page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

মোরে উডাইয়া নাও

প্রেমিকাকে উঠিয়ে নিতে হয়। শৈশব-কৈশোরে বরিশালের দিনগুলিতে আশপাশের ঘটনা দেখে তেমন ধারণা হয়েছিলো। ছোট্ট শহর, রিক্সা নিয়ে এক ঘণ্টায় পুরো শহর ঘুরে আসা যেতো ৬ টাকায়।

রাস্তাঘাট ফাঁকা ফাঁকা—শহরের অন্য মাথায় কোনও এক শরৎ সকালে কেউ যদি কাউকে উঠিয়ে নিতো—আমাদের কাছে নোটিফিকেশন চলে আসতো বাতাসে ভেসে। বৈদ্যপাড়ায় ঠিক যে বাড়িটাতে আমরা ভাড়া থাকতাম তার সামনে মন্টু চাচার দোকানের সামনে দিয়ে একজন সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় হয়তো বলে গেলো—অমুক কন্টাকটারের মেয়েকে উঠিয়ে নিয়ে গেছে তমুক চেয়ারম্যানের ছেলে!

আমিও স্বপ্ন দেখতাম একদিন কাউকে উঠিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাবো।

‘উঠিয়ে নেয়া’ ভাবতেই কেমন যেন একটা অন্যরকম ব্যাপার ভর করতো, যত না তার প্রেম—তার চেয়ে বেশি প্রাইড। কিন্তু উঠিয়ে নিয়ে যাবোটা কই? কার কাছে? বরিশালের বাইরে অন্য কোথাও যাই নি। আত্মীয়স্বজনও সব কাছাকাছি দূরত্বে বাস করে।

যারা উঠিয়ে নেয় তারা সোজা লঞ্চে গিয়ে ওঠে, ঢাকার পথে, ঢাকাইয়া আত্মীয়স্বজনদের বাড়ি। সাথে থাকে বাবার পকেটমারা টাকা বা চুরি করা গয়নাগাটি, মায়ের। কিন্তু আমার তেমন সাহস নাই, উঠিয়ে নেবার রসদ, মানুষ বা বস্তু, কোনটাই। শেষে আমার লঞ্চও যাবে পঞ্চও যাবে!

কেউ যে একজন আছে, তাও নয়। বা বিষয়টা ধোঁয়াশাপূর্ণ। একজন পড়শি যাকে দেখলে হার্টবিট কখনও ড্রামবিট হয়ে যায় কিন্তু চিঠি লেখার সাহস কলমের কালিতে আবার ধুয়েও যায়।

kowshik1b

রাতের লঞ্চঘাট, বরিশাল। ঢাকার উদ্দেশ্যে যাচ্ছে লঞ্চ। ছবি. লেখক।

তখন সবাই চিঠি লিখেই প্রেমের প্রস্তাব দিতো, আর তা কালির কলমেই লেখা হতো। পড়শিনি যেভাবে তাকায় মনে হতো সামথিং সামথিং—কিন্তু কথার বরিশাইল্লা পিউর টানে প্রেমের কিছু পেতাম না। তদুপরি শিক্ষিত বরিশাইল্লাদের সেমি-প্রমিত ভাষায় কথা বলার পারিবারিক চর্চার সাথে তার ‘ও মোর আল্লা…তুমি ঘেডি ঘুরাইয়া আমারে খালি দ্যাহো ক্যা’ জাতীয় ডায়লগ শুনে প্রেমও গুটিয়ে যেতো।

‘উঠিয়ে নেয়া’ একতরফা মনে হলেও বিষয়টা একদমই তেমন নয়। মেয়েটি একদিন কীর্তনখোলার নৌকায় ভাসতে ভাসতে প্রেমিকের চোখে গভীর দৃষ্টি ফেলে বলবে ‘মোরে উডাইয়া লইয়া যাও’। শোনা মাত্র ছেলেটির আকাশে উড়তে শুরু করবে কাকপক্ষী আর তখনই উঠিয়ে নেয়া হবে। কিন্তু ধোঁয়াশাপূর্ণ ড্রামবিটের উৎস যে বালিকা সে এমন তরলায়িত ডায়লগ জীবনেও দিবে না। বরঞ্চ এটা বলতে পারে, ‘মোরে কি চদু পাইছো যে মুই তোমার মত আকাইম্মার লগে ভাইগা যামু? এক্কেরে কিত্তনখোলায় হালাইয়া চুবামু!’

ঢাকা থেকে সাতসকালে ঘাটে ভেড়ে লঞ্চ; বরিশাল লঞ্চঘাট। ছবি. লেখক।

ঢাকা থেকে সাতসকালে ঘাটে ভেড়ে লঞ্চ; বরিশাল লঞ্চঘাট। ছবি. লেখক।

হয়তো তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া যেত দিনকয়েকের জন্য। দুই পরিবারের মধ্যে সম্ভাব্য শত্রুভাবাপন্নতার নাড়িনক্ষত্র জানা থাকায় এই ‘হতে পারে’ প্রেমের ভয়াবহ পরিণতি আচ করতে পারছিলাম। উঠিয়ে নেবার পরে দেখা যেত দুই পরিবার মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। মেয়ের অভিভাবকদের জন্যও ভালো একটা অজুহাত হতো যে মেয়েকে উঠিয়ে নিয়েছে, ভেগে যায় নি তো!

যদিও এসব ক্ষেত্রে সবাই মোটামুটি নিশ্চিত থাকে যে মেয়েটি স্ব-ইচ্ছায় ছেলের সাথে ভেগেছে, তারপরেও মেয়ের পরিবার সেটা অস্বীকার করলেও কেউ কিছু মনে করে না। ভদ্রতায়। তাদের চোখে এটা ‘উঠিয়ে নেয়া’ই। এবং বীর-প্রেমিকের মত এই ‘উঠিয়ে নেয়া’য় অ্যাডভেঞ্চারে গর্বিত হতে পারতাম!

একদিন কিন্তু সে ঠিকই আমাকে এই ডায়লগ মেরে বসলো, ‘তুমি মোরে উডাইয়া নাও।’ কিন্তু আমি তার ক্ষুদ্র একটা ছবি উঠিয়ে নিয়ে চলে এসেছিলাম। এতদিন পরে মনে হচ্ছে আমার সিদ্ধান্ত সঠিকই ছিলো। এখন সে আমার মত বুড়িয়ে গেলেও ওই ছবিটায় তাকে সেই উঠিয়ে নেয়ার দিনটির মতই ধরে রাখা গেছে।

About Author

কৌশিক আহমেদ
কৌশিক আহমেদ

চুয়াত্তরে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে জন্ম। ইংরেজি সাহিত্য ও ব্যবসা প্রশাসনে পড়াশুনা। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত। বাংলাদেশের ব্লগ, সামাজিক গণমাধ্যম, নতুন মিডিয়া এবং এর সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত ও প্রভাব নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত। ব্লগ: বিপদজনক ব্লগ