page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

ফালু মিয়ার ক্ষতিপূরণ

১৯৯৯ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে ফালু মিয়ার সঙ্গে দেখা হয়। তার সম্পর্কে জানতে পেরেছিলাম শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক আলতাফ পারভেজের কল্যাণে (তমিজউদ্দিনের অমর প্রেম দ্রষ্টব্য)। তিনি এই হৃতভাগ্য মানুষটির ওপর করা একটি ফলো আপ রিপোর্টিংয়ে আমাকে সঙ্গে থাকার সুযোগ দিয়েছিলেন।

logo faisal noi

অনন্যা পত্রিকার ১৯৯৯ সালের ১—১৫ আগস্ট সংখ্যায় এক্স ফাইল বিভাগে এই সংশ্লিষ্ট রিপোর্টটি ছাপা হয়েছিল।

দেখা হওয়ার পর থেকে ফালু মিয়াকে কখনো ভুলতে পারি নি। তাঁর জন্য গভীর একটা মায়া অনুভব করি সব সময়।

 

১০ লাখ ৩৩ হাজার টাকা… কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্দোষ জীবনের ২২ বছর এবং ফালু মিয়া

তৃতীয় সাবজজ আদালত, জিলা ঢাকা
পপার মিস কেস নং—২১/৯৫
ফালু মিয়া, পিতা মৃত— লাল চাঁন, সাকিন—সালিপুর, থানা—সাভার, জিলা—ঢাকা।
… বাদী

বনাম
১। বাংলাদেশ সরকার, পক্ষে— সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সচিবালয়, থানা—রমনা, ঢাকা।
২। মহা—পুলিশ পরিদর্শক (আই জি পি), পুলিশ সদরদপ্তর, ঢাকা।
৩। মহা—কারা পরিদর্শক, কারা অধিদপ্তর, ঢাকা।
৪। জেলা প্রশাসক, ঢাকা কালেকটরেট ভবন, থানা—কোতয়ালি, ঢাকা।
৫। জেল সুপার, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কোতয়ালি, ঢাকা।
… বিবাদী

ক্ষতিপূরণ অর্থ আদায়ের মোকদ্দমা। মোকদ্দমার তায়দাদ ১০,৩৩,০০০ টাকা।

ফালু মিয়াকে নিয়ে অনন্যা পত্রিকার রিপোর্ট

ফালু মিয়াকে নিয়ে অনন্যা পত্রিকার রিপোর্ট

ডেট লাইন ২৭ আগস্ট ১৯৭২
একটি জীবন যখন বেদখল হয়ে যায়
মুক্তিযুদ্ধ ফেরত দিনমজুর ফালু মিয়া। চিতাবাঘের মতো ক্ষিপ্র এক কর্মী—পুরুষ। ’৭২ এর ২৭ আগস্ট তিনটি ডাকাতি মামলায় সাভার পুলিশ সন্দেহবশত গ্রেফতার করে তাকে। ঘরে তখন তিন মাসের ‘সংসার’। গর্ভবতী। এরপর অবিশ্বাস্য ক্রান্তিকাল। ডাকাতি কেসগুলোয় দুটিতে ফাইনাল রিপোর্ট হয়। কোর্ট ফয়সালা হতে থাকে। আসামি তালিকায় ফালু মিয়ার নামই ছিল না। কিন্তু মুক্তি পায় না ফালু মিয়া। তৃতীয় মামলায় সাত (৭) বছর পর বিচার শুরু হয়। বাদীপক্ষ অর্থাৎ পুলিশ উল্লেখ করতে ভুলে গিয়েছিল যে, তদন্তে ফালু মিয়া নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৭৮ সালে সামরিক আদালত অন্য অনেকের সঙ্গে ফালুকে ১২ বছর কারাদণ্ড দিয়ে দেয়। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পায় না ফালু মিয়া। সশ্রম কারাদণ্ডে জেলে কার্পেট বুনে চলে সে। তথাকথিত ‘সাজা’ শেষ হয়। তারপরও বন্দিত্ব চলে ফালু মিয়ার।

