page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

তমিজউদ্দিনের অমর প্রেম

স্বনামধন্য সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ পাক্ষিক অনন্যা পত্রিকায় আমাকে কিছু লেখার সুযোগ করে দেন। শ্রদ্ধেয় এই সাংবাদিক কোন কাজের দায়িত্ব আমাকে দিলেও নিজেই সঙ্গে যেতেন, আমি কিছু লিখলেও পুরোটা পুনর্লিখন করতেন, সংশ্লিষ্ট রেফারেন্স ও বিষয়াদি সংযুক্ত করে লেখাকে যথাসাধ্য পরিপূর্ণ করে দিতেন। লেখায় আমার নাম থাকলেও সেখানে মূলত সব লেখাই থাকতো ‘আলতাফ পারভেজ’-এর। (ক)

তাঁর সঙ্গে পরিচয় আমার ব্যক্তিগত জীবনে যারপরনাই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল। বৈষয়িক সংকটে তিনি অন্নসংস্থান করে দিয়েছিলেন। আরো বড় কথা তিনি ছিলেন ঘনিষ্ঠ হতে পারা প্রথম প্রফেশনাল জার্নালিস্ট। নিরহংকার, আন্তরিক। তাঁর নামের পাশে নাম ছেপে দিতেন এর গুরুত্ব তখন কতটুকু বুঝেছিলাম মনে নেই দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভালোই টের পেয়েছি এবং স্মরণে শ্রদ্ধায় অবনত হই। যদিও লজ্জায় কখনো কৃতজ্ঞতা বা থ্যাংকসটুকুও জানাই নি। মনে হয় তিনি নিজ থেকেই জানেন।

logo faisal noi

 

আলতাফ ভাইয়ের কাছে পাঠিয়েছিলেন চিন্তা পত্রিকার আপেল ভাই। জ্বালানী বিষয়ক একটা লেখা বুঝে নেয়ার জন্য। তখন চিন্তা পত্রিকায় লেখা ছাপাবার চেষ্টা করতাম। যাতে কিছু বিল পাই। পরে দেখেছি তাঁরা দুজন আলাপকালে প্রসঙ্গের অর্ধেক থেকে আলোচনা শুরু করেন। মানে, সম্বোধনের ভদ্রতা প্রকাশ্যে না থাকলেও খুব যে ভালো বোঝাপড়া আছে বুঝতাম।

আমার অনেক অনুরোধের পর শ্যামলী-মোহাম্মদপুর লিংক রোডে অবস্থিত চিন্তা অফিস থেকে(খ) আমাকে তাদের টাঙ্গাইল নয়াকৃষি আন্দোলন অফিসে জয়েন করতে পারি বলে জানানো হয়। সেখানে কী করবো জিজ্ঞেস করলে জানানো হয়েছিল চাষবাসও করবেন, রিপোর্টও পাঠাবেন। তখন দার্শনিক ও কবি ফরহাদ মজহারের চিন্তা পত্রিকা বিশেষ পাঠকদের মনযোগ আকর্ষণ করেছিল। যার অধিকাংশ লেখায় আমার দাঁত বসানোর সুযোগ ছিল না। এখানে লেখা ছাপানো অনেক সম্মানের হবে মনে হওয়ায় চেষ্টা করতাম। পরে ধরতে পেরেছি, আপেল ভাই আমার অসহায়ত্ব টের পেয়ে পারভেজ ভাইয়ের কাছে পাঠিয়েছিলেন। পারভেজ ভাই কী করেছেন উপরে উল্লেখ করেছি। সাংবাদিক হতে আগ্রহী অনুল্লেখযোগ্য এক অনাত্মীয় তরুণের প্রতি অগ্রজ এই দুই সাংবাদিকের দরদী আচরণ অনেক সৌভাগ্যের, টের পাই।

