page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

থ্যাত্‌তেরিকা

thetterika 1

অবরোধের এমন দিনে কোনো মতে একটা সিএনজি নিয়ে ডরে ডরে মিশা ভাই কমিশনারের কাছে লবণছড়া শান্তিতে পৌছায় বটে কিন্তু যানবাহনহীন, জনমানবহীন, বন্ধ দোকান-পাট দেখে ১০০০ টাকার নোট লিয়ে খুব পেরেশানিতে পড়ে যায়।

ড্রাইভারটাও পইড়ছে ক্যাচক্যাইচ্চা। কারো সাহায্য পাওয়া গেলে, মুফতে সুবিধাটা নিতে ইচ্ছা কইরতেছে।

এলাকার সবুর কাকে কলার ধরে জানি পেটাচ্ছিল, আর কচ্ছিল “আমার টাকা, আমার টাকা না দিয়া ফুর্তি মারিস!” আমিন বাঁচানোর চেষ্টা করলে সবুর তাকে ধরে, “এই আমিন্না, তুই দালালি করিস ক্যান? তোর কাছে টাকা পাই, খুঁইজেছি। দে এখন অর টাকাসহ তোর টাকা দে…।” আমিন চেপে যায়। মিশা দেখে, নাহ, এখানে হবে না।

whomayun alik2

এ সময় বীরদর্পে এগিয়ে আসে গরীবের বন্ধু, চেরাগের আলো সালাহ্‌উদ্দিন। আর যাইব কোয়ানে মিশা… সালাহ্‌ এসেই বিগলিত হাসি দিয়া, বডিতে যথাসম্ভব বিনয় রাইখে কুলাকুলি করবে নাকি পায়ের ধুলি নেবে ভাইবতে ভাইবতে সেলাম দিল। ভাব গাম্ভীর্যের সাথে কুশল জানতে চাইল। অস্থির মিশা কুশল-মুশলের উত্তর দিয়ে তার সমস্যাটা সমাধানের পথ খোঁজে, সরাসরি কওয়াও যায় না। ওপাশ থেকে জিজ্ঞেস কইরবে এবং সালাহ্‌ কইরেও বসে।

মিশা ১০০০ টাকার নোট, ভাঙতি, ভাড়া জটিলতার কথা বলে। সালাহ্‌ এমন একটা কাজই খুঁইজতেছিল পৃথিবীতে। একটা তুড়ি দিল, কাজ পাইয়ে গেছে। ড্রাইভারের মাথায় হাত বুলিয়ে কয়, তোর যে দিন রে আজ!

সালাহ্‌র বাসায় আশ্রয় নিতে হল মিশাকে। টাকা ভাঙতি ভাড়া, হালকা জলযোগ আর কমিশনারের সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দেবার সহযোগিতায়।

সালেহ্‌ মিশাকে একটা রুমে এনে বইসতে বলে। বসার জায়গা বলতে পালং, সেখানেই বসে পড়ে। বসার পর মনে হল ভুল কইরেছে, জায়গাটা ভেজা ভেজা মনে হইচ্ছে।

সালাহ্‌: আমার গরীবখানা। বসেন, একটু লুডুস দেই।

মিশা: নাহ্‌ ঠিকাছে। কিচ্ছু লাগবে না। চা হলেই এনাফ…। বইলে শেষ করতে পারল না।

সালাহ্‌: চা দেবানি। আপনি নিশ্চিন্ত থাকেন। এখানে কেউ আপনাকে জ্বালাবেনা নি।

এটা কয়ে মিশার ভিত্রে ডর ঢুকায়া দিল। সে ভাবে, নিশ্চিন্ত থাকেন মানে কী!

বুয়া ঢোকে। মিশাকে দেখে খুব আপন আপন লাগে, মনে পড়ে না। পরে জানতে পেরে তো বেহুঁস হবার দশা। তার চোখের সামনে মিশার কয়েকটা ক্লিপিংস ভাইসে ওঠে। শেষ দেখা মিশার ডায়ালগ “আমি কবিতা লেখা কবি না, আমি রবি। আমার সাথে টক্কর দিলে সোজা কব্বরে যাবি।”

ছোটভাই সালাহ্‌উদ্দিনকে বুয়া বাদাইম্মা হিসাবেই জাইনতো। আইজ জানল সে কত বড় কুতুব। বুয়া হালকা সাজ দিয়ে, চুরি করে চিপায় রাখা লিপস্টিক বের কইরে ঠোঁটে দিল। ফুল আঁকা গেলাসে শরবত নিয়ে ঢুকল। সালাহ্‌র বৃদ্ধা মা পর্দার ফাঁক দিয়া উঁকি মেরে দেখে। বুয়া মিশার হাতে শরবত দিয়ে পা ছুয়ে সালাম করতেই মিশা সরতে গিয়ে শরবত ছলকে পড়ে।

