page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

ধনী হওয়ার বিজ্ঞান (১)

getting-rich-1

ঊনিশ শতকের আমেরিকান ‘নিউ থট মুভমেন্ট’ এর অন্যতম পথিকৃৎ লেখক ‘ওয়ালেস ডি ওয়াটলস (১৮৬০-১৯১১)। তিনি ব্যক্তিগতভাবে তেমন জনপ্রিয় ছিলেন না। সারাজীবন সাফল্যের সূত্র সন্ধানে ব্যস্ত ছিলেন।শেষ জীবনে তা তিনি খুঁজে পান কিছু দার্শনিকের রচনায়। তাদের প্রভাবে ‘উন্নত জীবন’ অর্জনের লক্ষ্যে তিনি লেখেন পাতলা গড়নের সোজাসাপ্টা এই বই। তার মতে দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা বিষয়ে আগের ধারণাগুলিকে এই বইয়ে তিনি বদলে দিতে পেরেছেন।

তার ১৯০৩ সালের বই ‘দ্যা সায়েন্স অফ গেটিং রিচ’ সারা বিশ্বে বিপুল খ্যাতি লাভ করে। এখনো পর্যন্ত সমান জনপ্রিয় এই বইয়ে লেখক অর্থ উপার্জনের সুনির্দিষ্ট একটি বিজ্ঞানের কথা বলেছেন। বইটির সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তীতে বেশ কয়েকজন লেখক অর্থনৈতিক সাফল্য-নির্ভর বই প্রকাশে উদ্বুদ্ধ হন। এর অবিশ্বাস্য পাঠক চাহিদার কারণে প্রথম প্রকাশের ১০০ বছর পরেও একাধিক প্রকাশনী বের করছে একই বই।

ওয়াটলস তার বইয়ে মোট ১৭ টি ছোট ছোট অনুচ্ছেদে সোজাসাপ্টা ভাষায় এই বিজ্ঞান ব্যবহার করার ও সংশ্লিষ্ট সব বাধা পেরোনোর পদ্ধতি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তার মতে প্রতিযোগিতা নয় বরং সৃজনশক্তিই সম্পদ অর্জনের প্রধান উপায়। তিনি দেখিয়েছেন, কারো ধনী হওয়ার ক্ষমতা কীভাবে আশেপাশের সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে। বইটির শেষে রয়েছে ওয়ালেসের বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘হাউ টু গেট হোয়াট ইউ ওয়ান্ট’— সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন সম্পদ সৃষ্টির অভিনব সব কৌশল।

১৭ চ্যাপ্টারের বইটির বাংলা অনুবাদ সাম্প্রতিক ডটকমে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছে। প্রথমে ভূমিকাসহ প্রথম চ্যাপ্টার।

wales-d-2

ওয়ালেস ডি ওয়াটলস (১৮৬০-১৯১১)


ধনী হওয়ার বিজ্ঞান

ওয়ালেস ডি ওয়াটলস

অনুবাদ: আয়মান আসিব স্বাধীন


ভূমিকা

এই লেখায় ধনী-গরীবের অবস্থান নিয়ে কোনো দার্শনিক আলোচনা নাই, বরং আমাদের প্রতিদিনের জীবনে কাজে আসবে এমন সব উপায়ের কথা বলা আছে। কোনো থিওরি ভিত্তিক বিশদ গবেষণাও নাই এতে, ফলে আপনি সহজেই এই লেখাকে ব্যবহারিক নোটবুক হিসাবে কাজে লাগাতে পারবেন। যাদের টাকা লাগবে, যারা আগে টাকা কামিয়ে পরে দর্শনের গবেষণা করতে চান, যাদের বেঁচে থাকার মহাজাগতিক কারণ বিশ্লেষণের কোনো আগ্রহ বা সুযোগ নাই—লেখাটা তাদের জন্যে। বিজ্ঞান কী ভাবে কাজ করে তা জানার আগ্রহ আপনার নাই, অথচ বিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত ব্যবহার করে লক্ষ্য অর্জনের ইচ্ছা রাখেন—আপনি যদি তেমন লোক হন, তবে আপনার জন্যেই এই বই।

