page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

বাংলাদেশের আশার গুড়ে ইন্ডিয়ার আশ্বাস বালি

flag34

সংবাদ মাধ্যমের নিউজে যারা কাজ করেন তাদের পক্ষে কোনো বিষয়ের খুঁটিনাটি মনে রাখা সহজ হয়। কথাটা মনে হল সম্প্রতি বাংলাদেশ বিষয়ে ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘আপ্লুত’ হওয়া এবং সেদিন দিল্লিতে যৌথ পরামর্শক কমিশনের বৈঠকের পর বাংলাদেশের আবেগ দেখে।

এই যৌথ কমিশন বা জেসিসি’র একটা নিউজ মাস খানেক বা তারও আগে আমাকে দেখতে হয়েছিল। সেখানে বাংলাদেশ পররাষ্ট্রের তরফে প্ল্যান ছিল যে এবারের বৈঠকে তিস্তা অথবা সীমান্ত চুক্তি বিষয়ে কোনো একটা ফয়সালা হবে। সেই মাফিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইন্ডিয়া সফরে যাবেন। সীমান্ত চুক্তির সফলতা নিয়ে তিনি দেশে ফিরবেন।

shuvra47

ভারতের একটি প্রতিনিধি দল সেই সময়ে বাংলাদেশ সফরে আসছিলেন। তারা নানা আশ্বাসও দিয়েছিলেন। খোলাসা করে কিছু না বললেও ‘ইতিবাচক’ মনোভঙ্গি তারা প্রকাশ করছেন। আমরা বণিক বার্তায় এ সংক্রান্ত খবরও ছেপেছিলাম। মাস কয়েক পরে দেখা গেল ঘটনা আসলে বাংলাদেশ অনুযায়ী ঘটে নাই। ঘটেছে ইন্ডিয়ার মতো করে। তিস্তা অথবা সীমান্ত কোনো বিষয়ে বলার মতো আলাপ হয় নাই। বারে বারে নিজেদের মনগড়া প্রেস রিলিজ প্রকাশে ওস্তাদ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রীয় দফতরও এবার আশ্বাসের বেশি কিছু শোনাতে পারে নি।

ভারতের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় করতে চায় বাংলাদেশ

ভারতের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় করতে চায় বাংলাদেশ

একই রকম আরেকটা খবর আমাকে দেখতে হয়েছিল বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়ার নৌ পথে চলাচল বিষয়ে।

অর্থমন্ত্রী আব্দুল মুহিত একটা পরিকল্পনা প্রস্তাব করেন যে, দুই দেশের নৌপথের যোগাযোগ যদি বাড়ানো যায় তবে পর্যটনের বিকাশ ঘটবে। এই যোগাযোগ যদিও অবাণিজ্যিক না। কিন্তু এই যোগাযোগেরও গোমর ফাঁস হল এবারের জেসিসি’র বৈঠকে। দিল্লির সেই আলোচনায় বাংলাদেশ তরফে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ব্যবহারের সুযোগ ইন্ডিয়ার জন্য উন্মুক্ত করার প্রস্তাব দেয়া হয়। নৌ-যোগাযোগ সেই কাজে ব্যবহার করা হবে। বৈঠকে বাংলাদেশ পক্ষ প্রস্তাব করে, ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ভারতীয় শিল্পপতিরা গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরি করতে পারেন। অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য সমুদ্র উপকূলবর্তী পথ ব্যবহার করা হবে। চেন্নাই থেকে কলকাতা হয়ে বাংলাদেশের মংলা ও চট্টগ্রাম হয়ে এই সমুদ্র উপকূলপথকে সিঙ্গাপুর পর্যন্ত বিস্তার ঘটানোই এর লক্ষ্য।’ আর বিপরীতে বাংলাদেশের প্রাপ্তি ‘ভরসা’ ও ‘বিশ্বাস’। এর বাইরেও ‘সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হলো মহাকাশ গবেষণা, পারমাণবিক শক্তি ও পুনর্বিকিরণ শক্তি। বাংলাদেশকে ভারত এই ক্ষেত্রগুলোতে প্রশিক্ষণ দেবে। ‘(প্রথম আলো)

