page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

নিজের সঙ্গে কথা (১)

sanya-monorail-1

মাগরিবের নামাজ পড়ে একা একা বসে আছি নিজের ঘরে। জানালা গলে অন্ধকার আর ঠাণ্ডা বাতাস আসছে।

—হায় বাতাস, তুমি কি কেবলি বাতাস?

—মনে হয় না।

—আচ্ছা, কখনও যদি হাওয়া হাওয়া হয়ে যেত!

—তখন শুধু যে আমরা নিঃশ্বাস নিতে না পেরে মারা যেতাম তা-ই না, আমরা কথা বলতে না পেরেও মরতাম।

—কথা বলতে পারতাম না?

—না। সেটা বোঝা যায় কারও সাথে কথা বলার সময়—দম শেষ তো কথাও শেষ। আর বুকে এবং পেটেও যে একটা অস্থির ভাব থাকে কথা বলার সময়—অনেকটা কবুতরের বাকবাকুমের শারীরিক অনুবাদের মতো—সেটাও মনে হয় কথা বলার কন্টিনিউইটি বজায় রাখার জন্য জরুরি। সেই অস্থির ভাবটা আরও তীব্র আকার ধারণ করে পেটে চাপ সৃষ্টি করে যখন আমরা জোরে কথা বলি, বা আমার ক্ষেত্রে, যখন আমি নামাজে দাঁড়িয়ে চারপাশের শব্দ ব্লক করার জন্য একটু শব্দ করে সূরা পড়ি। কাজেই, মনে হয় শুধু জোরে কথা বললেই না, আমরা কখন কোন ভঙ্গিতে থেকে কিছু বলি তার উপরেও নির্ভর করে আমাদের কোন অঙ্গে কতটা চাপ বা প্রভাব ফেলে বাতাস।

logo-sanya-rushdi

—কিন্তু কথা বলতে না পেরে মরতাম কেন?

—সেইটা এইজন্য যে, বেশির ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষই অন্যদের সাথে তো বটেই, নিজের সাথেও কথা বলে। নিজের সাথে কথা না বলে আমাদের একা একা থাকাটা প্রায় অসম্ভব হতো।

—কই? আমি তো নিজের সাথে কথা বলি না!

—আরে, শুধু শব্দ করে, ঠোঁট নেড়ে কথা বলাই তো কথা বলা না। শব্দ দিয়ে, বাক্য দিয়ে চিন্তা করাটাও এক রকমের কথা বলা। সেইজন্যেই হয়তো শব্দের নাম শব্দ? কারণ নিঃশব্দ, স্বতন্ত্র শব্দমালার মধ্যেও এক ধরনের শব্দ বা আওয়াজ লুকিয়ে থাকে, যেটা আমরা যেন অনেকটা কানেই শুনতে পাই, চোখেই দেখতে পাই, বা অন্য কোনো ইন্দ্রিয়তে টের পাই?

—কিন্তু চিন্তাও যদি এক রকম কথা বলাই হয়, তাহলে চিন্তা বলে কিছু কি নাই?

—আছে। তবে আমার মনে হয়, চিন্তা ঘটে আরও গভীরে, কথোপকথনের চেয়ে আরও দ্রুত। একটা বাক্যে এক বা একাধিক শব্দ থাকে। বাক্যটাকে যদি ধরে নেই একটা ট্রেন আর একেকটা শব্দকে একেকটা কামরা, তাহলে দেখা যাবে, ট্রেন যত স্পিডে চলে, কামরাগুলো ততই মিলেমিশে অদৃশ্য হয়ে যেতে থাকে। আমার মনে হয় চিন্তার শুরু হয় এ রকম অনেকটা নিরাকার, অধরা বাক্যের শুরুতে।

—দাঁড়ান দাঁড়ান! আপনি বলছেন বাক্য এমন একটা তরল বা বায়বীয় আকার ধারণের আগে আমরা চিন্তা করি না? ভাষা শেখার অনেক আগের থেকেই যে শিশুরা অনেক কিছু নিজেরাই পারে ও শেখে, তার জন্য কি চিন্তার দরকার হয় না?

