page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

প্রোডাক্ট রিপ্লেসমেন্ট

‘ফান্টস’ খেয়ে অনেক ভেটভেটানির পর ডার্লিংরে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করতে যাবে এই সময় খ্যাক খ্যাক করে বেস্তমিজের মত ‘সিমেন মোবাইল’টা বাইজা উঠল। ১২টা মিসকল, টেক্সট। নার্গিসের টেক্সটা পড়ে ফাখ্রুল। দেখা করার কথা। তারও আজকে ১২টা। জীবনটা এতদিন কেরোসিন আছিল এখন ইউরিন! বসের ‘মুরাদ টাকলা’ ভাষায় টেক্সট্‌টা পড়ে “পোন দর পোন দর বাইনকট। টয় আই আস্কা, তর কাকরে পোন দেয়া দিসসি। জলদে আএ।” মানে ফোন ধর ধর বা** তুই আয় আজকে চাকরি তোর ** দিয়া দিচ্ছি। জলদি আয়।”

whomayun alik2

ফাখ্রুলের ঘুম ভাঙলে সিলিংয়ে ‘টেনশনাল ফ্যানে’র দিকে চোখ যায়। হেলিকপ্টারের মত ফা ফা ঘুরতেছে। এটা অটো। বাতাস নাই একফোটা খালি আওয়াজ। সে পাদ দিলে এর চেয়ে জোরে বাতাস বের হয়। ফোনে কথা বললে কেউ কারো কথা শোনে না। তারপরেও ফ্যান। ছেড়ে রাখে, ঘুমালে ট্রেনে যাচ্ছে এমন একটা ফিল হয় (কোনদিন গায়ে এসে পড়ে এই ভয়ে সে মুখের উপর চাদর দিয়া রাখে)।

ঘুম থেকে উঠে ফাখ্রুল একটা ‘টয়লেট টি’ খায়। এই চা খেলে পেটে একটা মোচড় মারে। তারপর সে বাথরুমে দৌড় মারে। গিফট করার মত দলা বের হয়। পেটটা ক্লিয়ার হয়। (লেখক এই চা কই খাইছে পূর্বের এক লেখায় কইছে)।

ব্রাশ করতে গিয়া দেখে ‘গ্লুক্লোজ’ পেস্ট শেষ। এই পেস্টের সুবিধা হচ্ছে শেষ হলেও টিপে টিপে বের করা যায়, কিছুদিন যায়। বরকত আছে।

কলের পর কল আসে, মোবাইল নিয়া গোসল করতে ঢোকে ফাখ্রুল। ‘ওয়াক্স সাবান’ দিয়া ডইলা ডইলা গোসল করতে গিয়া দেখল বহুদিন অবাঞ্ছিত লোম পরিষ্কার করে নাই। ‘বালিকা ব্লেড’ দিয়া পুঁছপাঁছ মারতে গিয়া গাল কেটে ফেলে। কাউরে না পাইয়া সে সকালের ফোনটারেই গাইলাইতে গাইলাইতে গালে হাত দিয়া বের হয়। নাস্তা কিছু নাই। অসুবিধা নাই বাইরে করে নেবে।

‘এশোল’ ব্র্যান্ডের জাঙ্গিয়াটা একটু টাউট হয়, সামনের দিকে ফুলে থাকে। সে গর্ববোধ করে, পুরুষত্ব প্রকাশ পায়। আচ্ছামত লাগায় ‘3X Shata’ বডি স্প্রে। আঠা আঠা হয়ে থাকে। ‘বুলফাইটে’র শার্টের উপর টাইটা লাগিয়ে ফুটপাথ থেকে কেনা ‘নাইন্টেইন’ ব্যাগটা ঘাড়ে ঝোলায়। একটা খালি ‘ভার্জিনে’র বোতল ছিল বাজাইতে বাজাইতে ঐটা নিয়ে বের হয়। ‘বলটাইমের বাটারবন’ খেতে খেতে রাস্তায় দাঁড়ায় গাড়ির জন্য।

সেরাম রোদ। পকেট থেকে ‘গ্রেবান’ সানগ্লাসটা পরে ফাখ্রুল। কলেজে যাবার জন্য দাঁড়ানো নিমকিকে দেখে খালি ‘ভার্জিনে’ চুমুক দেয়, তারপর একটু নেড়ে ছুঁড়ে বোতলটা ফেলে দেয়। ভাবটা এমন এতক্ষণ খাচ্ছিল, এখন শেষ। কানে হেডফোন গোঁজে। হেডফোনটা নষ্ট, কিন্তু কানে দিয়ে রাখে, স্মার্ট দেখায়।