এভাবে ১৯৯৩—এর ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত ২১ বছর ৮ মাস কারাগারে কেটে যায় ফালু মিয়ার। ফালু মিয়া যার জন্য যুদ্ধ করেছিল সদ্য স্বাধীন সেই বাংলাদেশ ততদিনে তরুণ হয়েছে। আর ফালু মিয়া হয়েছে ৬০ বছরের বৃদ্ধ। নির্দোষ কারা জীবনের যন্ত্রণায় আর সেখানকার শারীরিক শ্রমে ফালুর একটি কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে। হয়েছে যক্ষা।

’৯৩-এ যখন তিনি মুক্তি পান তখন বাংলাদেশ জুড়ে হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। ইন্টারভিউ দিতে দিতে টায়ার্ড ফালু মিয়া একটি কথাই বলতেন,‘আদালত, পুলিশ আর কারা কর্তৃপক্ষের অমনোযোগিতা ও অদক্ষতার কারণে আমার জীবনের ২২টি বছর হারিয়ে ফেলেছি।’

মুক্তির সময় ফালু মিয়ার কোনো মামলারই বিস্তারিত কাগজপত্র পাওয়া যায় নি। জেলে থাকা অবস্থাতেই ফালু মিয়ার বাবা, মা, চাচা সবাই মারা গেছে। বৌ চলে গেছে, সন্তানের খোঁজ ছিল না। ছিল না কোন স্থাবর সম্পত্তিও। ফালু মিয়ার খোঁজ রাখে নি নিকটাত্মীয় কেউ। কারণ তার গ্রেফতারের কথা কেউ জানতো না। জেল থেকে যোগাযোগও করতে পারেন নি ফালু। চিঠিপত্র লিখতেন। লাল দেয়াল পেরিয়ে সেগুলো আর সাভার পৌঁছতো না।

২২ বছরের জেল জীবনে ফালু মিয়াকে কোর্টে হাজির করা হয় মাত্র তিন বার। সুযোগ পেলেই জেল কর্মকর্তাদের হাতে—পায়ে ধরতেন তিনি। কিন্তু ‘বিজ্ঞ বিচারকের দরবার’ পর্যন্ত পৌঁছানো হয় নি তাকে। ২৪—১১—৯৩—এ ফালু মিয়ার মুক্তি সম্ভব হয়েছিল মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার আইনজীবী এলিনা আজিজ ও জনৈক মতিন সাহেবের বিশেষ উদ্যোগে।

