পয়গম্বর মুসার কাহিনী নিয়ে রিডলি স্কটের নতুন ছবি—এক্সোডাস: গডস অ্যান্ড কিংস (২০১৪)

সিনেমার শিরোনাম মনে রাখার সাথে সাথে যারা পরিচালকের নামটিও মনে রাখেন তাদের কাছে রিডলি স্কট নামটি নিশ্চয়ই অপরিচিত নয়। রিডলি স্কটের কথা উঠলেই এখনো ২০০০ সালে নির্মিত বিখ্যাত গ্ল্যাডিয়েটর সিনেমার কথা মনে পড়ে।

মহাকাব্যিক বা পৌরাণিক ধাঁচের সিনেমার ভিজ্যুয়াল তৈরিতে যেসব খুঁটিনাটি ডিটেলিং প্রয়োজন সেসবের প্রায় পুরোটাই রিডলি স্কটের সিনেমায় দেখা যায়। ইংলিশ এই পরিচালক ‘ব্লেড রানার’, ‘আমেরিকান গ্যাংস্টার’, ‘ব্ল্যাক হ’ক ডাউন’ সহ আরো আরো বক্স-অফিস কাঁপানো ব্যবসাসফল সিনেমা বানিয়েছেন।

২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তার ‘এক্সোডাস: গডস অ্যান্ড কিংস’ সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। সিনেমাটি এ মাসের ১২ তারিখ যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি পেলেও আন্তর্জাতিকভাবে এখনো মুক্তি দেওয়া হয় নি। এর মধ্যেই আইএমডিবি-তে সিনেমাটির রেটিং ৬.৫।

মুসা নবী তথা মোজেস কীভাবে হিব্রু জাতিকে মিশরের ফেরাউনদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করেছিলেন সেই পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে নির্মিত হয়েছে ‘এক্সোডাস: গডস অ্যান্ড কিংস’। খ্রিস্টানদের পবিত্র আদিগ্রন্থ তথা ওল্ড টেস্টামেন্টের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘যাত্রাপর্ব’ এবং ইহুদিদের পবিত্র গ্রন্থ তোরাতে বর্ণিত আছে এই সমস্ত ঘটনা।

সিনেমার কাহিনী ঈসা নবীর জন্মেরও ১৩০০ বছর আগের। প্রথমেই দেখা যায়, রাজপুত্র রামিসেসের সাথে রাজবাহিনীর সেনাপতি হিসাবে মুসা নবী সেথি-বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ। এর মধ্যে রামিসেসের পিতা সেথি লোকমুখে শোনা একটি ভবিষ্যৎবাণী সম্পর্কে সকলকে জানায়। ভবিষ্যৎবাণী অনুসারে কোনো এক সময় দুইজন লোকের একজন অপরজনের জীবন বাঁচাবে এবং যে ব্যক্তি জীবন বাঁচাবে সে পরে সকলের নেতা হিসাবে আবির্ভূত হবে।

যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসা নবী রামিসেসের প্রাণ বাঁচান। ফলে রাজপরিবারে অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে মুসা নবীকে পিথোম শহরে রাজপ্রতিনিধি হেগেফের সাথে দেখা করতে পাঠানো হয়। হেগেফ সেখানে হিব্রু দাসদের তদারকি করত।

সেখানে গিয়ে মুসা নবী দাসশ্রমিক জশোয়ার কাছ থেকে দাসশ্রমিকদের উপর রাজপরিবারের বীভৎস্য অত্যাচারের কথা শোনেন। জশোয়ার পিতা নান পরে মুসা নবীকে তার আসল বংশপরিচয় সম্পর্কে জানান। আসল পরিচয় মতে, মুসা বনি ইস্রায়েল তথা হিব্রু বংশের সন্তান। তার বোন মরিয়ম শিশু বয়সেই লালন-পালনের জন্য মুসা নবীকে ফেরাউন কন্যার নিকট পাঠায়। এসব বিষয় জানতে পেরে ঘটনার আকস্মিকতায় দিশেহারা হয়ে পড়েন মুসা এবং পিথোম ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন।

