page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

মিনিমাউস-মিকিমাউস

মিনিমাউস-মিকিমাউস নামে যে কোনো কার্টুনের চরিত্র থাকতে পারে এটা আমাদের ধারণাতেও ছিল না। এক রোজার ঈদের আগে আমাদের জন্য মিকিমাউস-মিনিমাউস আঁকা গজ কাপড় কিনে আনা হলো। এই কাপড় দিয়েই শার্ট বানানো হবে ঈদে। এখন বুঝতে পারি, ওই সময় আমাদের সমবয়সী শহুরে ছেলেমেয়েরা ধূমছে মিনিমাউস-মিকিমাউস দেখছে। ডোরেমন জনপ্রিয় হলে যেভাবে টিশার্ট, শার্ট, খেলনা সর্বত্র ডোরেমন পাওয়া যায়। অ্যাংরিবার্ড যেভাবে শার্টে উঠে আসে সেভাবেই তখন মিনি-মিকিরা এসেছিল আমাদের শার্টের কাপড়ে।

তখন সম্ভবত আমি টু বা থ্রিতে পড়ি বিরাশি/তিরাশি সাল হবে। কারণ আমরা যখন ফোরে পড়ি তখন আমাদের গ্রামে প্রথম টিভি আসে। শুক্রবার টিভিঅলা বাড়িতে গিয়ে আমরা বিলিভ ইট অর নট আর এইসব দিনরাত্রি দেখতাম। তো মিনি-মিকি আঁকা লম্বা কাপড়টা যখন বিছানায় পাতা হলো তখন আমরা প্রথম দেখলাম পুরো কাপড় জুড়ে ছোটাছুটি করছে হাজার হাজার মিকি-মিনি।

mahbubmlogo

আমি আর আমার ভাই, আমরা পিঠাপিঠি। আমার নাম মান্না, ওর নাম পান্না। সাধারণত আমাদের শার্টগুলো হতো একই রঙের, একই কাপড়ে তৈরি। আমি আর পান্না মিলে খুব আগ্রহ নিয়ে দেখলাম। মনে মনে গল্প সাজানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই কোনো গল্প জোড়া দিতে পারলাম না। নিয়ম অনুসারে কাপড়টি পাঠানো হলো দর্জির দোকানে। দর্জিদের আমরা বলতাম খলিফা। শব্দটা সম্ভবত উর্দু। কাপড়ের সাথে গিয়ে আমরা দুই ভাই শার্টের মাপ দিয়ে আসতাম। আমাদের মতো খলিফা সাহেবেরও কাপড় খুব পছন্দ হলো। গ্রামের জন্য খুব আনকমন ডিজাইনের কাপড়।

যতদূর মনে পড়ে এরকম প্রিন্টের গজ কাপড় ছিল সেটা। - লেখক

যতদূর মনে পড়ে এরকম প্রিন্টের গজ কাপড় ছিল সেটা। – লেখক

আমাদের বাড়ির পাশেই বাজার। বাজারে দর্জির দোকান। সেখানে শার্ট বানানো হচ্ছে। আমরা মাঝে মাঝে দেখে আসতাম। শার্ট বানানোর অগ্রগতি। দর্জি আমাদের বলতো, এই যে ধরবো তোমাদের শার্ট। কয়েকদিন যেতে না যেতেই শার্ট বানানো হয়ে গেল। আমরা টাকটা শার্ট নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। ট্রায়াল দিতে গিয়ে দেখলাম শার্ট বেশ ছোট হচ্ছে।

সবাই বললো, খলিফা কাপড় চুরি করেছে। খলিফাদের এই এক কমন বদঅভ্যাস ছিল। আমরা শার্ট নিয়ে দোকানে গেলাম। উঁকি দিয়ে দেখলাম, খলিফার ড্রয়ারে মিকি-মিনির কিছু অংশ রয়ে গেছে। কিন্তু, খলিফা যে কাপড় চুরি করেছে সেটা আর বলতে পারলাম না। বললাম, শার্ট তো ছোট হইছে। খলিফা আমাদের আবজাব বুঝিয়ে আবার বাড়ি পাঠিয়ে দিল।

ঈদ চলে এসেছে। এখন সময় নেই। ঈদে আমাদের ওই ছোট শার্টই পরতে হবে। ঈদের দিন আমরা ছোট শার্ট পরে ঈদগাতে গেলাম। আসলে আমরা ঈদগাতে যেতাম না। ঈদগার পাশে মেলা বসতো সেখানে যেতাম। সেখানে গিয়ে খেলনা ইঁদুর, ঢোল, বাঁশি কিনতাম। পথে যার সাথেই দেখা হলো, সেই বললো, শার্ট তো ছোট হইছে। আমরাও সবাইকে বললাম, অমুক খলিফা কাপড় চুরি করছে তো। তাই।

এইভাবে ঈদের দিনের এক বেলা শার্টটা পরার পর আমরা আর কিছুতেই শার্টগুলো পরতে রাজি হচ্ছিলাম না। তাই শার্ট দুটো আমাদের দুই প্রতিবেশী বাচ্চাকে দেয়া হলো। ওরা তো নতুন শার্ট পেয়ে খুব খুশী। কিন্তু ওদের পরনে ওই শার্ট দেখলেই আমার মেজাজ খারাপ হতো।

ওই দর্জিকে আমরা আর কখনোই শার্ট সেলাই করতে দেই নাই। মিনিমাউস-মিকিমাউসের প্রতি ওই শার্টের মাধ্যমেই একটা জটিল অভিব্যক্তি তৈরি হয়েছিল। পরে মিনিমাউস-মিকিমাউস কার্টুন দেখলেই আমার শার্টের কথা মনে পড়তো। এখনও মাঝে মাঝে মনে পড়ে। বিছানার ওপর পুরো গজ কাপড়টা ফেলে আমরা গল্পটা বানানো চেষ্টা করছিলাম সেটা। যদিও জানতাম না মিনিমাউস-মিকিমাউস আসলে কী?

About Author

মাহবুব মোর্শেদ

কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক জন্ম, ১৯৭৭ প্রকাশিত বই গল্প : ব্যক্তিগত বসন্তদিন, দেহ, অর্ধেক জাগ্রত রেখে উপন্যাস : ফেস বাই ফেস ননফিকশন : গুরু ও চণ্ডাল কবিতা : বস্তু পৃথিবীর রহস্য