page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

দ্যাট গার্ল ইন ইয়েলো বুটস

kalki-k-87

“মেয়েটা যেন জুলিয়া রবার্টস ও বাগস বানি’র এক অদ্ভুতুড়ে মিশ্রণ।”

আমি এর আগে কারো মুখাবয়বের বর্ণনায় এর চাইতে ডাহা সত্য কথা শুনি নাই।yellow-5

ঠিক তাই, কেননা অভিনেত্রী কাল্কি কেকলাঁ’র উপরের পাটির উঁচু দাঁত দু’টো যেমন কার্টুন চরিত্র বাগস বানিকে মনে করিয়ে দেয়, তেমনি বিষণ্ণ সময়ে তার ভঙ্গিমা চিরাচরিত জুলিয়া রবার্টসের প্রতিনিধিত্ব করে। তবে এই ছবিতে কাল্কি যে দলের নারীর প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তাদের সম্বন্ধে আমাদের ধারণা খুবই কম বলেই মনে করি।

কাল্কির চরিত্রটির নাম রুথ। তার বাচনভঙ্গি বলে সে ইংল্যান্ড থেকে এসেছে। বর্তমানে ভারতে একটি ম্যাসাজ পার্লারে কাজ করে। অতি দ্রুত না হলেও কম সময়ের ভেতরেই আমরা তার সম্বন্ধে কিছু অজানা তথ্য জেনে ফেলি।movie-review-logo

আমরা জানতে পারি যে সে ভারতে একজন অবৈধ অভিবাসী। আমরা জানতে পারি তার মা ইংরেজ ও বাবা একজন ভারতীয়, যিনি কিনা রুথের শৈশবেই তাদেরকে ছেড়ে চলে যান।

আমরা জানতে পারি, রুথ কখনোই তার বাবাকে দেখে নি, তার কোনো ফটোগ্রাফও তার কাছে নেই। আমরা জানতে পারি যে তার বাবা হুট করেই তাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, যেখানে তার সাথে যোগাযোগ করার মত কোনো তথ্য না থাকলেও তিনি তার মেয়েকে আরেকবার দেখার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। সেই সাথে আমরা এও বুঝতে পারি—রুথ তার বাবাকে খুঁজে বের না করা পর্যন্ত ভারত ছেড়ে যাবে না।

anurag-k-1

পরিচালক: অনুরাগ কাশ্যপ

একজন ‘ইলিগাল ইমিগ্র্যান্ট’ এর জন্য ভারতে থাকা অসম্ভব না হলেও কষ্টসাধ্য। বিশেষ করে উপমহাদেশীয় পরিবেশে একজন মেয়ের পক্ষে সেই সমস্যার সমাধান বের করা বেদনাদায়কই বটে। তবু রুথ এগোতে থাকে।

আমরা তাকে মুম্বাইয়ের গোলকধাঁধার মত ইমিগ্রেশন অফিসে চলাফেরা করতে দেখি। দেখি সেখানকার সরকারী কর্মচারীরা কীভাবে তার দিকে কিছু রূঢ় প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। তাই সহানুভূতি জন্মাতে বেশি সময় নেয় না।

আবার খানিক বাদেই যখন দেখি রুথ তার ম্যাসাজ পার্লারের পুরুষ খদ্দেরদের বিশেষ চাওয়া পূরণ করে হাজার রুপি বাড়তি কামিয়ে নিচ্ছে, তখন নিজেদের রক্ষণশীলতা ওই সরকারী কর্মচারীগুলির দিকেই ঝুঁকতে চায়। কিন্তু রুথের চারদিকে বহুমাত্রিক সব চরিত্রের সমাবেশে তাও ধীরে ধীরে সয়ে আসে।

yellow-2

রুথের একটা বয়ফ্রেন্ড আছে, যার সাথে সে শারীরিক লেনদেনে একদমই আগ্রহী নয়। তিরিক্ষি মেজাজের সেই মাদকাসক্ত যুবক এক পর্যায়ে মাদকসেবন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। হয়তো রুথকে খুশি করার জন্য, কিংবা অন্য কিছুর স্বাদ পাবার জন্য। তা যাই হোক না কেন, তার পুনর্বাসনের অনন্য প্রক্রিয়া দর্শকদের কমিক রিলিফ হিসাবে কাজ করে।

