page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

তিরিশের মহামন্দা

Keynes 4

আমাদের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শেষের দিকে ড. খলিলুর রহমান চলে গেলেন লাহোর স্টাফ কলেজের ডাইরেক্টর হয়ে। স্টাফ কলেজ ছিল পাকিস্তানের সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিসের ট্রেনিং কেন্দ্র।

১৯৬৩ সালের শেষের দিকে বা ১৯৬৪ সালের প্রথম দিকে এমদাদুল হক মজুমদার ক্যামব্রিজ থেকে মাস্টার্স করার পর আমাদের বিভাগীয় প্রধান হয়ে আসেন। তিনি এবং ম্যাডাম (যিনি চৌমুহনী কলেজের অধ্যক্ষ তোফাজ্জল হোসেন সাহেবের কন্যা ছিলেন) অত্যন্ত ভদ্র ও অতিথিপরায়ণ ছিলেন। স্যারের ছেলে শিবলীর জন্মদিনে বা অন্য উপলক্ষে ওনার বাসায় প্রচুর খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন হত এবং আমরা মানে স্যারের প্রিয় ছাত্ররা সেই সব উৎসব থেকে কদাচিৎ বাদ পড়তাম।

ali ahmad rushdi png

আমাদের লাইব্রেরিতে হাল আমলের বই ছিল নিতান্তই অপ্রতুল। মজুমদার স্যার ইকোনমিকসের জটিল বিষয়ের উপর এক প্যারা বা এক পৃষ্ঠার সহজ সরল ভাষায় নোট করে দিতেন এবং বলতেন এই সব বিষয়ের তাত্ত্বিক বিবরণ বিস্তারিত জানার জন্যে তোমাদের আরও অনেক বই পড়তে হবে। কিন্তু জিনিসটা কী তা জানার জন্যে আমার নোটই যথেষ্ট।

ইকোনমিকসের জটিল বিষয়গুলি বুঝবার জন্যে স্যারের এসব নোট যে কী অপরিসীম উপকারে লেগেছিল তা বোঝাবার ভাষা আমার নাই।

স্যার বলতেন, কোন জটিল বিষয়কে ভয় পেলে তা আরও জটিল আকার ধারণ করে। আর যদি মনে করো অন্য দশ জনে পারলে আমি কেন পারবো না তাহলে দেখবে তা সহজ হয়ে গেছে। মজুমদার স্যারের এ বক্তব্য যে কত সত্য আমিই তার প্রমাণ। শুধু অনার্স ক্লাসেই নয় পরবর্তী কালেও বার বার এর প্রমাণ পেয়েছি। মজুমদার স্যারের এই সদুপদেশ আমি আমার ছাত্রদের কাছেও বলেছি এবং আমার ছাত্ররাও আমার মতোই এর সত্যতার প্রমাণ করেছে।

এমনি একটি আপাত জটিল ব্যাপার নিয়ে স্যার একদিন আলাপ করছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন তোমরা কি “থ্রিফট প্যারাডক্স বা কেইনশিয়ান প্যারাডকস”-এর নাম শুনেছ?

আমরা একবাক্যে জবাব দিলাম “না।”

স্যার বললেন, প্যারাডক্স মানে হচ্ছে মতের বৈপরীত্য, যা আপাত দৃষ্টিতে অযৌক্তিক হলেও প্রকৃত পক্ষে সত্য। বাংলা কবিতায় যেমন, “ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে।” স্যার বলছিলেন, থ্রিফট (thrift) হচ্ছে সঞ্চয় প্রবণতা আর থ্রিফট প্যারাডক্স হচ্ছে অর্থনীতিতে একটা প্রসিদ্ধ প্রবাদ: যদি কোন সমাজে প্রত্যেকেই অধিক সঞ্চয় করতে চায় তাহলে সেই সমাজে সামগ্রিক ভাবে সঞ্চয় কমে যাবে। আপাতদৃষ্টিতে সমাজের প্রত্যেকেই যদি আগের তুলনায় বেশি সঞ্চয়প্রবণ হয়ে ওঠে সামাজিক সঞ্চয়ও বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সব সময় এই কথা সত্যি নয়।

