page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

তেলের দাম ওঠা-নামার জন্যে ওপেক যে কারণে দায়ী নয়

oil price 2

অর্থনীতির ছাত্র হিসাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বিভাগীয় শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন প্রফেসর আবু মাহমুদ, রেহমান সোবহান, মোজাফফর আহমদ প্রমুখ।

প্রফেসর মাহমুদের ক্রিটিক্যাল মিনিমা বা ন্যূনতম চাহিদা তত্ত্ব এবং রেহমান সোবহানের পাকিস্তানের দুই অংশে অর্থনৈতিক বৈষম্য সম্পর্কিত তুখোর আলোচনা তখন ছাত্রছাত্রীদের মাঝে দারুণ উৎসাহ যোগায়েছিল। এবং তাদের মধ্যে এই ধারণার জন্ম হয়েছিল যে কোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্যে অর্থনীতি নয় বরং রাজনীতিই বেশি প্রয়োজন।

ali ahmad rushdi pngপ্রফেসর রেহমান সোবহান প্রতি সপ্তাহে একবার করে ক্লাসের কোন ছাত্র বা ছাত্রীকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ে বক্তৃতা করতে নির্দেশ দিতেন। ক্লাসের অন্যান্য ছাত্ররা আলোচ্য বিষয়ের উপর প্রশ্ন বা মন্তব্য করতে পারতেন। তিনি নিজে মডারেটরের ভূমিকা পালন করতেন। এ ছাড়াও তিনি টিউটরিয়াল ক্লাস নিতেন। এই সব ক্লাসে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। অন্যান্য স্যারেরা টিউটরিয়াল নেবার ব্যাপারে এতটা সিরিয়াস ছিলেন না কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন।

এই সব সাপ্তাহিক বক্তৃতা ও টিউটরিয়াল ক্লাসসগুলোতেও একই সুর বাজতো। রাজনীতি ছাড়া অর্থনীতির কোনো তত্ব্র কাজে লাগানো দস্তুর মত অসম্ভব। তাছাড়া অর্থনীতির মূল কর্মকাণ্ড উৎপাদন, ভোগ ও বণ্টন ব্যবস্থা কোনো সোসিও-পলিটিক্যাল ভ্যাকুয়ামের মধ্যে চলতে পারে না।

মিটিং শুরুর আগে ওপেকের ভিয়েনা হেডকোয়ার্টারের ছাদে পুলিশ পাহারা

মিটিং শুরুর আগে ওপেকের ( Organization of the Petroleum Exporting Countries – OPEC) ভিয়েনা হেডকোয়ার্টারের ছাদে পুলিশ পাহারা

পরবর্তীকালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসার এডিথ পেনরোজকে পেয়েছিলাম সুপারভাইজার হিসাবে। তিনি নিজে এবং তারই সুযোগ্য ছাত্র ড. বিপ্লব দাশগুপ্ত উভয়েই জ্বালানী তেল বিশেষজ্ঞ ছিলেন। আমার নিজের থিসিসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল এনার্জি প্রাইসিং ( Energy Pricing)। এছাড়া ড. দাশগুপ্ত ছিলেন বাঙালী। ফলে খুব সহজেই আমার সাথে হৃদ্যতা গড়ে ওঠে।

আমার থিসিসের ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরির জন্যে পেনরোজ সাত বোনের গল্প কিংবা বিশ্ব তেলের বাজারে যে সাতটি বিশাল কোম্পানি তেল সাপ্লাই দিত (Seven Sisters) তাদের গল্প শোনাতেন। সাত বোনের নাম ছিল অ্যাংলো-পারসিয়ান অয়েল কোম্পানি বর্তমানে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম বা BP, গালফং) অয়েল, স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব কেলিফোর্নিয়া (SoCal), ট্যাক্সাকো বর্তমানে শেভরন (Chevron), রয়্যাল ডাচ শেল (Shell), স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউ জার্সি (Esso) এবং স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউ ইয়র্ক বর্তমানে এ্যাক্সন মবিল (ExxonMobil)।