—দরকার হয় হয়তো, কিন্তু সেই চিন্তার পথ ভাষার পথ থেকে আলাদা। ভাষা এবং চিন্তা দুইটা আলাদা আলাদা সিস্টেম মিলিত হয় যখন বাচ্চারা কথা বলতে শেখে। তার আগে ইন্সটিংক্ট, রিফ্লেক্স ও প্রোটো-ল্যাংগুয়েজ জনিত হয় না কি শিশুদের কার্যকলাপ? আর যা কিছুর জন্যে চিন্তার দরকার হয়, তা তো ঘটে একটা সামাজিক পটভূমিতে, যেখানে শিশুটা শুধু নিজেই উপস্থিত থাকে না, তার ‘More Knowledgeable Other’ (MKO)-ও উপস্থিত থাকে।

—মানে কী হলো? কী বলছেন এসব?

—আমি বলি না তো! লেভ ভিগট্‌স্কি অনেক আগেই MKO সম্পর্কে  বলে গেছেন যে, মানুষ, বিশেষ করে বাচ্চারা নিজেরা নিজেরা যতটুকু শেখে, তার চেয়ে বেশি শেখে নিজেদের চেয়ে বেশি পারদর্শী, বেশি জানা কারও সংস্পর্শে আসলে। সেই MKO বাচ্চাটার বাবা-মা, শিক্ষক কিংবা অন্য কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষও হতে পারে, আবার বাচ্চাটার বড় ভাইবোন, অন্য বাচ্চারা, সমবয়সীরা, ও এমনকি কোনো ইলেকট্রনিক টিউটারও হতে পারে। যেমন কোনো কম্পিউটার গেইম অথবা কোনো নাচ শেখার ক্ষেত্রে, বা কোনো প্রাণীকে অনুকরণের ক্ষেত্রে, ইত্যাদি।

—আচ্ছা। কিন্তু এই লেভ ভিগট্স্কি‌টা কে?

vigotosky-1

লেভ সিমিওনোভিচ ভিগট্স্কি‌ (১৮৯৬ – ১৯৩৪)

—ভিগট্স্কি‌ ছিলেন উন্নয়ন ঘরানার এক রাশান মনোবিজ্ঞানী। খুব অল্প বয়সে টিউবারকিউলোসিসে মারা যান। মনোবিজ্ঞানের জন্যে ব্যাপক তার অবদান। তারপরেও উন্নয়ন মনোবিজ্ঞান বলতে বেশিরভাগ মনোবিজ্ঞানীরা শুধু জঁ পিয়াজেকেই বোঝে। দুনিয়া জুড়ে প্রায় সব ইউনিভার্সিটিতেই পিয়াজের থিওরিই পড়ানো হয়। ভিগট্স্কি‌র প্রসঙ্গে শুধু এইটুকুই বলা হয় যে উনি পিয়াজেকে চ্যালেন্জ করেছেন, খুবই বুদ্ধিমান, প্রতিভাবান, ক্যারিশম্যাটিক মানুষ ছিলেন, এবং অল্প বয়সে মারা গেছেন।

—কিন্তু ভিগট্স্কি‌ সম্পর্কে পড়ানো না হলে আপনি জানলেন কীভাবে?

—আমি তেমন কিছু জানি না তো! ওনার সম্পর্কে আমি একটু-আকটু পড়েছি বিভিন্ন আর্টিকেলে আর ইন্টারনেটে। তারপর যতটুকু পারি নিজে নিজে ইন্টারপ্রেট করছি। সেই ইন্টারপ্রেটেশনে অনেক ভুল থাকতে পারে। অনেক ফ্লুইড ব্যাপারকে আমি হয়তো বোঝার স্বার্থে অনেকটা ছবিতে পরিণত করে ফেলছি!

