page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

ডার্ক এনার্জি, ডার্ক ম্যাটার

মহাবিশ্ব যে প্রতিনিয়ত বিস্তৃত হচ্ছে, এর আয়তন বাড়ছে এটি প্রায় সবারই জানা। ধারণা করা হত, এই প্রসারিত হওয়ার প্রক্রিয়াটি ধীরে, মহাকর্ষ শক্তির আকর্ষণের কারণে ধীরে ঘটছে। আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্বও সেই কথা বলে। কিন্তু হাবল টেলিস্কোপের আবিষ্কারের পর জানা যায় মহাবিশ্বের বিস্তৃত হওয়ার গতি আসলে বাড়ছে। এবং এটি ঘটছে মহাশূন্য বা স্পেসের নিজস্ব শক্তির কারণে। এই শক্তির নাম ডার্ক এনার্জি।

১৯৯০ এর দশকের শুরুর দিকে মহাবিশ্বের প্রসারিত হওয়ার ব্যাপারটি ঠিকঠাকই ছিল। হয়ত এর শক্তির ঘনত্ব এতই বেশি যে এই প্রসারিত হওয়ার ব্যাপারটি কখনোই থামানো বা পুনরায় ধ্বংস করা যাবে না, অথবা এর শক্তির ঘনত্ব এতই কম মাত্রার যে প্রসারিত হওয়া কখনো থামবেই না। কিন্তু নিশ্চিতভাবে মহাকর্ষ শক্তি এই প্রসারিত হওয়ার ব্যাপারটি সময়ের সাথে সাথে ধীরগতির করে দিয়েছে। ধরে নেওয়া হয়, এই ধীরগতি হওয়ার ব্যাপারটি পর্যবেক্ষণ করা হয় নি, কিন্তু তাত্ত্বিকভাবে এই প্রসারিত হওয়ার প্রক্রিয়াটি ধীর গতি হওয়ারই কথা।

মহাবিশ্ব অসংখ্য বস্তুতে পরিপূর্ণ, এবং মহাকর্ষ শক্তির আকর্ষণ এই বস্তুগুলিকে একসাথে ধরে রাখে। এরপর ১৯৯৮ সালে হাবল স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে অনেক দূরের সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, অনেক অনেক কাল আগে এই মহাবিশ্ব বর্তমানের তুলনায় আরো ধীরগতিতে প্রসারিত হচ্ছিল।

সুতরাং অনেকে যেমন মনে করে যে মহাকর্ষ শক্তির কারণে এই প্রসারণ প্রক্রিয়া ধীরগতিতে ঘটছে তা ঠিক নয়। এর গতি আসলে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেউই এরকম আশা করে নি। কেউই জানত না এর ব্যাখ্যা কীভাবে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু কোনো একটা কারণে এটি ঘটছিল। তাত্ত্বিকেরা এর তিন ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

অনেকে মনে করেন এটি কোনো একভাবে আইনস্টাইনের মহাকর্ষীয় তত্ত্বের বিপরীতে ঘটছে, যে তত্ত্বে মহাজাগতিক ধ্রুবকের কথা বলা আছে। হয়ত কোনো এক অদ্ভুত ধরনের তরল শক্তি ফাঁকা জায়গা পূরণ করেছে। হয়ত আইনস্টাইনের মহাকর্ষীয় তত্ত্বে কোনো ভুল রয়েছে, নতুন কোনো তত্ত্ব দিয়ে হয়ত এই মহাজাগতিক গতি বৃদ্ধির ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করা যাবে। কিন্তু তাত্ত্বিকেরা এখনো এর সঠিক ব্যাখ্যা জানেন না। তবে তারা এই সমাধানের নতুন একটি নাম দিয়েছেন, ডার্ক এনার্জি বা ডার্ক শক্তি।

মহাবিশ্ব ডার্ক এনার্জি - মহাবিশ্বের প্রসারণ: এই চিত্রটিতে ১৫ বিলিয়ন বছর আগে মহাবিশ্বের জন্মের পর থেকে প্রসারণের হার দেখা যাচ্ছে। রেখাগুলি যত নিচের দিকে অর্থাৎ যত সংকীর্ণ প্রসারণের হার তত বেশি। এই রেখাগুলি লক্ষণীয়ভাবে উপরে উঠে এসেছে ৭.৫ বিলিয়ন বছর আগে, সে সময় মহাবিশ্বের উপাদানগুলি দ্রুতগতিতে একটি আরেকটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞানে বলা হয়ে থাকে একটি রহস্য ডার্ক ফোর্স ছায়াপথগুলিকে ধাক্কা দিচ্ছে বলেই দ্রুতগতিতে মহাবিশ্বের প্রসারণ ঘটছে।

