page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

রিয়া ও ফারহানা

রিয়ার ব্যাপারে কত্তো কথা। কিন্তু সব হইল ছোটবেলার। আমি আর রিয়া, আমগোর ভেতরের গল্পগুলা এক রকমের স্মৃতিময়। আমি যখন ওইগুলা ভাবি, অজান্তেই কীরম লাগে। এই কীরম লাগার টিপ্পনিতে আমি হাইসা উঠি। সিগ্রেট টানতাম যে আমরা—রিয়াগোর বাসার ছাদে, মনে পড়লে এখন অদ্ভুত লাগে।

সিগ্রেট কিনতাম দূরের দোকান হইতে। আর লোকচক্ষুরে আমার লাগতে থাকত লজ্জা। ফের ভয়ও লাগত অনেক—তবু একবারও ধরা না খাইয়া আমরা সিগ্রেট খাইতাম। সন্ধ্যার পরে। আটটা বা সাতটা, এই সকল টাইমে।

জানি এই অন্ধকার সময়ে দূরবর্তী বাড়ি থিকা আমাদের সিগ্রেটের আগুন দেইখা ফেলার কথা। কিন্তু দেখা আর যাইত না। কেন যাইত না? রিয়া কইত, আমগোর সম্পর্কটা কিন্তু গডের সাহায্যে চলে।

আমি মিলাইতাম, গডের সাহায্যের লগে আমগোর রিলেশনরে। সিগ্রেট খাওয়া, পরে চুমা খাওয়া, পরে অর হাত দিয়া এইসব-সেইসব। ইত্যাদি।

saad rahman logo

কিন্তু রিয়ার লগে আমার সম্পর্ক আর অতি দূরে গড়াইল না। খুব সম্ভব রিয়া কোনোখান থিকা গাঁজার সন্ধান পাইছিল। গাঁজার লগে গিয়া মিলছিল—তথা গাঁজাঅলা পোলার লগে। সেই গাঁজা লইয়া ধরাও খাইছিল ওই, এবং ধরা খাইবার আগে কিম্বা পরে কলেজের ছেলেদের মুখে আমি শুনছি—রিয়া চামেলিবাগের এক ফ্লাটে কোচিং টাইম কাটাইছিল। বা প্রায়শই কাটাইত।

আমি কথাটারে একটু উপড়াইছিলাম এই বইলা—‘কোচিং তো আসলেও হইতে পারে। তাই না?’

ছেলেরা আমারে টিটকারি করছিল—‘হে হে, সাদ ভাই! খায়া তো আর কাম নাই, ভূতের বাড়িত কোচিং দিব!’

ওই বাড়িটা কিনা একটু পুরান-পুরান ছিল। হয়তো এখনো আছে। এবং লাল ইট বের হওয়া অন্যান্য বাড়িদের মতই তারে দেখতে। অগো কথা আমার যুক্তিগত মনে হইছিল না। বরঞ্চ বুঝছিলাম, এইসব বালছাল মাইন্ডের পোলাপানের লগে আমার দাঁড়ানোই শোভা পায় না। অরা আমার বয়সে সমান-সমান হইলেও, কলেজের ছেলেগুলা আমারে ভাই ডাকত। এগারো সালে। এবং আমি অগোরে তুমি ডাকতাম। রিয়া বা এলাকার অন্য কোনো একটা মেয়ের সামনে যখন আমি ছেলেগোর একজনরে ডাকতাম, “অই! এদিক্ আয়!” রিদম লাগত তখন আমার ভেতরে, গভীরে।

saad_3b

যাই হোক, রিয়ার পরে আমার সম্পর্ক গড়াইল আরেক মেয়ের দিকে। ফারহানা হইল সেই মেয়ের নাম—লোকে ডাকত ফিরোজা। ফিরোজা আর ফারহানা, এই দুই নামের মাঝে কোনো মিল নাই। নাম সংক্ষেপণ বা সংযুক্তি, এইসব কিছু না। ওই দুইটাই অর দুই দুই ভিন্ন নাম। কোনো একটা নামও কোনো একটার লগে আইসা মিলে নাই। আমি ফারহানা ডাকতাম। ফিরোজাটা যদিও সুন্দর। ফারহানা নিয়া আমার গল্প বাইঁধা গেছিল। আমি যে অরে প্রপোজাল পাঠাইছিলাম লেটার দিয়া—ওইখানে সবুজ কালিতে লেখছিলাম, “অনাগতা ফারহানা”। ফলেই এইটারে আর বাদ দেই ক্যামনে আমি—পরে?