ফালু মিয়ার অবৈধ ও বেআইনি আটকাদেশ সম্পর্কে উপরোক্ত মানবাধিকার সংস্থা ১৯৯৪—এর ২৮ মার্চ ১০ লাখ ৩৩ হাজার টাকার একটি ক্ষতিপূরণ মামলা দায়ের করে। কীভাবে টাকার এই অংশ হিসাব করা হলো সেটা এক কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার। মোকদ্দমার ৫ নং পাতা থেকে উদ্ধৃতি… বিবাদীগণের কর্তব্যে অবহেলা ও অদক্ষতার দরুন বাদী তাহার জীবন হইতে স্ত্রী হারাইয়াছে, স্ত্রী থাকিলে সন্তানাদি আসিতো এবং একটি সুখি জীবন যাপন করিতে সক্ষম হইতো–সে স্বামী ও সম্ভাব্য পিতা হইতে বঞ্চিত হইয়াছে। যাহার জন্য বাদীর মানসিকভাবে অপূরণীয় ক্ষতি হইয়াছে, তজ্জন্য বিবাদীগণ ক্ষতিপূরণ করিতে আইনত বাধ্য। বাদী গ্রেপ্তার ও জেল পূর্ব জীবনে দিনমজুর (কামলা) রূপে কাজ করিয়া দৈনিক ২০ টাকা আয় করিত তথা মাসিক আয় ৬০০/- ও বাৎসরিক আয় ৭,২০০/- টাকা তৎসহ পোশাক—পরিচ্ছদ বাবদ ভাতা হিসাবে বাৎসরিক ৫০০/০০ টাকা, মোট বাৎসরিক ৭,৭০০/০০ টাকা গণ্য, অবশ্য জেলে থাকাকালীন সরকার খাওয়া দিতো বিধায় বাদী তদদরুন কোনো খরচ বা অর্থ দাবী করে না। বিবাদীগণের কর্মচারীর অযোগ্যতা ও দুর্নীতিপরায়ণতায় এবং খামখেয়ালি কাজের জন্য বাদী তাহার সুন্দর সুখী জীবন হইতে ২১ বছর ৮ মাস হারাইয়াছে— বাদীর দৈনিক মজুরি ক্রমশ বৃদ্ধি পাইতো, কিন্তু বাদী দাবী করে না। যাহা কোনো অবস্থায় আর ফিরিয়া আসিবে না। আত্মীয় স্বজন হারা হইয়া বাদী অমানবিক জীবন যাপন করিতে বাধ্য হইয়াছে। বাদী তাহার মাসিক উপার্জন ক্ষতির জন্য বিবাদীগণের নিকট বার্ষিক গড় ৭,৭০০/০০ টাকা (৭২০০+৫০০) হিসাবে ২১ বছর ৮ মাসের ধরুন ১,৬৬,৮৩৩.৮০ টাকা পাওনা হইয়াছে এবং স্ত্রী আত্মীয় স্বজন সংসার ও যৌবনকাল হারানো ও অবৈধভাবে গ্রেপ্তার ও বিনা অপরাধে ২১ বছর ৮ মাস আটক থাকার ফলে মানবিক ও নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ায় ক্ষতিপূরণ বাবদ ১০,০০,০০০/০০ (দশ লক্ষ) টাকা ধার্য্য করা হইয়াছে একুনে ১০,৩৩০০০/০০ টাকা ধার্য্য ও পাওনা হয় যাহা বিবাদীগণ একক বা যুক্তভাবে পরিশোধে বাধ্য। …ফালু মিয়া মুক্তি পেয়েছে ৬ বছর হলো। কিন্তু ক্ষতিপূরণ সে পায় নি। মামলার তারিখ পড়লেই সরকার সেদিন গরহাজির থাকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আদালতে ক্ষতিপূরণ মামলার যে জবাব দাখিল করেছে তাতে এখনো উল্লেখ করা হচ্ছে যে, ফালু মিয়া একজন কুখ্যাত পেশাদার ডাকাত।

ফালু মিয়া: ডেট লাইন ১৯৯৯
ফালু মিয়া আজও ক্যামন সুন্দর বেঁচে থাকতে চান
ফালু মিয়ার বর্তমান স্ত্রী মনিরা কিছুদিন হলো আজমপুরের মা ও শিশু ক্লিনিকে চতুর্থ শ্রেণীর একটা চাকরি পেয়েছে। এক হাজারের বেশি বেতন দিতে কিছুতেই রাজি করানো যায় নি। আপাতত ও—ই। গতকাল রাত আটটায় অফিসে গেছে সে। পুনরায় তাকে কাছে পেতে আজ রাত আটটা—নয়টা বেজে যাবে ফালু মিয়ার। মনিরা গত বিকেলে যে রুটি করে রেখে গিয়েছিল আজ দুপুরে খাওয়ার জন্য, তা থেকে খানিকটা খেয়ে তারপর আজকাল যে রকম হয়, গা গুলিয়ে গলায় বেঁধে গেল। তক্তপোষের বাঁ শিয়রে রাখা পাত্র থেকে পানি খেয়ে চিত হয়ে শুয়ে রইলেন তিনি। নিঃশ্বাস নেয়ার সময় তার হাড় উপচানো-কুঁচকানো পাতলা চামড়ার বুক থমকে থমকে তাকে তবু আজ সাহায্য করে!