getting-rich-bok

ধরেন, টমাস আলভা এডিসন কিংবা মার্কনি বিদ্যুৎ কীভাবে কাজ করে, সেই সম্পর্কে আপনাকে ধারণা দিচ্ছেন। আপনি জানেন, তারা কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই নির্বিঘ্নে তাদের প্রতিটি বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণ করতে পারবেন। তাই তাদের কথাগুলির প্রতি আপনার এক ধরনের অটল বিশ্বাস কাজ করবে। এই লেখা পড়ার সময়ও আমি আপনাদের কাছ থেকে ঠিক সেই রকম বিশ্বাস আশা করব, আর তেমনটা হলে আপনার ধনী হওয়া নিশ্চিত। কারণ এইখানে ধনী হওয়ার যে উপায়ের কথা বলা হয়েছে, তা এক সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞান। এই বিজ্ঞানের ব্যর্থ হওয়ার কোনো আশঙ্কা নাই। তারপরও যারা তাদের বিশ্বাসের যৌক্তিক ভিত্তি বা দার্শনিক ব্যাখ্যা খুঁজতে চান, তাদের জন্য এখানে দরকারি কিছু রেফারেন্স দেওয়া ‌আছে।

অদ্বৈতবাদ—যে মতবাদ অনুযায়ী গোটা বিশ্বের সব উপাদানকে একটা সারবস্তুর ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা হয় (অল ইজ ওয়ান, ওয়ান ইজ অল)—একটা হিন্দু মতবাদ এর উৎস। এই মতবাদ গত দুইশ’ বছর ধরে আস্তে আস্তে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে খুব শক্ত এক স্থান তৈরি করে ফেলেছে। প্রায় সব রকম ওরিয়েন্টাল ফিলোসফিই এর ভিত্তিতে তৈরি। এমনকি রনে দেকার্তে, শোপেনহাওয়ার, গেয়র্গ হেগেল ও রালফ ইমারসনের মত দার্শনিকেরাও এই ধারণাকে তাদের মূল হিসাবে ব্যবহার করেছেন।

যারা এইসব দার্শনিক ভিত্তি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান, তাদেরকে নিজ উদ্যোগে হেগেল আর ইমারসনের লেখাগুলি পড়ে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি।

এখানে স্পষ্ট ও সহজ ভাষায় সবকিছুর যথাযথ বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে কারো বুঝতে সমস্যা না হয়। আপনার যদি এই বইয়ের দার্শনিকতার ভিত্তি নিয়ে ভালোমত জানার একান্তই ইচ্ছা থাকে, তবে উপরে যেসব লেখকের নাম দেওয়া হয়েছে তাদের বই পড়ে দেখতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি সেই লেখকদের থিওরিগুলি বাস্তব জীবনে খাটিয়ে তার সুফল ভোগ করতে চান, তাহলে এখানে যেভাবে বলা হয়েছে—ঠিক সেই সেই ভাবে কাজ করা শুরু করে দিন।

 

অধ্যায় ১

ধনী হওয়ার অধিকার

দারিদ্র্যকে বড় করে দেখিয়ে যে যা-ই বলুক না কেন, ধনী না হলে আপনি কখনোই একটা পরিপূর্ণ ও সফল জীবন কাটাতে পারবেন না। আরও ভালো করে বললে, টাকা না থাকলে একজন মানুষ তার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা এবং বুদ্ধিমত্তার স্বাদ পায় না কোনো ভাবেই। কারণটা খুব সহজ—আপনি যদি আপনার নিজের ক্ষমতা বা প্রতিভার পূর্ণ ব্যবহার করতে চান, তাহলে আপনার অবশ্যই বহু জিনিসের প্রয়োজন পড়বে। এখন আপনার যদি টাকা না থাকে, তবে সেইসব জিনিসপাতি আপনি কিনবেন কীভাবে?

