page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

বেকারত্বের কেইনসীয় সমাধান ও তারপর

১৯৭০ সালের দিকে লন্ডনে প্রফেসর এডিথ ইলুরা টিলটন পেনরোজ ছিলেন আমার সুপারভাইজার। বিভাগীয় শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন পিটার এয়ার ও বিপ্লব দাশগুপ্ত (১৯৩৮-২০০৫)।

ড. দাশগুপ্ত বাঙালী ছিলেন। তিনি প্রফেসর পেনরোজের তত্ত্বাবধানেই ডক্টরেট করেছিলেন। তিনি সোয়াসে ( SOAS) শিক্ষকতা করতেন। প্রফেসার পেনরোজের মতোই তিনি জ্বালানী তেল বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং ভারতে তেলের দাম ও আন্তঃপ্রদেশ বৈষম্য নিয়ে অনেক লিখেছেন।

ali ahmad rushdi png

তার সাথে প্রথম থেকেই ভাল একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তিনি আমাদের সংখ্যাত্মক অর্থনীতি (Quantitative Economics) পড়াতেন। বিষয়টির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক না থাকায় প্রথম প্রথম কিছুটা অসুবিধা হচ্ছিল আমার। ড. দাশগুপ্তের সাহায্যে সহজেই এই অসুবিধা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলাম।

ডিপার্টমেন্টের ভিতরে কিংবা বাইরে কোন ফাংশানে গেলে ড. দাশগুপ্ত এবং আমার জন্যে হালকা পানীয়ের ব্যবস্থা থাকত। দুজনের কেউ অ্যালকোহল পান করতাম না। প্রফেসর পেনরোজ আমাদের এই অ্যালকোহল বিমুখতার প্রশংসা করতেন।তিনি বলতেন, নিজেদের কৃষ্টি ও সামাজিক অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া সাহসের ব্যাপার সন্দেহ নেই, কিন্তু তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে দরিদ্র ও অনুন্নত দেশ পাশ্চাত্যের অনুকরণে মদ ও জুয়ার পেছনে যত টাকা খরচ করে তার অর্ধেক পরিমাণ টাকাও যদি দেশের শিল্প বা উন্নয়ন কাঠামো গঠনের কাজে বিনিয়োগ করা হতো তাহলে ওসব দেশ আর অনুন্নত থাকত না।

প্রফেসর পেনরোজকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, পক্ষান্তরে তুমি অনুন্নত দেশে মদ ও জুয়ার ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছ—তাই নয় কি? তাতে কি এসব দেশে আরও কিছু লোক বেকার হয়ে পড়বে না মনে করো?

edith penrose 1

প্রফেসর এডিথ পেনরোজ (১৯১৪-১৯৯৬)। তার বিখ্যাত বই The Theory of the Growth of the Firm (১৯৫৯)

তিনি হেসে বললেন, কেউ কেউ অবশ্য মনে করে দেশে যে কোন জিনিসের উৎপাদন বৃদ্ধি মানেই উন্নতি। পর্নোগ্রাফি কিংবা দেহব্যবসা বিস্তার লাভ করলেও কিছু লোকের চাকরি হয়। কিন্তু এই বিস্তার কি দেশের জন্য উন্নতি না অবনতি তা চিন্তা করে দেখার ব্যাপার।

বিপ্লব দাশগুপ্ত যোগ করলেন, বৃটিশ ইন্ডিয়াতে বৃটিশ সরকার চেয়েছিল বৃটেনের তৈরি কাপড় ও যাবতীয় জিনিসপত্র বিক্রি করতে। ভারতবর্ষ তার তীব্র বিরোধিতা করেছিল অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে। বৃহত্তর স্বার্থের খাতিরে এবং আরও বেশি লোকের সসম্মানে বাঁচবার ও জীবিকা অর্জনের নিশ্চয়তা বিধানের জন্যে কিছু লোকের যদি চাকরি হারাতেও হয় তাও বরং বরণীয় ও করণীয়।

ড. দাশগুপ্ত আরও বলছিলেন যে, দেখুন, যে কোন ব্যবসা তা লিগ্যাল হউক কিংবা ইল্লিগ্যাল, কিছু লোকের অন্নসংস্থান তো অবশ্যই করে থাকে। তাই বলে কি যেসব ব্যবসা দেশের ক্ষতি করবে সেইসব ব্যবসা চলতে দেওয়া উচিৎ?

