page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

ফুকো, ফিফা, র‍্যাব ও অন্যান্য

ড্রিম জার্নাল লিখতেছি বহুদিন ধরে। স্বপ্নটপ্ন যাই দেখি ঘুমের মধ্যে, সেইগুলা লিখে রাখি। স্বপ্ন যেহেতু খুব প্রাইভেট আর পার্সোনাল, এই লেখাগুলারে আমার স্ক্যান্ডাল ভিডিওর মতো ভাবা যাইতে পারে। সব ফাঁস কইরা দিলাম নিজেই। স্বপ্নগুলায় সেক্স আছে, ভায়োলেন্স আছে, কিছুই-নাইও আছে। অবদমনও থাইকা থাকতে পারে। স্বপ্ন, সব মনে থাকে না। ফলে একটু কাহিনীরও সম্ভাবনা আছে। আবার সব হারায়া যায়, তাও না। ফলে, এমনিতেই গল্প গল্প হওয়ার চান্স আছে। তো, আমার এইসব মনে-না-থাকা ও হারায়া-না-যাওয়া স্বপ্নগুলাই শব্দকল্পড্রিম

chingkhai-logo

 

ফুকো

হোয়াইটবোর্ডে মার্কার দিয়ে লিখি ‘মিশেল ফুকো’। তার ডাননিচে লিখি ‘সলিমুল্লাহ খান’। তারপর পিছন ফিরে সবার দিকে তাকাই। পুরো ক্লাসরুমে জনা বিশেক হবে। ছড়ায়া ছিটায়া বসা ছোট ছোট গুচ্ছে।

আপনারা তালাল আসাদের নাম শুনছেন?

নিরুত্তর নিরবতা।

fokuআচ্ছা কে কে শুনছেন হাত তোলেন।

অল্প অল্প পজ দিয়ে হাত তোলার সময় দিয়ে তারপর তোলা হাতের সংখ্যা গুনতে গুনতে তারপর আবার আরেকটু পজ দিয়ে হাত নামাবার সময় দিয়ে দিয়ে আমি বলতে থাকি, …তালাল আসাদ? …গায়ত্রী স্পিভাক? …মিশেল ফুকো? …সলিমুল্লাহ খান? …ফরহাদ মজহার? …ব্রাত্য রাইসু? …

হাঁটতে হাঁটতে দেখি একদম পিছনের সারিতে বসা দুই হামবুড়ো। এক তৈমূর স্যার। দুই সলিমুল্লাহ খান। (আরেকজন ছিল মেবি। মুখটা ভালো করে খেয়াল করি নাই। ডিএফডব্লুউ মেবি।) এই কচিকাঁচার মেলায় তারাও দেখলাম খুব আগ্রহে হাত তুলতেছেন মিটি মিটি হাসিমুখে। তৈমূর স্যার পা ছড়ায়া বসছেন খুব ক্যাজুয়ালি। সলিমুল্লাহ খান ভ্রূ কুঁচকায়া ঘাড় তুইলা চশমার চিপা দিয়া তাকায়া আছেন।

আমি অ্যাবসার্ড খাই। এক অনন্ত ব্লিকনেসে তলায়া যাইতে থাকি।

 

ফিফা

স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলা। জয়কে দেখি বহুদিন পর। বাট হাই হ্যালো হয় না। ফলে ঠিক দেখা হয় না আমাদের। স্কুলের মাঠেও বহুযুগ পর খেলা। ঘাসকাঁদার আমাদের স্কুলমাঠ। পাশেই মসজিদ।

যাই হোক। বিপক্ষ দলে যথারীতি সে-ই গোলি।

খেলা শুরু হইলে আমারে কে জানি বল বাড়ায়া দেয়। আমি আর গোলি শুধু। ওয়ান-অন-ওয়ান। আমি ঠাণ্ডা মাথায় প্লেসিং করি। জয় তাকায়া তাকায়া দেখে শুধু। গোল! আমার সেই আগের ধার এখনও আছে! ওয়াও!

fifaকিছুক্ষণ পর আবারও আমরা মুখোমুখি। এইবার আমার মাথা ঠাণ্ডা নাই। আমি জানের জোরে শট মারি। নাটমেগ হয়ে যায়। বল জয়ের পায়ের ফাঁক দিয়ে জালে। আমি তো অবাক। ভাবি, শটের পাওয়ারের কারণে নিশ্চয়।