হেগেফ ফেরাউন রামিসেসকে মুসার ঘটনা বলেন। রামিসেস ঘটনার সত্যতা নিয়ে দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়েন। পরে রামিসেসের মা রাণী তুইয়ার মরিয়মকে ডাকেন এবং তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। মরিয়ম অস্বীকার করতে থাকলে রামিসেস মরিয়মের হাত কেঁটে ফেলার হুমকি দেয়। সে মুহূর্তে মুসা হাজির হন এবং জানান তিনি হিব্রুজাতির সন্তান।

এই ঘটনার পর তুইয়া চেয়েছিলেন মুসাকে যেন মেরে ফেলা হয়। কিন্তু রামিসেস তাকে নির্বাসনে পাঠান। মিশর ছাড়ার আগে মুসার সাথে তার আসল মা ও বোন মরিয়মের দেখা হয়। মুসা মরুভূমি পাড়ি দিয়ে মদিন শহরে পৌঁছে জিপোরাহ এবং তার পিতা জেথ্রোর দেখা পান। পরে জিপোরাহকে বিয়ে করে সেখানেই মেষপালক হিসাবে জীবন যাপন করতে থাকেন। এভাবে নয় বছর অতিবাহিত হয়।

এরপর মুসা হঠাৎ একদিন পাথর ধসে গুরুতর আহত হন। সেদিনই তিনি আগুনজ্বলা এক ঝোঁপের সম্মুখীন হন এবং মালাক নামক এক বালক ফেরেশতার দেখা পান।

পরে ঘরে ফিরে তিনি স্ত্রীকে তার অতীত জীবনের কথা তুলে ধরেন এবং খোদা যে তাকে বিশেষ কাজে মিশর যেতে বলেছেন এ কথাও জানান তিনি। এসব কথা শুনে মুসার স্ত্রী খুব বিচলিত হন এবং ভাবেন মুসা হয়তো আর ফিরে আসবে না পরিবারের কাছে।

তবু তিনি মিশরের দিকে যাত্রা করেন এবং নান ও জশোয়ার সাথে মিলিত হন। সে যাত্রায় প্রথমবারের মতন তার ভাই হারুনের দেখা পান। এরপর হারুনের কাছে যুদ্ধকৌশলের দীক্ষা নিয়ে দাসশ্রমিকদের নিয়ে বাহিনী গঠন করেন এবং ফেরাউনদের আক্রমণ করতে থাকেন। এবং দাসশ্রমিকদের মুক্ত করে দেওয়ার ব্যাপারে চাপ দিতে থাকেন রামিসেসকে।

এর মধ্যে ফেরেশতা মালাক আবার দেখা দিয়ে জানায় যে মিশরের উপর খোদার দশ রকমের আজাব নেবে আসবে। আজাব নেমে আসে এক সময়। মাটি থেকে পানি রক্ত হয়ে বেরিয়ে পড়তে থাকে। ব্যাঙ, কেঁচো, উকুন ও পঙ্গপালের হামলা শুরু হয়। প্লেগে লোকজন মারা যেতে থাকে। হিব্রু জাতির লোকেরা ঘরের দরজা ভেড়ার রক্ত দিয়ে লেপে দিয়ে এই আজাব থেকে রক্ষা পায়।

দশ নম্বর আজাবের কথা জানার পর মুসা আতঙ্কিত হন। এই আজাবের ফলে সব নবজাতক মারা যাবে। এদিকে মুসা বার বার রামিসেসকে দাসশ্রমিকদের ছেড়ে দেওয়ার কথা বলতে থাকেন। রামিসেস অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কথা চিন্তা করে দাসশ্রমিকদের মুক্তি দিতে অসম্মত হন। আজাবের ফলে মিশরের তখন ভয়ঙ্কর দশা। রামিসেসের নবজাতক শিশু মারা যায়। সন্তান হারিয়ে ক্রুদ্ধ রামিসেস মুসা ও হিব্রু জাতিকে মিশর ছাড়ার নির্দেশ দেন।