বুয়া: একটু লুডুস খান।

মিশা আশেপাশে কোন লুডুস দেখে না। মনে হয় উত্তেজনায় হয়েছে।

“মাইয়া চাইলাম তুই দিলি না ৫ মিনিটের কাম” গাইতে গাইতে সালাহ্‌ ফোন করে সুমনকে, শোন তোকে একটা কথা বলি, আগে বল কাউরে কবি না।

সুমন: কী কাউরে কব না, আগে ক’তো কী কথা।

সালাহ্‌: সারপ্রাইজ! কথা দে কাউরে কবি না, কসম!

সুমন: আরে তোর কথা আমি কাউরে কই নাকি, কয়েছি কখনও?

সালাহ্‌: শোন, আমার বাসায় কে আয়েছে জানিস? মিশা সওদাগর। এটা তেমন কোনো ব্যাপার না। সেলিব্রিটি আমাগে বাসায় আসতেই পারে।

সুমন: কইস কী! সাবধানে থাক, সে তো সুবিধার না। মেয়ে দেখলেই… তোর আপা কই!

সালাহ্‌: থুর। মোটেও না। উনি ভিলেন তো ফিল্মে, বাস্তবে খুব নীরিহ লোক। অমায়িক। না দেখলে বিশ্বাসই করবি না।

সুমন: আমি এখনই আইস্তেছি।

সালাহ্‌: কাউরে কইস না যেন ভাই।

সুমন: মাথথা খারাপ!

তারপর সালাহ্‌ ভাবে আরেকজনকে ফোন করা উচিত। রাজীব। নিজে একটা কিছু মনে করে, তারে আন্ডার-এস্টিমেট করে। আজকে তার হেডম দেখায়া দেবার দিন। এটা শুনলে একদম জ্বলে যাবে।

সালাহ্‌: হ্যালো রাজীব।

রাজীব: কীরে, একদম ফোন করে হ্যালো রাজীব। কিছু কবি মনে হয়, তাড়াহুড়া দেইখতেছি।

সালাহ্‌: তাড়াহুড়া কই দেখলি! এমনি ফোন করলাম। তোরে এম্নে ফোন করা যাবে না। ভাল আছিস?

রাজীব: আছি। কী হয়েছে বল। বাসায় কিছু…

সালাহ্‌: নাহ্‌ বাসায় কী হবে… বাসায় মেহমান ভর্তি, তোর সাথে যে দেখা করব সে উপায় নেই।

রাজীবঃ কেন কীসের মেহমান? মেহমান হলে বের হতে পারবি না কেন?

সালাহ্‌: যে সে নাকি? সেলিব্রিটি … মিশা সওদাগর।

রাজীব: কীসের সওদাগর?!

সালাহ্‌: মিশা, মিশা সওদাগর। বিশাল স্টার সেলিব্রিটি। সেদিন আমরা বাসায় বাংলা ফিল্ম দেইখতেছিলাম না…

রাজীব: হ্যাঁ। হাসতে হাসতে যে সোফা থেকে পড়ে গেছিলাম…

সালাহ্: হয়। ঐ যে ভিলেনটা… নায়িকার ওড়না ধরে টান দিল… অই তো মিশা। চিনিস নে?

রাজীব হাসতে হাসতে পড়ে গেছে। কথায় কথায় হাসতে হাসতে ফ্লোরে পড়ে যাওয়া চাই। আজাইরা। সালাহ্‌ ‘হ্যালো হ্যালো’ করতে লাগলো।

রাজীব: সেলিব্রিটি তোদের বাসায় কীয়ারে? তোদের বাসায় তো তোদের ধনী আত্মীয়রাই আসে না।

রাজীব খোঁচা দিয়ে কথা বলবেই। গা জ্বালায়া দেয়।

সালাহ্‌: কী কী কীইই… তুই জানিস আমার বাসার সামনে দিয়া মো মো মোস্তফা সরয়ার ফারুকী যায়, আমার দিকে তাকাইছে, আমি ডাকি নাই মনে কর।

রাজীব: মো মো মোস্তফা সরয়াোর ফারুকী, ডাকলে কী হইত? দৌড়ে এসে তোর কোলে উইঠে পড়ত…

এরপর আর কথা চলে না। কী বুঝে রাজীবকে ফোন করতে গেছিল। মাসুদকে ফোন করতে হবে।

সালাহ্‌: মাসুদ, মাথায় কী চাইপছিল… রাজীব শ্যাইয়োকে ফোন কইরছিলাম। রাজীবকে ফোন করা একদমই বোকামি হয়েছে।

(মেয়ে কণ্ঠ): কে?