অনন্যা পত্রিকার দুটি লেখা বিষয়বস্তুর জন্য মনে আছে। বিষয় নির্বাচন, যাতায়াত ভাড়া, পুরোটা লেখা ইত্যাদি যথারীতি আলতাফ পারভেজের। শুধু যৌথ নামে ছাপা হয়েছিল। বিল পেয়েছিলাম। এর মধ্যে একটা ছিল রূপগঞ্জের এক প্রেমিক বুড়োকে নিয়ে। সখের বৌ মরে যাওয়ার পর তার হাড্ডি-গুড্ডি তুলে ঘরে নিয়ে এসেছিলেন আবার। অন্যটি বিনা বিচারে ২২ বছর জেল খেটে বের হয়ে আসা ফালু মিয়ার উপর। যে ২২ বছর জেল খানায় নিখোঁজ থেকে বের হওয়ার পর বাইরে এসে পরিচিত আত্মীয়-স্বজন কাউকেই খুঁজে পান নি।

লেখার কপি না থাকায় ১০/১৪ মোহাম্মদপুর, ইকবাল রোডে অনন্যা(গ) অফিসে যাই। অফিস স্টাফ মাসুদ ও পারভিনকে দেখে অনেক ভালো লাগলো। এখনো আছেন তারা। বললাম এক সময় এখানে কিছুদিন কাজ করেছি। তারা চিনলেন না। জানলাম আলতাফ পারভেজ ভাই এখানে আর কাজ করেন না। পেশাগত জীবনের প্রথম দিককার পুরান অফিসটিতে এসে অনেক ভালো লাগলো। পা টলে উঠলো একটু।

আগ্রহী পাঠকের জন্য তমিজউদ্দিনের উপর ফিচারটা উল্লেখ করলাম।

গুলবাহার থেকে নূরজাহান
একজন তমিজউদ্দিনের পাগলামী কিংবা ভালোবাসা

স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন কিংবা তালাক অথবা নির্যাতনই হলো এ দেশে ‘সংবাদ’। এ দেশে স্বামীর ইমেজ মানে ‘নির্যাতক’। কিন্তু উল্টোটা যখন ঘটে এবং ভয়ঙ্কর রকমে ঘটে?… চলুন ঢাকা ছেড়ে, শীতলক্ষ্যা পেরিয়ে…

ডেটলাইন অক্টোবর ১৯৯৬
তারাবো, রূপগঞ্জ
রূপগঞ্জ থানার তারাবো গ্রামে তমিজউদ্দিনের বাড়ি। ৫৫ বছরের বৃদ্ধ। ২ মেয়ে ৩ ছেলে। গ্রামীণ মধ্যবিত্ত সুখের সংসার। ভূ-সম্পদও যথেষ্ট। বছর দুয়েক আগে হঠাৎ স্ত্রী গুলবাহার মারা গেলেন। আর তখন থেকে চারপাশের জনপদ দেখছে অভূতপূর্ব এক শোকার্ত স্বামীকে। স্ত্রী প্রেমে তমিজউদ্দিন এতটাই দেওয়ানা হলেন যে, ’৯৬-এর ৩০ সেপ্টেম্বর কবর থেকে গুলবাহারের হাড়, কঙ্কাল উঠিয়ে বাড়ি নিয়ে এলেন। সাবান দিয়ে ধুয়ে মানুষের মতো সাজিয়ে সেগুলো রেখে দিলেন বাড়ির আঙিনায়। এমনকি মাঝে মধ্যে বিছানায়ও। চারদিকে হইচই। পত্র-পত্রিকায় ছাপা হলো ঘটনা। বিখ্যাত পত্রিকা ফার ইস্টার্ন ইকনোমিক রিভিউতেও উঠলো এ ঘটনা। শীতলক্ষ্যা পেরিয়ে রাতারাতি তমিজউদ্দিন গড়ে তুললেন ‘স্বামী’ শব্দের নতুন ইমেজ। পাগলামী কিংবা ভালোবাসা…