ড. দাশগুপ্তকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এদেরকে সাত বোন বলা হচ্ছে কেন? তিনি বলেছিলেন সাত বোন কথাটা প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন ইতালির রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন তেল কোম্পানি ENI (Ente Nazionale Idrocarburi) এর প্রধান এনরিকো মেট্টি (Enrico Mattei)। দ্বিতীয় মহা যুদ্ধের পর ইতালির এই প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রতিষ্ঠিত এই তেল কোম্পানিটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার জন্যে। এনরিকো লক্ষ করলেন উপরোক্ত সাতটি কোম্পানির পাঁচটিই আমেরিকান, একটি ব্রিটিশ আর একটি ডাচ। সবাই মিলে এই পণ করে বসে আছে যে উৎপাদনকারী দেশগুলোকে বেশি পয়সা দেওয়া হবে না অপর দিকে ক্রেতাদের কাছ থেকে বেশি দাম আদায় করা হবে। তাদের এই কৌশল বাস্তবায়িত করার জন্যে তারা নিজ নিজ সরকারের কাছ থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য আদায় করতে পেরেছিল। যেহেতু এই সাতটি কোম্পানি একই লক্ষ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা করে যাচ্ছিল কাজেই তাদেরকে সাত বোন হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

এনরিকো মেট্টি তার কোম্পানিটি বন্ধ করলেন না বরং এটাকে আরও শক্তিশালী করে তুললেন। তিনি সাত বোনের শক্ত প্রাচীর (কারটেল) ভেঙে মিডল ইস্টের বাজারে ঢুকতে চাইলেন। নিজের শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তিনি সোভিয়েত রাশিয়ার সাথে চুক্তিবদ্ধ হন এবং ঘোষণা দেন যে তেল উৎপাদনকারী দেশসমূহের তেল উত্তোলন ও রিফাইনারি কোম্পানিগুলোর লাভের শতকরা ৭৫ ভাগ পর্যন্ত পাওয়া উচিত। এই ঘোষণার ফলশ্রুতিতে মেট্টি কারটেল ভুক্ত সদস্যদের কাছে অনাকাঙ্ষিঘোত ব্যক্তি হিসাবে গণ্য হতে থাকেন।

দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ১৯৬২ সালে তিনি এক প্লেন ক্র্যাশে মারা যান। অনেকে অনুমান করেন যে মেট্টির বিমানে বোমা পাতা ছিল কিন্তু বস্তুতঃ কী ঘটেছিল বিশ্ববাসী আর জানতে পারে নি। তবে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর মনে এই আশার সঞ্চার করতে পেরেছিলেন যে তেলের বিনিময়ে তারা আরও অনেক বেশি অর্থ পেতে পারে।

সাম্প্রতিক কালে আল-জাজিরা টেলিভিশনের এক অনুসন্ধানে জানা গেছে উপরোক্ত সাতটি কোম্পানি ১৯২৮ সাল থেকে এক গোপন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে নিজেদের মধ্যে একটি কারটেল (CARTEL) সৃষ্টি করেছিল ফলে বিশ্ব তেলের বাজার বস্তুতঃ একটি একচেটিয়া বাজারে (Monopoly) পরিণত হয়ে পড়েছিল। ১৯৬০ সালের দিকে সমস্ত পৃথিবীতে যত তেল উৎপাদন হয়েছে তার শতকরা ৯৮ ভাগই এসেছে উপরোক্ত সাত বোনের কল্যাণে।

প্রফেসর এডিথ পেনরোজ

প্রফেসর এডিথ পেনরোজ

আমি প্রফেসর পেনরোজকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এই সাত বোনের আচার-আচরণ কি একই রকম ছিল? একই কর্মপদ্ধতি, একই দাম কিংবা মুনাফার হার? তিনি হেসে জওয়াব দিয়েছিলেন, “বাজারে মাত্র একজন যোগান দাতা থাকলেও (Monopoly) অভিন্ন দাম নাও থাকতে পারে।” একই ব্যবসায়ী যখন বিভিন্ন বাজারে পণ্য সরবরাহ করে তখন কোন বাজারে কী দাম নেবে তা নির্ভর করে কোন বাজারে প্রতিযোগিতা কেমন তার ওপর। যেখানে প্রতিযোগিতা বেশি সেখানে দাম কম এবং যেখানে প্রতিযোগিতা কম সেখানে দাম বেশি।