ফালু মিয়া আয়ত্তগত তাবৎ কৌশল ব্যবহার করেও তা থেকে নিস্তার পান না। দুপুর গড়িয়ে খানিকটা সামনে এগিয়েছে তখন। আজমপুর থেকে চার টাকা রিক্সা ভাড়ায় আঁকাবাঁকা সরু পিচঢালা রাস্তার দু’পাশের অত্যাধুনিক ডিজাইনে নতুন গড়ে ওঠা বিলাসবহুল বাড়িগুলো পেছনে রেখে জয়নাল মার্কেটে যাওয়া যায়। দোকানপাট অবশ্য খুব একটা বেশি নেই। পূর্ব দিকের গলির একেবারে মাথায় পৌঁছে ডান দিকে বাগানের মধ্য দিয়ে চিকন কাঁচা মাটির রাস্তা দিয়ে যেতে হয় নূরু দেওয়ানের বাড়ি। এখানে চারশো টাকায় বাঁশের চাটাই ঘেরা টিনের ছোট্ট এক ঘরে ফালু মিয়া ভাড়া থাকেন। থাকেন না বলে তাকে রাখা হয় বলাই সঙ্গত। এই বাসার ভাড়াসহ তাবৎ খরচ—ই তো বহন করে তার স্ত্রী। ফালু মিয়া তখন শুয়ে ছিলেন।

জিয়া বিমান বন্দর পেরিয়ে আমাদের সংগৃহীত ঠিকানামতো ফালু মিয়ার ঠিকানা মিলছিল না কিছুতেই। বাসার নাম্বারও পড়ে নি এদিকে। শফিক নামের তরুণটি নিজ থেকে আগ্রহী হয়ে উত্তর পাড়ার প্রতিটি বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেছিল। আমরা রেল লাইন ধরে হেঁটে জয়নাল মার্কেটের দিকে ফিরে আসছিলাম। রেল লাইন থেকে বাঁয়ে ঘর উঠে যাওয়া একটা ভিটের উপর ছোট্ট চালের দোকান। তিন/চারজন লোক বসে কথা বলছিল নিমগ্ন হয়ে। ওরাও চিনতে পারলো না, কিন্তু লাল শার্ট পরা যুবকটি তার স্মৃতির সঙ্গে আমাদের তথ্য মিলিয়ে নিচ্ছিল। কোথাও মিলছে কোথাও মিলছে না। আমরা আশার মুখ দেখলাম।

‘হালু ?’

‘না ফালু মিয়া।’

‘বিনা বিচারে বাইশ বছর জেলত আছিল, পাঁচ/ছয় বছর আগে বাইরাছে। আগে সাভার বাড়ি আছিল?’

অনন্যা পত্রিকার সে সংখ্যা

অনন্যা পত্রিকার সে সংখ্যা

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। ঠিক ধরেছেন। জানেন নাকি সে এখন কোথায় থাকে?’

‘জয়নাল মার্কেট যাইয়া পুব দিকে গেলে দেখবেন গ্রিল দেওইননা একটা জায়গা। একটা ভূষির আড়ৎ। হেইয়ানো হারাদিন বয়। যান পাইতে পারেন।’

ওদের রেখে আমরা চলে আসি। লাল শার্ট পরা যুবকের মুখমণ্ডল জুড়ে চাপা উত্তেজনা, পেছনে সে সঙ্গীদের ফালু মিয়ার জীবন কাহিনি শোনাচ্ছে।