এখন একজন নিউজের লোকের পক্ষে যদি হিসাব মেলানোর দরকার পড়ে তাতে বাংলাদেশ পক্ষের ছাড় দেয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটা পরিষ্কার হয়। কিন্তু কেন এবং কার জন্য এত ছাড়? এর বাইরেও বাংলাদেশের সংবাধ মাধ্যম যেমন করে এসব সংবাদ প্রচার করে তাতে মনে হয় দুই দেশের মধ্যে ‘সুসম্পর্ক’ বজায় রাখা বা বিরোধ তৈরি না করার একটা দায়িত্ব সাংবাদিকতার ঘাড়ে বর্তায়। যে সম্প্রচার নীতিমালা তৈরি হল সেদিন, নীতিগতভাবে এই নীতিমালার নিয়ম-কানুন কিন্তু ভালোভাবেই পালন করে আসছিলেন এখানকার সাংবাদিকেদের অনেকেই। এখন তা আইনের মধ্য দিয়ে পালনের বাধ্যতা তৈরি হল আর কি। তাই বলে এই নীতিমালাকে জায়েজ করা যাবে না। সাংবাদিকেরা তার ডিসিশান ও ইচ্ছা মাফিক লিখবেন, আইন করে তাকে কিছু করতে বাধ্য করা অন্যায়।

তো কথা হল এই দুই পক্ষের বৈঠক নিয়ে বাংলাদেশের মিডিয়া যতটা আশা অথবা হতাশা প্রকাশ করেছে, ইন্ডিয়ার মিডিয়ায় এই খবর নিরুত্তাপ। জি নিউজ খবর করেছে যে তিস্তা এবং সীমান্ত চুক্তি বিষয়ে বলার মতো কোন উন্নতি হয় নাই। তাদের ইকনমিকস টাইমসও একই খবর প্রকাশ করেছে। আর বাংলাদেশের কালের কণ্ঠের শিরোনাম, তিস্তা চুক্তিতে ঐকমত্য জেসিসির বৈঠক শেষে যৌথ বিবৃতি। প্রথম আলো কিছুটা চালাকি করেছে, তাদের প্রতিবেদক শিরোনাম যতটা পেরেছেন রেটোরিক্যাল রেখেছেন। কিন্তু ইন্ট্রোতে ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সংকল্পে পা বাড়াল বাংলাদেশ’ বলে নিজের মত প্রচার করে দিলেন।

এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের অনুবাদ সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। দেশের বাইরে গিয়ে সরকারি লোকেরা বাংলায় যা বলেন তারা তা হুবহু তুলে ধরেন। আসলটা পাঠকের সামনে আনতে তাদের নানা বিপত্তি ও অক্ষমতা বিভিন্ন সময়েই দেখা গিয়েছে। এবারও যখন মোদি আপ্লুত হলেন বলে খবর পেলেন এখানকার পাঠকেরা, তখন এই ‘আপ্লুত’ শব্দের ভালো কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া গেল না। কেন মোদি সাহেব এমন অনুভূতি প্রকাশ করলেন? এবং এটা বাংলাদেশের জন্য ভালো না খারাপ, তা কিন্তু বোঝা গেল না। এমনকি ইন্ডিয়া যে বার বার বিদ্যুতের কথা বলছে, সেটা কেন? তারা কি শীঘ্রই বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে যাচ্ছে অনেক পরিমাণে? এর কোনো তথ্য-উপাত্ত হিসাব কি আছে বাংলাদেশ পক্ষের হাতে?

এবার একটু পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো যাক। ‘বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্য বলছে, কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগের অনেক আগ্রহ প্রকাশ পেলেও ভারত থেকে প্রকৃত বিনিয়োগ তেমন একটা আসে নি। সংস্থাটির তথ্য অনুসারে, ২০১০-১১ অর্থবছরে ভারতীয় নিবন্ধিত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৬ কোটি ৮০ লাখ ২০ হাজার ডলার। এর বিপরীতে সে বছর প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৭ লাখ ১০ হাজার ডলার। ২০১১-১২ অর্থবছরে ১৯ কোটি ৭০ লাখ ৯৯ হাজার ডলারের বিনিয়োগ নিবন্ধন হলেও প্রকৃত বিনিয়োগ ছিল ২ কোটি ৭৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার।’ (বণিক বার্তা)