আবার একই যোগান দাতা যখন একাধিক পণ্য যোগান দেয় তখন বোধগম্য কারণেই দাম এক হয় না এবং বিভিন্ন উৎপন্ন দ্রব্যের উৎপাদন ব্যয় বিভিন্ন হওয়ার কারণে সব জিনিসের দাম এক হলেও লাভের হার বিভিন্ন হবে। পরবর্তী কালে The Theory of the Growth of the Firm বইতে প্রফেসার এডিথ পেনরোজ আরও বিষদ ভাবে বলেছেন:

‘অন্য ব্যবসা কিনে ফেলা (acquisition) কিংবা অন্য ব্যবসার সাথে মিশে যাওয়ার (mergers) সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আপাতত লাভের চেয়ে বাজারে সার্বিক ভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা, নিজের সুনাম বৃদ্ধি (an extension of firm’s goodwill) এবং ট্যাক্স রেয়ায়েত প্রভৃতি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পূর্ণ প্রতিযোগিতা মূলক বাজারে (Perfectly competitive market) যেমন এক একটি ক্ষুদ্র আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (firm) একটি মাত্র পণ্য তৈরি করে এবং তার গড় উৎপাদন ব্যয় যেখানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে সেখানেই তার উৎপাদন থেমে যায়, ( কারণ এর চেয়ে বেশি উৎপাদন করলে তার মুনাফা সর্বাধিক হবে না), বড় আকারের মাল্টি ন্যাশানাল এবং মাল্টি –প্রডাক্ট ফার্মগুলির সার্বিকভাবে কোন গড় উৎপাদন ব্যয় বা Average Cost Curve বলে কিছু নাই। তবে প্রত্যেক পণ্যের জন্যে সর্বাধিক উপযোগী উৎপাদনের লক্ষ্য অবশ্যই থাকে।

There may be an ‘optimum’ output for each of the firm’s product lines, but not an
‘optimum’ output for the firm as a whole. (Penrose, 1959: 98-99)

তিনি আমাকে বলেছিলেন, সাত বোনের মধ্যে সহযোগিতার চুক্তির অর্থ এই নয় যে কোনো দেশে তেল উত্তোলনের জন্যে সাত বোন মিলে একত্রে যেতে হবে। বরং সহযোগিতার অর্থ হচ্ছে কেউ কারো স্বার্থবিরোধী কাজ করবে না।

কথাপ্রসঙ্গে তিনি আমাকে আন্ডার গ্রাজুয়েট ইকনমিক্সের কিছু প্রাথমিক তত্ব্রও (Basics) স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। এই তত্বা হনুসারে কোন বাজারে যদি একজন মাত্র বিক্রেতা থাকে কিংবা একাধিক বিক্রেতা থাকলেও এক এক জন একটা বিশাল অংশের জন্যে একচেটিয়া ব্যবসা করতে পারে তখন অন্যান্য নিয়ামকসমূহ অপরিবর্তিত অবস্থায় (Other things being equal) বিক্রি বাড়াতে হলে দাম কমাতে হবে। [পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এক একটি ক্ষুদ্র আকারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইচ্ছা করলে নিজের উৎপাদন দ্বিগুণ কিংবা তিনগুণও বাড়াতে পারে এবং বর্ধিত উৎপাদ একই দামে বিক্রি করতে পারে।]

আমার জানতে ইচ্ছা করছিল সাত বোনের মধ্যে এই যে গোপন সমঝোতা চুক্তি ১৯২৮ সালে সম্পাদিত হলো এই সময়েই এই চুক্তির প্রয়োজনীয়তা কেন দেখা দিল? জবাবে ড. দাশগুপ্ত বলছিলেন বিশের দশকের শেষের দিকে জ্বালানী তেলের বিশ্ব বাজারে অতিরিক্ত সাপ্লাই শুরু হয়েছিল (Glut) বিশেষ করে আমেরিকার টেক্সাস, লুসিয়ানা ও ক্যালিফোর্নিয়ায় নতুন তেলের খনি আবিষ্কার হওয়ার ফলে এবং মহামন্দা শুরু হওয়ার প্রাক্কালে তেলের চাহিদা কমে গিয়েছিল বলে। সাপ্লাইয়ের তূলনায় চাহিদা কম হওয়ার ফলে তেলের দাম ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছিল। প্রধানতঃ কোম্পানিগুলোর লাভের হার বজায় রাখা ও বৃদ্ধি করার প্রয়াসেই এই সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল। দ্বিতীয়তঃ আমেরিকার বৈদেশিক নীতির চাহিদানুসারে পুরা মধ্যপ্রাচ্যের ব্ল্যাকগোল্ড (Petroleum Oil) তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যেও এমন একটা চুক্তির প্রয়োজন ছিল।