সালাহ্‌: আমি সালাহ্‌উদ্দিন। এটা তো মাসুদের নাম্বার, আপনি কীডা?
মেয়ে: হুম, মাসুদের নাম্বার। আমরা একটা কাজে আছি। আপনাদের কি টাইম সেন্স নেই। যখন-তখন ফোন দেন। বলেই ফোন কাট। গা আরো জ্বালায়া দিল সালাহ্‌র।

সালাহ্‌ বাথরুমে যায়। হাতে কালি দিয়ে একটা আউলা-ঝাউলা মুখ আঁকে। ময়লা দিয়া একটু ঘষে তারপর আসে।

সালাহ্‌: মিশা ভাই, আমি বহু আগে থেকে আপনের ফ্যান আর কি। এই দেখেন হাতে আপনার একটা ট্যাট্টু আঁকছিলাম।” বলে হাতের ট্যাট্টুটা দেখায়, মোটেও মিশার মত না। তারপরও বইলতেছে যখন…

সালাহ্‌: পুরনো হয়ে গেছে, ৪/৫ বছর আগের তো। আপনাকে লুডুস দেই, লুডুস খান।

“সে লুডুস কই!” মিশার গরম লাগতে শুরু করে।

মিশা: দেন খাই।

সালাহ্‌: আপাতত শরবত খাইতে লাগেন। লুডুস আনি।

সালাহ্‌ জানে আলমকে কল দিল।

সালাহ্‌: জানে আলম, শোন তোর ডিএসএলআরটা নিয়ে আয় তো সোনা।

জানে: কেন? কী হয়েছে?

সালাহ্‌: আন্না, সারপ্রাইজ আছে।

জানে: কী সারপ্রাইজ!? আমি এখন আসতে পারবো না নে।

সালাহ্‌: আরে বেটা সারাজীবন তো মেয়েদের ছবি তুলে গেলি। এবার ক্যামেরাটা কাজে লাগা। জীবন্ত কিংবদন্তী। সারাজীবন কইরে খেতে পারবি। আমি কী জিনিস তোদের তো দেখাই নাই, এবার দেখবি।

পাড়ার মোঃ আলি আসে। মিশার পাশে গর্বিত সালাহ্‌। মোঃ আলি মিশার দিকে তাকায়। স্বাভাবিকভাবেই মিশা বিব্রত।

সালাহ্‌: চিনছ!?

মোঃ আলি শরম পেয়ে চলে যায়। আমিন আসে।

সালাহ্‌: চিনছ?

আমিন: আরে চিনব না।

‘গুরু’ বলে আমিন সালাম করে। গায়ে হাত দিয়ে, “কী খাবেন গুরু? কী খেদমত কইরতে পারি আপনার একবার খালি মুখ ফুইটে বলেন।”

সালাহ্‌ সরিয়ে দেয়, অই গায়ে হাত দিস কেন? গায়ে হাত না দিয়া খেদ্মত করা যায় না?

সবুর আসে। এসে পরিচিতির ভঙ্গিতে তাকায়… আস্তে আস্তে হাসি প্রসারিত হয়।

সালাহ্‌: চিনছ?

সবুর: চিনব না মানে! মাম্মা, আমার টাকা কই? আমার টাকা দেও।

মিশা: কীসের টাকা?

সবুর: টাকা নিয়া এখন কীসের টাকা?

সালাহ্‌: এই কী সব বইলতেছ? উনি কে জান? সম্মানিত ব্যাক্তি আমাদের মেহমান।

সবুর: যেই হোক আমার টাকা আগে।

সবুর: এই আমিন, কি ক’ টাকা নেছে না?

আমিন: হ নেছে।

মিশা: আমি কবে টাকা নিলাম?

আমিন (মিশার কানে কানে): ভাই দিয়া দেন। কী আছে জীবনে, মান-সন্মান বড়।

সবুর মিশার কলার ধইরতে যাবে সালাহ্‌ ক্ষেপে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়।

সবুর দেখে নেবে, আইসতেছি বলে হুমকি দিয়া ফিয়া যায়।

মিশা এবার ক্ষেপে যায় সে চলে যাবে। সালাহ্‌ পাড়ার বড়ভাই মাস্তান জাহিদকে ফোন করে। জাহিদ কেরাম খেইলতেছিল।

সালাহ্‌: হ্যালো ভাই সালাম। ভাই কি ব্যাস্ত?

জাহিদ: কীডা?