প্রতিবেশীর প্রতি আপ্লুত হওয়ার কৌশলকে এখন গুরুত্ব দিচ্ছে মোদি সরকার

প্রতিবেশীর প্রতি আপ্লুত হওয়ার কৌশলকে এখন গুরুত্ব দিচ্ছে মোদি সরকার

এসব ফাঁকির পরেও ভরসা মরছে না বাংলাদেশের সরকারি লোকেদের। আরও অনেক মজা আছে, সাংবাদিকদের মতো সরকারের লোকেরাও ‘আভ্যন্তরীণ’ বিষয়ে ইন্ডিয়ার মত চান। নিজেরা ঠিকঠাক আছেন কিনা তা জেনে নেয়ার এ এক উপায় তারা বের করেছেন। যেমন ৫ জানুয়ারির আগের নির্বাচন, তৃনমূলের এক সাংসদের জামায়াতে ইসলামিকে অর্থ প্রদান–ইত্যাদি।

মোদি যে হুঙ্কার দিয়ে ক্ষমতায় চড়েছিলেন, তা তিনি এখন চাপা দিয়ে রেখেছেন। ফলে মনে হচ্ছে বুঝি তিনি খুবই উদার আর প্রেমময়। যে কারণে আপ্লুত হচ্ছে। কিন্তু ঘটনা তো আসলে তা না। মোদি জাপান-চীন ঘুরে এসেছেন। হন্যে হয়ে আশপাশের আরও অনেক দেশে গিয়েছেন তিনি। ইন্ডিয়ায় তিনি প্রচুর বিনিয়োগ আনতে চান। ‘চীনা মডেল’ তার অনুপ্রেরণা। ইন্ডিয়ায় বিশ্বের টাইকুনরা বিনিয়োগ করবে। ইন্ডিয়াও নিজের নিজের পণ্য বানাবে। সেগুলো বেচবে আশপাশের দেশে। আর অন্য দেশের প্রোডাক্ট উৎপাদনের মধ্য দিয়ে দেশের বেকারত্ব কমবে। এ জন্য মানুষের ভূমি, জল জবরদখলেও তার আপত্তি নাই। এসব আয়োজনে বিভোর মোদি কেন বাংলাদেশের দিকে নজর দিবে? এত সময় তার কোথায়। বিদ্যুৎ সরবরাহেও তাদের গড়িমসি এর মধ্যে খবর হয়েছে। তিস্তা নিয়ে মমতা এবং মোদির একমত হওয়ার কোন সুযোগ নাই। বাংলাদেশে এতটা জোর করতে জানে না যে তিস্তার হিস্যা সে আদায় করে নিতে পারবে।

কারণ বাংলাদেশের মন দুর্বল। যে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এখনকার সরকার ক্ষমতায় তার পক্ষে জোরালো কণ্ঠ হওয়া সম্ভব না। বিদেশের সঙ্গে খাতির আছে, জনমনে এই প্রচার এই সরকার দেখাতে চায়। আবার বিদেশীরাও যে ‘ভুল’ বুঝে আছে তাও ভাঙানো দরকার। এ জন্য নানা চেষ্টা ও তদবির খেয়াল করা যাচ্ছে। মোদি ‘হুম’ বললে সেটাকে আপ্লুত বলে চালিয়ে দেয়ার আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হচ্ছে। মোদির সঙ্গে হাসিনার দেখা হবে নিউইয়র্কে সেই খবর আশপাশে বেশ চাউর হচ্ছে। সবাই মেনে নিচ্ছে এই সরকারকে–সেটা প্রতিষ্ঠা করতে এমন আরও কত সময়, শ্রম, সুযোগ-সুবিধা ও ছাড় দিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশের কেউ তা হলফ করে বলতে পারছে না। কাউকে বলতে শোনা যাচ্ছে না।

সব মিলিয়ে দেখা যায় একটা দুর্বল, অগোছালো এবং দেশের স্বার্থ রহিত সম্পর্ক ইন্ডিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ বজায় রেখেছে। দেশের স্বার্থের অধিক কোনো দূরভিসন্ধি হয়ত আছে। কিন্তু যে গুড়ের আশায় বাংলাদেশ বসে আছে তাতে যে বার বার বালি ঢেলে দিচ্ছে ইন্ডিয়ান বিভিন্ন সরকার, এসব নিয়ে না রাজনৈতিক না সাংবাদিক–কোনো মহলেই তর্ক, আলোচনা জোরদার হচ্ছে না।

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।