অর্থনীতিতে আয়ের যে অংশ খরচ না করা হয় তাই সঞ্চয়। এখন মানুষ যদি তাদের আয়ের বৃহত্তর অংশ খরচ না করে কিংবা আদৌ খরচ না করে তাহলে নতুন যে সব পণ্য তৈরি হল তা আর বিক্রি হবে না (বিদেশে রপ্তানী করতে পারলে অবশ্য অন্য কথা)। বিক্রি কমে গেলে দোকানে শ্রমিক ছাঁটাই হবে আর এসব শ্রমিকরা আগে যা কিনত এখন আর তাও বিক্রি হবে না। এমতাবস্থায় দোকানের মালিকরা ফ্যাক্টরিতে নতুন অর্ডার দেয়া বন্ধ করে দেবে। যার ফলে ফ্যাক্টরিতেও শ্রমিক ছাঁটাই হবে, যেমনটা হয়েছিল মহা মন্দার সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ব্রিটেনে, জার্মানিতে, ফ্রান্সে এবং আরও অনেক দেশে।

ত্রিশ দশকের গোড়ার দিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শিল্পোন্নত দেশগুলোতে যে ব্যাপক হারে বেকার সমস্যা দেখা দিয়েছিল তাকেই মহামন্দা তথা গ্রেট ডিপ্রেশন বলে। মহামন্দার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রসিদ্ধ অর্থনীতিবিদ লর্ড কেইন্স এই প্যারাডক্সটি পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন।

জন ম্যানার্ড কেইনস

অর্থনীতিবিদ জন ম্যানার্ড কেইন্স (৫/৬/১৮৮৩ – ২১/৪/১৯৪৬)

কেইন্স যা বলতে চেয়েছেন তার সারমর্ম হচ্ছে: যেহেতু সঞ্চয় নির্ভর করে আয়ের ওপর আর আয় নির্ভর করে বিনিয়োগের ওপর, কাজেই বিনিয়োগ না হলে আয় বাড়বে না এবং বিনিয়োগ কমে গেলে আয়ও কমে যাবে। অর্থাৎ সামগ্রিক ভাবে সঞ্চয় যদি বিনিয়োগে রূপান্তরিত না হয় তা হলে দেশের আয় কমে যাবে এবং পরবর্তী সময়ে সঞ্চয়ও হ্রাস পাবে।

আমরা জিজ্ঞেস করলাম, এখানে কেইন্সের নতুনন্ত্ব কী? স্যার বললেন, এখানে কেইন্সের নতুন কোনো তত্ব নাই। তবে আগে যেমন মনে করা হতো বাজারে কোন কারণে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হলে তা স্বয়ংক্রিয় ভাবে ঠিকঠাক হয়ে যাবে কেইন্স দেখিয়েছেন বাজারে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনবার জন্যে সরকারের তরফ থেকে স্থানকালমাত্রা ভেদাভেদে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। “নাজিমুদ্দিন সল্যুশন” বলে অর্থনীতিতে কিছু নাই।

আমরা অনুচ্চ উচ্চারণ করে উঠলাম, নাজিমুদ্দিন সল্যুশন?

স্যার ঈষৎ হেসে জবাব দিলেন, শুনেছি খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকা-কালীন তাঁর একটা অদ্ভুত কৌশল ছিল জটিল সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্যে। কৌশলটা ছিল ফাইল হারিয়ে ফেলা।

আমরা সবাই হেসে উঠলাম।

হাসি থামলে স্যারকে আরও খোলাসা করে বলার জন্যে অনুরোধ করেছিলাম। প্রথমতঃ কী কারণে মহামন্দা ঘটল এবং দ্বিতীয়তঃ এই মহামন্দার হাত থেকে এসব দেশ কী ভাবে রক্ষা পেল?