opec first meeting 1960

ইরাকের বাগদাদে ১৯৬০ সালে প্রথম ওপেক কনফারেন্স

পরবর্তী কালে জানতে পেরেছি আমেরিকার কম্পিটিশন কমিশন তথা Justice Department নিজেদের প্রতিষ্ঠিত আইনের বিরুদ্ধে হওয়া সত্বে হও এই সব সহযোগিতা চুক্তির বিরোধিতা করে নি। তাদের যুক্তি ছিল আমেরিকার নিরাপত্তা সব আইনের ঊর্বেজন। বৃটিশ জার্নালিস্ট অ্যান্থনি স্যাম্পসন (Anthony Sam pson) তার The Seven Sisters গল্পে সাত বোনের কীর্তিকলাপ সম্পর্কে আরও বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন।

আমেরিকার এই বৈদেশিক নীতির ফলশ্রুতিতেই গালফ অয়েল ও ইরাক পেট্রোলিয়াম যৌথভাবে কুয়েতে প্রবেশের অনুমতি পায় এবং এর অল্প কিছুদিন পরেই তিরিশের প্রথম দিকে স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব কেলিফোর্নিয়া (SoCal) বাহরাইনের বিশাল এলাকা নিয়ে তেল অনুসন্ধানের অনুমতি পায়। ১৯৩৩ সালে SoCal সৌদি আরবের বিশাল এলাকায় তেল অনুসন্ধানের অনুমতি লাভ করে। পরে অবশ্য SoCal তার মালিকানার অর্ধেক টেক্সাকোর কাছে বিক্রি করে দেয়। এইভাবে আরামকোর (ARAMCO)জন্ম হয়। ১৯৪৬/৪৭ এর দিকে আরামকোর পার্টনার হিসাবে জয়েন করে Exxon ও Mobil। আমেরিকার জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট এবং স্টেইট ডিপার্টমেন্ট এই পার্টনারশিপের অনুমোদন দিয়েছিল দেশের নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে তথা মধ্যপ্রাচ্যে কম্যুনিস্টদের প্রভাব রোধ করার জন্যে।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম সাত বোন তাদের নিজ দেশের সরকারের কাছ থেকে আর কী ধরনের সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছিল? ড. দাশগুপ্ত বলেছিলেন রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ ছাড়াও আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়েছিল অনেক ক্ষেত্রে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় কোম্পানিগুলো বিদেশে যে পরিমাণ ইনকাম ট্যাক্স দিত নিজ দেশে সেই পরিমাণ ট্যাক্স কম দিতে হতো। তাছাড়া ১৯৫০ সালে যখন সৌদি আরব তার রয়্যালটির হার শতকরা ৫০ ভাগে উন্নীত করলো আমেরিকান সরকার এই বর্ধিত রয়্যালটিও কোম্পানিগুলোর দেশীয় ট্যাক্স লায়াবিলিটি থেকে বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল।

তিনি আরও বললেন চল্লিশ দশকের শেষের দিকে এবং পঞ্চাশ দশকের প্রথম দিকে যখন মধ্যপ্রাচ্যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জোরদার হতে থাকে তখন ১৯৫১ সালের ১৫ মার্চ ইরানের শাহ তেল জাতীয়করণ করতে স্বীকৃতি দান করেন এবং ড. মোসাদ্দেককে প্রধান মন্ত্রী হিসাবে নিয়োগপত্রে অনুমোদন দান করেন। ব্রিটিশ সরকার জাতীয়করণের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কোর্টে মামলা করে কিন্তু হেরে যায়। তা স্বত্বেও ব্রিটিশ সরকার ইরানের মোসাদ্দেক সরকারেরর বিরুদ্ধে ইম্বারগো (Embargo) বজায় রাখে।