—কী বললেন? ছবিতে ‘পরিণত’ করে ফেলছেন? ছবি কি তাই করে নাকি? আর ‘পরিণত’ শব্দটা তো অনেক ভাবে ব্যবহার হয়, যেমন পূর্ণতাপ্রাপ্ত হিসাবেও ব্যবহার হয়, আবার হ্রাসপ্রাপ্ত বা সঙ্কুচিত হিসাবেও ব্যবহার হয়। আপনি কোন অর্থে ব্যবহার করলেন?

—কী মুশকিল! আমি তো ‘turn,’ মানে ‘একটা থেকে আরেকটায় রূপান্তরিত হওয়া’ অর্থে বললাম। কিন্তু আপনার প্রশ্ন তো আমাকে সমস্যায় ফেলে দিল।

—হি হি কীভাবে?

—আপনি যেই দুই অর্থের কথা বললেন, সেই দুই অর্থই কোনো আইডিয়াকে ছবিতে ‘পরিণত’ করে ফেলার ক্ষেত্রে খাটে।

—আর আপনি যেই অর্থে বললেন?

—সেই অর্থে তো খাটেই, সেইটা পূর্ণতাপ্রাপ্তির সাথেই খাটুক, কিংবা হ্রাসপ্রাপ্তির সাথেই খাটুক। যে কোনো ‘এক রকম থেকে আরেক রকম হওয়া’ বা কোনো রকম পরিবর্তন হওয়ার ক্ষেত্রেই খাটে।

—ব্যাপারটা আরেকটু পরিষ্কার করবেন কি?

—আপনার “ছবি কি তাই করে নাকি” প্রশ্নটার মধ্যে আমি ‘পরিণত’-র যেই অর্থ পেয়েছি, তা হল, পূর্ণতাপ্রাপ্তি। ঠিক অর্থ পেয়েছি?

—ঠিক।

—পূর্ণতাপ্রাপ্তি কখন ঘটে? কোনো কিছু পূর্ণ কখন হয়? যখন একই দিকে, একইভাবে, কিছু চলতে চলতে, বাড়তে বাড়তে, ঘটতে ঘটতে, এক সময়ে একটা লিমিটে পৌঁছে যায়। নাকি?

—যেমন?

—যেমন একটা গোলাপ কলি থেকে ফুটতে ফুটতে এক সময় পুরাপুরি ফুটে যায়, তারপরে সেটা আর ফোটে না। তারপরে ফুলটা আস্তে আস্তে মরে যায় বা ঝরে যায়। তাই না?

—হ্যাঁ।

—অন্যভাবে বলতে গেলে এইখানে মাপকাঠিটা মানের না, পরিমাণের। মানুষের দৈহিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও অনেকটা এ রকম বলা যায়। সমস্যা হল, যখন এ ধরনের পর্যবেক্ষণ মানসিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও চাপিয়ে দেয়া হয়। মানসিক গঠনের ক্ষেত্রে যে এ রকম ঘটে না, তা না। এরকম না হলে কিছু বোধগম্য হতো না। তবে সেরকম উন্নয়ন গঠনমূলক উন্নয়ন, সব সময় যা উন্নয়নের গভীরে যায় না, বরং বিস্তার করে।

—কিন্তু এই মানসিক গঠনমূলক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও কি মন একটা লিমিটে পৌঁছে আস্তে আস্তে মরতে থাকে?

jean-piaje

জঁ পিয়াজে  (১৮৯৬ – ১৯৮০)

—মন ও দেহ একটা মিলিত সত্তা হলেও, মন তো দেহের মতো দৃশ্যমান না। তাই মনের মৃত্যু প্রত্যক্ষভাবে না, পরোক্ষভাবে দেখা দেয়। যেমন একই ধারায় এগোতে এগোতে এক সময় মানসিক ভাবে ক্লান্ত হয়ে যায় ব্যাক্তি। এক সময় সেই এগোনো অর্থহীন হয়ে যায়। এক সময় এতদিনের চর্চার পেছনে যে মূল তত্ত্ব, সেটার অক্ষমতা ধরা পড়ে যায়। আর তখনই একটা ক্রাইসিসে পড়ে যায় ব্যাক্তি। একদিকে তার সামনে এগোতে হবে বেঁচে থাকার জন্য, আরেকদিকে তার সব পথ বন্ধ মনে হতে থাকে, তার বিচলিত লাগতে থাকে। একটা ভিশাস সার্কেলে ঘুরপাক খেতে থাকে সে। এক্সিস্টেনশাল সাইকোথেরাপির ভাষায় এই অবস্থাটা একটা বাউন্ডারি সিচুয়েশন বা এক্সিস্টেনশাল ক্রাইসিস, যেটার থেকে নিষ্কৃতির পথ নাই, বরং যেটাকে মেনে নেয়া বা গ্রহণ করে নেয়া যেতে পারে।