আরও কিছুক্ষণ পর আবারও সেইম সিচুয়েশন। আমি আর জয়। তীব্র শট। নাটমেগ। গোল।

আমি আর জয়। শট। নাটমেগ। গোল।

আমার মনে হয় শেষ দুইটা সিচুয়েশনে আমি এমনটা চাই নাই। বাট শট নিলেই আপনাআপনি গোল হইতেছিল। যেন কেউ আমার শট নিয়ন্ত্রণ করতেছে। বোধহয় আমার পুরো খেলাই।

আমি মনে মনে খুব চাইতেছিলাম কেউ যেন গেইম সেটিংয়ে ঢুইকা কন্ট্রোলার সেটিং ফুল ম্যানুয়াল কইরা দেয়। আমার খুব চান্স মিস করতে ইচ্ছে করতেছিল। ইচ্ছে করতেছিল কয়েকটা শট বারের উপর দিয়া মারি। কয়েকটা জয়ের ডানে-বায়ে, কিংবা গোলবারেরও বাইরে, কিন্তু সোজা না, ওর পায়ের ফাঁকে না।

আমি কি কাঁনতেছিলাম?

 

র‍্যাব

হাঁটতেছিলাম আমরা। আমি আর একটা র‍্যাব। গন্তব্য সুনির্দিষ্ট। বাট পৌঁছাইতেছিলাম না।

আমরা বাইরে আড্ডা দিতেছিলাম। রাতের বেলা। কে কে তা খেয়াল করি নাই। রাস্তায় দাঁড়ায়া গল্প করতেছিলাম। জায়গাটা কোথায় তাও জানি না। হঠাৎ একটা সিভিল ড্রেস পড়া র‍্যাব আইসা খপ কইরা ধরে আমার হাত। বলে, আপনাকে যেতে হবে। গাড়িতে ওঠেন। দেখলাম আমি একা না। আমাদের বাকি সবাইরেও ধইরা নিয়া যাইতেছে। একটা ডিসটোপিয়ান জগৎ হইয়া উঠতেছে চারপাশ। দুনিয়ার সবাইরে ধইরা নিয়া যাইতেছে র‍্যাব।

rabহাঁটতে হাঁটতে র‍্যাবের সাথে আলাপ হয়। লোকটা দেখলাম কঠিন না। নরম আছে।

তারে জিজ্ঞেস করি আমার কি কোনো চান্স নাই। যে আমি নিজেরে প্রমাণ করতে পারব আমি নিরপরাধ। ইনোসেন্ট।

সে নির্বিকার।

আচ্ছা না হয় গেলাম। কিন্তু আমার তো অনেক ঝামেলা। কিছু ইমার্জেন্সি আছে। সেইগুলা কেমনে ম্যানেজ করব।

র‍্যাবের আগ্রহ দেখলাম না। তাও ঝামেলাগুলা বলা শুরু করলাম। এক। মেসের চাবি আমার কাছে। আমরা ৩ জন থাকি। ফলে বাকি ২ জন ঢুকতে পারবে না। দুই। কলেজের ডর্মে আমি মাত্র উঠলাম। ৩ দিন প্রবেশন পিরিওড। আজকে থার্ড নাইট। আজকে যদি বাইরে কাটাই তাইলে আমি শেষ।

র‍্যাব দেখি নির্বিকার। সে আমার প্রবলেমগুলা বুঝছে। কিন্তু কোনো হেল্প করতে পারবে না। এমন একটা ভাব। সো আজকে রাতটা হাজতেই কাটাইতে হবে। এইটা মাস্ট। যা দেখার তা কালকে দেখা যাবে।

তো স্বপ্নের শুরু থিকা আমি আর একটা র‍্যাব হাজতে যাব বইলা কেবল হাঁটতেই আছি।

 

ওড়া

আমি উড়তেছিলাম। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট উচ্চতায় আটকায়া ছিলাম। তার উপরে আর উড়তে পারতেছিলাম না। যেন নাটাই এর সুতা শেষ। কিংবা থাকলেও আর ছাড়া হইতেছে না। ফলে আমি একটা জায়গায় ঘুরপাক খাইতে থাকতেছিলাম। নাইমা আসতেও পারতেছিলাম না।

