page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

ভাড়ার ভিসিআর আর ম্যারাথন সিনেমা

পরে সেটা হইছিল সিডির দোকান। তবে আগে, সিডির দোকানের আগে ছিল ভিডিওর দোকান। সেই দোকান থাইকা আনা হইত ভিসিআর। মাঝেমাঝে ভিসিপি। আমাদের তখন ঈদের মত লাগত। দুই তিন দিন বইসা আমরা সিনেমা দেখার ঈদ পালন করতাম। টিনের ঘরের জানালা কপাট বন্ধ কইরা দিনের বেলা আন্ধার বানাইয়া ছোট-বড়-বুড়া মিইল্লা নন-স্টপ সিনেমা দেখতাম।

দর্শকদের মধ্যে আমরা কাছাকাছি বয়সের ৭/৮ জন চাচাত ভাইবোন আর ভাড়াটিয়াদের ছেলেমেয়েরা, যাদের সংখ্যা হবে ১৫/২০। একেবারে আণ্ডাবাচ্চা থেকে শুরু কইরা আমাদের বয়সী পোলাপান। মুরুব্বীদের মধ্যে থাকত ইয়াং বয়সী আঙ্কেল আন্টি। সব মিলে প্রায় ৩০ জন দর্শকের ঘরোয়া সিনেমা হল হইয়া যাইত বড় চাচার টিভিঘর।

খাট, ফ্লোর—মাটির ফ্লোরে মাদুর পাইতা, চেয়ারে, একেবারে পিচ্চিগুলা দাঁড়াইয়া—দেখা হইত সিনেমা।

তখন আমি এইচএসসি ভর্তি হইছি। এক চাচাত বোন যে আমাদের বড়াপা তিনি ছিলেন পুরা গ্রুপের গুরু। তার নেতৃত্বে ভিসিআর আনা হইত। বয়সে তিনি আমার বড় হইলেও আমরা একই ক্লাসে পড়তাম। তো আপা যেদিন ভিসিআর ভাড়া আনার হুকুম দিতেন—ওইদিন মোটামুটি এলাকায় হৈচৈ পইড়া যাইত।

সবাই কাজ বাজার স্কুল শেষ কইরা প্রস্তুত হইয়া থাকত। কোনো একদিন বিকালে সাদাকালো টিভিতে ভিসিআর লাগানো হইল। টাকা বেশি থাকলে ভিসিআর আর কম হইলে ভিসিপি। সম্ভবত সেই ৯০ সালের শেষের দিকে ভিসিআর ভাড়া ছিল ২০০ টাকা—তিনদিনের জন্য।

বড় চাচার টিভি ছিল ন্যশনাল, ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট। দুইটা বল্টু সামনে ডান সাইডের নিচে থাকত। একেবারে ডাইনেরটা ডানদিকে ঘুরাইলে টিভি খুলত আর বেশি ঘুরাইলে সাউন্ড বাড়ত। আর তার বামপাশের বল্টু ডানদিকে ঘুরাইলে টিভিতে আলো বাড়ত আর উল্টাদিকে ঘুরাইলে আলো কমত।

ন্যশনাল টিভির পর্দার উপরে একটা হালকা রেডিশ কালারের ট্রান্সপারেন্ট কাগজ লাগনো হইছিল। সাদাকালো ছবি হালকা কালারের মত আভা ছড়াইত। একটু যেন কালার টিভি কালার টিভি ভাব।

আমাদের পপুলার সিনেমাগুলা ছিল একদম কারেন্ট মুভিগুলা। যেমন কেয়ামত সে কেয়ামত, দিল, সালমান খানের ম্যায়নে পেয়ার কিয়া বা মিঠুনের ছবি অমিতাভের ছবি। আমাদের মধ্যে প্রত্যেকের সিলেক্টেড প্রিয় নায়ক-নায়িকা ছিলো। যেমন কারো প্রিয় নায়ক মিঠুন—সে মিঠুন বলতে অজ্ঞান। সবাই জানত যে অমুক মিঠুনের ফ্যান। কেউ রেখা–কেউ শ্রীদেবী। প্রিয় নায়ক যাদের একই—তারা একটা গ্রুপ। দুই পরস্পরবিরোধী গ্রুপের মধ্যে বাগযুদ্ধ ছিল প্রতিদিনের ঘটনা।