মহাবিশ্ব ডার্ক এনার্জি – মহাবিশ্বের প্রসারণ: এই চিত্রটিতে ১৫ বিলিয়ন বছর আগে মহাবিশ্বের জন্মের পর থেকে প্রসারণের হার দেখা যাচ্ছে। রেখাগুলি যত নিচের দিকে অর্থাৎ যত সংকীর্ণ প্রসারণের হার তত বেশি। এই রেখাগুলি লক্ষণীয়ভাবে উপরে উঠে এসেছে ৭.৫ বিলিয়ন বছর আগে, সে সময় মহাবিশ্বের উপাদানগুলি দ্রুতগতিতে একটি আরেকটি থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল। জ্যোতির্বিজ্ঞানে বলা হয়ে থাকে একটি রহস্য ডার্ক ফোর্স ছায়াপথগুলিকে ধাক্কা দিচ্ছে বলেই দ্রুতগতিতে মহাবিশ্বের প্রসারণ ঘটছে।

ডার্ক শক্তি কী?

যা এখন পর্যন্ত জানা গেছে তার চেয়ে অজানার পরিমাণই বেশি। এই ডার্ক এনার্জি কীভাবে প্রসারিত হওয়ার প্রক্রিয়াটিকে প্রভাবিত করে তা জানা গেছে বিধায় কী পরিমাণ ডার্ক এনার্জি মহাবিশ্বে আছে তাও জানা গেছে। এছাড়া বাকি সবটুকুই এখনো রহস্য। কিন্তু এই রহস্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। এই মহাবিশ্বের সব মিলিয়ে প্রায় ৬৮ শতাংশই ডার্ক এনার্জি। আর ডার্ক ম্যাটার বা ডার্ক বস্তুর পরিমাণ ২৭ শতাংশ। আর বাকিটুকু, অর্থাৎ আমাদের পৃথিবীর সবকিছু, এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা সবকিছু এই মহাবিশ্বের ৫ শতাংশেরও কম পরিমাণের। সেদিক থেকে বলা যায়, এগুলি মহাবিশ্বের এতই ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ যে এগুলিকে স্বাভাবিক বস্তু বলা উচিৎ নয়।

ডার্ক এনার্জির একটি ব্যাখ্যা হলো এটি স্পেস বা মহাশূন্যেরই একটি বৈশিষ্ট্য। আলবার্ট আইনস্টাইনই প্রথম উপলব্ধি করেন মহাশূন্য মানে কিছু ‘না থাকা নয়’। মহাশূন্যের আশ্চর্য সব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, এর মধ্যে অনেকগুলি এখন বুঝতে পারা শুরু হয়েছে।

আইনস্টাইন প্রথম যে বৈশিষ্ট্য বুঝতে পেরেছিলেন তা হলো, আরো মহাশূন্যের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা। এরপর আইনস্টাইনের মহাজাগতিক ধ্রুবকের তত্ত্বটি দ্বিতীয় একটি অনুমান করে, ‘ফাঁকা স্থান’ বা শূন্য তার নিজের শক্তি ধরে রাখতে পারে। এই শক্তি মহাশূন্যের নিজেরই একটি বৈশিষ্ট্য হওয়ার কারণে এই শক্তি মহাবিশ্ব প্রসারিত হওয়ার কারণে দুর্বল হয় না। ফলে এই শক্তি মহাবিশ্বের প্রসারিত হওয়াকে আরো দ্রুততর করে। দুর্ভাগ্যবশত কেউই বোঝে না সেখানে মহাজাগতিক ধ্রুবকের কাজ কী? বা এই প্রসারণের গতি বাড়ানোর জন্য সেই মহাজাগতিক ধ্রুবকের কেন একেবারে সঠিক মান রয়েছে?

