page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

ডিভিডি-শেভিং ফোম-কোডাক রিল

shiba-brata-1

বসুন্ধরা সিটির ছয় তলায় যে দোকানটা থেকে আমি নিয়মিত কম দামে পাইরেটেড ডিভিডি কিনি, সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। অন্য আরেকটি দোকান থেকে কিনতে শুরু করেছিলাম। পরের মাসে গিয়ে দেখি সেটা একটা ইলেকট্রনিক অ্যাকসেসরিজের দোকান। আশপাশে আরও কয়েকটি ডিভিডির দোকান বন্ধ হয়ে গেছে বা যাওয়ার পথে।
পিলখানায় রাইফেল স্কোয়ারের চার তলার ডিভিডির দোকানগুলো এখন মোবাইল ফোনের দখলে।

খোঁজ নিয়ে শুনলাম, ডিভিডি আর তেমন চলে না। মানুষ ইন্টারনেটে সিনেমা নামিয়ে টেরাবাইটপ্রমাণ পোর্টেবল হার্ড ডিস্কে কপি করে রেখে দিচ্ছে।

shibbratalogo

প্রযুক্তি আরেকদফা নিজের খোলস পাল্টাচ্ছে। চোখের সামনে। মাত্র কদিনে।

দুনিয়ায় কমপ্যাক্ট ডিস্কের জমানা বেশিদিন হয় নি। ঢাকায় কতোদিন হবে? পনের বছর? এই তো মাত্র সেদিন এলিফ্যান্ট রোডের গীতালি থেকে ম্যাগনেটিক টেপের ক্যাসেট কিনেছিলাম। গীতালি দোকানটা এখনও আছে। কিন্তু সেখানে আর কোনো ম্যাগনেটিক টেপ ক্যাসেট নেই। ওরা এথন সিডিতে গান কপি করে দেয়। ম্যাগনেটিক টেপ, যেটা ফিতা-ক্যাসেট নামে সাধারণ্যে পরিচিত, ঢাকার কোথাও নেই। আমাদের গ্রামের বাড়িতে সনি কোম্পানির ক্যাসেট প্লেয়ার কবে লোহালক্করের দোকানে চলে গেছে।

ফিতা ক্যাসেট এমনভাবে হাওয়া হয়ে গেছে—মনে হবে কখনও ছিল না। এখন যদি আশির দশকের পটভূমিতে কেউ পিরিয়ড ফিল্ম বানায়, তো আর্ট ডিরেকটরকে এই প্রপসটা জোগাড় করতে ঘামতে হবে।

ডিভিডি

প্রযুক্তি আমাদের জীবন যাপন দ্রুত পাল্টে দিচ্ছে। এত দ্রুত যে, মাঝে মাঝে তাল রাখা মুশকিল।

আমি হিসেব নিতে বসলাম, নিজের জীবদ্দশায় প্রযুক্তির পরিবর্তন কী কী দেখলাম। বড় পরিবর্তনগুলো বাদ দিয়ে আমি ছোটখাট পরিবর্তনগুলোর একটা তালিকা মনে মনে তৈরি করতে থাকলাম। এমনসব পরিবর্তন, যেগুলো আমার জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলেছে।

আমার হাতে এখন কোনো ঘড়ি নেই। মোবাইল ফোনে সময় দেখে নেই। অধিকাংশ যুবকের হাতেই আমি আর ঘড়ি দেখি না। এই ‘না দেখাটাও’ পুরনো হয়ে পাল্টে যেতে শুরু করেছে। এখন আবার ঘড়ি পরা নতুন করে চল হয়ে উঠছে। যুবকরা এখন সখ করে ঘড়ি পরে। তাও আবার ডিজিটাল ঘড়ির জায়গায় ডায়াল ঘড়ি (অ্যাপেল কোম্পানি দেখছি বাজারে স্মার্ট ঘড়ি এনেছে। ইউটিউবে আনপ্যাক-রিভিও দেখলাম। কিন্তু বুঝে উঠতে ব্যর্থ হলাম, মোবাইল ফোন থাকতে কেউ কেন স্মার্ট ঘড়ি কিনবে)।

জিপ্পো লাইটারও ফিরে এসেছে। আগের মতোই পেট্রোল দিয়ে জ্বালাতে হয়। ঢাকনা খুললে খটাং করে একটা ধাতব শব্দ হয়।

ক্যাসেট

ডেস্কটপ কম্পিউটারের জন্য সিআরটি মনিটর এখন কিনতে চাইলেও আর কিনতে পাওয়া যাবে না। সিআরটি টেলিভিশন পুরোপুরি অচল হয় নি। তবে যেসব বাসার ড্রইংরুমে এখনও টিকে আছে, সেগুলোয় শেষ প্রজন্মের যন্ত্র হিসেবে নষ্ট হয়ে চিরবিদায় নেওয়ার প্রতীক্ষায়।