আমরা ভূষির আড়ৎ পেয়ে গেলাম। ফালু মিয়াকে চেনে এমন লোক পেয়ে গেলাম। সে আমাদের নূরু দেওয়ান বাড়ি নিয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগেই ফালু মিয়া বাড়ি ফিরে এসেছে। প্রদর্শকের সঙ্গে মাটির স্তূপের সিঁড়ি বেয়ে আমরা তার ঘরে ঢুকি। ছোট্ট এক রুমের টিনের ঘর। মেঝেটা মাটির। ঘরের মূল অংশে একটি কাঠের চৌকি। তাতে কাঁথা বিছানো, দুটো তেল চিটচিটে বালিশ। ইতস্তত ছড়ানো নিত্য ব্যবহার্য কয়েকটি আসবাব। কিছু আছে কিংবা যেন কিছুই নেই। ঘরে অসম্ভব অস্থিরতার ক্রন্দন পরিবেশ খেলা করে। গুমোট গরম হাওয়া। দু’মিনিটের মধ্যে আমরা ঘেমে উঠলাম। আমাদের ঢুকতে দেখে শয্যা ছেড়ে উঠে বসেছেন একজন বৃদ্ধ। তার চেহারা আর সব বৃদ্ধের মতো নয়। বৃদ্ধদের যেসব রোগ-শোক হয় বয়োঃবৃদ্ধির জন্য এর ওপর সেসব ছাড়াও মানুষের অমানবিকতা, অবহেলা, নির্বুদ্ধিতা, নিষ্ঠুরতার এক ভিন্ন ইতিহাসচিহ্ন প্রবাহিত।

মোলায়েম গলায় কুশলাদি জিজ্ঞেস করে কথা বলা শুরু করলাম। ঢাকাইয়্যা ভাষার কথোপকথন।

এই লোকটির নাম ফালু মিয়া। তিনি এখন কথা বলছেন। আশ্চর্য হয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে থাকি। স্মরণকালে এতো মনযোগী হওয়ার মতো আর কিছু খুঁজে পাওয়া যায় নি। ফালু মিয়া আজো কথা বলেন, এখনো তার অভিসম্পাত আছে, ঘৃণা বেঁচে আছে। মানুষ বলেই হয়তো আছে। কিন্তু তার অনুভূতির কারণে এবং নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতার নিষ্পেষণের সঙ্গে নিশ্চয়তাহীন বর্তমান এবং বাকি জীবনের সঙ্গে মিলিয়েই যেন বদলে গেছে তার বলার এবং জীবন দর্শনের ধরন।

বুঝতে পারি আর কোনো সহানুভূতি, প্রাপ্তি, আশ্রয় কিংবা অভিযুক্তদের যে কোনো প্রায়শ্চিত্যও তার ক্ষতির ক্ষত নিরাময়ের জন্য যথেষ্ট নয়। তার জন্য নতুন ও হেমন্ত বিকেলের প্রশান্ত সুবাতাস নিয়ে মায়াময় ফিরে আসবে না। অসভ্যতার অভিশাপবিদ্ধ ফালু মিয়ার জীবন নিরর্থক ও কষ্টে বন্দি।

ফালু মিয়া তার জীবনের কথা বলছেন আমাদের কাছে। অসম্ভব অনিচ্ছায় বলছেন। অন্য অভিজ্ঞতাগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে তিনি ধরেই নিয়েছেন এই বলায়ও কিছু হবে না। কোনো ফলোদয় ঘটবে না। তিনি বলছেন, যেন স্বগোতোক্তি, কোন আবেদন বা নির্ভরশীলতা নেই আমাদের প্রতি। তার কণ্ঠস্বরে নির্লিপ্ততা ও ভাবাবেগের মাঝামাঝি একটি পার্থক্যরেখা স্থির।