রিয়ার নিকট হইতে ফারহানার কাছে যাওয়া, এরই মাঝখানে কিছুদিন আমি কষ্টে কাটাইলাম। এই কিছুদিনের তুলনায় দুই হাজার এগারো সালরে এখন আমার কাছে কষ্টের-কষ্টের মতই লাগে।

প্রথম যেদিন রিয়া আমারে কইল, আর ফোন দিবা না আমারে। হঠাৎই একটা দিন। বিকাল বেলা। আমি মায়ের ফোন নিয়া ওই টাইমে ঘুরে বেড়াইতাম। ওইটা দিয়াই আমার হম্বিতম্বি ও যাবতীয় চলত। রিয়ার কথায় আমি মূহ্যমান হয়া গেলাম। ভাবলাম, এ কেমন কথা? অদ্ভুত ত!

আমার বরং কান্না পাইতে লাগল। মনে আছে, সেইদিন সারাটা বিকাল আমি নির্ঘুম, তবু দুইটি চোখ বন্ কইরা বিছানায় পড়ে রইলাম। সন্ধ্যা হইল। মাগরিবের আজান হইল পরে মা আইসা শিওরে দাঁড়াইলেন। আমার ঘরটি অন্ধকার। আমারে উঠায় দিয়া মসজিদে যাইতে তাগাদা করলেন মা—আমি কইলাম, হু যাইতেছি।

রিয়ার লগে আমার মিলমিশ। সিগ্রেট খাওয়া এবং ছাদে যাওয়া। কোনো কোনো দুপুরে বাইরে-টাইরে যাওয়া। রাজারবাগ পড়ত তো ওই, আমরা দুপুরে একটু ঘুইরা আসতাম মাঝে মাঝে। রাজারবাগ স্কুল থিকা অরে রিসিভ কইরা মৌচাক মার্কেটের সামনে দিয়া সিদ্ধেশ্বরী হইয়া বেইলি রোডে গিয়া বিদ্যা প্রকাশনীতে একটা ছোট ঢুঁ মাইরাই আবার চইলা আসা। মালিবাগ মোড় হইতে দুইজনে বিচ্ছিন্ন হইয়া বাসার গলি পর্যন্ত দুষ্টুমির হাসে মারতে মারতে—ওই আমার দিনগুলা। মাগরিবের নামাজ পড়তে বাইর হইয়া এই সকল কিছুই আমার চোখে ভাসতে থাকল।

আমি বরাবরের মতই নামাজ কামাই দিয়া সোজা উইঠা গেলাম রিয়াগোর বাসার ছাদে। তিনতলা বাড়ি, অরা থাকত দুই তলায়। আমি গেলাম ছাদের দক্ষিণে, মায়ের ফোন থিকা অর ফোনে কল দিলাম। সেই ফোন কি আসলেই অর ছিল? দুই হাজার এগারো সালে, অই যখন পড়তো ক্লাস এইটে। অরই তো ছিল। উপরন্ত আমার মায়ের মোবাইলটাও তখন তো আমারই। রিয়া আমার কলটি ধরল না। এই টাইমে অরা সাধারণত ঝালমুড়ি বানাইত। অথবা মিষ্টিমুড়ি। অথবা সব্জির বড়া। ইত্যাদি বানানোতে রিয়া কুটিবাটি করত, পাঁকের ঘরে। কেননা, এর পরেই অর ছাদে আসতে হইত। তিনতলার কথা বইলা। তিনতলায় শিল্পীগোর ঘরে। রিয়া অর মায়েরে কইত, “আম্মু! একটু শিল্পীদের বাসা থিকা আসি।”

আজকে হয়ত অই সত্যিই সত্যিই শিল্পীদের বাসায় আসব। আমি দুঃখ দুঃখ মনে সিঁড়িঘরে আইসা তিনতলার দিকে নজর দিতে লাগলাম। এবং দুইতলার গেট খুলে কিনা, সেইদিকে আমার কান। মনের কষ্টে আমার ভেতরটা ভাঙতে-ভাঙতে লাগল। অনেকক্ষণ হইবার পরে, খুব সম্ভব এশার আজান পর্যন্ত আমি বইসা রইলাম। রিয়া তো আর বাইর হইল না। আমার অস্থিরতার সবটুকু আমি বুকের মধ্যে নিয়া অর বাসার সামনে দিয়া নিচে নাইমা গেলাম।

