page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

বেপারিদের তারপরও জাহাজের খবরটা রাখতে হয়

ইন্ডিয়ার ইলেকশনের রেজাল্ট বাজারে আসার পরপরই আবদুল্লাহপুর যাওয়া হইছিল আমার। সেখানে শুনলাম মানুষজন মোদীর ক্ষমতায় আসায় শেখ হাসিনা সরকারের সম্ভাব্য ক্ষতি বিষয়ে আলাপ করতেছে। ক্ষতিটা ঠিক কী তারা কইতে পারতেছে না, কিন্তু এই চেঞ্জটা আওয়ামী লীগের পক্ষে যায় নাই, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত।

আবদুল্লাহপুর এমনিতে জঞ্জালময় একটা জায়গা। মানুষজন যাওয়া—আসার মধ্যে থাকে সবসময়। গার্মেন্ট কর্মী আর পরিবহন শ্রমিকে গম গম করে জায়গাটা। সুবাস, সুবেশ কিছু এখানে নাই। রোগা মেয়েরা হেসে—মেতে ওঠে মাঝে মাঝে। ছেলেরা অলটাইম যেন চোরা মুখে ঘুরে বেড়ায়। এমন অর্বাচীন, অপোগণ্ড সমাজে মোদী বিষয়ক আলোচনা শিক্ষিতের মনে বিস্ময় জাগায় বৈকি!

 

এরপর হয়ে যাওয়া মোদীর শপথ অনুষ্ঠানে তারেক জিয়া নাকি হাজির আছিল সে বিষয়ে আমাদের গ্রামের কয়েকজন, ঢাকার কয়েকজন মিলে আব্বার লগে আলাপ করছেন। কিন্তু তাকে কোথাও দেখা যায় নাই কেন তাইলে? মোদীর লগে তারেক তথা বিএনপির এমন আঁতাতের আকাঙ্ক্ষা জনগণমাঝে তারপরও বেশ চাউর আছে।salahuddins1

শুনলাম বাংলাদেশ প্রতিদিন নামের পত্রিকা লিখছে মোদীর নির্বাচনের খরচ জুগাইছেন তারেক জিয়া, বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর খবর দিছে মোদীর দাওয়াতে ইন্ডিয়া যাবেন তারেক। হাচামিছা বিচারের চাইতে বলতে গেলে এসব গুজব কিন্তু সেই সাধারণেদের তৈরি। যাদের একটা অংশরে আমরা এলেমদারেরা ছোটলোক বলে থাকি। মিডিয়া, শিক্ষানুকূলেরা যাদের আমলে নেয় না সেই আম আদমির পারসেপশন কেমনে পলিটিক্যাল আনকনশাসে বিরাজ তার নজির এসব ঘটনা।

এমন আরও সব পলিটিক্স আর কালচার সমাজে পাইবেন যাদের আমরা ছোটলোক হিসাবে ঠিক চিনা উঠতে পারি না এগুলা আসলে তাদের সম্পত্তি। মোদী বিষয়ক তাদের মতামত কোথাও প্রচার পাইবার আশাও তারা করে না।

ফেনীর এক চেয়ারম্যান হত্যার ঘটনার পর পত্রিকাগুলা প্রথম দিকে সরকারি দলের প্রচার—প্রপাগান্ডা ছাপাইছিল। কে আসলে খুন করছে তা সাংবাদিকেরা জানতেন না। কিন্তু ফেনীর লোকেদের মুখে মুখে কোন্দল আর কয়েকটা নাম ঘুরাফিরা করতেছে। আমাদের এখানকার নিয়মানুবর্তী সাংবাদিকতা যেসব সত্য গোপন করতে চায় বা ছাপানোর উপযুক্ত মনে করে না, জনগণমুখ সেসব সত্য জিয়ায়া রাখে। এর একটা চাপ আছে। সেই চাপে সাংবাদিকেরাও লিখে ফেলেন যে আসলে এটা অমুকের কাজ। মানে আগের দিন যখন পাঠক জানে কে করছে কামডা, পরের দিন পত্রিকাগুলা সেসব ছাপায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বাংলাদেশের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও বাংলাদেশের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী

উন্মূল ঢাকা শহরের মধ্যবিত্ত অবশ্য বাসি খায়াই অভ্যস্ত। জানেন তো প্রথম আলো ঢাকাতেই অর্ধেকের বেশি সেল হয়। যদি ধরেন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের কথা, তাইলেও এসব ‘সাধারণ’ সাংবাদিকদের বাধ্য করছেন নির্বাচন যে হয় নাই সেটা প্রকাশ করতে। নইলে জামায়াত নিধনের নামে সব মিডিয়া তো ৫ জানুয়ারির নির্বাচন কইরা ফালাইছিল প্রায়।

ভাইবা দেখলাম এ দেশের গরিব—গুর্বা মানুষের পলিটিক্যাল পারসেপশন নিজেরা গ্রহণ করলেও ছোটলোকেদের চেহারা গোপন করে মিডিয়া কিম্বা বুদ্ধিজীবী সমাজ। তারা এসব ছোটলোকি বাছ—বিচার অস্বীকার/আড়াল করেন। ইন্ডিয়ান প্রডাক্টের ভোক্তা যেমন এই শ্রেণী আবার সরাসরি ইন্ডিয়ার বাজার সম্প্রসারণের প্রতিরোধকারী হিসাবেও এরা সজাগ। ফলে ইন্ডিয়া নিয়া তাদের একটা চিন্তা আছে। নিজের দেশ বিষয়েও।