কেমন ছিল গুলবাহার?
২৩ বছর বয়সে তমিজ উদ্দিনের সঙ্গে গুলবাহারের বিয়ে। তমিজউদ্দিনের ভাষায় ‘শ্যামলা এই মাইয়া আমার জীবনটা সুন্দর কইরা দিছিলো। যেই দিন হেয় আমার কাছে আইলো, বুঝলাম আল্লায় একটা দূত পাঠায় দিছে। বাড়িতে ছিল বেহেস্তের শান্তি।’ সেই গুলবাহার হঠাৎ লিভার ক্যানসারে মারা গেলেন। চিকিৎসার জন্য সুদূর মাদ্রাজ গিয়েছিলেন তমিজউদ্দিন, বাঁচাতে পারেন নি।

প্রতিদিন দুবার কবরে ছুটে যেতেন। ঘুম থেকে উঠে এবং সন্ধ্যায়। দোয়া পড়তেন। মাটি ঠিক করে দিতেন। ঢাকা থেকে নিয়ে স্পেশাল সব ফুলগাছ লাগাতেন। কিন্তু তুমুল বৃষ্টিতে একদিন কবর দেবে যায়। পানির তোড়ে কিছুতেই মাটি রাখা যাচ্ছিল না। তমিজউদ্দিনের ভাষায়—হে সময় বর্ষাকাল একদিন গুলবাহারের কবরে গিয়া দেহি, মাটি ভাইঙ্গা পড়ছে। কবরের ভেতর থেইক্যা বার হইয়া গেছে গুলবাহারের মাথার কঙ্কাল। দুই হাত। মাটিতে লেপটানো। সহ্য হয় নাই। কাপড় মোড়াইয়া বাড়িতে লইয়া আইলাম।…

তারপর জানাজানি, এলাকার মৌলভিরা ক্ষিপ্ত হন তমিজউদ্দিনের ওপর। দু’তিন দিন পর আবার কঙ্কালটি কবরে রেখে আসতে হয় তমিজউদ্দিনকে। এখনো গুলবাহারকে স্বপ্নে দেখেন তমিজউদ্দিন। ‘রাইতে নয়, সারাক্ষণই দেহি। চোখ বন্ধ করলেই দেহি।’

১-১৫ আগস্ট ১৯৯৯, পাক্ষিক অনন্যা পত্রিকায় ছাপা রিপোর্টের ছবি।

১-১৫ আগস্ট ১৯৯৯, পাক্ষিক অনন্যা পত্রিকায় ছাপা রিপোর্টের ছবি।

তমিজউদ্দিনকে তারাবোর সবাই চেনে। কেউ একে অস্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবে নেয় না। মনে করে স্ত্রীর প্রতি অন্য রকম এক মানুষের অন্য রকম এক ভালোবাসা। ডাক্তাররা আগেই বলেছিলেন গুলবাহার বাঁচবে না। তারপরও তমিজউদ্দিন লাখ লাখ টাকা খরচ করেছেন। প্রতিজ্ঞা করেছিলেন রক্ত বেচে হলেও চিকিৎসা করিয়ে যাবেন।

ডেটলাইন জুলাই ১৯৯৯
আবার তমিজউদ্দিনের খোঁজে এবং তিনি বিয়েও করেছেন
কোনার ঘরটার দরোজা জানালা ভেঙে গেছে বলে পুরনো ভাড়াটিয়া উঠে যাওয়ার পর গত দু’ মাসে ভাড়া দেয়া যায় নি। তমিজউদ্দিন তাই নিয়ে ব্যস্ত। কাঠমিস্ত্রিকে এটা-ওটা এগিয়ে দিচ্ছিলেন।

