page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

নিহত রুবীর সন্তানদের বেঁচে থাকা

ডেটলাইন ২০ জুলাই ২০১৪

হাজি কাকার সঙ্গে ফোনে কথা বলে জানলাম, জনির বাবা বিদেশ থেকে ফিরে জনি ও তার বড় বোনকে রাজা নগরের মরিচা গ্রামে ফেরত নিয়ে গেছে। সৎমায়ের সংসারে। জনির বাবা আবার বিয়ে করেছেন বছর দুয়েক আগে। পরিচয়ের পর থেকে জনির নানির এই ভাইকে হাজি কাকা ডাকি। পরিচয় এক ঘটনা সূত্রে। ২০০৮ সালের ১০ অক্টোবরের এই ঘটনা যারই জ্ঞাতসারে এসেছে মর্মাহত হয়েছিলেন।

ঐ দিন ভোরে মরিচা গ্রামের পাশ দিয়ে শীর্ণা-প্রবাহিত লাঘাটা নদীর পাড়ে গ্রামের গৃহবধু রুবী বেগমের মৃতদেহ লোকজনের নজরে আসে শিশু জনির চিৎকারে। তার বয়স তখন মাস ছয়েক। সে মৃত মায়ের দুধ খাওয়ার চেষ্টা করছিল আর চিৎকার করে কাঁদছিল।

logo faisal noi

তখন শীত সবে পড়তে শুরু করলেও সিলেটের দিকে ওই রাতে একটু বেশিই পড়েছিল। এ জন্য ঠাণ্ডায় সর্দি হয়ে গিয়েছিল বাচ্চাটার। গলা ভেঙে ফ্যাসফেসে শব্দ বেরুচ্ছিল। যা দূর থেকে শোনাও যাচ্ছিল না। পরে অনেককে আশ্চর্য হতে শুনেছি এই বলে যে বাচ্চাটাকে শেয়ালেও আক্রমণ করতে পারতো। ওদিকে শেয়ালের উৎপাত আছে। পথে যেতে যেতে অনেকের মোবাইলেই দেখেছি নদীর পাড়ে জনি ও তার মায়ের পড়ে থাকার ভিডিও ফুটেজ। সাংবাদিক শুনে তারা দেখিয়েছিলেন আমাদের।

ঘটনাটি জেনেছিলাম সামহ্যোয়ার ইন ব্লগে সাংবাদিক বন্ধু ভাস্কর চৌধুরীর লেখার মাধ্যমে। স্থানীয় সাংবাদিকদের পাশাপাশি সুলেখিকা মানবী অনলাইনে শিশুটিকে সাহায্যের উদ্যোগ নিলে অনেকে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। লন্ডন থেকে ইমিগ্রেশন এইডের প্রতিষ্ঠাতা ব্যারিস্টার মইনুল ইসলাম জনির পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, চিকিৎসা মাসিক ভিত্তিতে বহনে এগিয়ে আসেন। বিশিষ্টজন আরিফ জেবতিক, সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল, কৌশিক আহমেদকেও শিশুটির জন্য খাদ্য, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে দেখেছি। সাংবাদিক এস কে দাসের নেতৃত্বে নয় সদস্যের সহায়তা কমিটি করা হয়েছিল। স্থানীয় সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে রুবী হত্যার বিচার চেয়ে মানববন্ধন হয়েছিল একাধিক। তারা আর্থিক সহযোগিতাও করেছিলেন। অনলাইনে প্রচুর মানুষের সম্পৃক্ততা ও নানামুখী উদ্যোগ দেখে ব্যক্তিগতভাবে মুগ্ধ ও আবেগতাড়িত হয়ে মৌলভীবাজার গিয়েছিলাম জনিকে দেখতে ও মামলার অবস্থা জানতে। পুরানো বন্ধু সাংবাদিক বিকুল চক্রবর্তী ও শেখ রহিমের সঙ্গে কয়েক বছর পর দেখা হলে সুন্দর সময় কাটে।