বিল্ডিংটা একটু অভিজাত কায়দার ছিল। একতলার গেটে বইসা থাকতেন এক বুড়া দারোয়ান। তিনি আমার দিকে তাকাইয়া একটা বাড়তি ফাইজলামির হাসি দিলেন। লোকটা তো জানে না, রিয়া আজ ছাদে ওঠে নাই। আমার কলটাও ধরে নাই। আমি একটা মেসেজ করছিলাম। সেই মেসেজে কী লেখা হইছিল, চার বছর পরে আইসা আমার সেইটা মনে নাই। বুড়ার উপরে মেজাজ চইটা গেল। তারে কোনো প্রকার উল্টা হাসি না দিয়া সোজা বাইর হইয়া চইলা আসলাম।

এইসব ঘটনার কয়দিন পরেই আমি ফারহানার সহিত মিলে গেলাম। একটা বাহারি চাকচিক্যময় ডায়রির কাগজে, আলুথালু ফন্টে বড়সড় একটা চিঠি লেখলাম। দুর্দান্ত সেই চিঠি, চার পাঁচ পৃষ্ঠা নিয়া গঠিত। যা কিনা আমার কান্নাগুলাই শুধু বইলা গেল। মজার ব্যাপার হইল, যেহেতু আমার মনটা তখনো রিয়ার তরেই ছটফটাইতেছিল ফলে এইখানেও রিয়ারে আমি ঢুকায় দিলাম। অদ্ভুত ব্যঞ্জনা দিয়া আমি লেখলাম যে রিয়া নামের একটা মেয়ে আমার অন্তরকে ভেঙে দিছে। উপরন্তু আমি বললাম, “ফারহানা, আমার ক্যান জানি মনে হয়, একটা ভগ্ন হৃদয়ের মেরামত করবার সকল শক্তিই তোমার আছে।”

ফারহানাও এক চিঠিতে পটে গেল। আমি আমার এক দোকানদার বন্ধুর বরাতে চিঠিটা ফারহানারে পানে পাঠাইছিলাম। ওই দোকান হইতে ফারহানা কলম, কিম্বা ছোট ভাইয়ের চকলেট, এই টাইপের আসবাবপত্র কিনত। দোকানদার বন্ধুটি তার হাতে সেইটা পৌঁছায় দিছিল। এবং আমার ফোনে একটা মেসেজও চইলা আসল, “আর ইউ সাদ? এম ফারহানা।”

এই রকমের, ছোট একটা মেসেজ। আমি পূর্বকল্পনা অনুযায়ী ফিরতি মেসেজ দিলাম।

ফোনে কথা-টথা বইলা আমরা মিট করছিলাম ঝিলপাড়ে। ঠিক ঝিলপাড়ে না, এরই কিনারে খিদমাহ হসপিটালের নিচে। আমরা পরস্পরে একে অপররে দেইখা নিয়া হসপিটালের পাশ দিয়া খিলগাঁওয়ের দিকে যাওয়া ধরছিলাম। ফারহানা এবং আমি—আমরা ইতস্তত একে অপররে দেখতেছিলাম। অই বইলা উঠল, আমারে কি তুমি রিয়াকে দেখাইবা? আমি আর কী বলি। চমকাইলাম। বাদে বললাম, ওই বাসার ওই মেয়েটা, ওই-ই রিয়া। ফারহানা ঝাপসা ঝাপসা চিনল। দ্যান কইলো, রিয়া যদি আবার ফিরা আসে? তখন!