ক্লাসের ঘণ্টা শেষ হয়ে গিয়েছিল। স্যার আমাদেরকে দশ মিনিট সময় দিলেন বাইরে থেকে চা পানি খেতে হলে খেয়ে আসার জন্যে। ইতিমধ্যে স্যার একজন বেয়ারা পাঠিয়ে ক্লাসরুমটি পরের ক্লাসেও ব্যবহার করার অনুমতি নিয়ে নিলেন।

দশ মিনিট পরে ক্লাস শুরু হল আবার।

স্যর বলা শুরু করলেন। মহামন্দা প্রথম শুরু হয় আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে। পরে তা অন্যান্য দেশেও ছড়িযে পড়ে। শুরুটা হয়েছিল ১৯২৯ সালের ২৯ অক্টোবর নিউইয়র্ক শেয়ার মার্কেট পতনের মধ্য দিয়ে।

পতনের মাত্রা এতই বিশাল ছিল যে ইতিহাসে এর নাম পড়ে যায় দ্যা ব্ল্যাক টুয়েসডে (Black Tuesday Stock Market Crash)। সবাই তাদের শেয়ার বিক্রির জন্য অফার দিচ্ছিল কিন্তু কেনার জন্য ধরতে গেলে কেউ ছিল না। ওইদিন মোট ১৬.৪ মিলিয়ন শেয়ার বিক্রি হয়েছিল। নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের জন্য এটা ছিল নতুন রেকর্ড।

শেয়ার মার্কেট পতনের মাস দুয়েক আগে সেপ্টেম্বরের ৩ তারিখে Dow-Jones সূচকের সর্বোচ্চ স্তর ছিল ৩৮১.১৭। দামের পতন শুরু হয়েছিল ২৪ অক্টোবর থেকে। ওইদিন শেয়ার মার্কেটে নিয়োজিত মোট সম্পদের শতকরা ১১ ভাগ বিলুপ্ত হয়ে যায়। ২৮ অক্টোবর ব্ল্যাক মান-ডে (Black Monday) দরপতন হয়েছিল শতকরা ১৩ ভাগ এবং ২৯ অক্টোবর ব্ল্যাক টুয়েসডেতে আরও ১২ ভাগ। পরবর্তী দুই বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত শেয়ারের দর পতন অব্যাহত থাকে এবং ১৯৩২ সালের ৮ জুলাইয়ে ডাও-জোন্স সূচকের নতুন অবস্থান দাঁড়ায় ৪১.২২।

স্যার এই পর্যায়ে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, ১৯২৯ সালের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রের GDP পর পর দুই কোয়ার্টার্স হ্রাস পায়। অর্থাৎ শেয়ার মার্কেট পতনের আগে থেকেই অর্থনীতির নিম্নগতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। অনেকে মনে করেন আমেরিকান সরকার যদি এই সময়ে খরচ না কমানোর নীতিতে বিশ্বাস করত তাহলে মহামন্দার হাত থেকে রক্ষা পেতে পারতো।

পরবর্তীকালে লন্ডনে আমার বন্ধু আশরাফ সাহেবের সাথে আলাপ করার সময়ে স্যারের এ বক্তব্য অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছিলাম। ১৯৮১ সালে আমার থিসিসের জন্যে কিছু উপাত্ত সংগ্রহের উদ্দেশ্যে লন্ডনে আশরাফ সাহেবের বাসায় অবস্থান করছিলাম। তিনি থাকতেন লন্ডনের কিংসভেল এলাকায়, কিন্তু ওনার বিজনেস ছিল লন্ডন থেকে কিছুটা দূরে, উইন্জরে। উইন্জর হচ্ছে রাণীর গ্রীস্মকালীন আবাসস্থল। দেশ-বিদেশ থেকে নানা বর্ণের নানা রঙের ট্যুরিস্ট আসতো সেখানে উইন্জর ক্যাসল দেখতে। নানা বর্ণের পাখি, ইংলিশ গোলাপ আর উন্নত মানের খাবার দোকান (বাংলাদেশীয় খাবারও আছে) ছিল উইন্জরের অবশ্যই যেতে হবে (Must Go) স্থানগুলির অন্যতম।

আশরাফ সাহেব প্রায়ই নিয়ে যেতেন আমাকে উইন্জরের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্যে এবং বিভিন্ন উপলক্ষে নিজের জন্যে এবং আমার জন্যে ভাল ও দামি জিনিসপত্র কিনে আনন্দ পেতেন।

আমি বলতাম, এত টাকা খরচ করা উচিত নয় আপনার।

তিনি বলতেন “খরচ কী ভাবে কমায় তা বলবেন না, আয় কী ভাবে বাড়ে তা বলুন।” ঠিক যে ভাবে কেইন্স সাহেব বলেছিলেন। কাকতালীয়ভাবে কেইন্স সাহেবও উইন্জরের ইটন কলেজের ছাত্র ছিলেন।

আমরা স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মহামন্দা রোধ করার ব্যাপারে ব্যাঙ্কিং সেক্টরের কী ভূমিকা ছিল?