…হাজতে নিয়া মাডার কেইসের আসামি কইরা দিলো। কইলাম লাখ লাখ মাডার অইচে এই দেশে। কোন কেইসের আসামি আমি। কইলো এই মাডার একাত্তরের মাডার না। জমিন লইয়া মাডার। কইলো আমি নাকি ডাকাইত। মুক্তিযোদ্ধাগোরে যেই সার্টিফিকেট দিছিলো ধইরা আননের সময় পুলিশেরা ছিঁইড়া হালাইছিল। কইলাম ছিঁইড়া হালানোর কথা। হেয়ারপর খালি তিন দিন হাজিরা দিতো নিছিল। তারপর জেলো গেছে বাইশ বছর। কিছু না জাইননা না বুইজঝা বাইশ বছর জেলো আছিলাম। কতো জনের কতো পাও ধরছি—বড় বড় অফিসার কইছে হইবো হইবো, বাইর কইরা দিমু। হোম মিনিস্টারও গেছে দুইবার। তার আত—পাও ধরছিলাম, অন্য হাজতিরাও কইছে। হুদাহুদি কষ্ট দিছে আমারে। আমার আত্মীয়স্বজনেরা কেউ জানতো না আমার খবর। তহন বাহাত্তর সাল। তারা মনে করছে রাজাকারেরা মাইররা ফালাইছে আমারে। আমি চিঠি দিলে জেল মাস্টারে ছিইড়া ফালাইয়া দিতো। বাইর হইয়া কাউরে পাই নাই। মা মরছে, বাপ মরছে, বড় একটা বইন আছিল সেও মরছে আমি জেলো থাকতেই। বউ থুইয়া গেছিলাম এক বছরের মাইয়া লইয়া। বিয়া বইয়া গেছেইগগা। মাইয়ার খবরও জানি না। জেলো পাট দিয়া চট বানাইতাম। পঁচা পাটের গন্ধেই মনেয় একদিন বাঁ তল পেডে হুইচ থুইয়া চটলে যেমন গাঁতে হেমন কষ্ট অইলো, স্বাস্থ্য ভালো আছিল পাত্তা দেই নাই। জেলখানার হাসপাতালো লইয়া গেলো। তহনই আমার বাম কিডনিডা নষ্ট অইয়া গেলো। দিনে দিনে শুকাইয়া গেলাম। জেলে বছরে একদিন পুরানা কাগজ নাড়াচাড়া হয়। কাগজ হালানোর সময় এলিনার চোহ পড়ে আমার কাগজ, হেই রাইত-ই আমারে বাইর কইরা আনে মানবাধিকার মতিন সাহেবসহ। আহারে মতিন সাহেব অনেক ভালো মানুষ আছিলো। আমি তো বেডা মানুষ, কই রাখবো? বিজয় নগরে ফিল্ম অফিসে রাখছিলো পনরো দিন। হেয়ারপর এইহানেক আইননা এলিনা এই বেডির লগি বিয়া দিছে। অয়ই কইরা পিড্ডা খাওয়ায় আমারে। অহন একটা মেডিকেলে চাকরি লইছে ঐহানো। মনিরা নাম। আগের ঘরের এক পোলা আছে। আমারে বাপের মতন জানে। অয়ই মাঝে মইধ্যে আইয়া ৫০/১০০ টাকা দিয়া কয় চান-পান খাইবা, নইলে মইরা যাইবা। কি কমু, পরের পোলা, পশশু আইছিলো, পকেটো ৪০ টাকা আছিল, ২০ টাকা দিয়া গেছে। ট্যাক্সি চালাইয়া আর কয় টাকাই পায়। তবু যা পারে দিয়া যায়।

‘কেসটা এখন কোন অবস্থায় আছে?’