—এই রকম ক্রাইসিসে আপনি কখনও পড়েছিলেন?

—হ্যাঁ, পড়েছিলাম।

—সেই অভিজ্ঞতার কথা একটু বলবেন?

—সব কিছুতে শুধু কান্না পেত। মাছ কুটতে গেলে, গাছের পাতা বা ফুল ছেঁড়া হলে, মাংস ঘরে আনা হলে। অমানবিক লাগতো এই সব কিছু। মনে হতো যে ওদের প্রাণের মূল্য আমাদের প্রাণের মূল্যের চেয়ে কেন কম হবে? কে ঠিক করে এসব মূল্যবোধ? এই জাতীয় নানান প্রশ্ন এসে ভিড় করতো মাথায়, যে সবের কোনো উত্তর মিলত না।

—আচ্ছা, এই অবস্থার মুখামুখি হওয়ার পেছনে কি শুধুই ব্যক্তিগত অর্থহীনতা নাকি অন্য কোনো সামাজিক কারণও আছে?

—অনেকে মনে করেন যে অতিরিক্ত যৌক্তিকতার মধ্যে বড় হওয়া, অতিরিক্ত যুক্তিনির্ভরতা, অযৌক্তিক ব্যাপারগুলাকে মেনে না নেয়া বা এড়িয়ে যাওয়া এই অবস্থার জন্য দায়ী।

—আপনি কী মনে করেন?

—আমি মনে করি সেটা আংশিক সত্য। কারণ এখনকার সমাজব্যবস্থায় যেই যুক্তি বিরাজ করে, সেই যুক্তিতে সমস্যা আছে। কিন্তু সেই সমস্যার সমাধান আছে তার থেকে উন্নতমানের যুক্তিতে, যেই যুক্তি আপাতদৃষ্টিতে অযৌক্তিক ব্যাপারগুলোকেও গ্রহণ করার পথ দেখায়, এক্সিস্টেনশাল ক্রাইসিস থেকে নিষ্কৃতির পথ দেখায়। কাজেই যুক্তি তো শুধু এক রকম না যে সেটা সঠিক পরিমাণে প্রয়োগ করাটাই সমস্যাকে হালকা করার, বা সেটার সমাধান করার একমাত্র উপায়। যুক্তির প্রকারভেদ আছে।

—কেমন সেই প্রকারভেদ?

—যেমন দার্শনিক দেকার্তের যুক্তি এক রকম, আর দার্শনিক ভিটগেনস্টাইনের যুক্তি আরেক রকম।

—কী কী রকম?

—দেকার্ত তার প্যাশন অফ দ্য সোল বই এর ভূমিকায় লিখেছেন:

“…একজন আর্কিটেক্ট যখন তার সমস্ত ভিত্তি স্থাপন করেন এবং কোনো অট্টালিকার প্রধান দেয়ালগুলো তুলে ফেলেন, কেউ সন্দেহ করে না যে তিনি তার পরিকল্পনা পরিপূর্ণ করতে পারবেন, কারণ তারা দেখতে পায় যে সবচেয়ে কঠিন কাজটা তিনি ইতিমধ্যে করে ফেলেছেন।” (দেকার্তে, ১৯৮৯, পৃ. ১২)