আবার নায়ক হিসাবে ছবির ধরনও আমাদের মুখস্থ ছিল। যেমন অমিতাভের ছবি মানে যে তুমুল অ্যাকশন এটা আমাদের মস্তিষ্কে একদম গভীরভাবে গাঁথা থাকত। আমাদের মধ্যে মানে ভাইবোনদের মধ্যে ঝগড়া হইত কে বেশি অ্যাকশন হিরো—অমিতাভ নাকি মিঠুন।

কোন নায়ক-নায়িকা বেশি সুন্দর সেইটা মাপার বড় ইন্ডিকেটর ছিল গায়ের রঙ। সাদাকালো টিভিতে হিন্দি ছবি দেইখা আমাদের পক্ষে কখনও বোঝার উপায় ছিল না যে আসলে কোন হিরো-হিরোইন কত সাদা। তবে সেইটা বোঝার উপায় ছিল ভিউকার্ড—যেইটা দেইখা বিতর্ক উসকাইয়া উঠত। নায়ক-নায়িকাদের রঙিন ভিউকার্ড আমাদের ভাইবোনদের কেনা হইত প্রতি মাসে বা সপ্তাহে। সেই রঙিন ভিউকার্ডে মূলত আমরা অমিতাভ, মিঠুন, জিতেন্দ্র, শ্রীদেবী, মাধুরী, মিনাক্ষ্মীদের রঙিন চেহারা দেখতে পারতাম—গায়ের রঙও আন্দাজ করা যাইত।

মিঠুন ফ্যানরা তাকে কোনোভাবেই কালা মানতে চাইত না—কিন্তু ভিউকার্ড দেইখা কনফিউজড হইত। তারপরেও সাদাকালো টিভিতে সিনেমা দেইখা আমরা কোনোভাবেই নিশ্চিত হইতে পারতাম না—নতুন নায়কের বেলায় তো আরো বিপদ। যে নায়ক-নায়িকার ভিউকার্ড নাই তাদের কোনো বেইলও ছিল না আমাদের কাছে। আমরা বুইঝা নিতাম ওইটা ভুয়া নায়ক বা নায়িকা।

তখনও অমিতাভকে কেউ বুড়া কইত না। তবে পুরান নায়ক কইতাম আমরা। মিঠুনকেও। তবে মিঠুনের বেশি পরিচিতি ছিল ড্যান্সার হিসাবে। তার মত ড্যান্সার ভূ-ভারত কেনো ভূ-গোলকেও নাই বইলা আমাদের পোলাপাইন গ্রুপের তুমুল বিশ্বাস ছিল। ঋষি কাপুর চাচিদের প্রিয় নায়ক। গোবিন্দ তখন উঠতি তারকা—কেউ বলত সে হেভি নাচে আবার কেউ বলত হেভি মারামারি করে। তবে একটু মোটকু ছিল বইলা আমার পছন্দ ছিল না। আর ছিল সঞ্জয় দত্ত—তখন স্মার্ট ছেলেমেয়েদের পছন্দের হিরো। সালমান আমাদের মাঝে পপুলার হবার একটু আগে আগে। অবশ্য আমার ভাল লাগত জিতেন্দ্রকে। একটা হিন্দি ছবিতে সে পুলিশ অফিসার আর উইড়া উইড়া ফাইট করে, এক ঘুষিতে অসংখ্য মানুষ মাইরা ফেলে—এইটা দেখা ছিল আমার আনন্দের।