robi2

মনে পরে গেল মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শেষ দিকে রাজানগর উপজেলার ছোট একটি বিচ্ছিন্ন বাড়ি। নাহ, জীবদ্দশায়ও সুখে ছিলেন না রুবি। অন্তত তাঁর ঘরে ঢুকে তাই মনে হবে যে কারো। খুব সাধারণ আর মলিন কিছু আসবাবপত্র। মাটির প্রলেপ দেয়া বাঁশের চাটাইর বেড়াঅলা একচালা ঘর। ঘরটা সব মিলিয়ে ৮ ফুট বাই ১২ ফুটের বেশি হবে কি! যদিও তার স্বামী আবুধাবি চাকরি করেন।

ঘর থেকে রান্না করার খুপরির মতো জায়গাটায় যেতে হয় মুরগির খোপে ঢোকার মতো করে। ভাঙা টেবিলের উপর একটা প্রেসক্রিপশন পড়ে ছিল। জনির বড় বোন ঝর্নার অসুখের পর ডাক্তারের দেয়া পরামর্শপত্র। অনেক খুঁজেও একটা গ্রুপ ছবি পেলাম না। কাঠের দরজায় জনির মায়ের কাঁচা হাতে আকা ফুল, আল্পনা। আমি যেদিন ওই ঘরে গিয়েছিলাম, তখন ওটা ছিল পরিত্যাক্ত। ছড়ানো ছিটানো ময়লা কাঁথা, বালিশ, থালা-বাসন,পাতিল। দরজা খোলা। জনি ও ঝর্না তাদের নানির সঙ্গে থাকলেও স্থানীয় মাদ্রাসায় ক্লাশ সেভেনে পড়ুয়া জনির ১৪ বছরের বড় ভাই জুবেল থেকে গেছে বড় চাচার ঘরেই। ওকে অনিচ্ছাসত্বেও জিজ্ঞেস করলাম খুনটা কে করেছে বলে মনে হয়? জুবেল নিঃসংকোচে বললো নানির বাড়ির কেউ বিষ খাওয়াইয়া মারছে। জুবেল জানালো তাদের ঘরের হাড়িপাতিল বস্তা বেঁধে রাখা হয়েছে ছোট চাচার ঘরে। জুবেলের চোখে সার্বক্ষণিক নিজের আশ্রয় হারানোর সতর্কতা। ভাবলাম, বড় হয়ে হয়তো নিজের বোনদের পাশে দাঁড়াবে সে। আচ্ছা মনে কষ্ট পেলে পাক, ভেবে জিজ্ঞেস করেছিলাম, বোনদের কী খবর? জুবেল বললো, ছোট চাচা বিদেশ যাওয়ার আগে নানির কাছে টাকা পাঠিয়েছে ওদের জন্য। (পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছি জুবেলকে দেয়া এই আশ্বাস সত্য ছিল না। খুনের ঘটনার ১দিন পর ওর ছোট চাচা বিদেশ চলে যায়।)

জনিকে যখন দেখেলিাম বয়স ছিল সাড়ে সাত আট মাস। ওর নানির বাড়ি গিয়ে। যতক্ষণ পারতো একটানা কাঁদতো শিশুটি। এখন সাড়ে ছয় বছর। হাজি কাকা জানিয়েছেন আজ, পতনউষার প্রাইমারি স্কুলে ক্লাশ ওয়ানে পড়ে ও এখন। তার বড় বোন ঝর্না পড়ে ক্লাশ সিক্সে। গত বছরগুলোতে সব সময় মনে হতো, জনি ভালো আছে। কখনো ওর সঙ্গে আবার দেখা হবে। মাঝেমধ্যে ফোনে জনির খোঁজ নিতাম। লন্ডনপ্রবাসী মহৎপ্রাণ মানুষ মইনুল ইসলামের প্রতিশ্রুতি মতো তার প্রতিষ্ঠান ইমিগ্রেশন এইড সহযোগিতার মাসিক টাকা নিয়মিত দিচ্ছে কিনা…। আজ জানলাম, রুবী হত্যা মামলার আসামী তার দেবর কুদ্দুস মিয়া জামিনে আছেন। জনির বাবা আগের বাড়ি থাকলে পাশের ঘরেই থাকে জনির মাতৃহন্তারক এই চাচা। জনির নানার কথায় বোঝা যায়, অনিশ্চয়তা তাদের চিন্তায় অস্পষ্ট। দরিদ্র সংসার থেকে সরে ওরা বাবার সংসারে গেছে। এতে অনেক চাপ কমেছে।