তিনি ১৭৭৩ সালে আমেরিকার বস্টন বন্দর থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চা বন্দরের পানিতে ডুবিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা (বস্টন টি পার্টি) এবং ১৮৩৯ সালে চীনের ক্যান্টন বন্দরে বৃটিশ বাণিজ্যতরী থেকে নিষিদ্ধ আফিম কনফিস্কেট করার কথা মনে করিয়ে দেন।

১৯৭৩ সালে মার্কিন পোস্ট অফিস ৪টি স্ট্যাম্পের একটি সেট ইস্যু করে, সবগুলি মিলে ২০০ বছর আগের বস্টন টি পার্টির দৃশ্য ফুটে ওঠে তাতে।

১৯৭৩ সালে মার্কিন পোস্ট অফিস ৪টি স্ট্যাম্পের একটি সেট ইস্যু করে, সবগুলি মিলে ২০০ বছর আগের বস্টন টি পার্টির দৃশ্য ফুটে ওঠে তাতে।

উভয় ক্ষেত্রেই দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এই নিয়ে যুদ্ধ হয়েছিল, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং চীনে অপিয়াম ওয়ার।

পেনরোজকে উদ্দেশ্য করে আমি বললাম, তিরিশের মহামন্দার সময়ে কেইনসের “আয়ের তুলনায় বেশি ব্যয় করো” নীতিই কি আমেরিকা ও গ্রেট বৃটেনসহ বহু দেশে মহামন্দা মোকাবেলায় সাহায্য করে নি?

চীনা শিল্পীর আঁকা ১৮৩৯ এর আফিম ধ্বংসের ছবি।

চীনা শিল্পীর আঁকা কমিশনার লীর ১৮৩৯ এর আফিম ধ্বংসের ছবি। ৬০ অফিসারের তদারকিতে ৫০০ শ্রমিক প্রায় ৩ মিলিয়ন পাউন্ড আফিম ধ্বংস করেন। ৭ ফুট গভীর ও ১৫০ ফুট লম্বা ৩ টি পরিখা খুড়ে তার মধ্যে মেশানো হয় আফিম, লবণ, পানি ও লেবু। এরপর খাল কেটে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়া হয় সেই নিষ্ক্রিয় দ্রবণ।

তিনি বলেছিলেন, বিলক্ষণ! কেইনসের গুণক তত্ত্বে (Investment Multiplier) তিনি দেখিয়েছেন অর্থনীতিতে নতুন কোনো বিনিয়োগ হলে জাতীয় আয় বাড়বে যে পরিমাণ বিনিয়োগ হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। কত বেশি তা নির্ভর করবে প্রান্তিক সঞ্চয় প্রবণতার ওপর (Marginal Propensity to Save)। (প্রান্তিক সঞ্চয় প্রবণতা হচ্ছে আয়ের পরিবর্তনের ফলে সঞ্চয়ে যে পরিবর্তন আসে তা। অর্থাৎ change in savings due to change in income.)

সঞ্চয় প্রবণতা যত কম, গুণকের মাত্রা তত বেশি। তাই বলে তিনি সঞ্চয়ের বিরুদ্ধে ছিলেন না। তিনি দেখিয়েছেন এখানে একটা ফ্যালাসি অব কম্পোজিশন রয়েছে। ব্যক্তির জন্যে যা ভাল তাই গোটা সমাজের জন্যে ভাল এটা সব সময় সত্যি নয়। কেইনস যা বলতে চেয়েছেন তার সারমর্ম হচ্ছে: সামগ্রিক ভাবে সঞ্চয় যদি বিনিয়োগে রূপান্তরিত না হয় তা হলে দেশের আয় কমে যাবে এবং পরবর্তী সময়ে সঞ্চয়ও হ্রাস পাবে।

পেনরোজ আরও বলছিলেন, কেইনসের গুণক তত্ত্ব অর্থনৈতিক মন্দার সময়েই বেশি প্রযোজ্য।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন?

