসের আগমনী আওয়াজও শুনতে পেলাম। একজন পুলিশ এসে জানতে চাইল, আমি কোথায় যাচ্ছি।

বললাম।

বলে, তোমাকে কি আমরা কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারি?

অবশ্যই। কেন নয়?

— আগুনটা ঠিক কখন লেগেছে?

— জানি না, গন্ধে আমার ঘুম ভাঙছে মিনিট কয়েক আগে।

— কোনদিক থেকে আসছে ধোঁয়া বা আগুন?

আমি হাত দিয়ে দেখালাম।

এরপরে প্রশ্নের পড় প্রশ্ন। দমকল আগুন নিভাইতে পারতেছে না। পুলিশকে বললাম, আমার বাড়িওয়ালিকে একটু দেখে আসি, তোমার প্রশ্নের উত্তর পরে দেই?

বলে, “ডোন্ট ওয়ারি এবাউট হার, শি উইল বি ফাইন।”

আরে আগুন তো ওরা নিভাইতে পারতেছে না, বলে আমি হাঁটা দিতে উদ্যত হইলাম, দেখি আরও কতেক পুলিশ ওই বাসার পোলাপানগুলারে ধরে আনছে। চারটারে চারদিকে বসাইয়া চারজন পুলিশ আলাদা আলাদা জেরা করতেছে। আমার দরোজার সামনে যে সরু ফুটপাথ ওইখানে।

এর মধ্যে বাড়িওয়ালির দরজায় নক করলাম। খোলে না। খোলে না। অনেক জোরে ধাক্কাধাক্কি করলাম। মূল ফটক বাদ দিয়ে শোবার ঘরের জানালা দিয়ে তার নাম ধরে ডাক দিলাম “মিসেস অ্যানি, ফায়ার ফায়ার” বলে।

তিনি ভেতর থেকে বললেন, “ডোন্ট ওয়ারি, ইট’স অল দেয়ারস’ ড্রামা। ডু ইউর বিসনেস, হানি।”

যা বুঝলাম, ইনস্যুরেন্স কোম্পানি থেকে টাকা আদায় করার জন্য বাড়ির বাসিন্দারা নিজেরাই আগুন লাগায়ে দিছে, কৌশলে। শেষমেশ পুলিশ কী প্রমাণ করতে পারছে জানি না, মাসের পর মাস ওই বাড়িটায় তালা ঝুলছিল, কোর্টের নোটিস সহ।

২.
আমেরিকার পশ্চিমের একটি অঙ্গরাজ্য নেভাডায় আজ (স্থানীয় সময় ৫ নভেম্বর) একটি জরুরী দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। দেশটির প্রেসিডেন্সিয়াল পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি সমাবেশে বক্তব্য রাখছিলেন প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে। এমন সময় তিনি কিছু একটা অস্বাভাবিকতা আঁচ করতে পারেন—জনতার মধ্যে। ভিড় এর মাঝখান থেকে “গান”, “গান” বলে তার ভক্তরা চিৎকার শুরু করে। [সঙ্গীত নয়, জি ইউ এন—মানে যে অস্ত্র দিয়ে গুলি বের হয়]

মুহূর্তেই তার নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে ঘিরে ফেলেন। তাকে ব্যাকস্টেজে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়। এদিকে ভিড়ের মাঝখান থেকে সন্দেহভাজন একজনকে পাকড়াও করে নিরাপত্তাকর্মীরা।  হাফিংটন পোস্ট-এর ভিডিও থেকে এটুকুই দেখা যায়।

ট্রাম্পের স্টেজ থেকে দৌড়ে পালানোর দৃশ্য কতটুকু আসল কিংবা ভেজাল তা কেবল নির্বাচনের পরেই জানা যাবে। কারণ, এনবিসি নিউজের বরাত দিয়ে হাফিংটন পোস্ট আরও জানায়, “No weapon was found.” তবে, এবিসি নিউজ জানায়, ওই সন্দেহভাজনকারীর হাতে একটি প্ল্যাকার্ড ছিল ‘”Republicans against Trump” সম্বলিত। তার নাম অস্টিন ক্রাইটস। তেত্রিশ বছর বয়স্ক ওই রিপাবলিক সমর্থককে জেরা শেষে সিক্রেট সার্ভিস ইতিমধ্যে ছেড়ে দিয়েছে।

তবে, নিরাপত্তাকর্মীরা এইসব ইমারজেন্সি মুহূর্তে সবার আগে টার্গেটের মাথা ঢেকে দেন, হাত দিয়ে। নিন্দুকেরা বলবে, তার সিকিউরিটিরা হয়ত ভাবছে না, এই লোকের মাথায় তো কিছুই নাই, তাই হয়ত ঢাকে নাই। আবার, ডেমোক্রাট এটাকেই হয়ত পুঁজি করে ‘স্ক্রিপ্টের দুর্বলতা’ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করতে পারে। কিংবা, ট্রাম্প যে তার নিজের শিবিরেই বিতর্কিত—এ বিষয়েও ফোকাস করতে পারেন হিলারি।

trump-12

“এবিসি নিউজ জানায়, ওই সন্দেহভাজনকারীর হাতে একটি প্ল্যাকার্ড ছিল ‘”Republicans against Trump” সম্বলিত। তার নাম অস্টিন ক্রাইটস। তেত্রিশ বছর বয়স্ক ওই রিপাবলিক সমর্থককে জেরা শেষে সিক্রেট সার্ভিস ইতিমধ্যে ছেড়ে দিয়েছে।”

