page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

পানের বোঁটা

manosh chy 12

বিশ্রী খেতে চা-ও আমি দুবার খেয়ে ফেললাম। মাঝে একবার কফি দিতে বলি, সেটা বিশ্রীতর, তবু পুরো কাপ খেলাম। কিন্তু একবারও দাম চাইল না উর্দিপরা ফিরিওয়ালা। অনেকদিন পরে ট্রেইনে উঠলাম বলে মনে হচ্ছিল বুঝি আদ্যন্ত কোথাও একটু সিগারেট খাওয়া যাবে না। ঠিক মনে হচ্ছিল বলা যায় না। মনে-মনে এরকম একটা আশঙ্কা মনগড়া ভাবছিলাম। সেটার কারণ হতে পারে কাউকেই ঠিক সিগ্রেট খেতে উঠছেন বলে মনে হলো না আশপাশে।

আমি প্রথম বার যখন দুই কামরার মাঝখানে গিয়ে সিগ্রেট ফুঁকলাম, পাশের বাথরুমটাও ব্যবহার করলাম। এক ওঠাতে দুই জরুরি কাজ সারার খুশিমনে দেখি ঠিক পাশেই চা-কফিওয়ালার পসরা। হিসিখানা থেকে বের হয়ে তাই তাঁকে দাম নিতে বলি। অম্লান বদনে তিনি আবারও বললেন ‘অত তাড়াহুড়ার কী আছে!’ কোনো সন্দেহই আমার হয় নি তখনো।

manosh chy logo

 

ঘণ্টা খানেক পরে কেবল সিগ্রেট খেতেই ওখানে গেছি। এর মাঝে আরও একবার চা-পর্ব হয়েছে আমার। এবারেও দার্শনিকের মতো শান্ত তিনি। এবারে আমি তাঁকে টাকা দেবার জন্য পীড়াপিড়ি করলাম। কিন্তু তাঁকে সত্যি সত্যিই বিরক্ত মনে হলো এত তাড়াতাড়ি টাকা সাধাসাধি করাতে।

এমনিতেই এদিকটার কিছুই আমার মুখস্ত না। তার উপরে রাত্রি। আমি বুঝতেও পারছি না ট্রেইন কতখানি এসেছে, আর আমার কতদূর বাকি। আমি ভাবলাম নামার সময়েই দেব। কুমিল্লায় আমার কলিগরা নিষ্ঠার সঙ্গে একটু পর পর ফোন দিয়ে যাচ্ছেন কতটা দূর এলাম জানতে, আর কত সময় লাগতে পারে তার হিসেব আমাকে জানান দিতে। আমি নানাভাবে আশ্বস্ত করা সত্ত্বেও তাঁদের আন্তরিক আতিথেয়তার জন্য কুমিল্লা স্টেশনে তাঁরা থাকবেনই।

চা-ওয়ালার সঙ্গে এবার যে গল্প জুড়লাম আমি, হিসিখানা ও তাঁর চায়ের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে, সেটা নেহায়েৎ কৌতূহলবশত। আখাউড়া থেকে কুমিল্লা কতদূর, লাকসাম থেকে আখাউড়া কতদূর, কোনটার আগে কোনটা এইসব হাবিজাবি। চা-ওয়ালারও এতটুকু সন্দেহ হলো না। এরপর নেহায়েৎ কুমিল্লার কলিগদের একটা যথাযথ ধারণা দেবার জন্যই চা-ওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম ‘কুমিল্লা যেতে আমার কতক্ষণ লাগবে?’

চা-ওয়ালা পরিতোষের সঙ্গে ঘোষণা দিলেন বিশ মিনিটের মতো। এরপর আমি যখন জোর দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম ‘তাইলে টাকা নেন না কেন’, তখনই কেবল তিনি জানতে চাইলেন আমি কই যাব। কুমিল্লা যাব শুনে তিনি হতভম্ব হলেন, বিরক্ত হলেন, তারপর ভর্ৎসনার স্বরে জানতে চাইলেন ‘এই ট্রেইন কোথাও থামতে দেখেছেন?’

আমি নিরঙ্কুশ ব্যাক্কলের মতো মাথা নাড়তেই তিনি ঘোষণা দিলেন ‘সুবর্ণ এক্সপ্রেস তো কোথাও থামে না। আমাদের এই চা-সার্ভিস এই ট্রেইনেই আছে। নামার আগে পয়সা নিই। অন্য ট্রেইনে নগদ নগদ।’ তাঁর পরের কথাগুলো বিশেষ তাৎপর্য তখন আর রাখে না। নবীন শীতের রাতে কুমিল্লা যাবার কথা আমার, তার থেকে দুই-আড়াই ঘণ্টা বেশি সফর করে রাত্রি এগারোটা নাগাদ চট্টগ্রাম পৌঁছানোর কোনো আগ্রহই আমার নেই তখন।

চা-ওয়ালা গোয়েন্দাগিরি শুরু করেন, ‘টিকিটে কী লেখা আছে?’