তিনি একটা উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, ধরো কোনো একজন মহৎ ব্যক্তি কিংবা সরকার দেশের স্কুলের ছাত্রদের জন্যে দশ লক্ষ জোড়া জুতা অনুদান হিসাবে দিতে চান এবং জুতা কেনার জন্য প্রয়োজনীয় টাকা ছাত্রসংখ্যা অনুপাতে প্রত্যেক স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

এখন এটা যদি হয় অর্থনৈতিক মন্দার সময় মানে যখন দোকানে দোকানে জিনিসপত্র অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে আছে, জুতা তৈরির মালামাল মজুদ আছে, ফ্যাক্টরি, ট্রেনিংপ্রাপ্ত শ্রমিক সবই বিদ্যমান, নাই শুধু চাহিদা—তেমন অবস্থায় নতুন চাহিদা সৃষ্টির সাথে সাথে প্রথমে দোকানের মজুদ জুতা (সামগ্রী) শেষ হবে এবং পরে দোকানের শেলফ খালি হওয়ার সাথে সাথে নতুন জুতা তৈরি হয়ে শেলফ ভর্তি হয়ে যাবে।

অর্থাৎ কেইনশিয়ান গুণক তত্ত্ব খুব তাড়াতাড়ি বাস্তবায়িত হয়ে যাবে। অন্যদিকে যে দেশে অর্থনৈতিক অবকাঠামো তৈরি হয় নি, রাস্তাঘাট হয় নি, জ্বালানি, বিদ্যুৎ কিছুই নাই, সেখানে নতুন চাহিদা সৃষ্টি হলেও প্রথমে নিকটস্থ দোকানে এবং পরে দেশের প্রসিদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্রে খুঁজে দেখা হবে ‌ওই জিনিস পাওয়া যায় কিনা। দেশে না থাকলে বিদেশ থেকে আনা হবে কিংবা দেশের বেকার সমস্যা দূর করতে চাইলে দেশের ভিতরেই জুতার ফ্যাক্টরি তৈরি করা হবে। কিন্তু এই সব কিছু করতে অনেক সময়ের প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেছিলেন, মুদ্রানীতির মাধ্যমে বাজারে অর্থের পরিমাণ বাড়ানোর জন্যে প্রাইভেট উদ্যোক্তার দরকার। এক্ষেত্রে মুদ্রানীতি শিথিল করা যেতে পারে। অর্থাৎ অর্থনীতিতে যারা ব্যবসা-বাণিজ্য করছে কিংবা শিল্প-কল-কারখানা গড়ছে তাদের হাতে সহজ শর্তে ঋণ পৌঁছে দিতে হবে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে ঋণবৃদ্ধির যে সব কৌশল রয়েছে তা কোনো কাজেই আসবে না যদি না উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসে।

এ অবস্থায়, সরকারের নিজেরই নতুন নতুন উদ্যোগ নিয়ে বাজারে নামতে হবে। তিনি তখন অর্থনীতিতে বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ উচ্চারণ করলেন: You can drag a horse to the well but cannot help if it does not drink,
পানি খাওয়ানোর জন্যে তুমি তোমার ঘোড়াকে কুয়ার কাছ পর্যন্ত টেনে নিতে পারো কিন্তু ঘোড়া যদি পানি না খায় তাহলে কী করতে পারো?

এয়ার (Peter Ayre) সাহেবের জ্ঞানের পরিধি ছিল প্রায় অপরিসীম। তিনি মনিটারি ইকনমিকস পড়াতেন কিন্তু যে কোনো বিষয় যখনই জিজ্ঞেস করা হতো তার একটা জুৎসই উত্তর প্রায় তৈরিই থাকত। আমার সহপাঠী নিকলসন একদিন জিজ্ঞেস করেই ফেললো, Where do you get all these from? —আপনি এসব কোথায় পান? তিনি সহাস্যে উত্তর দিলেন From the air (Ayre).

আমি এয়ারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, অর্থনীতিতে কেইনসের সবচেয়ে বড় অবদান কোনটি?