ডার্ক ম্যাটার এই প্রসারণকে বাধা প্রদান করে

ডার্ক ম্যাটার এই প্রসারণকে বাধা প্রদান করে: এই চিত্রটিতে ডার্ক ম্যাটারের ছড়িয়ে থাকা, ছায়াপথ এবং অ্যাবেল ৫২০ গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের কেন্দ্রে হট গ্যাস দেখা যায়। এর ফলাফল ডার্ক ম্যাটারের মৌলিক তত্ত্বগুলির জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারত।

মহাশূন্য কীভাবে শক্তি অর্জন করে তার আরেকটি ব্যাখ্যা আসে বস্তুর কোয়ান্টাম তত্ত্ব থেকে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রকৃত অর্থে ‘ফাঁকা স্থান’ বা মহাশূন্য অস্থায়ী বস্তুকণায় পরিপূর্ণ। সেগুলি সবসময় গঠিত হয় এবং অদৃশ্য হতে থাকে। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানীরা যখন হিসাব করার চেষ্টা করেছেন এর ফলে মহাশূন্য কী পরিমাণ শক্তি পায়, তারা ভুল উত্তর পেয়েছেন, অনেক ভুল একটি উত্তর। প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে ১০১২০ গুণ বড় মান এসেছে। ১ এর পর আরো ১২০ টি ০। এরকম ভুল উত্তর সচরাচর পাওয়া যায় না। সুতরাং রহস্যটি রহস্যই থেকে গেছে।

ডার্ক এনার্জির আরেকটি ব্যাখ্যা হলো এটি নতুন এক ধরনের গতিশীল এনার্জি ফ্লুইড বা শক্তিক্ষেত্র। এটি শূন্যের সবটুকুই দখল করে কিন্তু মহাবিশ্বের প্রসারণের ওপর এর প্রভাব বস্তু এবং স্বাভাবিক শক্তির বিপরীত। পঞ্চম গ্রীক দার্শনিকের নামানুসারে কোনো কোনো তাত্ত্বিক এর নাম দিয়েছে ‘quintessence’ বা ‘বিশুদ্ধ’। কিন্তু এটি যদি শক্তির একেবারে বিশুদ্ধ রূপও হয়, তবু আমরা এখনো জানি না এটি কীসের মত, কার সাথে এর মিথষ্ক্রিয়া ঘটে, কেনই বা এর অস্তিত্ব রয়েছে। সুতরাং রহস্য থাকছেই।

একটি শেষ সম্ভাবনা হল আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব সঠিক নয়। এই ডার্ক এনার্জি শুধু মহাবিশ্বের প্রসারণকেই প্রভাবিত করে না, এটি ছায়াপথের স্বাভাবিক বস্তুকণা ও ছায়াপথের ক্লাস্টারগুলির আচরণকেও প্রভাবিত করে। যদি এই ব্যাপারটির মাধ্যমে একটি সিদ্ধান্তে আসা যেত যে ডার্ক এনার্জি সমস্যার সমাধান নতুন একটি মহাকর্ষ তত্ত্ব অথবা না, তাহলে ছায়াপথগুলি কীভাবে ক্লাস্টারে একত্রিত হয় তা আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারতাম।

কিন্তু যদি দেখা যায় একটি নতুন মহাকর্ষ তত্ত্ব আসলেই প্রয়োজন তাহলে সেই তত্ত্বটি কী ধরনের হবে? আমাদের প্রয়োজনীয় সোলার সিস্টেম বা সৌর জগতের উপাদানগুলির গতিকে এটি কীভাবে সঠিক উপায়ে ব্যাখ্যা করবে? আইনস্টাইনের তত্ত্বটি সোলার সিস্টেমের গ্রহগুলির গতিকে ব্যাখ্যা করে এবং একই সাথে মহাবিশ্ব সম্পর্কে আলাদা একটি অনুমান প্রদান করে। অনেক গুলি তত্ত্ব সেক্ষেত্রে রয়েছে, কিন্তু কোনোটিকেই পুরোপুরি গ্রহণ করা যায় না। ফলে রহস্য থাকছেই।

ডার্ক এনার্জির সম্ভাবনাগুলির মধ্যে কোনটি আসলে ঠিক, মহাশূন্যের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য? একটি গতিশীল এনার্জি ফ্লুইড? নাকি মহাকর্ষের নতুন একটি তত্ত্ব? এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আরো বেশি এবং আরো যথাযথ তথ্য প্রয়োজন।

ডার্ক ম্যাটার বা ডার্ক বস্তু কী?