দেকার্ত এখানে চিন্তার কাঠামোর কথা বলেছেন। একটা প্ল্যানের কথা বলেছেন, যেটা ধরে চিন্তা অগ্রসর হবে। মানে আগের থেকেই একটা ফ্রেইমওয়ার্ক তৈরি করে নেয়া, পরে যেটাতে শুধু ডিটেইলস বসিয়ে নিতে হবে। এই দর্শনের প্রভাব এখনও আছে আমাদের উপর। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে এইভাবেই ভাবতে ও লিখতে শেখানো হয়।

এ রকম পিছন ফিরে ফিরে সামনে এগোনোর অথবা হ্রাসপ্রাপ্ত পূর্ণতাপ্রাপ্তির বিরোধিতা করেছেন ভিটগেনস্টাইন, যখন উনি ‘কালচার অ্যান্ড ভ্যালু’ তে লিখেছেন:

“তোমার অহংকারের অট্টালিকা ভেঙে ফেলতে হবে। এবং তার মানে ভয়ঙ্কর কাজ।” (ভিটগেনস্টাইন, ১৯৮০, পৃ. ৩০ e)

 

witgenestain-1

লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন (১৮৮৯ – ১৯৫১)

কাজেই, ভিটগেনস্টাইন কোনো প্ল্যান বা কাঠামো ধরে সামনে এগোতে ইচ্ছুক না। যেই অট্টালিকা নিয়ে এত গর্ব, অথবা গর্বের যেই অট্টালিকা, সেটাকে উনি ভাঙতে বলছেন, তা যত ভয়ঙ্কর আর যত বেশি কাজই হোক না কেন। ওনার দর্শন ওনার ব্যাক্তিগত জীবন থেকে আলাদা কিছু ছিল না। আর তাই ওনার জীবদ্দশায় বের হওয়া ওনার একমাত্র বই ‘ট্র্যাক্ট্যাটাস’, যেটা দর্শনের জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, সেটা পরবর্তী জীবনে খারিজ করতে দ্বিধা করেন নাই তিনি।

—আচ্ছা, তার মানে কি ভিটগেনস্টাইন ভাঙতে ভাঙতে গড়েছেন, যেখানে দেকার্ত শুধু গড়েই গেছেন?

—সে ভাবেও বলা যায়। অনেকে সে ভাবেও বলে।

—আপনি কীভাবে বলেন?

—আমিও সে ভাবে বলি, কিন্তু আমি তার সাথে কিছু যোগ করি। যেমন, একই কাঠামোর উপর অট্টালিকা গড়তে থাকলে, সেটা হয়তো দিগন্ত বিস্তৃত হবে, সেটার অনেক শাখা-প্রশাখা হবে, কিন্তু সেটা একটাই থাকবে, কোনো বৈচিত্র থাকবে না। যেখানে ভাঙতে ভাঙতে গড়লে, কিংবা একেক পরিবেশে, একেক অবস্থায় একেক ভিত্তি দিয়ে শুরু করলে বৈচিত্রও থাকবে, কোনো একটা মতবাদ আধিপত্যও করবে না, পরিস্থিতি অনুযায়ী তা পরিবর্তন করাও সহজ হবে।

—এই রকম কোনো উদাহরণ জানা আছে আপনার যেখানে একেক অবস্থায়, একেক ভাবে কোনো মতবাদ উপস্থাপন করা হয়েছে?

—হ্যাঁ, জানা আছে। ভিগট্স্কি‌র Zone of Proximal Development (ZPD) কনসেপ্টটার কমপক্ষে দুইটা ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে, আর আরেকটা অর্থের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে ওনার ‘মাইন্ড ইন সোসাইটি’ বইটাতে।

—দুইটা ব্যাখ্যা কি দুইটা ক্ষেত্রবিশেষে দেয়া হয়েছে?