তিনি বলেছিলেন, কেইনসের সবচেয়ে বড় অবদান হচ্ছে তিরিশের মহামন্দা থেকে পাশ্চাত্য বিশ্বকে বাঁচিয়ে তোলা। অনেকে মনে করেন কেইনসীয় নীতির ফলে পূঁজিবাদ ব্যবস্থা বেঁচে গিয়েছিল।

ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদদের মতে কোনো দেশে মাঝে মাঝে বেকার সমস্যা কিংবা মন্দা কিংবা মূল্যস্ফীতি দেখা দিলেও তা শেষ পর্যন্ত স্বয়ংক্রীয় ভাবে সংশোধন হয় যাবে।

স্ত্রী ও কেইনস

স্ত্রী ও কেইনস

অন্যদিকে কেইনস বলেছিলেন দীর্ঘমেয়াদী সল্যুশন কিংবা স্বয়ংক্রিয় সমাধান অনেক সময় এত দীর্ঘায়িত হয় যে আমরা তা দেখার জন্যে অনেকেই বেঁচে থাকব না। “in the long run, we are all dead.” তিনি মূলতঃ স্বল্পমেয়াদী ভারসাম্যহীনতার দিকেই বেশি খেয়াল দিয়েছিলেন।

কেইনস ক্লাসিক্যাল অর্থনীতির কমপক্ষে চারটা অনুমান (assumption) ভুল প্রমাণিত করেছিলেন।

এক: শ্রমিকের মজুরি নির্ধারিত হয় শ্রমের যোগান ও চাহিদার উপর। চাহিদার স্থিতিশীল অবস্থায় যদি যোগান বৃদ্ধি পায় তাহলে শ্রমিকের মজুরি কমে যাবে। আর যদি যোগানের অপরিবর্তিত অবস্থায় চাহিদা বাড়ে তাহলে মজুরি বেড়ে যাবে।

শ্রমিক নিয়োগের সময় মালিক দেখবে একজন শ্রমিক নিয়োগ করতে হলে কিংবা এক ঘণ্টা বেশি কাজ করাতে পারলে মালিকের আয় কতটুকু বাড়বে। যতক্ষণ মালিকের আয় শ্রমিকের মজুরির তুলনায় বেশি থাকে ততক্ষণ সে আরও বেশি শ্রমিক কিংবা শ্রমঘণ্টা নিয়োগ দিতে থাকবে এবং যখন মালিকের আয় ও মজুরি সমান হবে তখন সে আর বেশি নিয়োগ দেবে না।

কেইন্স দেখিয়েছেন শ্রমিকদের সংগঠন তথা সরকারের নিম্নতম মজুরি আইনের ফলে মজুরি নিম্নগামী হয় না (downward inflexibility)। অর্থাৎ কাজ করতে ইচ্ছুক সব শ্রমিককে নিয়োগ দিতে হলে মজুরি যে পর্যায়ে নামতে হবে সেই পর্যায়ে নামতে পারে না।

দুই: সঞ্চয় ও বিনিয়োগ ইন্টারেস্ট ইলাস্টিক। অর্থাৎ সুদের হার বাড়লে সঞ্চয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং সুদের হার কমলে বিনিয়োগের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

কেইনস দেখিয়েছেন সঞ্চয় ও বিনিয়োগ উভয়ই ইন্টারেস্ট ইনইলাস্টিক। তার মতে সঞ্চয় নির্ভর করে প্রধানতঃ আয়ের ওপর এবং বিনিয়োগ নির্ভর করে প্রধানতঃ লাভের সম্ভাবনার ওপর। মন্দার সময়ে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ করতে ভয় পায় এবং নতুন বিনিয়োগের অভাবে আয়বৃদ্ধির পথও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বেকার সমস্যার আর কোনো সমাধান হয় না।