সালাহ্: ভাই আমি সালাহ্‌উদ্দিন। আমার বাসায় একটু আসবেন।

জাহিদ: অহহ বাদাইম্মা সালাহ্‌ কবি না। তর বাসায় কী হয়েছে?

সালাহ্‌: এই তো ভাই, একজন সন্মানিত ব্যাক্তি আইসছে তো তার সঙ্গে বসে দুটো ডাল-ভাত খাবেন।

জাহিদ: কেডা?

সালাহ্‌ মিশার ব্যাপারে বলে। জাহিদ আসে।

সালাহ্‌ এসে মিশাকে সান্ত্বনা দেয়, কোনো সমস্যা নাই, জাহিদ ভাই আইসতেছে উনি সব দেইখবে। শুধু উনার সাথে দাঁড়িয়ে হাসি-মুখে একটু ফটু তুলতে হবে।

মিশা চলে যেতে চায়। রাগ করে চলে যাচ্ছে কিনা সবাই আটকায়, মাফ চায়। তারপর সে বলে অনেক দেরি হয়েছে তার কাজ আছে যেতে হবে। জাহিদ ভাই আসে।

আবার কুশলাদি মুশলাদি বিনিময় চলে।

জাহিদ: কিছু খাইয়েছেন?

(একজন শরবতের কথা বলে)

লুডুস খান একটু…

মিশা: থুত্থুরি লুডুস। লুডুস মুডুস খাব না। অনেক বেইজ্জতি হইয়েছে। আর না। আমি চলে যাব।

জাহিদ (অপ্রস্তুত হয়ে, অভিনেতা জাহিদ হাসানের মত ভঙ্গিতে মুখ-চোখ শক্ত করে), কীডা বেইজ্জতি কইরেছে?

তারপর উত্তরের অপেক্ষা না করে: সালাহ্‌, মিশা ভাইরে কেডায় জোরপূর্বক বেইজ্জতি কইরছে… লিস্টি দে।

সালাহ্‌ সবুরের ব্যাপারে বলে।

জাহিদ: আমাদের এলাকায় এসে আমার ভাইরে বেইজ্জতি…। জাহিদ ফোনে, অই পুলাপান মাল লইয়া আয় । বেইজ্জতি কাকে বলে কত প্রকার দেখাচ্ছি।

মিশা (চেপে গিয়ে): ভাই, তেমন কিচ্ছুটি হয় নি। এম্নিতেই টায়ার্ড লাইগতেছে। চলে যাই।

জাহিদ: বসেন।

তারপর জাহিদ, আমিন, সালাহ্‌রা বসে মিটিং করে।

জাহিদ: এত সন্মানিত একটা ব্যক্তিরে আইনা ঝামেলায় ফালায়া দিলি। সামলাইতে না পারলে আনস কেন? বলে সালাহ্‌কে ঝাড়ে। এখন অরে আটকা, পরে কিছু হইলে?

সালাহ্‌ মিশার কাছে আসে। মিশা চলে যেতে চায় সালাহ্‌ মানা করে। মিশা কিচ্ছু শুনতে চায় না বের হয়ে যাবে জোরপূর্বক।

মিশা: ভাই, আমার একটা ইমেজ আছে বাজারে।

সালাহ্‌: কেমনে বের হবেন? অরা সব মারার জন্য রেডি হয়ে আছে।

মিশা কয়েক জায়গায় ফোন করে ইনফর্ম করে।

সালাহ্‌ জাহিদের প্ল্যানটা বলে। শোনেন মিশা ভাই, যেটা হয়েছে, অরা যদি এট্যাক করে, মানে আমরা ঠিক কইরেছি পয়লা এট্যাক আমরা করব না, অরা করবে। তো আম্নেরে কয়েকটা বাড়ি দিবে…

মিশা আর পারে না। দাঁড়িয়ে যায়, “দ্যাটস অল। আমার লিঙ্ক জানেন, আমি পুলিশ কল কইরতেছি?”

সালাহ্‌: তো যে লাউ সেই কদু। আগেই পুলিশ ডাকবেন… লোক জড়ো হবে তখন আম্নের ইজ্জত থাকব?

 

রেডিওতে এই বিড়ম্বনার গল্প বলছিল মিশা। যদিও হাসতে হাসতে কিন্তু তখন ডাইল-কেরোসিন অবস্থা হয়ে গেছিল।

সেবারের মত ইজ্জত নিয়া ফিরতে পারছিল সেলিব্রিটি। কোন অশান্তি, বিশৃখঙ্খলা, অঘটন ছাড়া।

About Author

হুমায়ূন সাধু
হুমায়ূন সাধু