—হ্যাঁ, দুইটা উন্নয়নপর্বের ক্ষেত্রবিশেষে দেয়া হয়েছে। কারণ উন্নয়নের এক পর্যায়ে যে ধরনের উন্নয়ন উন্নতি ইঙ্গিত করে, আরেক পর্যায়ে তা নাও করতে পারে এবং অবনতি ইঙ্গিত করতে পারে। যেমন, উন্নয়নের শুরুতে বিস্তার করতে শিখতে হয়। নইলে তো কোনো কিছুর মানে বুঝবে না কেউ। গঠনমূলক উন্নয়নের পরে আসে বিবর্তনবাদী উন্নয়ন। কারণ নিয়ম ভেঙে গড়তে হলে আগে নিয়ম জানতে হয়।

—আচ্ছা, ‘জোন অফ প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট’ বা  ZPD কথাটার অর্থ কী?

—আপনার কী মনে হয়? ‘জোন অফ প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট’-এর অর্থ কী হতে পারে?

—‘জোন’ মানে তো স্থান বা এরিয়া, ‘প্রক্সিমাল’ মানে কাছাকাছি, আর ‘ডেভেলপমেন্ট’ মানে উন্নয়ন। তো ‘জোন অফ প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্টের’ অর্থ ‘কাছাকাছি উন্নয়নের স্থান’?

—হ্যাঁ। অথবা ধরাছোঁয়ার মধ্যেই যেই উন্নয়ন, যেই উন্নয়ন এখনও হয়ে সারে নাই, কিন্তু হতে পারে কোনো ‘মোর নলেজেবল আদারের’ সহযোগিতায়, সেই উন্নয়নের এরিয়া।

—আপনি বলছিলেন ভিগট্স্কি‌ কমপক্ষে দুই ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন ZPD। কোন কোন ভাবে বলবেন কী?

—প্রথম ব্যাখ্যাটা আমার মনে হয়েছে একটা কোয়ানটিটেটিভ ব্যাখ্যা। যেন ক্লাসরুমে বসে টিচার অঙ্ক কষে বের করছেন যে বাচ্চাটা দুইটা ভিন্ন পরিবেশে, কোন একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে কত নাম্বার পেয়েছে, এবং সেই দুইয়ের পার্থক্য কত নাম্বারের। উনি বলেছেন:

“নিজে নিজে সমস্যা সমাধান করলে যতটুকু উন্নয়ন ঘটে, আর কোন MKO -র নির্দেশনায় বা সহযোগিতায় সমস্যা সমাধান করলে যতটুকু উন্নয়ন ঘটতে পারে, সেই দুইয়ের ব্যবধানই হচ্ছে ZPD।” (ভিগট্স্কি‌, ১৯৭৮, ‘মাইন্ড ইন সোসাইটি’, পৃষ্ঠা. ৮৬)।

এই সংজ্ঞা ভিগট্স্কি‌ দিয়েছেন একটা নির্দিষ্ট কন্টেক্সট, একটা নির্দিষ্ট পরিবেশের উদ্দেশ্যে। যেখানে হয়তো উন্নয়ন মানে গঠনমূলক উন্নয়ন, আর তাই যেখানে উন্নয়নের মাত্রা নির্ণয় করতে পারা একটা জরুরি ব্যাপার। এর পরের ব্যাখ্যাতেই সেই প্রয়োজনীয়তা কমে আসতে দেখা যায়, যেখানে উন্নয়ন মানে শুধু গঠনমূলক উন্নয়ন বা সম্প্রসারই না, বরং ক্রমবিকাশও। তাই ZPD -র দ্বিতীয় ব্যাখ্যায় উনি বলেছেন :