স্যার বলেছিলেন, দেশের বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলি শেয়ার মার্কেটের উদ্ধারের জন্যে এগিয়ে আসে নি বরং এই সময় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে ব্যাঙ্কিং সেক্টরও নিজেদের পোর্টফোলিও থেকে শেয়ারের পরিমাণ হ্রাস করছিল। এমতাবস্থায়, ব্যাঙ্কিং সেক্টরের ওপর থেকে ব্যবসায়ী ও সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা উঠে যায় এবং ব্যাঙ্ক থেকে তাদের আমানত যে যত তাড়াতাড়ি পারে উঠিয়ে নেওয়ার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে ১৯৩৩ সালের মধ্যে আমেরিকার মোট ২৫,‌০০০ ব্যাঙ্কের মধ্যে ১১,০০০ ব্যাঙ্ক বন্ধ হয়ে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক যে দেশের অন্যান্য ব্যাঙ্কের জন্যে শেষ আশ্রয়স্থল (Lender of the Last Resort) এই ধারণা তখনও পাকাপোক্ত ভাবে গড়ে ওঠে নি।

এই পর্যায়ে স্যার বললেন, শেয়ার মার্কেট ধ্বসের প্রকৃত কারণ কী ছিল তা নিয়ে এখনও অনেক গবেষণা চলছে। অনেকে মনে করছেন বিশের দশকের অর্জিত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি (Roaring Twenties) আমেরিকানদের মনে এই ধারণার জন্ম দিয়েছিল যে বিনিয়োগ মানেই সাফল্য। ফলে ঋণদান ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কগুলির যতটা সতর্ক থাকা উচিত ছিল ততটা সম্ভবতঃ ছিল না। শেয়ার মার্কেটেও “কিনলেই লাভ” এই প্রত্যাশা কিংবা স্পেকুলেশনের কারণে ফটকাবাজারি ব্যবসা বিস্তার লাভ করে। যার ফলে দু একটা বিজনেস ফ্লপ করার পরেই বাজারে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। নিচের ছবিতে দেখা যাচ্ছে শেয়ারের মূল্যসূচক ১৯২২ সাল থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত এই সাত বছরে বৃদ্ধি পেয়েছিল প্রায় ৬ গুণ । যে কোন বিচারে শেয়ারের দামের ঊর্ধ্বগতি ছিল অস্বাভাবিক।

অর্থনীতিতে সামান্য মন্দাভাবও অনেক সময় বড় আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে যখন শেয়ার বাজারে মার্জিন লোনের পরিমাণ বেড়ে যায়। মহামন্দার ঠিক আগে নিউ ইয়র্ক শেয়ার বাজারে নিয়োজিত সম্পূর্ণ মূলধনের দুই তৃতীয়াংশ ছিল মার্জিন লোন। ফলে শেয়ারের দাম সামান্য কমলেও অনেকে শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য হত। কারণ দাম কমার ফলে জামানত হিসাবে রক্ষিত শেয়ারের ভেল্যুও কমে যেত। কাজেই জামানতের টাকার পরিমান ঠিক রাখার জন্যে আরও কিছু শেয়ার বিক্রি করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।