ডেমড়া পৌঁছে এক টাকায় খেয়া নৌকায় শীতলক্ষ্যা না পেরিয়েও এখন তারাবো বাজারে আসা যায়। সরাসরি বাস যোগাযোগ স্থাপিত হয়ে গেছে। গাড়ি কাচপুর এসে বাঁয়ের রাস্তায় যেয়ে বিশ্বরোড থেকে চিকন পিচ ঢালা রাস্তায় তারাবো পৌঁছে গেলো। তখন বিকেল। তমিজউদ্দিনকে স্থানীয়ভাবে কানা তমু হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়। তমিজউদ্দিনের বাসায় ভাড়া থাকে আঃ কাশেম। ঠেলা ভ্যান চালায় সায়েদাবাদ এলাকায়। তার সঙ্গে বসেই শুরু হলো গল্প। তার স্ত্রীও যোগ দিলেন। কতগুলো পিচ্চিও জুটে গেলো। এ-ঘর ও-ঘর থেকে আরো দু’একজন মহিলা চৌকির কোনায়-পিঁড়িতে বসে গেলেন। সবাই তমিজউদ্দিন সম্পর্কে জানা মজার ঘটনাবলি বর্ণনা করছেন। এ-ওর মুখ থেকে বিবরণ ছিঁড়ে নিয়ে নিজে বলছে। দরোজার সামনে দিয়ে কড়া পর্যবেক্ষণ করে গেলো তমিজউদ্দিনের মেজো ছেলে। সাংবাদিকদের আসা তার পছন্দ হয় নি। টহল দিয়ে গেল দুই পুত্রবধূও।

বাঁ হাত বাঁকা করে তাতে শাড়ি, গামছা, সায়া-ব্লাউজ ফেলে দুদ্দার পায়ে কলতলার দিকে এগিয়ে যেতে দেখা গেল তমিজউদ্দিনের ‘বাঁজা’ বউ নূরজাহানকে। আঁড়চোখে কী একবার তাকিয়ে দেখলো! দু’ চোখে গভীর আগ্রহ নিয়ে জলচৌকিতে বসে বাবা সম্পর্কে গল্প শুনতে লাগলো তার ছোট মেয়ে পারুল। আর কাশেমের বউ আঁচলে মুখ ঢাকতে ঢাকতে রহস্যময় হাসি হেসে বললো—‘হেইতে আইতাছে!’ চাপা হাসির শব্দ তুলে তড়িঘড়ি উঠে গেলো এতক্ষণ বসে গল্প করতে থাকা অনেকে। জমে উঠলো।

‘কৈ? কে আইছে?’ উচ্চকণ্ঠে বলতে বলতে ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন তমিজউদ্দিন। হাতে কেন যেন একটা শাবল। ঘামে-ধুলোয় চিটচিটে হয়ে শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে পরিধানের স্যান্ডো গেঞ্জি-লুঙ্গি। এক চোখ দিয়ে পিট পিট করে দেখতে লাগলেন তিনি। কণ্ঠে অদ্ভুত শব্দ করে সপ্রশ্ন তাকিয়ে আছেন।

‘স্লামালেকুম চাচা। ভালো আছেন?’

‘হুম্-আপনেরা কে?’

‘মনে নাই চাচা, হেই যে পত্রিকায় ছাপা হইলো? তাইতেই আইলাম ক্যামন আছেন। আইয়েন চাচা… হ্যাঁ?… কী বলেন?’

‘হ, চিনছি, কত মানুষ আইছে। ছবি তুইল্লা নিছে।’

‘আপনার স্বাস্থ্য ভালো আছে কিনা দেখতে আসলাম। ক্যামন আছেন বলুন তো!’

‘আর ভালা। হেইতিও নাই আমারও মুখ উইটঠা গেছে। আরে ঐ… হুইস, হাঁসগুলাইন দুরাস না কা … একটু বন…।’ তমিজউদ্দিন মাঝ উঠোনে শুকোতে দেয়া ধান খেতে আসা হাঁস তাড়াতে উঠে গেলেন।

পাশের ঘরের এক বউ বসে ছিল পাশে। জিজ্ঞেস করলাম, এমনিতে তার স্বাস্থ্য ভালোই আছে কিনা?

‘আরে ধুর, কীয়ের? হারাদিন গুলবাহারের ফিরিস্তি। মাতার ঠিক-ঠিকানা নাই। যা মনে লয় তা-ই করে।’

‘কী করে বলেন তো! আচ্ছা ইইন ঠিক মতো নামাজ-রোজা করেন, মানে ধর্ম কি খুব কড়াকড়িভাবে মানেন?’

‘হেই যে কই না, কোন ঠিক নাই। মনে কইলে ওক্তো লাগে না।’

‘ঠ্যাং ভাইঙ্গা দিমু তহন ডিম খাওন ছুইটটা যাইবো…।’ তমিজউদ্দিন আসছেন।

‘তা চাচা আপনার আগের স্ত্রীর কথা কি এখনো মনে পড়ে?’