২০০৮ সালের ৭ নভেম্বর জনিকে দেখতে যাই যখন খুব অসুস্থ দেখে বড় বোন ঝর্না ও ওর নানিকে সঙ্গে করে ঢাকায় বাসায় নিয়ে এসেছিলাম। ডাক্তার বলেছিলেন নিওমোনিয়া হয়ে গিয়েছে। কয়েক দিন ওষুধ খাওয়ানোর পর ওর নিঃশ্বাস থেকে কফের গর গর শব্দ সেরে গিয়েছিল যখন খুব আনন্দ লেগেছিল, মনে আছে। সবাই শুনে খুশি হয়েছিল।

এক নজরে রুবী হত্যা-কাহিনি

ডেটলাইন: অক্টোবর, ২০০৮

এই ঘটনাটার স্মৃতিচারণও খুব বেদনার মনে হয়। ঘটনাটা ছিল এরকম যে, ২০০৮ সালের ১০ অক্টোবর শুক্রবার ভোরবেলা রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের মরিচা গ্রামে লাঘাটা নদীর পূর্ব তীরে প্রবাসী মাসুদ মিয়ার স্ত্রী ৩ সন্তানের জননী রুবি বেগমের লাশ ও লাশের পাশে তার কনিষ্ঠা ছয়-সাত মাস বয়সের শিশুকন্যা জনি বেগমকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়। এ সময় শিশু জনির মৃত মায়ের স্তন পানের চেষ্টা গ্রামবাসীকে হতবাক করে। পরে এই দৃশ্য পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হলে স্তম্ভিত হয়ে যায় সবাই। ১১ অক্টোবর শনিবার লাশের ময়না তদন্ত শেষে নিহত গৃহবধূর বাবার বাড়ি কমলগঞ্জ উপজেলার পতনউষার ইউনিয়নের গোপী নগর গ্রামে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় গৃহবধূ রুবির মা সিতারা বেগম বাদী হয়ে কুদ্দুছ মিয়া ও তার স্ত্রী খায়রুন বেগমকে আসামী করে রাজনগর থানায় মামলা নং ০৩/১০-১০-০৮ইং দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর রাজনগর থানাপুলিশ নিহত গৃহবধূর দেবর কুদ্দুছ আলীকে গ্রেফতার করে।

৯ অক্টোবর বাড়ি থেকে দুপুরে শিশু জনিকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময়ও তার হাতে ফোন সেট ছিল। এটা দিয়ে সে সর্বশেষ তার চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রীর সাথে কথা বলে। সে তখন ডাক্তারের সামনে আছে বলে জানায়। পরিচিতজনদের সঙ্গে সেই তার শেষ কথা। পুলিশ অবশ্য বলছে তারা রুবির ফোন কলের লিস্টে দেখেছে সর্বশেষ রাত ১০টা পর্যন্ত সে তার দেবর কুদ্দুস আলীর সাথে কথা বলেছে। পুলিশের আরো বক্তব্য ছিল রুবির কল লিস্টের ১শ ২০টি কলের মধ্যে ৯০টিই সে করেছে দেবরকে। এই সূত্রে পুলিশের সন্দেহ রুবির সঙ্গে দেবর কুদ্দুসের শারীরিক সম্পর্ক ছিল। তবে রুবি খুন হওয়ার আগে ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকতে পারে। এই আলামত পাওয়া গেছে। আর রুবিকে মারা হয়েছে শ্বাসরোধ করে। তার কাঁধে আঘাতের দাগ ছিল বলেও জানিয়েছিল পুলিশ। তাকে খুন করার পর লাঘাটা নদীর পারে নিয়ে ফেলে রাখা হয় মুখে বিষ ঢেলে।