তিন: মুদ্রা চাহিদার একমাত্র কারণ হচ্ছে মুদ্রা জিনিসপত্র বেচাকেনার মাধ্যম। ক্লাসিক্যাল অর্থনীতিবিদরা আরও বিশ্বাস করতেন অর্থনীতিতে সবসময় পূর্ণ নিয়োগ বিরাজ করছে। অর্থাৎ দেশে অবস্থিত সমস্ত সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে। কাজেই দ্রব্যসামগ্রীর পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নাই। এমতাবস্থায় বাজারে অর্থের পরিমাণ বেশি হলে মূল্যস্তর বেড়ে যাবে এবং অর্থের পরিমাণ কমে গেলে দ্রব্যের দাম হার মোতাবেক কমে যাবে।

কেইনস দেখিয়েছেন বিভিন্ন কারণে বাজারে সব সময় পূর্ণ নিয়োগ বিরাজ করে না। অর্থাৎ রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মাধ্যমে অর্থনীতির স্থবিরতা ও অদক্ষতা দূর করে দ্রব্যসামগ্রীর পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব।

তাছাড়া কেইনসের মতে মুদ্রাচাহিদার তিনটি কারণ আছে। যথা, বেচাকেনার মাধ্যম (Transaction), সতর্কতামূলক (Precautionary) ব্যালান্স এবং প্রত্যাশামূলক (Speculative) ব্যালান্স। ঋণপত্র, বন্ড ও শেয়ার বাজারের ব্যবসায়ীরা সুবিধা মতো দামে কেনার জন্যে কিছু টাকা হাতে রাখে। এটাকেই বলা হয় Speculative ব্যালান্স।

এই তিনটির মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয়টির পরিমাণ নির্ভর করে জিনিসপত্রের বাজারদরের ওপর আর তৃতীয়টি নির্ভর করে সুদের হারের ওপর। মুদ্রার পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকা অবস্থায় যদি অধিক জিনিস বাজারে বিক্রি করতে হয় তাহলে দাম কমাতে হবে। আর যদি দাম কমানো সম্ভব না হয় তাহলে বাজারে মুদ্রার পরিমাণ বাড়াতে হবে।

কেইনস দেখিয়েছেন বিভিন্ন কারণে অনেক সময় বাজারদর নিম্নমুখী হয় না। বিশেষ করে শ্রমিকের মজুরি এবং অপ্রতিযোগিতামূলক বাজারে লাভের হার সাধারণতঃ নিম্নগামী হয় না বলে দামও কমে না।

এমতাবস্থায় বাজারে মুদ্রাচাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে মুদ্রা সরবরাহ বাড়ানো দরকার। অন্যথায় সুদের হার বৃদ্ধি পাবে। তাতে করে প্রত্যাশামূলক চাহিদা কিছুটা হ্রাস পাবে এবং Speculative ব্যালান্সের একাংশ Transaction ব্যালান্স হিসাবে কাজ করবে। কিন্তু সুদের হার বৃদ্ধির ফলে বেকারত্ব দূর করার জন্যে যে পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার ছিল তা আর হবে না।

চার: সাধারণতঃ সুদের হারের সাথে বাজারে প্রচলিত ফিক্সড ইনকাম বন্ড ও ঋণপত্রের দামের একটা উলটা আনুপাতিক সম্পর্ক (Inverse relationship) বিরাজ করে। সুদের হার বাড়লে বন্ড হোল্ডাররা মনে করে বন্ডের বাজারদর এখন সবচেয়ে কম। এটাই বন্ড কেনার উপযুক্ত সময়। এ কারণেই সুদের হার বৃদ্ধি পেলে Speculative ব্যালান্স কমে আসে এবং সুদের হার কমলে Speculative ব্যালান্স বৃদ্ধি পায়। সুদের হার সবচেয়ে কম মানে হচ্ছে বন্ডের দাম সবচেয়ে বেশি।

এখন বাজারে যদি কখনো এই ধারণা জন্মায় যে বর্তমান সুদের হার সবচেয়ে নিম্ন স্তরে আছে তাহলে মনে করতে হবে বর্তমানে বন্ডের দাম সবচেয়ে বেশি। কাজেই বন্ড বিক্রি করে নগদ টাকা হাতে নেওয়ার এটাই উৎকৃষ্ট সময়।

কেইনস এই অবস্থাকে বলেছেন লিকুইডিটি ট্র্যাপ (Liquidity Trap)। বাজার যখন এই ট্র্যাপে পড়ে যায় তখন মুদ্রানীতি বিকল হয়ে পড়ে।

উপরোক্ত চার কারণে বাজারে স্বয়ংক্রীয় ভাবে সংশোধন আসে না। একমাত্র রাজস্ব নীতি ও সরকারী বিনিয়োগই তখন ভরসা।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কত দিন লেগেছিল মহামন্দা কাটিয়ে উঠতে?

