page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

বনভোজন

paromita2014

হুঁট করে এই কথাটা মনে পড়ে গেল। যদিও এখন আর নাই, তবে তখন শীতকাল মানেই বনভোজন ছিল। অবশ্য বনভোজন কথাটা কখনো কাউকে বলতে শুনি নাই। বলত—পিকনিক, লিখত—বনভোজন। প্রত্যেক ব্যানারেই এই লেখাটা থাকতো—‘চল বন্দু গুরে আসি’ বা ‘চল বন্দু ঘুরে আশি’। সেই সাথে আরো দুই একটা ভুল বানান। কক্সবাজার-কে হয়তো লেখা ‘ককসোবাজার’, চাঁদা বানানে চন্দ্রবিন্দুই নাই, বান্দরবনকে ‘বানরবন’ অথবা আরো হাস্যকর কোনো ভুল। এই তো আমাদের ছোটবেলার দেখা ব্যানার।

logo paromita

পাড়ার গলিতে গলিতে ঝুলানো হত প্রতি শীতে। সবাই পিকনিকে যেত। হয় কাপ্তাই, নয় রাঙামাটি, নয় খাগড়াছড়ি, নয় কক্সবাজার। বন্ধুরা মিলে যেত, আন্টিরা মিলে যেত, আঙ্কেলরা মিলে যেত, নানারা মিলেও যেত। যেতে পারতাম না শুধু আমরা। আমরা মানে যারা কচিকাঁচার দল। যাদের বয়স দশ-এগারোতেই সীমাবদ্ধ।

আমাদের বাসা ছিল দামপাড়া এলাকার সবচেয়ে পুরাতন বিল্ডিংয়ের নিচের তলায়। সামনে বড় উঠান। উঠানের মাঝখানেই বরই গাছ। আর বাম পাশে এক বড় মাঠ। সেই মাঠে একটা মাত্র গাছ ছিল—এক পায়ে দাঁড়িয়ে, অর্থাৎ তিনি তাল গাছ। এবং আমাদের অতি প্রিয় কেননা তিনি যে লম্বা আর একলা! ভূত সংক্রান্ত বানানো সব গল্প তাকে নিয়ে যে বেশ জমতো!

আমার তখন বয়স খুবই কম। নয়-দশ বছর হবে। বড়দের সাথে খেলি মানে যারা ষোল-সতের। ক্রিকেট খেলি, ফুটবল খেলি, কানামাছি, গোল্লাছুট, বিঘ্ঘা, মার্বেল, ডাংগুলি, মালেক-বুলবুলি- সিঙারা এসবও খেলি। বিকালে মাঠে খেলি। আর সন্ধ্যায় উঠানে।
তারপর আস্তে আস্তে সবকিছু ভরাট হতে শুরু করল। সম্পত্তি ভাগ হতে থাকল। একদিন মাঠের মাঝখানে দেয়ালও উঠে গেল। দেয়ালের ওইপাশে টিনের বাড়ি, এইপাশে টিনের বাড়ি উঠতে থাকলো। খেলাধূলা সব উঠানেই। পরিসর সীমিত তাই অত বেশি খেলাও আর যায় না। আর চিৎকারও করা যায় না। বাড়ির লোকজনের ডিস্টার্ব হয়। ওই আধাসমাপ্ত টিনের ঘরগুলাতেও খেলাধূলা হত। খেলা মানে ইনডোর গেইম। উপরে টিনের চাল আর ভিতরে ইটের দেয়াল। চারপাঁচটা এক রুমের ঘর বানানো, দরজা জানালা নাই। সেইখানে ইট সুরকি সিমেন্ট রাখা। ওই লাল ইটের গুঁড়া দিয়ে আমরা নকল রান্না-বান্না খেলতাম।

এমন সময় আরেকটা শীতকাল আসল। আর পাড়ার মোড়ে মোড়ে বনভোজন লেখা ব্যানার ঝুলতে থাকল। সন্ধ্যায় এসব মোড়গুলিতে ছোকরাবয়সীরা ক্যারাম খেলে। খেলতে খেলতে তাদের আসন্ন পিকনিক নিয়ে আলাপ করে। তখন প্রতিদিন সন্ধ্যায় একবার করে ইলেকট্রিসিটি চলে যায়। ওই এক ঘণ্টা বাবা মা আমাদের খোঁজ নেয় না। কান ধরে পড়তে বসায় না। আমরা যা খুশি তা করতে পারি। আমরা তখন মিটিং করি। সন্ধ্যার লোডশেডিং মিটিংয়ে আমি প্রশ্ন তুললাম—সবাই পিকনিক করবে, আমরা করবো না কেন? চল আমরা পিকনিক করি!