খুনের কারণ হিসেবে পুলিশ যে সব তথ্য পেয়েছিল তা হলো, নিহত রুবি বেগমের কাছ থেকে দেবর কদ্দুছ মিয়া ও তার স্ত্রী খয়রুন বেগম জমি বিক্রি করবে বলে বিরাট অংকের টাকা নেবার পরও জমি রেজিস্ট্রি করে দিতে গড়িমসি করে। না দেওয়াতে নিহত রুবি বেগম টাকা ফেরত নিতে চাইলে দেবর কদ্দুছ মিয়া ও স্ত্রী খয়রুন বেগমের সাথে নিহত গৃহবধূ রুবি বেগমের ঝগড়াবিবাদ হয়। ৮ সেপ্টেম্বর কুদ্দুস তাকে বাড়ির উঠোনে ফেলে মারধর করে অনেক লোকজনের সামনে। এ ছাড়াও কিছুদিন আগে রুবির স্বামী তার ভাই কুদ্দুসের কাছে ৭০ হাজার টাকা পাঠায়। এই টাকা নিয়েও কুদ্দুসের সঙ্গে রুবির ঝগড়া হচ্ছিল।

এসব তথ্য প্রকাশিত ও স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত ছিল।

সংযুক্তির আগে: ভাস্কর চৌধুরী ও মানবীর লেখা দুটি সংযুক্তিতে দিলাম। আগ্রহী পাঠকের কৌতূহল নিবৃত্তির পাশাপাশি পুনর্লেখনের বিড়ম্বনাও কমবে। জনির বাড়ি যাবার স্মৃতিটুকুও থাকলো। আর মানুষের মমতা বোঝানোর জন্য সাহায্যে এগিয়ে আসা তখনকার কিছু চিত্রও উল্লেখ করা হলো। সবার বিস্তারিত সম্পৃক্ততা দেখতে সামহ্যোয়ার ইনের সংশ্লিষ্ট লেখাগুলোর মন্তব্য দেখা যেতে পারে।

লেখকের কোলে জনি।

লেখকের কোলে জনি।

জনির নানা বাড়িতে নানির কোলে আতঙ্কিত জনি । ৭ নভেম্ভর, ২০০৮।

জনির নানা বাড়িতে নানির কোলে আতঙ্কিত জনি । ৭ নভেম্ভর, ২০০৮।

সংযুক্তি ১
ডেটলাইন: ৩ নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১০:৩০

জনিরা জ্বলে উঠুক প্রতিশোধের আগুনে । ভাস্কর চৌধুরী

একটা অস্পষ্ট স্বপ্ন নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে আছে। যে স্বপ্ন এগিয়ে যায়….! কখনো আবার স্বপ্নের মৃত্যু হয়। কখনো জ্বলে উঠে। জ্বলে উঠে প্রতিশোধের আগুনে। আবার হয়তো স্বপ্নেরা এক হয়……! যেখানে জমাট বাঁধা কষ্টগুলো তার অদৃশ্য আলোছায়ায় ভেসে উঠে।

জনি। এক বছরের একটি শিশু। যে শিশুর স্বপ্নের মধ্যমণি তার মা। শিশুটি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে খোঁজে তার মাকে। মাঝে মাঝে অস্পষ্ট সুরে মা বলে ডুকরে ডুকরে কাঁদে। কান্নার প্রতিধ্বনি ভেসে উঠছে আকাশে-বাতাসে। ক্ষিদের জ্বালায় বারবার চেষ্টা করছে মায়ের দুধপান করতে। ঠেলে বুকের উপরিভাগে উঠেও পড়ে যাচ্ছে শিশুটি। কিন্তু পারছে না। মা-যে আর এই পৃথিবীতে নেই এটুকু বোঝার বয়স হয়তো তার হয়নি। এভাবেই কিছু সময়……কিছু অদৃশ্য স্বপ্ন ছুঁয়ে যায়……ছুঁয়ে যায় বাস্তবতার নিরিখে।