মোদীর জামানায় আওয়ামী লীগের খারাপটা যখন এই শ্রেণী দেখতেছিল, ইন্ডিয়ার পররাষ্ট্রনীতি বদলাইবে না, চরম বুঝদার বুদ্ধিজীবীরাও তখন এসব বলাবলি করতেছিলেন। খালেদা জিয়া কেন মোদীরে শুভেচ্ছা জানাইছেন তা নিয়া ফরহাদ মজহার খুব নাখোশ হইলেন। জনগণের চাওয়ার প্রতিফলন নাকি নাই এখানে। মোদীর নির্বাচনী প্রচারণা কালীন হম্বিতম্বি জনমনে যে উৎকণ্ঠা ছড়াইছে তা বিষয়ে বিএনপির উন্নাসিকতায় বেজার হয়েছেন মজহার। কিন্তু ঠিক মিডল ক্লাসের বাইরে মোদীভীতি সঞ্চারিত হইতে দেখলাম না আমি। নিয়মিত মনযোগের সহিত মিডিয়া পাঠের অভ্যাস না থাকাটা একটা কারণ হইতে পারে। যে কারণে ছোটলোকেরা পিছায়া থাকে। মাথার উপর খড়্‌গ ঝুলে থাকলেও তারা টের করে না—এ পাশ থেকে ভাবনাটা এমন।

কিন্তু খেয়াল করলে টের করা যায় মোদীর ভৌগলিক দূরত্ব মিডিয়ার বরাতে যেমন কইমা আসে, ছোটলোকেদের দুনিয়ায় তেমন গুরুতর দূরত্ব ঘুইচা আসে না। মোদী তাদের এলাকা থিকা দূরেই থাকেন। মিডল ক্লাসের মতো তারে বেডরুমে টাইনা আনেন না। মোদী তাদের জন্য দূরের সওদাগর। আগের আমলের সওদাগরের লগে খায়খাতির যে ছিল আওয়ামী লীগের সে খবর তাদের কানে আসে। যখন কেউ ক্ষমতায় টিকে থাকে তখন তার শক্তি উপরওয়ালা কেউ যোগান। সেই কেউ ছিল কংগ্রেস। তারা যখন আর নাই তখন হাসিনা সরকার কোথায় এত জোর পাইবেন! ফলে এরা যে যা কিছুর ব্যাপারি হন না কেন মোদীর খবর রাখাটা তাদের কর্তব্য হয়ে পড়েছে।

সহজ-সরল একটা হিসাব আছে বইলা আমি খেয়াল করলাম। ছোটলোকেরা তো আসলে সমাজের সকল অংশের খবর রাখে। রুটি-রুজির বাইরে বাড়তি পলিটিক্যাল চর্চা হিসাবে তারা এটা জারি রাখে। ভোটের বাইরে আপন ভিটা—মাটি কিম্বা রুটি-রুজির উপরে কেউ হামলা করলে তারা নিশ্চয় প্রতিরোধ করে। মিডল ক্লাস তো গুটায়া আসছে ঢাকায় কিম্বা চিটাগাঙে, মফস্বলের কোনো কোনো এলাকায়। কিন্তু বিস্তর জায়গা জুইড়া ছোটলোকেরা থাকেন। তাদের বলার কিম্বা দেখার যান্ত্রিক উপায় কম। নিজেরা নিজেরা বলাবলি করে, টক শোতে আসে না। দেখেও না বইলা আমি সন্দেহ করি। তাদের একটা ইনটিউশন কাজ করে। ‘এইবার বৃষ্টি হবে কি হবে না’—ব্যাপারটা এমন। অমুক জায়গায় বৃষ্টি হইছে মানি হইল এখানেও হবে দিন কয়েক পরে। মোদীর ক্ষমতায় আসার মানে হইল এখানেও একটা চেঞ্জ আসবে। নেসেসারিলি চেঞ্জ দরকার হয় ছোটলোকেদের। তারা পলিটিক্যাল পার্টি দ্বারা অরগানাইজড না, তবে চেঞ্জের আশা ছাড়ে না। এবং চেঞ্জের আসল কারবারিও তারা। মিডল ক্লাসের কয় ভোট এই দেশে? আমি তো বলি যে এখানকার ছোটলোকেরা মিডল ক্লাসের তুলনায় ফ্রেশ খাবার খায়। দামেও তাদের ঠকতে হয় না।

এখন এসব ছোটলোকির মানে হইল নির্বাচন। ভোট দিতে না পারার ক্ষোভ মিডল ক্লাসের তেমন নাই। কিন্তু এরা মানতে পারতেছে না। যে কারণে মোদীর মধ্য দিয়া এরা নিজেদের না—পাওয়ার কথাটা জানান দেয় আর কি। মোদী আসলে হাসিনার ক্ষতি এইটা বলার জন্য মোদী সমর্থক হওয়ার মতো নৈতিক জ্ঞান অবশ্য এদের নাই। দুই দলই সমান—এমন আদর্শিক সিদ্ধান্তেও এরা আসতে পারে নাই এখনও। জাগতিক নগদ লাভ আর পরকালের বাকির পাওনা—আমার অভিজ্ঞতায় এমনটাই ভাবে ছোটলোকেরা।

 

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।