এ অধিবেশনে কে আমার প্রস্তাবে ভেটো দেবে, আমি তা আগে থেকেই জানতাম। সে দিলও। প্রতিপক্ষের নাম আমার বড় বোন এবং সে আমার কুপ্রস্তাবে যারপরনাই বিরক্ত। আমাদের শক্তি সামর্থ্য নিয়ে সে প্রশ্নের পর প্রশ্ন তুলে গেল।

পিকনিক কোথায় হবে? আমরা কি বাস ভাড়া করে যেতে পারবো?

—আমরা কোথাও যাবো না। ওই যে টিনশেড বিল্ডিং উঠতেছে, মাঠের এইপাশে, ওইখানে পিকনিক হবে।

কী হবে? টাকা নাই আমাদের কারো কাছে।

—টাকা লাগবে না। ওইখানে চুলা ধরাব। আমাদের রান্নার হাঁড়ি-পাতিল দিয়ে রান্না করব।

আর রান্নার জিনিসপত্র? চাল ডাল তরকারি?

—সবাই যার যার বাসা থেকে চুরি করে আনবো।

আমার বড় বোনের খুবই অপছন্দ হইল এই চোরা পিকনিক আইডিয়া। কিন্তু উপস্থিত জনতা তখন চুরি আর পিকনিক দুইটারই মজা পেয়ে গেছে। সুতরাং আগামী শুক্রবার পিকনিক হবেই হবে। আমরা এর নাম দিলাম চোরা পিকনিক। আর পুরা একটা সপ্তাহ এইটার প্ল্যান-প্রোগ্রাম করতে থাকলাম। বড়দের সামনে আলোচনার জন্য এইটার কোড নেইম দেওয়া হইল—পিআইসি-এনআইসি।

আমার বড় বোন, ডানে। - লেখক

আমার বড় বোন, ডানে। – লেখক

সেই শুক্রবার সবচেয়ে বড় বেঈমানি করল আমার বড় বোন। সে তার সবচেয়ে সুন্দর জামাখান পরে পিকনিকে হাজির! এদিকে সবাই যে যার বাসা থেকে দুইটা আলু-একটা পিয়াজ-এক খাবলা চানাচুর ইত্যাদি নিয়া হাজির।

সমস্যা দেখা গেল চুলা জ্বালানোয়। চুলা জ্বালানো যে এত কঠিন কে জানতো! কয়েকটা ইট জড়ো করে, তার মধ্যে আমাদের পুরান বই খাতা কাগজ টাগজ সব দেয়া হইল। কিন্তু ম্যাচটাই আনে নাই কেউ।

পিআইসিএনআইসি-তে যারা অংশ নিছে তাদের মধ্যে বয়স সবচেয়ে কম আমার। আর চুরি বাটপারিতে সবচেয়ে বেশি দক্ষও হইলাম আমি। কটকটি খাওয়ার জন্য বাসার ভালো বাল্ব খুলে নষ্ট বাল্ব লাগায়ে রাখতাম। কটকটিওয়ালার সাথে চুক্তি ছিল। ভালো বাল্ব দিলে ডাবল কটকটি। তার কাছ থেকে নষ্ট বাল্ব ধার নিয়া রাখতাম। আর মা অফিস থেকে ফিরলে বলতাম বাল্ব নষ্ট। মা ভালো বাল্ব লাগাইত, আর আমি ওই নষ্ট বাল্ব দিয়া আবার কটকটি খাইতাম। আরো কত দুই নাম্বারি ব্যবসা ছিল আমার!

আমার বড়বোন ছিল মহাসুন্দরী। পুরা গলির ছেলেরা তার প্রেমে দিওয়ানা মাস্তানা। আর এইসব ভাইব্রাদারের কাছ থেকে কত যে চকলেট চুইংগাম মিমি খাইছি আমি—তার হিসাব নাই। কত চিঠিই না তারা আমারে দিছে আমার বোনরে দেওয়ার জন্য। অনেক গিফটও দিতো। আর সে সবই আমি মেরে দিতাম। চিঠিগুলা নালায় ফেলে দিতাম। আমার বোন কিছু টেরও পাইতো না। কারণ ওইসব গিফট আমি এক ভাইব্রাদারের কাছ থেকে নিতাম আর অন্য ভাইব্রাদারের কাছে কম দামে বেচে দিতাম।

তো আমি নেমে গেলাম চুরিতে। প্রথমে বাসা থেকে ম্যাচ চুরি করে আনলাম। পূজার আসনে প্রদীপ জ্বালানোর যেই ম্যাচ সেইটা আস্তে করে পকেটে ঢুকায়ে নিয়ে আসলাম। এরপর দেখা গেল চালের অভাব। সবাই মুঠোয় ভরে ভরে চাল আনছে। তাই যথেষ্ট চাল হয় নাই। এদিকে বাসায় যে ড্রামে চাল রাখে সেটা রান্নাঘরে। ছুটির দিন হওয়ায় মাও রান্নাঘরে। চাল আনার উপায় নাই।