একটি গল্পের সামান্যতম উপাখ্যান জন্ম দিলাম মাত্র। এর কালরেশ এখনও বলা হয়নি।

এইতো কয়েকদিনে আগে ফলাও করে পত্রিকায় প্রকাশ হলো আমার এলাকার এই ঘটনাটি। সিলেটের মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী রাজনগর উপজেলার মরিচা গ্রামের গৃহবধূ রুবি বেগমকে গত ৯ অক্টোবর রাতে নির্মম ভাবে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে তার শ্বশুরবাড়ির লোকরা। তিন সন্তানের জননী গৃহবধূ রুবি বেগমকে হত্যা করে নদীর পাশে রেখে যায় তার ১ বয়সের জীবিত কন্যা শিশু কন্যা জনিকে। পরদিন গ্রামবাসী ক্ষেতে আসলে শিশুটির কান্না শুনে এগিয়ে এসে দেখতে পায় মৃত গৃহবধূ রুবি ও তার জীবিত শিশুটি মৃত মায়ের বুকের দুধ খাচ্ছে ও কান্নাকাটি করছে।

হিসেবটা এমন…….শ্বশুরবাড়ির অত্যাচার! অতঃপর একটি মৃত্যু! কিন্ত………..এখানেই শেষ নয়। একটি মৃত্যুর জন্য আরেকটি মৃত্যুর অপেক্ষা ।

নির্বাক জনি

আশিউর্দ্ধো বৃদ্ধা। শিশু জনির নানি। জীবনের শেষ অধ্যায়ে পাড়ি দিবেন এই বৃদ্ধা। অথচ মা হারা শিশুকে নিয়ে কোথায় যাবেন এই বৃদ্ধা। মায়ের বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত শিশু জনি সর্দি, কাঁশি, জ্বর ও পেটের পীড়া সহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে ডাক্তারের চিকিৎসাধীন রয়েছে। অসহায় বৃদ্ধার দু’চোখ দিয়ে বইছে অশ্রূর ধারা, দেখলে মনে হয় বৃদ্ধা বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। একদিকে মেয়ে রুবির নির্মম মৃত্যু ঘটনার শোক, অন্যদিকে এক বছর বয়সের নাতি জনি গুরুতর অসুস্থ।

জনির নানি সিতারা বেগম

সম্প্রতি সারাদেশে ঘটা করে পালন করা হল কন্যা দিবস। কিন্তু জনির মতো কন্যা শিশুদের ভাগ্য বদল হয় না। দিন দিন বাড়ছে জনিদের সংখ্যা।

বন্ধ হয়নি নারী নির্যাতন। বরং দিন দিন এর মাত্রা ও ধরন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া পত্রিকার পাতায়ও সবার কথা আসে না। অনেক নির্যাতনের ঘটনাই থেকে যায় খবরের অন্তরালে। খবরওয়ালা মানুষ হয়েও আর কত খবর দিব জনিদের। মাঝে মাঝে নিস্তব্ধ পাঠক হয়ে নিস্তব্ধতার ভঙ্গিমায় শুধুই পড়ে যাই। পত্রিকার এ পাতা থেকে সে পাতা। পড়া আর শেষ হয় না। আর কতকাল পড়বো ওদের খবর? ওদের ভাগ্যের কি হবে? ওদের ভাগ্যের কি পরিবর্তন হবে…?