Dow-Jones Index 1920-1940

Dow-Jones Index 1920-1940

মহামন্দা সৃষ্টির ব্যাপারে ব্যাঙ্ক বিপর্যয়ের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গভীর। দেশে মুদ্রা সরবরাহ কমে গিয়েছিল প্রায় এক তৃতীয়াংশ আর বেকারত্বের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে মোট শ্রমশক্তির ২৫ ভাগই বেকার হয়ে পড়ে। শিল্পোৎপাদন কমে গিয়েছিল শতকরা ৪৫ ভাগ। যুক্তরাষ্ট্র তথা পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলির সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের ভূমিকা ছিল অনেকটা নিরব দর্শকের মতো। বরং এই সব দেশের পলিসি মেকাররা প্রায় একই রকম ভুল করেছিলেন। সব দেশেই “আয় বুঝে ব্যয় করো” সিনড্রোম কাজ করছিল। মহামন্দা শুরুর প্রথম দিকে প্রায় সব দেশেই রাজস্ব আয়ের ঘাটতি কমানোর জন্যে অতিরিক্ত ট্যাক্স ধার্য করা হয়েছিল। অথচ কেইন্সের পরামর্শ অনুসারে এই সময়ে সরকারের আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করা এবং মুদ্রানীতি শিথিল করে বাজারে আরও অধিক টাকা ছাড়া উচিত ছিল।

মহামন্দার সময়েই ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট (Franklin Roosevelt) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ১৯৩২ সালে। তিনি গুণী-জ্ঞানী লোকদের ডাকলেন কীভাবে সমস্যার সমাধান করা যায় সেই পরামর্শের জন্যে। কেইন্স সাহেবও এই সভায় আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। সবার সাথে আলাপ করে রুজভেল্ট যে নীতি গ্রহণ করলেন তার নাম New Deal.

কেইন্স সম্পর্কে রুজভেল্ট বলেছিলেন, “আমার বিশ্বাস তিনি একজন অঙ্কের প্রফেসার। সারাক্ষণ শুধু অঙ্ক আর গ্রাফ নিয়ে কথা বলছিলেন।” রুজভেল্টের রেগুলার জাতীয় বাজেট ছিল সমতাপূর্ণ অর্থাৎ আয় বুঝে ব্যয়, Taxes = Expenditure। এটা ছিল কেইন্সের মতের বিরোধী কিন্তু ইমার্জেন্সী বাজেট কর্মসূচিতে সম্পূর্ণ ঋণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। ইমার্জেন্সি কর্মসূচির আওতায় সরকার ১৯৩২ সালে খরচ করে জাতীয় আয়ের ৩৩.৬ শতাংশ এবং ১৯৩৬ সালে প্রায় ৪১ শতাংশ।

এই কর্মসূচির ফলে ১৯৩৬ সালের মধ্যে আমেরিকা মহামন্দার কশাঘাত থেকে উঠে দাঁড়াতে পেরেছিল। অবশ্য রুজভেল্টের ভাষায় তখনও আমেরিকার এক তৃতীয়াংশ লোক খাদ্য বস্ত্র ও বাসস্থানের অভাবে জর্জরিত ছিল। বেকারত্বের হার সর্বোচ্চ ২৫.২ শতাংশ (১৯৩৩ সাল) থেকে নেমে ১৩ শতাংশে দাঁড়ায় (১৯৩৬ সালে) এবং ১৯৪১ সালে যখন আমেরিকা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয় তখনও প্রায় একই পর্যায়ে ছিল। ওই বছর সরকার যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত লোক নিয়োগ শুরু করে। এই খাতে প্রায় ১২ মিলিয়ন লোক নিয়োগ দেয়া হয়।

এই পর্যায়ে আমরা জিজ্ঞেস করলাম, মহামন্দার সময় ব্যাঙ্ক ফেইল্যুর ছিল প্রায় নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপার। এ ব্যাপারে রুজভেল্ট কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন?

খুব সুন্দর প্রশ্ন, স্যার বললেন। মহা মন্দার দুর্বার ধ্বংসযজ্ঞ থেকে ব্যাঙ্কিং সেক্টরকে বাঁচাবার জন্যে তিনি ১৯৩৩ সালে ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স (FDIC) প্রবর্তন করেন এবং কিছুদিনের জন্যে গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড রহিত করেন। এ ছাড়া তিনি ইমার্জেন্সি ব্যাঙ্কিং অ্যাক্ট চালু করে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনেন। তদুপরি সোশ্যাল সিকিউরিটি সিস্টেম চালুর মাধ্যমে একদিকে বেকার ও নিঃস্ব লোকদের অন্নসংস্থান ও অন্যদিকে বাজারে চাহিদার মন্দা ভাব দূর করার চেষ্টা করেন।

crowd 1931

১৯৩১ সালে ব্যাংক অব ইউনাইটেড স্ট্যাটস পতনের পর বাইরে জনতার ভিড়

 