মানুষের নিজস্ব বুদ্ধিমত্তা ও সম্ভাবনাকে ঘষামাজা করার জন্য তাকে অনেক জিনিস ব্যবহার করতে হয়। আর আমাদের সমাজ এতটাই গোছানো যে সেই জিনিসগুলি পেতে সেগুলি কেনা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। কাজেই সব ধরনের অগ্রগতির শুরুর ধাপটা পার করার জন্যই ধনী হওয়ার বিজ্ঞানটা আমাদের জানা দরকার।

সকল প্রকার জীবনের মূল উদ্দেশ্যই হলো উন্নয়ন বা অগ্রগতি। যারা জ্যান্ত, তাদের সবারই সাধ্যমত উন্নতি লাভের অধিকার আছে।

সবারই আছে জীবন ধারণের সমান অধিকার—কথাটার মানে কী? এর মানে, মানুষ হিসেবে আমাদের সবারই সেই সব জিনিস পাওয়ার অধিকার আছে, যা আমাদের মানসিক ও শারীরিক উন্নতির জন্য একান্ত জরুরি; বা সোজা কথায়, ধনী হওয়া আমাদের সবারই অধিকার।

ধনী হওয়া মানে নিজের যা আছে তা-ই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা নয়। এই লেখায় আমি ‘ধনী’ শব্দটাকে তাই কোনো বিশেষ অর্থেও ব্যবহার করছি না। আমি মনে করি, যদি কেউ বেশি বেশি উপভোগ করার সামর্থ্য রাখে, তবে তার অল্পতেই খুশি থাকা মোটেও উচিত নয়। প্রকৃতির উদ্দেশ্যই হলো জীবনকে এগিয়ে নেওয়া। কাজেই প্রতিটা লোকের ক্ষমতা, সৌন্দর্য বা প্রতিভা বাড়াতে প্রয়োজনীয় সকল বস্তুই তার হাতের নাগালে থাকা উচিত। অল্পতে তৃপ্ত থাকা তাই পাপের পর্যায়ে পড়ে।

যত ধরনের জীবন কাটানোর সুযোগ আমার আছে, সেই সুযোগগুলি পেতে যা যা দরকার—তার সবই যদি আমার থাকে, শুধু তাহলেই আমি নিজেকে ধনী বলতে পারব; আর অনেক অনেক টাকা না থাকলে তা কখনোই সম্ভব না। আসলে আমাদের জীবনের ধরনটাই এত জটিল হয়ে গেছে যে, একজন সাধারণ পুরুষ বা নারীর পরিপূর্ণ জীবনের দিকে এক ধাপ এগোনোর জন্যেও বেশ মোটা অঙ্কের অর্থ লাগে। আমরা স্বভাবতই নিজের সব সামর্থ্যের পূর্ণ ব্যবহার করতে চাই। আর তা করতে পারলেই আমাদের কাছে জীবনটাকে সফল মনে হয়। কিন্তু এই যে সামর্থ্যের পূর্ণ ব্যবহার, সেই জন্যে আমাদের দরকার হয় অনেক রকম জিনিসের। সেইদিক থেকে দেখলে, জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে ধনী হওয়ার বিদ্যা জেনে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নাই।

ধনী হওয়ার ইচ্ছা থাকায় দোষের কিছু নাই। আপনি ধনী হতে চান, তার মানে আপনি এক অফুরন্ত জীবনের সন্ধানে আছেন—এই কামনা তো অতি স্বাভাবিক। এর জন্য আপনাকে বাহবা দেওয়া দরকার। নিজের জীবনের সম্ভাবনাগুলিকে যতদূর সম্ভব বাড়িয়ে নেওয়ার ইচ্ছা কার না থাকে? বরং এই ইচ্ছা যার নাই, সে স্বাভাবিক মানুষের দলে পড়ে না।