সে ক্রিকেট খেলতেছিল। বোলিং করতেছিল। ডিপার্টমেন্টের বারান্দায় বোধহয়। দুধ দেখা যাইতেছিল তার। মানে আমি দেখতেছিলাম আর কি দূর থিকা। দুধ মানে ঠিক দুধও না। দুধের শেইপ। জামার উপর জাইগা থাকা। তার বুক ফেইসবুকে ছবিটবিতে দেইখা বা অত কিছু দেখা না যাওয়ার ফলে যত ছোট লাগে, সে তুলনায় বড়ই মনে হইছে।

oraআমি বোধহয় একটা সুপারম্যানের জামা পাই। বা অই রকম কিছু একটা। যার ফলে আমি উড়তে পারি। তবে জাস্ট নিরাকার ভার্চুয়াল পাওয়ার না সেইটা। সাকার কিছু একটা। যেইটা আমি হাত দিয়া ধরতে পারতেছিলাম। জামার মতো। বা জামাই। যেইটা লাগাইলে আমি উড়তে পারি। তো সেইটা লাগায়া আমি উড্ডয়নের ট্রায়াল দিব দিব এমন একটা ভাব করতেছিলাম। তখন দেখি তারে।

এই সিনটা আমাদের স্কুল বিল্ডিঙের সেটিংয়ে। বারান্দাঅলা অনেকগুলা ক্লাসরুম। তার সামনে ছোট ছোট চৌকোণা মাঠ। এই রকম লাগতেছিল। ঠিক কাটাকুটি খেলার নয়টা ঘরের মতো। শূন্য ঘরগুলা মাঠ। আর দাগগুলা বারান্দা অলা ক্লাসরুম। লম্বা লম্বা টানা বারান্দা।

তো সেইটা দিয়া হাঁইটা যাইতেছিলাম আমি। তখন দেখি তারে। দেইখা আমি ওর সামনে দিয়া হাঁইটা যাই। আমাদের চোখাচোখি হয়। সে দেখে আমারে। আমি তার সামনে দিয়া উইড়া যাইতে চাইলাম। তারে দেখায়া দেখায়া। উড়লামও।

কিন্তু কীভাবে উড়তেছিলাম মনে পড়তেছে না। মানে আমার পশ্চার কেমন ছিল সেইটা মনে নাই। তবে পাখির মতো দুই হাত মেইলা, মুখ নিচের দিকে রাইখা শুয়ে ছিলাম না। বাতাসের মধ্যে বইসা আছি এইরকম একটা ফিলিং হইতেছিল। বা দাঁড়ায়া দাঁড়ায়া উড়তেছিলামও হইতে পারে। কারণ আমার মুখ সোজা ছিল। আর আমি সামনের দিকটা দেখতে পাইতেছিলাম গাড়ি চালানোর মতো।

ওড়ার ফিলিংসটা অত স্পেশাল কিছু মনে হয় নাই আমার। মনে হইছে খুব স্বাভাবিক। যেন জন্মের পর থিকাই উড়তেছি আমি। খুব সহজ একটা ফিল।

যাই হোক। আমি ওরে দেইখা এবং দেখায়া দেখায়া স্কুল বিল্ডিংয়ের টানা বারান্দাগুলারে রানওয়ে বানায়া সোজা দৌড়াইতে লাগলাম। দৌড়াইতে লাগলাম। দৌড়াইতে লাগলাম। তারপর একসময় আস্তে আস্তে টেইকঅফ করলাম আর আকাশে ভাসতে শুরু করলাম।

কিন্তু সে কি আমারে দেখলো? দেখতেছে? দেখে?

 

কনভার্সেশন

তুমি ও তোমার মা। তোমরা দুজন। আমাদের বাসায়। যেন নতুন প্রতিবেশী। গত সপ্তাহেই আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে। কিংবা চাকরিসূত্রে তোমার বাবা আমার বাবা পরিচিত। কিংবা অন্য কোনো সূত্র। কিন্তু ব্যাপারটা খুব অবধারিত। এবং সহজ। যেন আমি জানি তুমি আসবে। যেন তুমি জানো তুমি আসবে আমাদের বাসায়।

তোমরা ছাড়া আমাদের বাসায় আমরা তিনজন। আমি, মা আর এক গুরুত্বহীন চরিত্র।

তুমি চুপচাপ বসা। তোমার মাকে, দেখলাম, আমি আন্টি ডাকি। মূলত মা ও আন্টি গল্প করে। বাকি চরিত্র এক একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। কেউ বসে থাকে চুপচাপ। কেউ মাঝে মাঝে পাশ কাটিয়ে হেঁটে যায়। কেউ কী করে তা আমরা বুঝতে পারি না। কিন্তু কারও মধ্যে কোনো মিথষ্ক্রিয়া নেই।