আমেরিকায় শেয়ার মার্কেট পতনের সময় ব্রিটেনে বেকারত্বের হার ছিল শতকরা ১০ ভাগ। মহামন্দার চাপে এ হার বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৩৩ সালে দাঁড়ায় শতকরা ২০ ভাগেরও বেশি। উত্তরাঞ্চলীয় শিল্প এলাকা গুলোতে বেকারত্বের হার ছিল শতকরা ৭০ ভাগ। ত্রিশ দশকের বাকি সময় ব্রিটেন ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি করতে থাকে। ১৯৩৮ সালে বেকারত্বের হার শতকরা ১০ ভাগে নেমে আসে।

জার্মানিতে মহামন্দার প্রকোপ এতই বেশি ছিল যে দেশ গৃহযুদ্ধের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। কম্যুনিস্ট ও নাজিদের মধ্যে প্রায়ই মারামারি হত। দেউলিয়াত্ব, আত্মহত্যা ও অপুষ্টিতে দেশ ছেয়ে গিয়েছিল। ৬ মিলিয়ন জার্মান তথা মোট শ্রমশক্তির ৪০ ভাগ বেকার অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নতুন পাশ করা ছেলেমেয়েদের শতকরা ৬০ ভাগই ছিল বেকার। হাজার হাজার লোক গৃহহীন অবস্থায় রাস্তাঘাটে কিংবা ভাঙা গাড়ির খোলসের মধ্যে রাত কাটাতেন।

মহামন্দার সময় ব্রিটিশ নভেলিস্ট খ্রিস্টোফার ঈশওরউড (Christopher Isherwood ) বার্লিনে ছিলেন। তিনি লিখেছিলেন:
“ রোজ সকালে শহরতলীর অসংখ্য স্যাঁতসেতে নিরানন্দময় প্যাকেজিং বাক্সের মত কুঁড়েঘরের বস্তিতে যুবক ছেলেরা জেগে ওঠে আরেকটা কর্মহীন দিনের অপেক্ষায়। কী করে কাটাবে আজকের দিনটা? ভাবে, জুতার ফিতা বিক্রি করে, ভিক্ষা করে, লেবার এক্সচেঞ্জ হলে বসে শতরঞ্চ খেলে, কিংবা প্রস্রাবখানার আনাচে-কানাচে ঘুরে, মানুষের গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে, বাজারে দোকানি কিংবা খরিদ্দারদের বোঝা উঠায়ে, গপ্প করে, লাউঞ্জে আড্ডা দিয়ে অথবা চুরি করে কিংবা জুয়ার টীপ্স আঁড়ি পেতে শুনে কিংবা ড্রেইন থেকে কুঁড়ানো সিগেরেটের বাট বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে। ”

স্যার আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছিলেন, আমেরিকা ও ব্রিটেনের তুলনায় জার্মানির অবস্থা একটু ভিন্ন রকম ছিল। উপরোক্ত দুই দেশেই আমদানি কর বৃদ্ধির ফলে জার্মানির রপ্তানী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু জার্মানির ক্ষেত্রে রপ্তানীর তুলনায় বৈদেশিক সাহায্যের প্রয়োজন ছিল বেশি। ১৯২৪ সাল থেকে আমেরিকা জার্মানিকে প্রথম মহাযুদ্ধের দায়মুক্তির ব্যাপারে সাহায্য করে আসছিল। ১৯২৯ সালে শেয়ারবাজার পতন ও পরবর্তীতে ব্যাংক বিপর্যয়ের কারণে আমেরিকা সেই ঋণের টাকা ফেরত চাইতেছিল। এত বড় চাপ জার্মানির পক্ষে সহ্য করা সম্ভব ছিল না। ফলে জার্মানিতেও ব্যাংক পতন শুরু হয় এবং মহামন্দা গভীর থেকে গভীরতর হয়ে পড়ে।