‘সব সময় পড়ে। হে থাকলে পোলাপাইনগুলি কি এত বেয়াদবি করতে পারত? পুলিশ পর্য্যন্তক আইতে পারতো না—দাও লইয়া খাড়াইত। দুইনাই এক পাশে আর আমি অন্য পাশে।’

‘কী হইছে কনতো।’

‘হাঁডুত মগজ অইছে অগো। মরলে স্বাধীন অয়। অহন মারতে চায়। বড় পোলার তন অর মায় মরার সময় টেহা লইছি—হেডা লইয়াও একটা সমস্যা আছিল। মাইনসে কয় নিজের পোলা। হমুন্দির পুতেরা সুযুগ লইছে।’

‘চাচা, আগের বউয়ের লাইগগা কি মায়া কইমমা গেছে? হুনলাম আবার বিয়া করছেন।’

‘এর কোন ঠিক নাই। নিজের হাঁস-মুরগা না থাকলে কবে চইল্লা যাইত। আমারে কেউ পোছেও না।’

‘এই ঘরে ছেলেমেয়ে আছে?’

‘যাতে পোলাইন-ছাওয়ান না অয় হেয়াললাইগা আগেই বাঁজা দেইখখা বিয়া দিছে পোলারা।’

‘কন কি, আগেই বোঝা গেল ক্যামনে?’

‘আগে বিয়া অইছে না আরেকটা।’

‘তাই? তা এখন বিয়ে কললেও আপনি আগের স্ত্রীকেই বেশি ভালোবাসেন, ঠিক না?’

‘হ।’

‘আচ্ছা চাচা বলেন তো তার কথা মনে উঠলে আপনার কেমন লাগে?’

তাঁর ভালো চোখটি দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো নিঃশব্দে, ধীরে মিশে যাচ্ছে ধুলো-ঘামের লবণাক্তে, কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘যাই করি হের কতা ছাড়া আর কিছু কখনো আমার মনে থাকে না। হে মইররা গেছে মনে অইলেই ডর করে। সকালে বেকের আগে কবরডা পরিষ্কার করি। তেরপল দিয়া ঢাইককা দেই। অহন নাগাইদ একটা বনও ওটতাম দেই নাই কবরো। প্রত্যেকদিন কোরআন শরিফ পড়ি। জেয়ারত করি। কবরে আত বুলাই। পাঁজা কইররা হুইয়া থাকি। মনে অয় হারাদিন হেতি আমার লগে লগে আছে…।’

‘কাম কাজ কিছু করেন?’

‘বাড়ি ভাড়া দেই, দোহান আছে, আর কিছু না।’

‘নতুন চাচির নাম কী?’

‘ওম-ম কী জানি কী—জানি…’

‘আচ্ছা আগের চাচির লগে কখনোই ঝগড়াঝাটি হইতো না, ঠিক না?’

‘অইত, কতা অইত না। হে পাঁচদিন ভাত না খাইয়া থাকলে আমিও খাইতাম না। আবার অন্য কেউর লগে ঝগড়া বাঁধলে দাও লইয়া ঝাঁপাইয়া পড়তো।’

ছেলে ও ছেলের বউদের সঙ্গে তমিজউদ্দিন। বাঁয়ে ছোট মেয়ে পারুল। ১৯৯৯। ছবি. আলতাফ পারভেজ।

ছেলে ও ছেলের বউদের সঙ্গে তমিজউদ্দিন। বাঁয়ে ছোট মেয়ে পারুল। ১৯৯৯। ছবি. আলতাফ পারভেজ।

‘আচ্ছা চাচা, উঠি আজ। নতুন চাচি কই?’