বিতর্ক উঠেছে এখান থেকেই যে, কোনো অস্ত্র যদি পাওয়া না যায়, তবে কী কারণে ওই ব্যক্তিকে একটি কৃত্রিম জরুরি অবস্থা তৈরি করে পাকড়াও করা হয়েছে?

উল্লেখ্য, এর আগে একাধিকবার তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারীকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। এতে করে তিনি ব্যাপক সমালোচিত হন। সেই সমালোচনার ক্ষতিপূরণ করতেই কি এই দৃশ্যের অবতারণা? নাকি একের পর এক বিতর্কিত বক্তব্য নিয়ে হতাশ রিপাবলিকান সমর্থকদের অনেকেই? নাকি, পরাজয়ের আশঙ্কায় বিরোধী শিবিরের কেউ তার প্রাণনাশ করতে চাইছেন? ট্রাম্পের ছেলে ইতিমধ্যে টুইটারে দাবি করেছেন এই ঘটনাকে ‘হত্যা প্রচেষ্টা’ হিসেবে।

নির্বাচনের আর মাত্র তিন দিন বাকি থাকতে ‘ট্রাম্পের জীবননাশের আশঙ্কা’র মত ঘটনা—সেটা সত্যি কিংবা সাজানো নাটক হোক, ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলবে, নিশ্চিত।

আমেরিকার জীবন যাপনের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে যে ট্রাম্প হচ্ছেন এক ধরনের বাজিকর। আমেরিকার প্রাত্যহিক জীবনে এই রকম বাজিকরদের দেখা মেলে। আমেরিকায় বসবাস করা অনেক মানুষ তর তর করে উপরে উঠে গেছেন এই ধরনের বাজির উপরে দাঁড়িয়ে। অনেকে রাতারাতি ধসে পড়েছেন, একই কারণে। ব্যাপারটা এই রকম— মশারি না টানাইলে মশা কামড়াবে, কিন্তু মশা কামড়াইলেই যে ম্যলেরিয়া হবে—এর সম্ভাবনা কত পারসেন্ট? ৫০ পারসেন্ট? ৫০ পারসেন্ট রিস্কের জন্য ৫-১০ ডলার খরচ কি করব নাকি করব না? নাকি ম্যালিরিয়া হলেই লাভ বেশি? এটা খুব ছোট একটা উদাহরণ মাত্র।

hillery-12

“ভদ্র, শালীন কথাবার্তা বলে কি হিলারিকে পাল্লা দেওয়া যাবে? এর চেয়ে বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য বক্তৃতা অনেক বেশি পাবলিসিটি এনে দিবে—এই বাজিতেই ট্রাম্প এগিয়েছেন।”

ভদ্র, শালীন কথাবার্তা বলে কি হিলারিকে পাল্লা দেওয়া যাবে? এর চেয়ে বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য বক্তৃতা অনেক বেশি পাবলিসিটি এনে দিবে—এই বাজিতেই ট্রাম্প এগিয়েছেন। জয় এলে আসতে পারে, না এলেও তুঘলকরি কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলার পয়েন্ট পাওয়া যাবে।

ট্র্যাম্পের সবচেয়ে বড় দুই কার্ড যেটা আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি, হচ্ছে—উইকিলিক্সের জুলিয়ান আস্যান্জ, আর আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। এদিকে  হিলারি হচ্ছেন ঝানু রাজনীতিবিদ, স্ট্রাটেজিস্ট।  সেই কৌশল হিসেবে তিনি উদারপন্থী, নারী ও অভিবাসীদের ভোট নিশ্চিত করে ফেলছেন। ট্রাম্পের নারী কেলেঙ্কারির সকল রেকর্ড ভোটারদের সামনে প্রমাণসহ হাজির করেছেন তিনি, যদিও ট্রাম্পের বহু চেষ্টা সত্ত্বেও নিজের স্বামীর যৌন কেলেঙ্কারি বিষয়ে এখন পর্যন্ত একটি শব্দ ব্যয় করেন নি তিনি—নির্বাচনী প্রচারাভিযান কিংবা লাইভ বিতর্ক অনুষ্ঠানে।

তারা দুজনেই অভিজ্ঞ খেলোয়াড়। ট্রাম্পের হাতে আর কোনো কার্ড আছে কিনা তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আরো তিন দিন।

অতএব, বাজি জেতে নাকি অভিজ্ঞতার রাজনীতি জেতে সেটা এখনি জানা যাচ্ছে না।

About Author

আশা নাজনীন
আশা নাজনীন