“কোন বাচ্চার আসল উন্নয়ন মাত্রা ঐ সমস্ত কার্যকারিতা বর্ণনা করে, যেগুলি ইতিমধ্যে পরিণত হয়েছে, আর তাই, যেগুলি উন্নয়নের ফলাফল। যদি কোন বাচ্চা নিজে নিজে কোন কাজ সম্পন্ন করতে পারে, তার মানে সেই কাজের কার্যকারিতা সে ইতিমধ্যেই আয়ত্ত করেছে। তাহলে ‘জোন অফ প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট’—যেইটা এমন সমস্যা ধারণ করে, যা বাচ্চাটা নিজে নিজে সমাধান করতে পারে না, তার অন্যের সহযোগিতা লাগে —কী বর্ণনা করে? ‘জোন অফ প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট’ এমন কার্যকারিতাকে বর্ণনা করে, যা বাচ্চাটা এখনও আয়ত্ত করে নাই, কিন্তু আয়ত্ত করার পথে আছে। যেই কার্যকারিতা কালকে পরিণত হবে, কিন্তু আজকে বাচ্চাটার মধ্যে অপরিণত অবস্থায় আছে। এই কার্যকারিতাকে উন্নয়নের “কলি” বা “ফুল” বলা যায়, কিন্তু “ফল” বলা যায় না। আসল উন্নয়ন মাত্রা মানসিক উন্নয়ন নির্ণয় করে পিছন ফিরে দেখে, যেখানে ‘জোন অফ প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট’ মানসিক উন্নয়ন নির্ণয় করে সামনে চোখ রেখে।” (ভিগট্স্কি‌, ১৯৭৮, ‘মাইন্ড ইন সোসাইটি’, পৃষ্ঠা: ৮৬-৮৭).

ভিগট্স্কি‌ এখানে ‘আসল’ উন্নয়নের ‘মাত্রা’র কথা বলেছেন, কারণ সেই উন্নয়ন ইতিমধ্যে ঘটে গেছে এবং তাই সেটা অতীতমুখী বর্তমান। সেই উন্নয়ন অনেকটা স্থির, তাই পিছন ফিরে, বিভিন্ন কার্যকারিতা দিয়ে সেটার মাত্রা নির্ধারণ করা অনেকটা সহজ। ‘জোন অফ প্রক্সিমাল ডেভেলপমেন্ট’ এর ক্ষেত্রে তা সেভাবে করা যায় না। কারণ সেই জোন, সেই ডেভেলপমেন্ট বর্তমানে থেকেও ভবিষ্যৎমুখী ও পরিবর্তনশীল। তবে বর্ণনা করেও কোয়ালিটেটিভলি এক ধরনের সীমা নির্দেশ করা যায়। সেটা এক রকম ছবি আঁকা—ছবি এঁকে যেমন বর্ণনা করা যায়। যাই হোক, ZPD -র অর্থ  আরও ব্যাপক। বিভিন্ন কন্টেক্সটে, বিভিন্ন বয়সে এইটা নতুন নতুন অর্থ নিয়ে হাজির হয়।

—আর কী অর্থ নিয়ে হাজির হয়েছে বলা যাবে?

—হ্যাঁ যাবে, তবে আজ থাক, পরে কখনও।

হঠাৎ খেয়াল হল যে আমি অন্ধকারেই বসে আছি। বাতি জ্বালালাম। ভিগট্স্কি‌কে আরেকটু পড়তে হবে।

(চলবে)

About Author

সানিয়া রুশদী
সানিয়া রুশদী

বিদ্যায়তন: উদয়ন বিদ্যালয় (ঢাকা, বাংলাদেশ), কাওয়ান্ডিলা প্রাইমারি স্কুল (অ্যাডেলেইড, অস্ট্রেলিয়া), ওকলি হাই স্কুল (মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া), মেন্টোন গার্লস সেকেন্ডারি কলেজ (মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া), মোনাশ ইউনিভার্সিটি (মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া), ইউনিভার্সিটি অফ সিডনি (সিডনি, অস্ট্রেলিয়া), ডিকিন ইউনিভার্সিটি (মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া)। লেখাপড়া ও কাজকর্ম: প্রাথমিক শিক্ষা ঢাকায় উদয়ন স্কুলে। ১৯৮৭ সাল (স্কুলের ৪র্থ শ্রেণী) নাইজেরিয়াতে কেটেছে। ৫ম শ্রেণী উদয়ন স্কুলে শেষ করে, ১৯৮৯ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়াতে আছেন। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরে আছেন। মোনাশ ইউনিভার্সিটি, সিডনি ইউনিভার্সিটি ও ডিকিন ইউনিভার্সিটিতে জৈব বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান পড়েছেন।