মিশর ছেড়ে যাওয়ার সময় হিব্রু জাতি মুসার দেখানো পথে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে লোহিত সাগরের দিকে যেতে থাকে। ওদিকে শোকে বিহ্বল রামিসেস সিদ্ধান্ত নেন তার বাহিনী নিয়ে মুসাসহ হিব্রুদের তাড়া করবেন।

মুসা নবী ও হিব্রু জাতির লোকেরা লোহিত সাগরের কিনারে পৌঁছে যায় এবং কী করবে বুঝতে পারে না। পরে মুসা নবী মাজেজা দেখান। তিনি তার তরবারি দিয়ে সমুদ্রের পানিতে ছোঁয়া দেন আর পানি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। সেই পথে স্বজাতির লোকদের সমুদ্রের ওপারে পাঠিয়ে দেন এবং ফেরাউন বাহিনীকে পরাস্ত করবেন বলে সেই স্থানে অবস্থান নেন তিনি।

এরপর যখন সমুদ্রের পানি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে থাকে তখন পানির স্রোতের তোড়ে ফেরাউন বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্যই মারা পড়ে। মুসা নবী ও রামিসেস বেঁচে যান।

রামিসেসকে দেখা যায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাহিনীর শোকে বিহ্বল অবস্থায়। আর মুসা নবী হিব্রু জাতিকে নিয়ে মদিনের দিকে যাত্রা করেন এবং সেখানে তার পরিবারের সাথে মিলিত হন।

এর পরের দৃশ্যে দেখা যায় সিনাই পর্বতমালায়, মুসা নবী খোদা প্রেরিত ‘দশ আজ্ঞা’ তথা ‘টেন কমেন্ডমেন্টস্‌’ লিপিবদ্ধ করছেন এবং অন্যদিকে হিব্রু জাতি তথা বনি ইস্রায়েল গোষ্ঠীর লোকেরা ‘বাছুরের স্বর্ণমূর্তি’ তথা ‘গোল্ডেন কাফ’ বানাতে ব্যস্ত। এই দৃশ্যের মধ্য দিয়ে সিনেমা শেষ হয়।

সিনেমায় মুসা নবীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাম্প্রতিক সময়ের নামজাদা অভিনেতা ক্রিশ্চিয়ান বেইল। এছাড়াও রামিসেসের চরিত্রে জয়েল এডগারটন, সেথির চরিত্রে জন তুতুররো, জসোয়ার চরিত্রে এরন পল, নানের চরিত্রে বেন কিংসলে অভিনয় করেন।

পরিচালকের সদ্যপ্রয়াত ছোটভাই এবং একই সাথে বিখ্যাত পরিচালক টনি স্কটের নামে সিনেমাটি উৎসর্গ করা হয়েছে। ১৫০ মিনিটের এই সিনেমার মিউজিক করেছেন আলবার্টো এগলিসিয়াস। চিত্রনাট্যকারদের দলে ছিলেন এডাম কুপার, বিল কোলাজ, জেফ্রি কেইন এবং স্টিভেন জেলিয়ান। সিনেমা নির্মাণে খরচ হয়েছে ১৪ কোটি মার্কিন ডলার। টু-ডি, থ্রি-ডি এবং আইম্যাক্স থ্রি-ডি এই তিনটি ফরমেটে সিনেমাটি মুক্তি পাচ্ছে। এর বাজারজাত এবং পরিবেশনা করছে টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্স।

সমালোচকরা ছবির অভিনেতাদের দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য যেমন বাহবা দিচ্ছেন তেমনি নির্মাণের মুন্সিয়ানার জন্য পরিচালকের গুণগানও করছেন বিস্তর।


এক্সোডাস: গডস অ্যান্ড কিংস: অফিসিয়াল ট্রেইলার

বিনোদন

About Author

নাসিফ আমিন
নাসিফ আমিন

লেখক ও অনুবাদক