এই সময় স্যার ও আমরা এক মিনিট চুপচাপ কাটালাম। তারপর স্যার আবার শুরু করলেন।

প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ ও চ্যান্সেলর হিটলার ১৯৩৩

প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ ও চ্যান্সেলর হিটলার ১৯৩৩

বিশের দশকে জার্মানিতে অতি মূল্যস্ফীতি হয়েছিল। মন্দা শুরুর পর ১৯৩০ সালের মার্চ মাসে ব্রুনিং (Heinrich Bruning) জার্মানির চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন। মহামন্দা দেখা দেওয়ার পরেও জার্মানদের স্মৃতিপট থেকে অতি মূল্যস্ফীতির ভয় মুছে যায় নি। মহামন্দা কাটানোর জন্যে ব্রুনিং সরকারি খরচ বাড়ানোর পরিবর্তে ট্যাক্সের পরিমাণ বাড়িয়েছিলেন। Cut your coat according to your cloth নীতিতে তিনি বিশ্বাস করতেন। কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন কোট বানাতে যদি তিন মিটার কাপড় লাগে তাহলে তিন মিটারই কিনতে হবে তার কম কিনলে তা হবে বাজে খরচ। জার্মান পার্লামেন্ট রাইখস্ট্যাগ (Reichstag) চ্যান্সেলরের আনীত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে কিন্ত প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ ইমার্জেন্সি রুলিং-এর মাধ্যমে করবৃদ্ধি ও শ্রমিকের বেতন কমানোর প্রস্তাবটি গৃহিত হয়ে যায়।

ইমার্জেন্সি রুলিং-এর বদৌলতে ট্যাক্স বৃদ্ধি ও বেতন কমানো আইনসঙ্গত হয়ে গেল বটে তবে সমস্যার সমাধান হল না। মহামন্দার দুখঃদুর্দশা অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের সমস্যা হিটলারের নাজি পার্টির জন্য ছিল সুখবর। সেপ্টেম্বর ১৯৩০ সালের ইলেকশনে নাজি পার্টি পেয়েছিল ১০৭ সিট।

লেখক ও বন্ধু আশরাফ সাহেব, লন্ডন ১৯৬৯/৭০

লেখক ও বন্ধু আশরাফ সাহেব, লন্ডন ১৯৬৯/৭০

বেকার সমস্যার ঘোর অমাবশ্যায় নিমজ্জিত জার্মান প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ ভাবলেন হিটলারের জনপ্রিয়তা জার্মানদের মনে নতুন আশার সঞ্চার করতে পারে। জানুয়ারি ৩০, ১৯৩৩ হিটলার চ্যান্সেলর নিযুক্ত হন। ক্ষমতাগ্রহণের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই হিটলার নিজের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের জন্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। মার্চ ১৯৩৩ সালে নাজি পার্টি সিঙ্গল মেজরিটি অর্জন করে পার্ল্যেমেন্টে ২৩০টি আসন দখল করে নেয়।

অনেকে মনে করেন মহামন্দা না ঘটলে জার্মানিতে নাজি পার্টির ক্ষমতারোহন সম্ভব ছিল না এবং হিটলার ক্ষমতায় না থাকলে পৃথিবীর মানুষকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে হত না।

About Author

আলী আহমাদ রুশদী
আলী আহমাদ রুশদী

ড. আলী আহমাদ রুশদীর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে করোটিয়ার সাদত কলেজে বেশ কয়েক বছর অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে সহযোগী-অধ্যাপক ছিলেন বহুদিন। ১৯৮৯ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে অবস্থিত Australian Competition and Consumers Commission এ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন প্রায় ১৫ বছর। সেখান থেকে অবসর গ্রহণের পরে ঢাকার AIUB ও নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কিছুদিন অধ্যাপনা করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে UNDP, ILO, World Bank ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কাজে গবেষণা করেছেন। বর্তমানে মেলবোর্নে অবসর জীবন যাপনের ফাঁকে তাঁর সময় কাটে অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখালেখি করে।