আনুরাগ কাশ্যপের পরিচালক হিসেবে এটা সপ্তম কাজ, আর আমার মতে, তখন পর্যন্ত তার সবচেয়ে পরিণত ছবি। বিষয়বস্তুর দিক থেকে এটা তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ‘পাঁচ (২০০৩)’ এর চাইতেও বিতর্কিত, যদিও সেই ছবির বাহুল্য আর আত্মপ্রশ্রয়ের কোনোটাই এখানে নাই।

প্রতিটা দৃশ্যের ফ্রেমিং যেন পরিমিত। আর ক্যামেরার কারুকাজ আমাদের বিক্ষিপ্ত করতে পারে—তা ভেবেই হয়তো বার বার বদ্ধ স্থানের আবেশ তৈরি করেছেন, যা শুধু চরিত্রগুলির দিকে মনোযোগ দিতে সাহায্য করে।

yellow-4

আসলে ভারতীয়দের কাছে এ রকম ছবি একপাশ থেকে দেখলে অপ্রত্যাশিত ও অপমানকর, আর অন্যপাশ থেকে দেখলে বৈপ্লবিক। যদিও এই বিশেষণগুলি প্রায়শই হাতে হাত রেখে চলে। এখানে এমন এক মুম্বাই শহর দেখতে পাবেন, যা ঢাকাবাসী আমাদের কাছেও ঠিক পরিচিত ঠেকবে না।

কাল্কি কেকলাঁ তখনকার স্বামী কাশ্যপের সাথে ছবির চিত্রনাট্যেও কাজ করেছেন। একজন বিদেশিনী হিসেবে ভারতে বেড়ে ওঠা নিজের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিগুলি তাকে অবশ্যই সাহায্য করেছে।

তবে রুথের মাঝে এক অস্বস্তিকর অনাসক্তি আছে, যেন ঠিক সময়ে কোনো আবেগই তার অবয়বে ফোটে না। একজন সমালোচকের চমৎকার পর্যবেক্ষণ: রুথ যেন একটি মানবদৈর্ঘ্যের চিনামাটির মূর্তি। তার ধৈর্য্যের মঞ্চ থেকে একটি আলতো ধাক্কাই তাকে ফেলে দিতে পারে। আর তাতেই সব চুরমার।

yellow-1ছবির শেষে যখন সবচেয়ে বড় রহস্য উদঘাটিত হয়, তা কিন্তু মোটেও গল্পের স্বার্থে নয়, বরং চরিত্রগুলিকে বিশ্লেষণের জন্যে। রুথ তার জবাব পায় ঠিকই, কিন্তু সেই সাথে বহু প্রশ্নও তাকে জড়িয়ে ধরে।

নতুন এসব জিজ্ঞাসার গণ্ডি ছোট, গভীরতা ব্যাপক। আসলেই, চিনামাটির মূর্তিগুলিকে প্রকৃতি বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেয় না। ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। কিন্তু কিছু আদৌ ভেঙেছে কিনা, তা সময়ই বলতে পারবে।

পরিচালনা: আনুরাগ কাশ্যপ । চিত্রনাট্য: আনুরাগ কাশ্যপ ও কালকি কেকলাঁ । প্রযোজনা: আনুরাগ কাশ্যপ । চিত্রগ্রাহক: রাজিভ রাভি । সম্পাদনা: শ্বেতা ভেঙ্কাট । সঙ্গীত: বেনেডিক্ট টেইলর ও নারেন চান্দাভারকার । অভিনয়: কাল্কি কেকলাঁ, নাসির উদ্দিন শাহ, প্রাশান্ত প্রাকাশ । জনরা: ড্রামা, থ্রিলার । মুক্তি: ২০১১ । দেশ: ভারত । ভাষা: ইংরেজি, হিন্দি । রঙ: রঙিন । দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৩৯ মিনিট।

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন
আয়মান আসিব স্বাধীন