অ্যাবেল ২৭৪৪ – প্যান্ডোরা’স ক্লাস্টার দেখা যাচ্ছে

অ্যাবেল ২৭৪৪ – প্যান্ডোরা’স ক্লাস্টার দেখা যাচ্ছে: অ্যাবেল ২৭৪৪ এর ধারণ করা নতুন মিশ্র-চিত্রটিতে এখন পর্যন্ত দেখা সবচেয়ে নাটকীয় এবং সবচেয়ে জটিল গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের সংঘর্ষ। নীল রঙ এখানে মোট ভর ঘনত্ব (এর অধিকাংশই ডার্ক ম্যাটার) বোঝাচ্ছে।

অনেকগুলি মহাজাগতিক পর্যবেক্ষণে মহাবিশ্বের একটি পূর্ণাঙ্গ তাত্ত্বিক মডেল দাঁড়া করানোর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আমাদের উপরে বর্ণিত সিদ্ধান্তে এসেছেন। প্রায় ৬৮% ডার্ক এনার্জি, প্রায় ২৭% ডার্ক ম্যাটার, ৫% স্বাভাবিক বস্তু বা ম্যাটার। ডার্ক ম্যাটার তাহলে কী?

এর সম্পর্কে আমাদের যতটুকু অজানা, জানার পরিমাণ তার থেকে বেশি নয়। প্রথমত, এটা ডার্ক, অর্থাৎ, এটি আমাদের পরিচিত নক্ষত্র বা গ্রহের মত কিছু নয়। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ২৭% হিসাব অনুযায়ী মহাবিশ্বে প্রয়োজনীয় দৃশ্যমান বস্তুর পরিমাণ খুবই সামান্য। দ্বিতীয়ত, এটি ব্যারিয়ন দ্বারা গঠিত স্বাভাবিক বস্তুর কোনো ডার্ক ক্লাউড রূপেও বিরাজমান না। এর কারণ, দেখা গেছে, ব্যারিয়ন উপাদানের ক্লাউডের মধ্য দিয়ে কোনো তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ গেলে এটি সেই বিকিরণকে শোষণ করে নেয়, ডার্ক ম্যাটারগুলি ব্যারিয়ন উপাদানের কোনো ক্লাউড হলে তেজষ্ক্রিয়তা শোষণের কারণে তা নির্ণয় করা সম্ভব হত।

তৃতীয়ত, ডার্ক ম্যাটার কোনো প্রতিবস্তুও না। কারণ প্রতিবস্তু বস্তুর উদ্দেশ্যে যে বিশেষ ধরনের গামা রশ্মির বিকিরণ ঘটায়, ডার্ক ম্যাটারের বেলায় তা দেখা যায় না। শেষপর্যন্ত, আমরা যতগুলি গ্র্যাভিটেশনাল লেন্স দেখি তার ভিত্তিতে ছায়াপথের সমান বড় বড় ব্ল্যাকহোলগুলিকেও বাতিল করে দিতে পারি। সেগুলির কাছে দিয়ে যাওয়ার সময় উচ্চ ঘনত্বের বস্তু সেগুলির জন্য আরো দূরে সরে যায়, কিন্তু সেক্ষেত্রে আমরা যথেষ্ট লেন্সিং এর ঘটনা দেখতে পাই না। সুতরাং আমরা বলতে পারি না, এই ব্ল্যাকহোলগুলি ওই ২৫% ডার্ক ম্যাটারের অংশ।

তবে আরো শক্ত কতগুলি ডার্ক ম্যাটার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যারনিক বস্তুগুলি যদি ভারি উপাদানের ঘন সন্নিবেশিত অংশে বাদামি ক্ষুদ্রাকৃতির অবস্থায় থাকে তাহলে সেগুলি ডার্ক ম্যাটার তৈরি করতে পারে। ডার্ক ম্যাটারের এভাবে থাকার সম্ভাবনাকে বলা হয় ‘ম্যাসিভ কমপ্যাক্ট হালো অবজেক্টস’ অথবা ‘MACHOS’। কিন্তু সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি হল, ডার্ক ম্যাটার আদৌ ব্যারন গঠিত বা ব্যারনিক নয়, বরং এটি এক্সিয়নস মত মহাবিশ্বের বাইরের কোনো কণা অথবা দুর্বলভাবে মিথষ্ক্রিয়াক্ষম বৃহৎ আকারের কণা (WIMPS = Weakly Interacting Massive Particles) দ্বারা গঠিত।

সূত্র: science.nasa.gov 

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক
সাম্প্রতিক ডেস্ক