নিমকি চলে যাবার পর ফাখ্রুল গাড়ি দেখে। নার্গিসকে তার অফিসের সামনে দাঁড়াতে বলছিল। একটা টেম্পু ডাকতে ডাকতে যায়, গুলিস্থান গুলিস্থান। দৌড়ে গিয়ে ওঠে। মুখটা ঢোকাতেই দেখে ভিতরে কোন জায়গা নাই। সামনের সারিতে দু’জন করে চারজন মেয়ে। তাদের পাশে বৃদ্ধ, এরপরে বস্তা টস্তা নিয়ে কিছু মজুর। ফাখ্রুল মুখ ঢুকিয়েই রাখে, তার দোকান বের হয়ে থাকে। মুখ দেখলে সমস্যা, পিছন দিকে দেখে তো কেউ চিনবে না, তার ইজ্জতও যাবে না। হেলপার চিল্লায়, “ভাই হয় ভিত্রে ঢুকেন, নয় বাইরে আসেন।” বলে গেটে জোরে বাড়ি মারে। ফাখ্রুলের মনে হয় তার পাছায় বাড়ি দিছে। হেল্পাররে মনডায় চায় তার ‘ম্যাকবোক’ কেডস্‌ দিয়া লাত্থি দিয়া ফেলে দেয়।

গরম বাবা মাজারের সামনে নার্গিস দাঁড়িয়ে থাকে, দেখেই ভাল্লাগে। কাছে যায়। নার্গিস হট।

নার্গিস – তোম্রে কয়বার কল দিচি?

ফাখ্রুল – কথা তো হইছে। তোমাকে রিপ্লাই দিলাম না?

নার্গিস – আমি একা একটা মেয়ে খাড়িয়ে আচি। কয়বার দিচি দেখ?

ফাখ্রুল – সিএনজিতে আছিলাম জান্ঠু, টের পাই নাই।

বলে ফোন চেক করতে গিয়ে পকেট থেকে ‘সিমেন’ ফোনের বদলে ‘ওয়াক্স’ সাবান বের হয়ে আসে।

নার্গিস – ইটা কী? তুমি পোকেটে সাবান লিয়া গুরো নাকি?

ফাখ্রুল – নাহ্‌… ভুলে… গোসল করতে সময় এত কল আসতেছিল… পকেটে মোবাইল রাখতে গিয়া মনে হয়…

নার্গিস – আর মনে হয় মোবাইল দিয়া গা ডলে আইচো।

ফাখ্রুল – হ্যাঁ, না মনে হয়।

টাইম নাই আসলে ফাখ্রুলের। নার্গিসকে একটা ‘কেরামিন সিম’ দেবার কথা। দিয়ে বসের কাছে যাইতে হবে জলদি।
নার্গিস সিমের কথা বলতেই ফাখ্রুল খোঁড়াতে লাগল। তার ‘ম্যাকবোক’ জুতার ভিতরে তেলাপোকা নড়তেছে। খোঁড়াতে খোঁড়াতে জুতার দিকে হাত দেয়।

নার্গিস (নাঁক কুচকে) – কী… ছিম কি জুতার ভিতর নাকি?

ফাখ্রুল জুতা খুলে ঝাড়া দিতেই একটা না দুইটা তেলাপোকা বের হয়ে আসল।

নার্গিস – পোকেটে সাবান, জুতায় তেলাপোকা। ছিম কই জাঙ্গিয়ার ভিতর না তো?

ফাখ্রুল হেসে কয়, নায়িকারা সিনেমায় তেলাপোকা দেখে ভয়ে নায়ককে জড়িয়ে ধরে, সব মিথ্যা!

নার্গিস – কী মিথ্যা?

ফাখ্রুল সিরিয়াস হয়ে—না মানে মেয়েরা তেলাপোকা ভয় পায়, এইটা মিথ্যা।

নার্গিস আবার সিম খোঁজে। ফাখ্রুল নার্গিসকে কানি আঙুল দেখায়। শিশি দেবার সিগন্যাল দিয়ে একটু দাঁড়াতে বলে চিপায় যায়। ফাখ্রুল আসলেই ‘কেরামিন সিম’টা জাঙ্গিয়ার সামনের পকেটে রাখছিল, আড়ালে হাত ঢুকিয়ে বের করে। জরুরি দামি জিনিস, টাকা এসব জাঙ্গিয়ার সামনের পকেটে রাখে।

ফাখ্রুল আশেপাশে তাকিয়ে, তোমাকে ‘কাউডাং’ আইসক্রিম খাওয়াইতে চাইছিলাম, আশেপাশে দেখা যাচ্ছে না। আচ্ছা, পরের বার নিয়ে আসবনে। বেবেকে বুঝিয়ে পরে দেখা হচ্ছে বলে চলে আসে।