তিনি বললেন ১৯৩৬ সালের মধ্যেই মোটামুটি সব দেশেই স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছিল।

তার পর?

এর কিছু দিনের মধ্যেই ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে যায় এবং শেষ হয় ১৯৪৫ সালে। যুদ্ধের সময়ে সব দেশেই ব্যাপক হারে লোক নিয়োগ করা হয় এবং যুদ্ধব্যয়জনিত কারণে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়। তাছাড়া দাম বেড়ে যাওয়ার ভয়ে মানুষ মজুদদারি শুরু করে। ফলে মূল্যস্ফীতি দেখা দেয়। যুদ্ধ শেষে শুরু হয় পুনর্গঠন। সেখানেও লোক নিয়োগ ও সরকারি ব্যয় চলতে থাকে। দেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব কেবল বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। কেইনসের প্রভাব সুস্পষ্ট।

আমি বললাম, মোটামুটি দেখা যাচ্ছে মহামন্দার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত (১৯৭০) আর কোনো মন্দা দেখা দেয় নি। সামান্য মূল্যস্ফীতি ও ব্যাপক কর্মসংস্থান ছিল এই সময়ের বিশেষ চিত্র।

উদ্ভাবক ও অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম ফিলিপস (১৯১৪-১৯৭৫)

১৯৪৯ সালে উদ্ভাবিত MONIAC (Monetary National Income Analogue Computer) হাইড্রলিক ইকোনমিক কম্পিউটারের সামনে উদ্ভাবক ও অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম ফিলিপস (১৯১৪-১৯৭৫)।

তিনি তখন ফিলিপস কার্ভের কথা তুললেন। বললেন, উইলিয়াম ফিলিপস নামে নিউজিল্যান্ডের এক অর্থনীতিবিদ ১৮৬১ থেকে শুরু করে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে একটি গ্রাফ এঁকে দেখিয়েছেন যে কোনো দেশে বেকারত্বের হার এবং মূল্যস্ফীতির হার পরস্পর বিপরীতমুখী।

লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৮ সালে। এর পর পরই পৃথিবীর অন্যান্য দেশে সমীক্ষা চালিয়ে একই রকম রেজাল্ট পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সব দেশেই মূল্যস্ফীতির সাথে সাথে বেকারত্বের হার কমে এসেছে।

১৯৬০ সালে পল স্যামুয়েলসন (Paul Samuelson) ও রবার্ট সলোর (Robert Solow) মতো বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদরাও এই ঋণাত্মক সম্পর্ক দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করে নিয়েছিলেন।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, মূল্যস্ফীতি আর বেকারত্বের এই যে বিপরীতমুখী সম্পর্ক তার থেকে কি এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যে সরকার কিছুটা মূল্যস্ফীতি সহ্য করার বিনিময়ে বেকার সমস্যা কমিয়ে আনতে পারে। অর্থাৎ সরকার বাজেট ঘাটতি ও মুদ্রানীতি শিথিল করে দেশে বেকারত্বের হার হ্রাস করতে পারে—যদিও তাতে মূল্যস্ফীতির কিছুটা ঝুঁকি থাকে?

phillips curve3

NAIRU দীর্ঘ মেয়াদী ফিলিপস কার্ভ হিসাবেও পরিচিত। [NAIRU stands for Non-Accelerating Inflation Rate of Unemployment. ]