বুদ্ধি বের করলাম দোকান থেকে চাল নিব। আমি সবসময় দুই পকেট ওয়ালা জিন্সের শার্ট পড়তাম। হাফ প্যান্ট পড়তাম চার পকেটওয়ালা। আর পাড়ার সব মুদি দোকানির সাথেই আমার ফাটাফাটি খাতির ছিল। সবচেয়ে কাছে ছিল প্রদীপ্পার দোকান। দোকানের প্রাচীন মালিক প্রদীপ গত হইছে অনেক আগেই। তবু সবাই ওই দোকানকে বলত প্রদীপ্পার দোকান। আমি হয়তো প্রদীপের নাতির নাতির সমান হব, তবু আমিও বলতাম প্রদীপ্পার দোকান।

তো সেই দোকানে ছিল তার ছেলের ছেলে টিটু। আমি দোকানে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়ায়ে থাকলাম। কারণ আমরা মানে বাচ্চারা যা যা কিনি সেগুলি ওর সামনেই সুন্দরভাবে সাজানো। নাবিস্কো চকলেট, ঝাল চকলেট, তাল বিস্কুট, ঝাল আচার, মিষ্টি আচার, বার্মিজ আচার, শন পাঁপড়ি—সবই তার সামনে। আর উপরে চিপস ঝুলানো, পলিথিনে ঝুলানো পাখির ডিম, নারকেলের সন্দেশ, দুই টিক্কা চানাচুর, আরো যা যা আমরা কিনি।

চালও সামনে রাখা। সিদ্ধ আতপ সবই। আর ভেতরের দিকে তাকে তাকে নানারকম জিনিস রাখা। সাবান, গোলাপজল, তেল এইসব। মনে মনে বুদ্ধি করলাম। দোকানদারকে ওই তাক থেকে কিছু নিতে হবে। সে আমার দিকে পিছনে ফিরে নিবে। আর আমি সেই ফাঁকে চাল নিয়ে পকেটে ঢুকায়ে ফেলবো। যেই ভাবা সেই কাজ।

বললাম, আংকেল একটা লাক্স সাবান।

সে লাক্স সাবান নিতে গেল। আমি চট করে আমার প্যান্টের চার পকেটে চাল ভরে ফেললাম। শার্টের পকেটেও। সে সাবান নিয়া আসল। বললাম, আমাদের বাকির খাতায় লেখেন। বলেই আমি দৌড়।

কিন্তু ওইদিকে তো আমার এই চুরি করা চালের পরিমাণ দেখে সবাই হতাশ। এত কমে নাকি কিছুই হবে না।

তো এইবার আমি কয়েকজন কমরেড সাথে নিয়ে গেলাম। যাদের প্যান্টে বড় বড় সাইজের পকেট আছে। এইবার গিয়া বললাম, আংকেল ছোটটা দিছেন কেন, মা বলছে বড়টা দিতে। উনি বড় লাক্স সাবান নিতে গেল আর আমি বললাম, আরেকটা ক্যামেলিয়া, আরেকটা তিব্বত ৫৭০, আর এক ছটাক সোডা…।

সে নিতে নিতে এদিকে আমার বাহিনী চাল, ডাল, দুয়েকটা পেঁয়াজ, রসুন নিয়ে চলেও গেল। দোকানদার টিটু সব জিনিস নিয়ে এসে একটা পলিথিনে ভরে আমাকে দিল। আর বলল, বাকির খাতায়? আমি কী একটা ভেবে বললাম, আরে না, টাকা তো দিছিল মা! আমি আনতে ভুলে গেছি! দাঁড়ান নিয়ে আসি।

বলে আমি চলে আসলাম। কে আর আনতে যায় ওইসব জিনিস!

এদিকে রান্না শেষ হল। লবণ কম, মসলা কম শুধুই চালে-ডালে-আলুতে খিচুড়ি। তবু কী মজা!

সবাই চায়ের চামচের বড়জোড় পাঁচ চামচ খেতে পারলাম। তাও খেলনা প্লেটে নিয়ে! আহাহা তাও কী যে তৃপ্তি এখনো মনে পড়ে! খেতে খেতে সবাইকে বললাম কীভাবে দোকান থেকে চাল চুরি করলাম। আর খাওয়া শেষে সবাই আমারে প্রতিদান দিল—আমি নাকি মহাশয়তান, চালের উপ্রে ডাল, ভাতের উপ্রে বিরিয়ানি, আর্জেন্টিনার উপরে ব্রাজিল, ফোর টোয়েন্টি যোগ ফোর টোয়েন্টি সমান এইট ফোরটি!

About Author

পারমিতা হিম
পারমিতা হিম

লেখক ও সাংবাদিক; এখন সময় টেলিভিশন, ঢাকা, বাংলাদেশে কর্মরত।