ঢাকার পথে জনিরা। কয়েকটি বাচ্চা তাদের এগিয়ে দিচ্ছে

ঢাকার পথে জনিরা। কয়েকটি বাচ্চা তাদের এগিয়ে দিচ্ছে

ঢাকা থেকে ফেরার পথে জনিকে দুধ খাওয়াচ্ছেন নানি, পাশে বোন ঝর্না।

ঢাকা থেকে ফেরার পথে জনিকে দুধ খাওয়াচ্ছেন নানি, পাশে বোন ঝর্না।

সংযুক্তি ২
ডেটলাইন: ৫ নভেম্বর, ২০০৮ সকাল ৮:২২

ডিসপোজেবল মানবীদের কথা — আরেকটি ছবি, আরেকবার ভুলে যাবার পালা !!! । মানবী

আমরা বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের সাথে ডিসপোজেবল প্লেট, গ্লাস কিনে থাকি। জিনিসগুলোর রং, আকার আর স্থায়িত্ব, ব্যবহারের উপোযোগিতা বিচার করে পছন্দ মতো ডিসপোজেবল তৈজস ঘরে নিয়ে আসি। কিছু সময়ের ব্যবধানে দৈনন্দিন প্রয়োজনে ব্যবহার শেষে খুব স্বাভাবিকভাবেই ছুঁড়ে ফেলি আবর্জনার স্তুপে।

ছোট্ট শিশু কন্যা বাবা, মা’র আদরে লালিত হয়ে কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে উপনীত হলেই নিজের অজান্তে তারও যাচাই শুরু হয়ে যায়। সবমিলিয়ে পছন্দ হলে তাকে বধূ সাজিয়ে তুলে নেয় কোন ঘরে… এ পর্যন্ত প্রায় অধিকাংশ বাংলাদেশি নারীর জীবনচিত্র এক। তবে দুর্ভাগ্যক্রমে, পরবর্তীতে একদল মানবীর ভাগ্যটা হয়ে যায় ডিসপোজেবল তৈজসের মতো। ব্যবহার শেষ হলে বা সংসারে তার উপস্থিতি অপ্রয়োজনীয় মনে হলে অত্যন্ত নির্বিকার ভাবে তাকেও ছুঁড়ে ফেলা হয় আস্তাঁকুড়ে।

সিলেটের মৌলভীবাজারের জনি নামের একবছরের ছোট্ট শিশুর মা হতভাগ্য রুবি, শশুড়বাড়ির নরপশুরা তাঁকে নির্যাতন করে হত্যার পর ডিসপোজেবল তৈজসের মতোই ছুঁড়ে ফেলেছে আস্তাকুঁড়ে। সবচেয়ে নির্মম এই যে, মৃতদেহটির সাথে সাথে তারা পরিত্যক্ত করেছে আরেকটি জীবন্ত প্রাণ — ছোট্ট দুগ্ধপোষ্য শিশু জনিকে!!!

এই পোস্টটির পাঠক পাঠিকারা অনেকে জনির মতো সন্তানের পিতামাতা তারা হয়তো ছোট্ট জনির মাঝে নিজেদের সন্তানের মুখ খুঁজে পাবেন। জনক জননী না হলেও আমরা প্রত্যেকেই জন্মেছি কোন না কোন নারীর গর্ভে.. এই ছবিটির ক্রন্দনরত শিশুটির স্থানে নিজেকে আর পাশে শায়িত মানবীর মাঝে নিজের মা’কে কি একবারের জন্য কল্পনা করতে পারি?

করুণ এই দৃশ্যটি কোন যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকার নয়, কোন দুর্ভিক্ষপীড়িত জনপদের নয়। স্বাভাবিক সময়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ছবি।

নরপিশাচরা সম্পত্তির লোভে কী নির্বিকার ভাবে ছিনিয়ে নেয় এক মানবীর জীবন, একজন মায়ের জীবন! রাতের আঁধারে লাশটি পশুপাখির থাবায় ক্ষত বিক্ষত করার আশায় আবর্জনার মতোই ছুঁড়ে রেখে যায়! মা’হারা শিশুর ক্রন্দনে নিজেদের উত্যক্ত করতে চায় না বলেই হয়তো তাকেও ফেলে আসে নিষ্প্রাণ দেহটির সাথে!