ঝর্না কলম উঠে যেতে দেখেছি, আমি যখন ক্লাস টেনে। ফাইভে পরীক্ষা দিয়েছিলাম উইনসাং কলমে। ইয়ুথ কালিতে। ক্লাস এইটে মিশ্র কলমে লিখতাম। মানে ঝর্না কলমও থাকতো আবার রিফিল বলপয়েন্ট কলম। শাদা সার্টে কালি লেগে যেত বলে ঝর্না কলম পরিহার করতে শুরু করি আমরা ক্লাস নাইন-টেনে। প্রথম যুগের রিফিল কলমের মধ্যে রেড লিফ ব্র্যান্ডটার কথাই কেবল মনে আছে।

এখন ওয়ান-টাইম কলমের যুগ। ইকোনো নামটা এখন আর দেখি না।

শেভিং ক্রিম এখন হয়ে গেছে শেভিং ফোম। সেটাও আবার আঙুলে ঘষে লাগালেই চলে। দরকার পড়ে না সুদর্শন শেভিং ব্রাশ, যার উপরিতলটা দেখলে চিরকাল রঙ্গন ফুলের কথা মনে হতো। সেই ফোমও বিদায় নেওয়ার পালা। আমার বেসিনে এখন একটি ইলেকট্রিক ট্রিমার। শেভার কিনবো কিনবো করছি। ফিলিপস কোম্পানির তিনমাথাওয়ালা শেভার দেখতে সায়েন্স ফিকশন ছবির স্পেসশিপের মতো। আমাকে খুব টানে।

কোডাক নামটা কি আর কখনও চোখে পড়বে না? ফুজিকালার?

ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে বাটা সিগন্যালের ধারে ফুজি কালার।

ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে বাটা সিগন্যালের ধারে ফুজি কালার।

সেলুলয়েড স্টিল ক্যামেরার সঙ্গে সঙ্গে উঠে গেছে ডার্ক রুম। রিল শব্দটা এখন আর শুনি না। এখন বিয়ের ছবি ছাড়া তো লোকে বোধ হয় খুব বেশি প্রিন্টও নেয় না ছবির। এর একটা কারণ বোধ হয় বিপুল সংখ্যক ছবি তোলা হয় অফুরন্ত মেমোরি কার্ডে। তাছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেগুলো পোস্ট করে ইনস্ট্যান্ট ফিডব্যাক। প্রিন্টের আর দরকার কী?

ফিলামেন্ট বাল্ব উঠে যাচ্ছে। উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এনার্জি সাশ্রয় করতে হবে। টিমটিমে লালচে-হলুদ আলোর দুনিয়াটা আর নেই। এখন সন্ধ্যার পর বাসাবাড়িতে ছড়িয়ে পড়ছে দুধসাদা আলো।

আমি এখন গান শুনি মূলত ইউটিউবে। এক গান অনেক শিল্পীর কণ্ঠে অনেক ভার্সনে পাওয়া যায়। আর একটা গান মনে পড়ে যাওয়া মানে ইউটিউব আপনাকে একের পর এক ‘রিলেটেড’ গান মনে করিয়ে দিতে থাকবে।

কিন্ডল

লক্ষ্য করে দেখলাম, সম্প্রতি যে কটি বই পড়েছি, তার বেশিরভাগই ডিজিটাল ভার্সনে, ই-পাব ফর্ম্যাটে। মূলত আইফোন আর কিন্ডলে।

এই ব্লগটি লিখছি ২০০৮ সালে কেনা আসুস কোম্পানির একটি ল্যাপটপে, অফিস ২০০৭ ভার্সনে, অভ্র ইউনিকোড ফন্টে। গত ১৪ বছর ধরে আমি কলম ছেড়ে ডিজিটাল ফর্ম্যাটে লিখছি। যন্ত্র বদলালেও কি-বোর্ড কমবেশি একই রকম আছে—অপটিমা মুনির। এই একটা ব্যাপার বোধ হয় আরও বেশ কিছুদিন একই রকম থাকবে।

সত্যি থাকবে তো?

বয়সে তরুণ কলিগদের অনেকেই ফোনেটিকে লেখে। বিজয় কী-বোর্ড তারা একেবারেই পারে না।

অতি সম্প্রতি আমার আই-ফোনে বাংলা লিখতে পারছি আমি, বাংলা-নোট নামক একটি অ্যাপসের কল্যাণে। কি-বোর্ডটা একটু জটিল, তিন ধাপের ইন্টারফেসে মুহূমুর্হূ লাফিয়ে বেড়াতে হয়। একবার হাত পেকে গেলে মনে হয় লেখা ক্রিয়াটা ট্রাফিক জ্যামে বসে বা ডাক্তারের ওয়েটিং রুমে আসীন অবস্থাতেও অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।

৯ অক্টোবর, ২০১৪ মোহম্মদপুর, ঢাকা

About Author

শিবব্রত বর্মন

কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক। জন্ম : ১৯৭৩, ডোমার, নীলফামারী। প্রকাশিত গ্রন্থ : ছায়াহীন; মিগুয়েল স্ট্রিট (অনুবাদ) ভি এস নাইপল; কদর্য এশীয় (অনুবাদ) সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ; পাইয়ের জীবন (অনুবাদ) আয়ান মার্টেল