টিকিটে কী লেখা আছে তা কি আমি জানি! আমি বালকের মতো পকেট থেকে টিকেট বের করি। চা-ওয়ালা ইন্টারোগেট জারি রাখেন ‘৩৬৫ টাকা নিয়েছে না? হুমম, এটাই নেবে। ডাইরেক্ট চট্টগ্রাম। পুরা ভাড়াটাই নিয়েছে না?’ গন্তব্যের থেকে ভাড়া পদ্ধতিতেই তিনি বিশেষ উৎসাহী মনে হলো।

টিকেটখানার দিকে বিহ্বল তাকিয়ে আমি প্রায় টিকেটখানাকেই প্রশ্ন করি, ‘এখন তাইলে কী করব?!’ চা-ওয়ালার উল্টোদিকের যে যাত্রীকে আমি এতক্ষণ খেয়াল করি নি তিনি প্রায় বিবেকের মতো উত্তর দিলেন, ‘দেখেন কোনো মন্ত্রী-মিনিস্টার আছে কিনা; ফোন দিলে আপনাকে কুমিল্লা নামিয়ে দিতে পারে।’

এই টীপ্পনির উত্তর দেবার মতো সপ্রতিভ আমি নাই তখন। কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা। ‘নাইলে এক কাজ করেন, দেখেন স্টেশন মাস্টারের ফোন নম্বর পাওয়া যায় কিনা। স্টেশন মাস্টারের মেলা ক্ষমতা। একটা ফ্ল্যাগ মাইরে দিবে, ব্যস।’ তিনি অনাবিল আনন্দে আরও বলে চলেন ‘আর নাইলে একদম মাত্থার দিকের বগিতে যান গিয়া। ড্রাইভারের লগে খাতির করেন। নামায়ে দিবে। তাড়াতাড়ি যান। সময় নাই।’ তাঁর গোঁফের নিচের হাসিটা দেখার মতো, কিন্তু গ্রহীতা হিসেবে সহ্য করার মতো না একটুও।

এই লোক বোধহয় এই ট্রেইনের অপেক্ষাকৃত নিয়মিত যাত্রী। হয়তো ছোটখাট ব্যবসায়ী। তাঁর চৌকস রস আর সাবলীলতার কারণে এরকমই মনে হলো। তিনি আমাকে ততক্ষণে নাদান এক লোক সাব্যস্ত করেছেন। এবং সেটা ষোল আনা ন্যায্য। আসলে একজন টিকেট কেটে এনে দেবার পর কোনো মতে তারিখটা দেখে পকেটে রেখে দিয়েছি বলে আমার নিজেরও নাদানই মনে হচ্ছে নিজেকে। উপরন্তু বাংলাদেশে কোনো ট্রেইন প্রকৃতই মধ্যবর্তী কোনো স্টেশনে না দাঁড়িয়ে সরাসরি চট্টগ্রামে গিয়ে পৌঁছাতে পারে এরকম কিছু কল্পনা করতে পারি নাই কোনোদিন। এতেও আমার নিজেকে নাদান মনে হলো।

আমার ধারণা চা-ওয়ালারও আমাকে নাদানই মনে হয়েছে। অন্তত তাঁর চোখ তাই বলছিল। কিন্তু এই লোকটার তীর্যক পরামর্শের হাত থেকে চা-ওয়ালাই বাঁচালেন আমাকে। লোকটা তখন বলছিলেন ‘আর কুমিল্লাতে দেখবেন ফেরিওয়ালার সবাই জানালা দরজা দিয়ে নেমে যাবে। ওদের পিছাপিছি নাইমা যাইয়েন।’ চা-ওয়ালা ছোটখাট চোখ পাকিয়ে তাঁকে ধমক দিয়ে দিলেন ‘ধুর মিয়া, ওই পোলাপাইনদের মতো হ্যায় নামতে পারবে?’