মইরা গেলে রায় অইবো আরকি। বাইশ বছর জেলে থাইকা ছয়/সাত বছর অইলো বাইরাইছি। আমি আশা ছাইড়া দিছি। কতো মানুষ আইয়ে। টেলিভিশনো দেহাইছে, পত্রিকার সাংবাদিক আইয়ে, ছবি তুইলা নেয়, লেইককা নেয়। কী আরে আমি জানি না। রাগ কইরা অহন আর আমি দিতাম যাই না। এলিনা ডাকলে মনে কইলে যাই নাইলে কইয়া দেই যামু না, অসুখ।

মানবাধিকার কর্মীরা আগে ডাইকা নিতো। এখন গেলে কতাও কয় না। কয়, আইছেন, ওহ,… বহেন কামাছে। হেরেগো মইধ্যে কোন মানুষের আত্মা নাই। কয়দিন সাহায্যের কতা কইয়া মতিঝিল লইয়া গেছে। আমারতন চাইর—পাঁচটা দস্তখত নিলো, তিন কপি ছবি নিলো, দুইজন উকিল দেখলাম কতা কইয়া বাইর অইয়া গেল। আমারে এমন একটা বাইককো কইলো না যে, যান বা থাহেন, কিছু না। আমি রাইত নয়টা নাগাইদ বইয়া রইলাম। শেষে হেই অফিসের একজনেই যাইতাম গা কইলো। আমি একলা একলা আইছি। হেই বিল ওরা উডাইয়া খাইয়া ফালাইছে বোধহয়। তয় ক্ষতিপূরণের ১০ লাখ অহনো খাইতে পারে নাই…

আজমপুরে সাংবাদিকতার পর
বিনা বিচারে ২২ বছর জেল বাস কাটিয়ে মুক্তি পেয়ে এসেছেন ছয়/সাত বছর হলো। বর্তমানে তার দিন কাটছে অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্টে। তিনবেলা খেতে পারে না। অথচ একদিন তিনি উপার্জনক্ষম ছিলেন। ছিলেন শক্ত—সমর্থ দিনমজুর। গাড়ি চালাতেন ইচ্ছে হলে। তাকে এমন অসহায় কেন করে দেয়া হলো কোনো অপরাধ ছাড়াই।

ফালু মিয়া

ফালু মিয়া

ডেট লাইন : ১৮ জুন ২০১৪
ফালু মিয়ার মৃত্যুর দশ বছর পর
ফালু মিয়ার মৃত্যুর খবর আগেই জানা ছিল। মামলাটির খোঁজ নেয়ার জন্য যোগাযোগ করি এ্যাডভোকেট এলিনা খানের সঙ্গে। ফালু মিয়ার নাম বলা মাত্রই তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ তাকে বের করেছিলাম। প্রায় ২২ বছর বিনা বিচারে জেল খেটেছিলেন। বের করে বিয়েও দিয়েছিলাম। চিকিৎসা করার ব্যবস্থা করেছিলাম। ক্ষতিপূরণ মামলা করেছিলাম। দ্বিতীয় সাক্ষ্যের সময়ই তিনি মারা যান। অনেক ডিলে হয়ে গিয়েছিল। আমরা দশ লাখ টাকার কিছু বেশি চেয়েছিলাম। সরকার অবজেকশন দিয়েছিল। মারা যাওয়ার পর তার উত্তরাধিকার হিসেবে স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণের টাকা পাইয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছি। একবার আদালত তিন লাখ টাকা দেয়ার রায় দিয়েছিল। কিন্তু সরকার পক্ষ তাতেও অবজেকশন দেয়। আদালত বলে, ৭২ সালের ঢাকার ডিসি, এসপিকে নিয়ে আসতে। সেটা কোন ভাবেই সম্ভব ছিল না। এর মাঝে ফালুর বৌ গ্রামে কোথায় চলে গেল আর ওয়ান ইলেভেনে পরিস্থিতি চেঞ্জ হয়ে গেল। আমিও প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে দিলাম।…’

‘মানে একটাকা ক্ষতিপূরণও পাননি তিনি?’

‘না।’

 

About Author

ফয়সল নোই
ফয়সল নোই

কবি। চীফ রিপোর্টার, চ্যানেল আই, ঢাকা, বাংলাদেশ।