আমরা অ্যাকশন ছাড়া সামাজিক ছবিও দেখতাম। তবে সেটা বাধ্য হইয়া—এলডার্স চয়েসে। যেমন তোফা—সেইটাও ছিলো জিতেন্দ্রর, দেখার মধ্যে আমি মনে মনে আশা নিয়ে বইসা ছিলাম এই হয়ত একটা মারামারির সিন আসবে। আমরা অ্যকশন ছবির মধ্যে ক্যাটাগরি করতাম, যেমন তুমুল মারামারি অথবা অ্যাকশনের মাঝে ডায়লগ বেশি। এই ক্যাটাগরিতে অমিতাভ, শক্রুঘ্ন, চিরঞ্জীব, মিঠুন, আরো কয়েকজনের নাম আসত।

ওই টাইমটা ছিল আমির খানদের আগমনের সময়। তুমুল রোমান্টিক কেয়ামত বা দিল দেইখা আমরা আসলে প্রেম শিখছি। বা বলা যায় রোমান্টিকতা। আমাদের চাচাতো ভাইবোনদের প্রেম ও ফ্যাশন টেনশন শুরু হইয়া গেছিলো। আমরা তখনই জানতে পারলাম পাড়ায় রাস্তার মোড়ে যে ছেলেটা সঞ্জয় দত্তের মত চুলের কাটিং কইরা দাঁড়াইয়া থাকে সে মূলত বড় আপার প্রেমিক।

হিন্দি রোমান্টিক ওই মুভিগুলা আমরা সঠিক সময়ে, মানে মুক্তি পাওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই দেখছি মনে হয়। ছবির খবর ওই ভিডিওর দোকান থাইকাই পাইতাম। ভিডিওর দোকানগুলো ছিলো পটুয়াখালি শহরের সব চাইতে সাজানো-গুছানো দোকান। মানে যেখানে রঙিন পোস্টার শোভা পাইত, টিউব লাইটের আলোতে ঝকমক করত।

হিন্দি ছবির পোস্টারের রঙিন ছবি বেশ আকর্ষণ করত। নায়ক-নায়িকার বয়স বোঝা যাইত না। খুবই আর্টিস্টিক। বাংলাদেশী সিনেমার পোস্টারের তুলনায় ছাপা, লেখা এবং স্টাইল খুবই নান্দনিক ছিল। ভিডিওর ফিতা বা ক্যাসেটগুলাতে ছবির ছবি থাকত। ছাপানো লেখা থাকত। কিছু ছবির ক্যাসেটে হাতে লেখা নামও থাকত। পুরান ছবির। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমরা বুঝতাম ছবি থেকে কপি করা ছবি। মানে দুই নম্বরী। প্রিন্ট ভাল না। সেজন্য ব্র্যান্ডিং করা, ছাপানো লেবেলের ভিডিওর ক্যাসেট আমরা ভাড়া নিতাম। ১০ টাকা ছিল একটা ছবির ভাড়া।

একদিন রাখা যাইত। ভিডিওর দোকানে ওই ছবিগুলার হাফ পৃষ্ঠা সমান সাইজের ছবি দিয়া একটা ক্যাটালগ খাতাও থাকত। সেই ক্যাটালগে একটু বিস্তারিত তথ্য থাকত—ছবির পরিচালক কে, গায়ক-গায়িকা কে ইত্যাদি। তবে এত কিছু আমাদের দেখা লাগত না—কী কী ছবি নতুন আসছে সেইটা আগে আগেই আমাদের মুখস্থ হইয়া যাইত। ভিডিওর দোকানে ছবি ভাড়া নেওয়া হইত ভিসিআর সমেত—তাই ভিডিওওয়ালাও যে ছবিগুলা সবাই নেবেই এমন কারেন্ট ছবিগুলার একটা প্যাকেট বানাইয়া রাখতো।