১৯৫৩ সালের জুন মাসে আমেরিকার আইজেনহাওয়ার সরকার (Eisenhower administration) মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারের সাথে একমত হয় এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (CIA) মাধ্যমে ইরানের শাহকে এই ব্যাপারে রাজি করানো হয়। ১৯৫৩ সালের ১৩ আগস্ট ইরানের শাহ (Mohammad Reza Shah Pahlavi) জননেতা ড. মোহাম্মাদ মোসাদ্দেককে পদচ্যূত করে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল জাহিদীকে প্রধান মন্ত্রী নিয়োগ করেন।

১৯৫৪ সালে ইরানের শাহের সাথে অ্যাংলো-ইরানিনিয়ান অয়েল কোম্পানির ((AIOC–formerly the Anglo-Persian Oil Company) নতুন করে আলোচনা হয়। এই আলোচনায় ইরানকে লভ্যাংশের ৬০ ভাগ দেওয়া হবে বলে স্বীকার করা হয়।

mosaddek

গৃহবন্দি মোহাম্মদ মোসাদ্দেক (১৯৬৫)। গৃহবন্দি অবস্থায় ইরানের আহমেদাবাদে ১৯৬৭ সালে মারা যান মোসাদ্দেক।

প্রাইম মিনিস্টার মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার পর আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যকে শায়েস্তা করার জন্যে তেল আমদানি কোটা (quota) চালু করে। ফলে আমেরিকার ভিতর ও বাইরের জগতে সাত বোনের একচ্ছত্র আধিপত্য চলতেও থাকে। স্থানীয় উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক সাপ্লাই দুটোই এখন সাত বোনের স্বেচ্ছাধীন।

আমি জানতে চেয়েছিলাম সাত বোনের এমন রমরমা অবস্থায় ১৯৬০ সালে ওপেকের (OPEC) জন্ম কীভাবে হলো?

perez a

হুয়ান পাবলো পেরেজ আলফনসো (১৯০৩-১৯৭৯)

ড. দাশগুপ্ত বলে চললেন, পঞ্চাশ দশকের শেষের দিকে তেল সমৃদ্ধ দেশগুলি তেলের নিম্নতম দাম দেখে অনেকটা নিরাশায় ভুগছিল। এত বিশাল সম্পদের মালিক হয়েও তারা অনেকটা গরীবের মতো জীবনযাপন করছিল বিশেষ করে কোম্পানিগুলির তুলনায়। এই সময়ে এ্যাক্সন মবিল একতরফা ভাবে কয়েকবার তেলের দাম হ্রাস করে ফলে তেল সমৃদ্ধ দেশগুলোর আয় আরও হ্রাস পায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬০ সালে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অনুষ্ঠিত তেলসমৃদ্ধ পাঁচটি দেশের সমন্বয়ে organization of petroleum exporting countries (OPEC) সৃষ্টি হয়। বাগদাদের এই প্রতিষ্ঠা সভায় যে পাঁচটি দেশ উপস্থিত ছিল তারা হচ্ছে সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, ভেনিজুয়েলা ও কুয়েত। ওপেক গঠনের ব্যাপারে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন ভেনিজুয়েলার শক্তিশালী তেলমন্ত্রী পেরেজ আলফনসো

পরবর্তী কালে ওপেকের সদস্য সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ১২। ফাউন্ডেশন মেম্বারদের ছাড়া অন্যান্য সদস্যরা হচ্ছে কাতার (১৯৬১ থেকে), ইন্দোনেশিয়া (১৯৬২থেকে ২০০৯ পর্যন্ত), লিবিয়া (১৯৬২ থেকে), সংযুক্ত আরব আমিরাত (১৯৬৭ থেকে), আলজেরিয়া (১৯৬৯ থেকে), নাইজেরিয়া (১৯৭১ থেকে), ইকোয়েডোর (১৯৭৩ থেকে), গেবন (১৯৭৫ থেকে ১৯৯৫ পর্যন্ত) এবং অ্যাঙ্গোলা (২০০৭ থেকে)।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম ওপেক সৃষ্টি হওয়ার ফলে উৎপাদনকারী দেশগুলোর কি কোন আর্থিক সমৃদ্ধি হয়েছিল? তিনি বলেছিলেন অবশ্যই হয়েছিল তবে অনেক ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত অর্থ কী কাজে লাগাবে এবং কী ভাবে খরচ করা হবে তা নিয়ে অনেক দেশ বিপদে পড়েছে।