‘আছে, তার লগে কী কইবেন—দরকার নাই, আমার কাম আছে, চা খাইবেন তো, মেস্তোরি বইয়া রইছে।’

ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকে চেয়ে আছেন দ্বিতীয় স্ত্রী নূরজাহান। তার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করি, ‘চাচি ভালো আছেন?তার কথা বলেন তো!’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নূরজাহান জবাব দিলেন, ‘ভালো আর কীয়ের বাবা, আমনে হেইতেরে ছাড়া আমার কতা হুইনেন। হের বগ মাইয়াও কতা কইতে চায় আপনাগো লগে। হের পোলারা আমারে মারে… আসতে যাইতে লাথি গুঁতা দেয়।’

‘কই আইলেন না, আইয়েন’—তমিজউদ্দিনের উদ্বিগ্ন কণ্ঠের তাড়া খেয়ে ফিরে আসি। তমিজউদ্দিন জানতে চান এখন কী মাস। বললেন,‘দশই জুলাই আইয়েন, গুলবাহারের মরণ দিন। দেহি এইবার কিছু পইসা খরচ করুম। আইবেন তো…?’

সন্ধ্যা জমে গেছে তখন, তাড়াহুড়ো করে খেয়া ঘাটের দিকে পা চালাই। তমিজউদ্দিন পেছন থেকে বলছেন, ‘চা খাইলেন ন? খাইয়া যান। কবরডা পতোই পড়বো, চাইয়া যাইয়েন…।’(ঘ)

ডেটলাইন ২৯ মে ২০১৪
মারা গেছেন তমিজউদ্দিন
এই লেখাটি কম্পোজ শেষে কৌতূহল হলো তিনি কেমন আছেন খোঁজ নেয়ার। সহকর্মী শাহরিয়া হোসেন রীয়ার গ্রামের বাড়ি তারাবো। তাকে এবং নারায়ণগঞ্জের বড় ভাই রুমন রেজাকে অনুরোধ করি তমিজউদ্দিনের সন্ধান দেয়ার। রীয়া জানালেন ৩ বছর আগে তিনি মারা গেছেন।


অনুঘণ্ট
[ক.] আলতাফ পারভেজ-এর উল্লেখযোগ্য গবেষণা গ্রন্থ কারাজীবন কারাব্যবস্থা কারাবিদ্রোহ, বাংলাদেশের নারী একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ, ইয়াসমীন: বিপ্লবহীনতার কালে একটি রক্তপাতের শিরোনাম এবং অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ, কর্ণেল তাহের ও জাসদ রাজনীতি ইত্যাদি। ছাড়াও তিনি ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহী অভ্যুত্থানের ওপর পূর্ণাঙ্গ গবেষণা করেছেন।

[খ.]চিন্তা অফিসে উবিনীগের দেশী জাতের কীটনাশকহীন পদ্ধতিতে চাষ করা ধান থেকে ঢেকি ছাটা লাল চালের ভাত আর টেংরা মাছের ঝোল তরকারি এক বর্ষণমুখর দুপুরে খুব সুস্বাদু লেগেছিল। টেবিলে এক সাথে খেতে বসা কয়েকজন মেয়ে অল্প একটু করে খাবার দ্রুত শেষ করে টেবিলে বসে কী সব বিষয়ে আলাপ শুরু করায় দ্বিধায় পেট পুরে খেতে পারি নি মনে পড়ায় এখন কম্পোজ করতে করতে ক্ষুধা লেগে উঠলো।

[গ.]অনন্যা অফিসের প্রাণচাঞ্চল্য আগের মতো নেই মনে হওয়ায় বিষাদ জাগলো। এলোমেলো চেয়ারগুলো অনেক দিন কেউ ব্যবহার করেছে বলে মনে হলো না। ২৯ মে, ২০১৪ বিকেল চারটায় দুজন কম্পোজিটর কম্পোজ করছিলেন। আর দুজন অলস আলাপ করছিলেন।

[ঘ.] অনন্যা, ১-১৫ আগস্ট, ১৯৯৯ ইং সংখ্যা।

ফিচার ইমেজ: ফয়সল নোই ২০১৪। ছবি. কাজী ইমদাদ

 

About Author

ফয়সল নোই
ফয়সল নোই

কবি। চীফ রিপোর্টার, চ্যানেল আই, ঢাকা, বাংলাদেশ।