ফলে, সব শেষে, তোমাদের যাই যাই ভাব আসে। আন্টি আমাকে কাছে টেনে নিয়ে কানে কানে কী জানি বলেন। সবার সামনে। ফিশ ফিশ করে। আমি খুব মাথা নাড়তে থাকি। আমার মনে হতে থাকে আমি সব শুনছি।

আমি তোমাকে বলি, তোমার একটা প্রিয় গান বলো তো। তুমি মনে করার চেষ্টা করতে থাকো। বলোও মেবি ২টা। মনে নেই। কিন্তু আমাদের মিথষ্ক্রিয়া হয়। আর একটা ড্রামাটিক আইরনি পুরোটা জুড়ে। তুমি আমি জানি আমাদের ব্যাকস্টোরি। আমাদের ইতিহাস। ফলে আমরা মজা পাই। কিন্তু বাকি চরিত্র জানে না কিছুই।

যাই হোক। আমি ভাবতে থাকি অমুক গানটা কাভার করব। বোধহয় তোমাকে শোনাতে চাই মনে মনে।

তারপর ভেতরের ঘরে ঘুমাতে আসি। বিছানায় আমরা তিনজন। আমি এবং নতুন দুইজন। মাসহ আগের দুইজন উধাও। নতুন দুইজন অলরেডি ঘুমে। ওদের পাশে গিয়ে আমি শুয়ে পড়ি। শীতকালই তখন। নতুন দুইজনের গায়ে একটা পুরনো কম্বল।

আমি বোধহয় বাথরুমে যাওয়ার জন্য বের হই রুম থেকে। কিংবা আন্টি আমাকে ডাকেন। কারণ তোমরা চলে যাচ্ছো। আমি বের হই। তুমি একটা বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে আছো মোবাইল হাতে। আমাকে দেখে জানতে চাও ওরা ঘুমিয়ে Conversationগেছে কি না। আমি বলি, হ্যাঁ, ডাকবো? তুমি, না। জেগে থাকলে নাকি ডাকতে বলতে। বাট ঘুমে যখন, থাক। তুমি জানতে ওঘরে আমরা তিনজন ঘুমানোর কথা না। তোমরা থাকাতেই এই। অপরাধবোধ এবং ভদ্রতা কাজ করে তোমার ভেতর। আমি তোমাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করি। বলি, ব্যাপার না।

এইখানে লিনিয়ারিটি ভেঙে যায় বোধহয়। যেহেতু আগেই আমাদের যাই যাই ভাব এসে গেছে। অর্থাৎ আমাদের চলে যাওয়ার কথা আগেই। এবং তারপর মা অর্থাৎ তোমার আন্টি তোমাকে আবারও ডাকে বিদায় বিদায় কথার জন্য। অথচ তুমি বের হয়ে দেখো আমি খুব রিলাক্স হয়ে আছি। প্লাস রুম ডিস্ট্রিবিউশন নিয়ে আমার গিল্ট আছে। অর্থাৎ রাতে আমরা তোমাদের এখানে থাকছি। অর্থাৎ লজিকের কোনো পরম্পরা নেই। এবং আমাদের এই কথোপকথনই তোমার কাছে প্রথম লাগে। তোমার আমার। ঐ দিনের। অথচ আগেই আলাপ ও বিস্তার হয়েছে আমাদের। ফলে তোমরা একটা গোলকধাঁধাঁয় আটকা পড়ো। কিংবা লিনিয়ারিটি নিজেই একটা গোলকধাঁধা।

তারপরে আর তুমি নাই। বিছানায় আমরা তিনজন। আমি, একজন এবং অন্যজন। একজনের হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। এবং স্লিপ ওয়াকিংয়ের মতো কাণ্ড শুরু করে সে। আমি সাবধানে আবার বিছানায় এনে শুইয়ে দেই তাকে। অন্যজন, কিছুটা ভয় পেয়ে, কিছুটা এমনিতেই, অন্য রুমে চলে যায়।

তারপর বালিশের তলায় একজনের মোবাইলে অ্যালার্ম বেজে ওঠে ভাইব্রেশনসহ।

About Author

চিংখৈ অঙোম
চিংখৈ অঙোম

সিলেটবাসী, মনিপুরিভাষী। মনিপুরি ও বাংলায় কবিতা ও কাহিনী লিখি ও অনুবাদ করি। সিনেমা বানাই। কপিরাইটার ছিলাম। এখন সাহিত্য পড়াই।