ওপেক সৃষ্টি হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন ভাবে জ্বালানী তেলের দাম বাড়ছিল। ১৯৬৯ সালে লিবিয়ার রাজা ইদ্রিসকে সরিয়ে কর্নেল গাদ্দাফি ক্ষমতা গ্রহণ করেন। গাদ্দাফি দ্বিধাহীনভাবেই ঘোষণা করলেন এখন থেকে তেল হবে রাজনৈতিক হাতিয়ার।

১৯৭৩ সালের মে মাসে মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত সৌদি বাদশাহ ফয়সলকে এই মর্মে হুশিয়ার করে দেন যে অচিরেই ইসরাইলের কাছ থেকে মিশরের দখলিকৃত ভূমি পুনঃরুদ্ধার করার চেষ্টা চলতে পারে। বাদশাহ ফয়সল আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে এই মর্মে সংকেত দেন যে আমেরিকা ইসরাইলকে সাহায্য করলে ওপেক তেলের দাম বৃদ্ধি করতে বাধ্য হবে। প্রেসিডেন্ট নিক্সন এই সময় ওয়াটার গেইট কেলেঙ্কারি নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিলেন যে ফয়সলের সতর্ক বাণীর প্রতি গুরুত্ব দিতে পারেন নি কিংবা গুরুত্ব দেওয়ার দরকার বোধ করেন নি।

১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর মিশর ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯ অক্টোবর ইসরাইলকে ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের যুদ্ধসামগ্রী সাহায্যের কথা ঘোষণা দেন এবং তার পর পরই ফয়সল ওপেকের তেল উত্তোলন শতকরা ২৫ ভাগ কমিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তেলের দাম ১৯৭০ সালের জানুয়ারি মাসে বেরেল প্রতি ১.৩৯ ডলার থেকে বেড়ে ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে ১০.৪৬ ডলারে দাঁড়ায়। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইম্বারগো থাকা অবস্থায় তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আয় কমেছিল শতকরা ৬ ভাগ। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন তেলের দাম বৃদ্ধিই সত্তর দশকের স্ট্যাগফ্ল্যাশনের জন্যে প্রধানত দায়ী। স্ট্যাগফ্ল্যাশন হচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও উচ্চ বেকারত্বের একই সাথে অবস্থান।

তার পর বিভিন্ন সময়ে তেলের দাম ওঠানামা করলেও ২০০৮ সালে সর্বোচ্চ ১৪০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। গত বছর জুন মাসে দাম ছিল ১১৫ ডলার। বর্তমানে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৪৯.৭৬ ডলারে (২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)। ভবিষ্যতে তেলের দাম বাড়বে না কমবে তা নির্ভর করে ওপেকের বাজার শক্তির (Market Power) ওপর। অর্থাৎ যোগানের পরিমাণ কমিয়ে রাখার ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে একতা বজায় আছে কিনা তার ওপরে।

About Author

আলী আহমাদ রুশদী
আলী আহমাদ রুশদী

ড. আলী আহমাদ রুশদীর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে করোটিয়ার সাদত কলেজে বেশ কয়েক বছর অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে সহযোগী-অধ্যাপক ছিলেন বহুদিন। ১৯৮৯ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে অবস্থিত Australian Competition and Consumers Commission এ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন প্রায় ১৫ বছর। সেখান থেকে অবসর গ্রহণের পরে ঢাকার AIUB ও নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কিছুদিন অধ্যাপনা করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে UNDP, ILO, World Bank ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কাজে গবেষণা করেছেন। বর্তমানে মেলবোর্নে অবসর জীবন যাপনের ফাঁকে তাঁর সময় কাটে অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখালেখি করে।