শরীর, মন আর আত্মা—এই তিনটার কারণেই আমরা বেঁচে থাকি। এই জিনিসগুলির কোনোটাই কোনোটার চেয়ে কম বা বেশি গুরুত্বপূর্ণ না। এর মাঝে একটাকেও যদি বাতিলের খাতায় ফেলে দেন, তাহলে বাকি দুইটাও কিন্তু ঠিকমত বাড়তে পারে না। শুধু আত্মা পরিষ্কারে ব্যস্ত থেকে মন আর দেহকে ছাড় দেওয়াও যেমন ঠিক না; তেমনি শুধু বুদ্ধির জন্যে শরীর আর আত্মাকে পাত্তা না দেওয়াও খারাপ।

অথচ আমাদের চারপাশে এমন একটা ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে গেছে যে, মন আর আত্মা বাদ দিয়ে আমরা শুধু শরীর নিয়েই পড়ে থাকি। যখনই কোনো সম্ভাবনা অপ্রকাশিত থেকে যায় কিংবা কোনো কাজের প্রক্রিয়া শেষ প্রান্তে আর পৌঁছায় না, তখনই আসে অতৃপ্ত বাসনা। আর এই বাসনা হলো সম্ভাবনার বহিঃপ্রকাশ বা আপনার কাজটুকু যথাযথভাবে সম্পাদনের ইচ্ছা।

শরীরকে ঠিকভাবে কাজে লাগাতে আমাদের ভালো খাবার চাই, থাকার আরামদায়ক জায়গা চাই, উপযুক্ত জামাকাপড় চাই। বিশ্রাম এবং অবসর সময়ও আপনার দেহের জন্য সমান দরকারি।

মনের দিক দিয়ে সুস্থভাবে বাঁচার জন্য আপনার লাগবে বই ; সেই বই পড়ার জন্য লাগবে যথেষ্ট সময়। আর বই পড়ে যা শিখলেন, সেই জ্ঞান কাজে লাগাতে আপনার ঘুরে বেড়াতে হবে, সময় কাটাতে হবে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে। মন তরতাজা রাখতে শিল্প ও সৌন্দর্যের কাছাকাছি থাকতে হবে, সুযোগমত সেগুলি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে হবে।

অন্যদিকে আত্মার শান্তির জন্য দরকার ভালোবাসা, আর দারিদ্র্য হলো ভালোবাসার সবচেয়ে বড় বাধা। আপনি যাদেরকে ভালোবাসেন, তাদের প্রতি সেই ভালোবাসা প্রকাশ পায় দেওয়ার মাধ্যমে। যেসব জিনিস তাদের উপকারে আসে, সেসব তাদের কাছে সহজে তুলে দিতে পারলেই আপনার ভালোবাসা মর্যাদা পায়। যার দেওয়ার মত কিছুই নাই—সে না পারে বাবা হতে, না পারে স্বামী হতে, না পারে সমাজের নাগরিক হতে, এমনকি পরিপূর্ণ মানুষও হতে পারে না সে। তাই ধনী হওয়ার বিকল্প নাই।

আপনি যদি একজন স্বাভাবিক মানুষ হয়ে থাকেন, তবে ধনী হওয়ার ইচ্ছা এড়ানো কখনোই সম্ভব না। কাজেই ধনী হওয়ার বিজ্ঞানও আপনি এড়িয়ে যেতে পারবেন না, কারণ আপনার লক্ষ্যে পৌঁছাতে এর চাইতে উন্নত ও প্রয়োজনীয় কোনো বিদ্যা আর নাই। যদি এই বিজ্ঞানকে শেষমেশ এড়িয়েই যান, তাহলে আপনি আপনার নিজের প্রতি, গডের প্রতি ও গোটা মানবতার প্রতি আপনার যে দায়িত্ব আছে—সেই দায়িত্বগুলিকেই পাশ কাটিয়ে গেলেন। কেননা, মানবতা ও গডের প্রতি নিজের দায় মেটানোর জন্য আপন সক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের কোনো তুলনা হয় না।

(চলবে)

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন
আয়মান আসিব স্বাধীন