আমরা যে শুধু হিন্দি ছবি দেখতাম তা না। এইটা ছিল ম্যাটিনি শোর মত। হিন্দি অ্যাকশন। তারপরে রাত যত গভীর হবে তত ছবির ধরন চেঞ্জ হইত। যেমন ভারতীয় বাংলা—প্রসেনজিৎ আর ভিক্টর ব্যানার্জির অ্যাকশন ছবি। তারপরে তাপস পালের ছবি—একটু সামাজিক টাইপ। আরো রাইত গভীর হইলে ইংলিশ ছবি চলত। টারমিনেটর। চাইনিজ মুভি। সুপারডুপার মারামারি। অবশ্য তখন রাত গভীর—১/২ টা। ইংলিশ ছবিতে হালকা ইরোটিক থাকত বইলা এইটা মিডনাইট স্পেশাল। দর্শকদের মধ্যে কাটছাট। মুরুব্বিরা এমনিতেই চইলা যাইত—তাদের ঘুমের সময় হইছে। আর বাচ্চাকাচ্চারদের মধ্যে এডলসেন্টদের আমরা ঘাড় ধইরা বাইর কইরা দিতাম। নিজেদের তখন পুরাই অ্যা ডাল্ট মনে হইত।

তারপরে রাত আরো গভীর হইয়া একসময় শেষ হইত। শেষ রাইতে ওই টিনের ঘরে আমরা কয়েকজন চাচাত ভাই থাইকা যাইতাম। সকালের আগে আগে আমাদের আরো কিছু দেখা হইত। ছবির ফিতা ভিসিআরে আটকাইয়া যাওয়া ছিল অবধারিত। সেই আটকানো ফিতা বা ঝির ঝির ছবি আসা দূর করার জন্য নানান প্রযুক্তি টিভির পাশে থাকতো। পেট্রোল এবং তুলা। পেট্রোল দিয়া নাকি ভিসিআরের হেড ভালো পরিষ্কার হইতো।

আমাদের গুরু আমাদের বড়াপা ভিসিআরের ছবি ঠিকমত আনার বিজ্ঞানী ছিলেন। এইজন্য তার ছিল মহল্লায় দুর্দান্ত দাপট—তিনি ছাড়া সিনেমা দেখার স্বপ্ন কেউ দেখত না।

টানা তিনদিন চলত আমাদের সিনেমা দেখার আসর। সকাল ৯/১০ টা থেকে আবার শুরু হইত দেখা। আমরা অনেকে ঘুমাইতাম—অনেকে ঘুমাইতাম না। ১৫/২০ টা ছবি দেখা হইত ওই এক ম্যারাথনে। শেষে মাথা ভো ভো করত। কোনো ছবির কাহিনী মনে করতে পারতাম না—একটার মধ্যে আরেকটা ঢুইকা যাইত।

সিনেমা দেখার ঝড় শেষ হইলে আমরা কয়েকদিন রেস্ট নিতাম। ঘুমাইতাম দুই-তিন দিন একটানা। তারপরে আলাপ করতে বসতাম কোন কোন ছবি দেখা হইল। কোন কোন নায়ক-নায়িকা ছিল। রেটিং করতাম। ঘটনার চুলচেরা বিচার বিবেচনা চলত। কোনো কাজিন হয়তো নতুন একটা ফ্যাশন শুরু করত ছবির প্রভাবে—কিছু ডায়লগ মুখে মুখে চলত কিছুদিন। তারপরে আবার অপেক্ষায় থাকতাম কবে বড়াপা ভিসিআর ভাড়া করার শুভসংবাদ দিবে।

About Author

কৌশিক আহমেদ
কৌশিক আহমেদ

চুয়াত্তরে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে জন্ম। ইংরেজি সাহিত্য ও ব্যবসা প্রশাসনে পড়াশুনা। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত। বাংলাদেশের ব্লগ, সামাজিক গণমাধ্যম, নতুন মিডিয়া এবং এর সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত ও প্রভাব নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত। ব্লগ: বিপদজনক ব্লগ