কোনো সন্দেহ নেই এই পরামর্শে কোনো কাজ হলো না আমার। সীটে বসে খুব আরাম করে কুমিল্লার কলিগদের এই অভূতপূর্ব কৃতিত্ব সম্বন্ধে জানালাম। তাঁরা সঙ্গে সঙ্গেই কী কী করা যায় তা ঠিক করে ফেললেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি একাধারে প্রক্টর এবং অত্যন্ত প্রিয়মুখ স্থানীয়। যা বুঝলাম তিনি স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন বা কিছু একটা। আমার পাশের সীটের সহযাত্রী পরিস্থিতি বুঝে উঠে গেলেন। পরে বুঝলাম তিনি চেকার বা এরকম পদস্থ লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে গেছেন। এই লোকের সঙ্গে এখন পর্যন্ত বিশেষ কোনো চোখ বিনিময়ও হয় নি কিন্তু। দশ-পনের মিনিট পরে যখন সত্যি সত্যিই ট্রেইনটা কুমিল্লায় থামল, আমার আর জানার দরকার নেই যে কী উপায়ে এটা থামল। আমি ব্যাগটা টান দিয়ে নামতে গেছি। একজন অল্পবয়স্ক চেকার এসে কোনো উস্কানি ছাড়াই জানান দিলেন ‘কোনো মিনিস্টার বললেও এই ট্রেইন থামত না; সামনে একটা একসিডেন্ট হয়েছে, সেইজন্য থামছে।’

আমি জানতে চাইলাম যাত্রীবাহী? তিনি জানান দিলেন ‘মালগাড়ি’। আমি পরম খুশিমনে একটা হাসি দিয়ে দরজার দিকে গেলাম। চেকারের হাতেই চা-কফির দাম দিতে গিয়ে দেখি, চা-ওয়ালা হাজির। পাশের যাত্রীকে একটা ধন্যবাদ দেবার কথাও মনে ছিল। দিলাম। চা-ওয়ালাকে একটা চায়ের দাম বেশি দিলাম। তারপর কুমিল্লায় নেমে পড়লাম।

কুমিল্লা ট্রেন স্টেশন; ছবি. roymonotosh [17 July 2011] Photos provided by Panoramio are under the copyright of their owners

স্টেশনে দেখি কলিগদের যাঁদের থাকবার কথা, ঠিক ওই সময়টাতেই তাঁরা নেই। নানাবিধ ফোনে, আর আমার বেকুব ভ্রমণ-পরিকল্পনা সামলাতে গিয়ে এসে পৌঁছাতে পারেন নি। আমার কিন্তু খালি ওই স্টেশনের বাইরে এসে একা একা ভাল লাগল। সামনে চারপায়া এক পান-সিগ্রেটের দোকান। আমার পকেটে হাত দিয়ে সিগ্রেটের পকেট থেকে একটা সিগ্রেট বের করি। নিজের লাইটার না-বের করে দোকানদারের ঝোলানো লাইটার থেকে সিগ্রেটটা জ্বালি। তারপর দোকানদারকে জিজ্ঞেস করি, একটা পানের বোঁটা বিনা পয়সায় নিতে পারি কিনা।

পানের বোঁটা কিংবা পানের এক কোণা নেবার জন্য দাম এমনিতেও দিতে হয় না। এই এক বস্তু চরম অশান্তির মধ্যেও দোকানদার দিয়ে দেন। আমার প্রশ্নটা আসলে বোঁটা ছিঁড়বার অনুমতি। পানের বোঁটাটা দোকানদারই ছিঁড়ে দিলেন। ভাবলাম দাঁড়ানো ট্রেইন নিয়ে কিছু জানতে চাইবেন। কিন্তু তিনি স্টেশনের বাইরের এই অন্ধকারে কোনো কিছুতেই বিশেষ উৎসাহী মনে হলো না। যেন বোঁটাটা আমাকে দেবারই কথা এই ভাবে আমার দিকে একটু তাকালেন। বিশ-বাইশের এই দোকানদারকে আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম ‘গরুর দুধের চা পাওয়া যাবে কোথাও?’ দোকানদার মাথা নাড়ল পরম আস্থার সঙ্গে। মুখে কিছু না বললেও বোঁটার জন্য একটুও বিরক্ত মনে হলো না তাঁকে।

বোঁটাটা কামড় দিয়ে সিগ্রেটের ধোঁয়া টানতে গিয়ে মনে হলো ঠিক এই মুহূর্তটার জন্যই কুমিল্লা এসেছি। ট্রেইনটা উছিলা, ভুল টিকেট উছিলা, বিরতিহীন ট্রেইন দাঁড়িয়ে-পড়া উছিলা, একটু পর যে কলিগরা আসবেন তাঁরাও উছিলা, পরের দিনের পরীক্ষার সভা উছিলা, কুমিল্লা শহরটাই উছিলা।

আধা অন্ধকারের ট্রেইন স্টেশন, সামনে হোটেলের সাইনবোর্ড, একটা বন্ধ-থাকা ফোয়ারা, আর তার সামনে দাঁড়িয়ে আমি মুখে পানের বোঁটা চাবাতে চাবাতে সিগ্রেট খাচ্ছি। এটাই পরম বাস্তব।

About Author

মানস চৌধুরী
মানস চৌধুরী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টারি করে নির্বাহ করি। গল্প, কলাম ইত্যাদি লিখি। সুযোগ পেলে পর্দায় অভিনয়ও করি।