ছোট্ট শিশু, আঁধার ঘনিয়ে এলে হয়তো ভয় পেয়েছে, ক্ষুধার যন্ত্রণায় ছটফট করেছে! হামাগুড়ি দিয়ে ছুটে গেছে মায়ের নির্জীব শরীরের কাছে, ভেবেছে স্নেহময়ী মা তাকে পরম আদরে বুকে টেনে নিবেন! মায়ের নির্লিপ্ততায় অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠেছে। খাদ্যের সন্ধানে এক সময় নিজেই খুঁজে নিয়েছে মায়ের বুক.. অভিমানী অবোধ শিশুটি বুঝতেও পারে নি পরম মমতাময়ী এই মা আর কোনদিন তাকে কোলে তুলে নিবে না, মায়ের বুকে সে আর কোনদিন খুঁজে পাবে না ক্ষুধা তৃষ্ণা আর ক্লান্তি নিবারনের পরম নির্ভরতার আশ্রয়!!!

আর দশটি ছবির মতো, ঘটনার মতো আমরা ভুলে যাবো এই ছবি, এই ঘটনাটি। জানবো না কী ঘটলো দুর্ভাগা এই শিশুর জীবনে! তার বাবা তাকে নিজের আশ্রয়ে ঠাঁই দিলো কিনা, তার মা’র হত্যাকারীদের শাস্তি হলো কিনা! হয়তো তাকেও বরণ করে নিতে হবে হতভাগ্য মায়ের মতো ডিসপোজেবল জীবন! হয়তো পথের ধারে পড়ে থাকা হাজারো শিশুর মতো সেও বেড়ে উঠবে অবহেলা আর বঞ্চনায়! কিংবা, কে জানে… যে সমাজ তার মা’কে নিরাপত্তা দিতে পারে নি, সেই সমাজ তাকে ঠেলে দিবে বারবণিতার অন্ধকার কোন জীবনে।

দুঃসহ মর্মস্পর্শী ছবিটি দেখার পর খুব ইচ্ছে করছে শিশুটিকে নিজের কাছে নিয়ে আসতে। হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব, সামাজিক রীতিনীতির কারণে অক্ষমতা আর অসহায় বোধ করা ছাড়া আর কোন সমাধান বা পরিণতি নেই এই ইচ্ছের।

নিজের আশ্রয়ে নিতে না পারলেও জনির জন্য কিছু একটা করা সম্ভব! জনির প্রবাসী বাবা, সব জানার পর যদি শিশুকন্যার দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে নিজ কন্যাকে পরিত্যক্ত করে, আমরা নিজেদের সাধ্যমতো প্রচেষ্টায় ছোট্ট জনির একটি সুস্থ সুন্দর নিরাপদ জীবনের ব্যবস্থা কি করতে পারি না!

শুধু সমবেদনা আর দুঃখপ্রকাশ না করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারি না এই অবোধ অসহায় শিশুটির দিকে!

জনির জন্য এখন পর্যন্ত যে যা সাহায্য পৌঁছে দিলেন।

বলা ভাল ইমিগ্রেশন এইড জনি, তার নানী ও বোনের ভরণ-পোষণ, দায়িত্ব নেয়ার ঘোষণা দেয়া সত্বেও অনেকে এখনো জনিকে সাহায্য করার জন্য তার বাড়ি চলে যাচ্ছেন। গত পরশু ঢাকার মীরপুর থেকে নাজমিন আক্তার নামের এক ভদ্রমহিলা জনি যাতে নিয়মিত দুধ খেতে পায় এ জন্য একটি বাছুরসহ গাভী পাঠিয়ে দিয়েছেন ট্রাকে করে। ১০ হাজার টাকা পৌঁছে দিয়েছেন প্রিন্স নামের এক জন। তার সঙ্গে পথ চিনিয়ে নিয়ে যাওয়া রাজিব সাহেব জনির হাতে গুঁজে দেন ২ হাজার টাকা।