পিটার এয়ার বলেছিলেন, প্রথমতঃ মূল্যস্ফীতির সাথে বেকারত্বের এই যে ঋণাত্মক সম্পর্ক (Inverse relationship) তা কোনো স্থায়ী সম্পর্ক নয় এবং দ্বিতীয়তঃ এই সম্পর্ক শুধুমাত্র চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার কমতে দেখা যায় না। অর্থাৎ মূলস্ফীতির মূল কারণ যদি হয় যোগানের স্বল্পতা কিংবা যোগানের ব্যয় বৃদ্ধি [যেমন তেলের দাম বৃদ্ধি] তাহলে বেকারত্বের হার হ্রাস পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই।

পরবর্তীকালে দেখা গেছে, বিশেষ করে তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে অনেক দেশেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং উচ্চ বেকারত্ব একই সঙ্গে অবস্থান করছিল, অর্থনীতির ভাষায় যাকে বলা হয় স্ট্যাগফ্লেশন (Stagflation)। ফিলিফস কার্ভের পরিপ্রেক্ষিতে এমনটা হওয়ার কথা নয়।

মিলটন ফ্রিডম্যান (১৯১২-২০০৬)

মিলটন ফ্রিডম্যান (১৯১২-২০০৬)

১৯৬৮ সালে মিলটন ফ্রিডম্যান (Milton Friedman) বলেছেন, মূল্যস্ফীতি আর বেকারত্বের বিপরীতমুখী অবস্থান (Phillips curve) বস্তুতঃ একটি স্বল্পকালীন বৈশিষ্ট্য। দীর্ঘ মেয়াদের জন্য এই ঋণাত্মক সম্পর্ক বজায় থাকবে মনে করা ভুল।

ফ্রিডম্যানের মতে, দীর্ঘমেয়াদী বেকার সমস্যার জন্যে মুদ্রানীতি কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো ভূমিকা নাই। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি দীর্ঘমেয়াদী মুদ্রানীতির লক্ষ্য NAIRU-এর কম পর্যায়ে স্থির করে তাহলে সেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না। [ ওপরের চিত্র দ্রষ্টব্য ] ।

NAIRU হচ্ছে Non-Accelerating Inflation Rate of Unemployment অর্থাৎ বেকারত্বের স্বাভাবিক হার। কর্মজীবনে মানুষ কখনো কখনো চাকরি বদলায়, স্থান বদলায়, অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা ফ্যাশন ও চাহিদা পরিবর্তনের কারণে বেকার হয়ে পড়ে। এই জাতীয় বেকারত্বকে নাইরো বলে। ফ্রিডম্যানের মতে, নাইরো হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী ফিলিফস কার্ভ, যা উপরের দিকে প্রলম্বিত এবং যার কোনো বিপরীতমুখী ঢাল (slope) নাই। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির মাত্রা বাড়িয়ে-কমিয়ে নাইরোর স্থান পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

নব্বইয়ের দশকে আমেরিকান অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব উভয়ই বেশ নিম্নপর্যায়ে অবস্থান করছিল। ফিলিপস কার্ভকে এখন কেউ আর অবশ্যম্ভাবী মনে করে না। তবে কেইনসের নাম না নিয়েও অনেক রাষ্ট্র অর্থনীতিতে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা এখন নিজেদের দায়িত্ব মনে করে। অতি সম্প্রতি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ এবং পরে বারাক ওবামা যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বাজারে ছাড়লেন এটা তারই প্রতিফলন।

About Author

আলী আহমাদ রুশদী
আলী আহমাদ রুশদী

ড. আলী আহমাদ রুশদীর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেসা কলেজে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা কলেজে কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে করোটিয়ার সাদত কলেজে বেশ কয়েক বছর অধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে সহযোগী-অধ্যাপক ছিলেন বহুদিন। ১৯৮৯ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। মেলবোর্নে অবস্থিত Australian Competition and Consumers Commission এ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন প্রায় ১৫ বছর। সেখান থেকে অবসর গ্রহণের পরে ঢাকার AIUB ও নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে কিছুদিন অধ্যাপনা করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে UNDP, ILO, World Bank ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের কাজে গবেষণা করেছেন। বর্তমানে মেলবোর্নে অবসর জীবন যাপনের ফাঁকে তাঁর সময় কাটে অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখালেখি করে।