বসের সামনে পড়বে, পড়লে কী বলবে, তার কী হবে ভাবতেই গলা শুকায়া মাঠও না বালুচর হয়া আছে ফাখ্রুলের। খচ খচ করতেছে। বিনয়ী একটা ভাব নিয়ে আসে চেহারা, আচরণে। এটা তার হিরোইঞ্চি বন্ধু গুরু নটরাজের কাছে থেকে শেখা। সে কারো কাছে টাকা চাইতে শরমায় না। একটা কাহিনী বানায়া মুখরে কঠিন বিনয়ভাব করে এমনভাবে বলে, সে চিট করতেছে বুঝলেও অনেকে টাকা দেয়। সেও দিছিল।

চোখে-মুখে সেরাম একটা ভাব আনার চেষ্টা করে ফাখ্রুল।

মূলত ফাখ্রুল ধান্ধা ফিকির করে চলে। বর্তমানে ‘ইউনিভার্সিটি লিভারে’ সাব সিনিয়র রিপ্রেজেন্টেটিভ। খাসা বাংলায় মলম+সেক্স ট্যাবলেট বেচার কাজ। রাস্তায়, বাসে, পার্কে বেচতে হয়।

এভাবে পার্কে ঘুরতে গিয়ে একদিন নার্গিসের লগে আলাপ। নার্গিসের বয়ফ্রেন্ড দেখে একেক সময় একেক জন। কেউ কেউ কয়, এরা ভাড়াটে লাইলি। ষাট টাকা মাত্র। তাই নাকি? এমনও হয়? ফাখ্রুলও ট্রাই মারে।

আস্তে আস্তে তারা সিরিয়াস হয়ে যায়। তারা জীবন বীমা সংসারের কথা ভাবে। এখনকার কাজটা একটু সেন্সিটিভ কিন্তু বিয়ের জন্য একটা কাজ জরুরি। লজ্জা লাগে বিধায় ফাখ্রুল পার্কে, বাসে বেচে না। ফার্মেসিতে দেয় বেচতে। বিয়ের জন্য সে প্রাইভেটে বিএ পরীক্ষাও দেয়।

অফিসে গিয়ে এক কাপ রঙ চা খেয়ে বডি টান টান করবে, আজকে বাইর করে দিলে বাংলাদেশ রেলওয়ের নিচে বডি দিয়ে দিবে ভাবতে ভাবতে উপরে উঠে দেখে জালিয়াতি আর নকল পণ্য বিক্রির জন্য তাদের অফিস পুলিশে রেড দিছে, লোকে লোকারণ্য। ফাখ্রুল কট।

হাজতে তাকে ‘স্মিরনফের’ বোতলে পানি ভরে পিটায়ছিল। উপরে কিচ্ছু হয় না, ভিত্রে গিরাগুরা গুড়া হয়া যায়। এটা কোন ব্যাপার না, কিন্তু পানি দিয়া কেন? মরার সময় পানি পাবে না।

সে বার ফাখ্রুল ছাড়া পেয়ে যায়। বস তাকে নির্দোষ হিসাবে সাক্ষি দেয়। কিন্তু ফাখ্রলের উপলব্ধি, হাজত খারাপ না। প্রত্যেক সিটিজেনের একবার জেল-হাজতে আসা উচিত। সকালে সিরিয়াল ধরে কাউন্ট, সিরিয়ালে খানা রাতে ইলিশ ফাইল। শুধু বাথরুম করতে একটু কষ্ট। তাছাড়া সব ভালই, খাওয়া দাওয়া ফ্রি। জেল থেকে বের হতেই যেটা হইল পুলিশ তাকে আলাদা ডেকে নিয়া জিগাইল, সেক্সের ট্যাবলেট ‘গয়াবা ভলিউম টেন’ আছে নাকি?

সে অবাক হবার টাইম পাইল না। বলল, নাই তবে ম্যানেজ করতে পারবে। পুলিশ তার নাম্বার নিল। পুলিশের লগে ভাল সম্পর্ক রাখা চাই, রাখছেও। এখন সে ইনফর্মার।

ফাঁকে ফাঁকে ফাখ্রুল কাজ খোঁজে, ‘টাইম বোম্ব ম্যাগাজিনে’ জবের অফার দেখে। ফাঁকে ফাঁকে নার্গিসকে খোঁজে। তখন পেপারে একটা অ্যাড পায়: “শিল্পপতির একমাত্র আদুরে মেয়ে মিস কিসমিসের আর্জেন্ট বডিগার্ড আবশ্যক। খাওয়া-দাওয়া ফ্রি। শিল্পপতির মেয়ের কয়েকটা ফ্ল্যাট বাড়ি আছে। সেখানে স্টে করতে হবে। ঈদে-পূজায় বিশেষ দিনে বোনাস। তড়িৎ যোগাযোগ।”

ফাখ্রুল প্রস্তুতি নেয়। পরের দিন মিস কিসমিসের সাথে দেখা করার মনস্থির করে।

About Author

হুমায়ূন সাধু
হুমায়ূন সাধু