এমেরিকা থেকে ফিরেই গত শনিবার ঢাকা থেকে পতন ঊষার গোপীনগর গ্রামে গিয়ে জনির পরিবারের সদস্যদের কাছে ৩ হাজার টাকা ও খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিয়ে আসেন সাবিনা ইয়াসমিন নামের এক ভদ্রমহিলা।

এছাড়া গত সন্ধ্যায় কমলগঞ্জ থানা নির্বাহী কর্মকর্তা জনিকে দেখে ২ হাজার টাকা দিয়ে এসেছেন।

একটি প্রতিষ্ঠান জনির পুরো দায়িত্ব নেয়ার পরও আর সাহায্যের দরকার কী? এই প্রশ্নে নতুন নতুন সাহায্য দিতে আসা মানুষরা বলছেন, যে যা করছে করুক। নিজে কিছু করতে না পারলে মন মানছে না।

সব দেখে আশা জাগে, কে কি করলো না করলো ভুললেও কেউ না কেউ জনির পাশে থাকবে। আমরা না থাকলেও।

দেশে এসে জনির খোঁজ নিতে যান সস্ত্রীক ব্যারিস্টার মইনুল

দেশে এসে জনির খোঁজ নিতে যান সস্ত্রীক ব্যারিস্টার মইনুল

ডেটলাইন: ১৩ নভেম্বর, ২০০৮ সকাল ১১:৪৯

সাহায্য – ১৪ নভেম্বর ২০০৮
শ্রী মঙ্গলের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন অঙ্গীকার-এর সদস্যরা আজ সকাল ১১.৩০ মিনিটের দিকে জনিকে দেখতে যান। তারা জনি ও তার নানী, বোনের জন্য কম্বল, শীতের পোষাক ও খাদ্য সামগ্রী নিয়ে গিয়েছিলেন সঙ্গে করে।

জনির জন্য সাবিনা ইয়াসমিনের দেয়া গাভী থেকে আজ আধা লিটারের কিছু বেশি দুধ দোয়ানো হয়েছে। জনির যা লাগে সেটুকু নেয়া হয়। বাকিটা গাভীর বাছুরটি খেয়ে নেয়।

রুবীর হাতে আঁকা ছবি।‘পাখি উড়ে যায় নিছে পরে যায় ছায়া…মানুষ চলে যায় রেখে যায় মায়া’। ছবির নাম: আজো মনে পড়ে তোমাকে

রুবীর হাতে আঁকা ছবি।‘পাখি উড়ে যায় নিছে পরে যায় ছায়া…মানুষ চলে যায় রেখে যায় মায়া’। ছবির নাম: আজো মনে পড়ে তোমাকে

সাহায্য – ১৮ নভেম্বর ২০০৮
মুন্সিবাজার শাখা সোনালী ব্যাংকে ভাস্করসহ স্থানীয় সাংবাদিকদের উদ্যোগে জনির সাহায্যের জন্য করা একাউন্টে ৫ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন। ফাতেমা নামে এক ভদ্রমহিলা।

ব্যাখ্যা: এই ঘটনাটি ব্যক্তিগত ভাবে স্মরণীয় অনলাইনে সংবেদনশীল এক দল তরুণ-তরুণীর সম্মিলিত দরদী উদ্যোগের জন্য। তারা একটি শিশুর নিরাপত্তাহীনতায় উদ্বিগ্ন হয়ে ব্যাকুল ভাবে এতো দ্রুত নিশ্চিত করেছিলেন যে, আমি তখন উপলব্ধি করেছিলাম এমনসব মানুষ পৃথিবীতে আছে জানাটাও অনেক আনন্দ ও ভরসার।

 

About Author

ফয়সল নোই
ফয়সল নোই

কবি। চীফ রিপোর্টার, চ্যানেল আই, ঢাকা, বাংলাদেশ।