এই যে ফারহানা, সন্দেহবতী ফারহানা—অইও রইল না। একদিন খুব জরুরি কথা জরুরি কথা ইত্যাদি বইলা আমারে ডাইকা নিল। আমরা রাজারবাগ স্কুলের পুকুরের ধারে গিয়া বসলাম। ফারহানার মুখে অদ্ভুত কষ্ট ও তাড়াহুড়ার ভাব। ওই তো এই স্কুলে পড়ে না। এইসব জায়গায় তার বিশেষ পরিচিতি নাই। ফলে অনেকটা দেদার ভঙ্গিতেই, তথা উঁচা স্বরে অই আমাদের রিলেশনটারে শেষ কইরা দিতে পারল। কেন করল? এইটা আর কইল না। যাওয়ার মুহূর্তে কানল কিনা, আমি পুরোপুরি টের পাইলাম না।

ঘটনা তাইলে কী? আমি অইদিনই জানলাম। কলেজের ছেলেদের মুখে মুখে কেমনে কেমনে ছড়ায়ে গেছিল, আমি, রিয়া এবং অারো কিছু ছেলেপেলে—আমরা কিনা নিয়মিত চামেলিবাগের ওই ভূতের বাড়িতে যাই। আমরা ব্যান্ড দল বানাইতেছি। কেমনে সম্ভব? এইসব রইটা যাওয়া মিথ্যার ফলেই ফারহানা আমা হইতে বিদায় নিল। আমি আমার সেই বন্ধুর দোকানে আলু বা চাউলের বস্তায় বইসা ফারহানার আসা-যাওয়ার দেখা পাইলাম। মাঝে মধ্যে।

এই রটনা বেশি চাওড় হয় নাই যদিও, তবু রিয়ার কানে কোনো একভাবে চইলা গেছে। সবচে জটিল বিষয় হইল যেটা, রিয়া ক্রমশই সারা মহল্লার চোখে আজব এক চিড়িয়ায় পরিণত হইছে। ছোট জামাকাপড় পইরা রাস্তায় বের হইতেছে। থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট জাতীয় জামাকাপড় পইরা বের হইতে থাকার সুবাদেই সারা মহল্লায় অর সম্বন্ধে কলেজের ছেলেদের মুখে বড় আলোচনার সূত্রপাত হইছে।

একটা ফোন আসল, দেখি রিয়ার নাম্বার। ভিমড়ি খাইতে খাইতেই ধরলাম, পরক্ষণেই অত্যধিক উঁচু স্বরে অর অনেক কথা, এবং কথার মধ্যেই আমারে ছোট করার, হেনস্তা করার মত বিস্তর বাৎচিত শুরু হইল। আমি উত্তরে কী-সব বলছিলাম, মনে পড়তেছে না। শুধু মনটা বিরাট ব্যথায় ভইরা উঠল। মনে আছে, সবিশেষ রিয়া আমারে কইল, “আড়াইতালার সিঁড়ির জানলা থিকা ওই বইটা নিয়া যাইবা?”

আমি জানতে চাইলাম, “কোন বইটা রিয়া?”

অই ঝামটি দিলো, “কী এক বালের কবিতার বই জানি।”

আমি বললাম, “ও আচ্ছা।”

রিয়া এবং ফারহানা উভয়েই যখন আমার কাছে আর রইল না তখন আমারে আরেক দিকে যাইতে হয়। আমি এইখানে সেইখানে ঘুইরা বেড়াইতে লাগলাম। কলেজের ছেলেগোর সাথেই। এগারো সালে, আহ, কত না ঘুইরা বেড়াইলাম—সারা ঢাকায়।

একদিন আমি বাসা থিকা বের হইয়া কোথাও যাইতেছি, আরো পরে। খুব সম্ভব এগারো শেষ হইয়া দুই হাজার বারো শুরু হইছে। দেখি রিয়া ও ফারহানা সামনে থিকা আসতেছে। একই লগে তাদের সমান তালে পদবিক্ষেপ। এ কেমন কথা? অরা দুইজনেই কি দুইজনারে চেনে? কী কইরা?

ভাবতে ভাবতে অরা আমার নিকটেই চইলা আসল, একটা খিল খিল হাসি দিয়া অরা ওই যে আমার পেছনে চইলা গেল, অদ্যাবধি আর সামনে আসল না। কিন্তু অরা তো মিল্যা গেল। সেটা কোন সূত্র ধইরা? জানি না।

দোকানদার বন্ধুটি আমার, সে একদিন কইল, “জানোস? ফিরোজা কিন্তু রিয়াগোর ব্যান্ড দলে আছে। চামেলিবাগে যায়।”

আমি জিগাইলাম, “ভূতের বাড়ি?”

About Author

সাদ রহমান
সাদ রহমান

জন্ম. ঢাকা, ১৯৯৬। কবিতার বই: 'কাক তুমি কৃষ্ণ গো' (২০১৬)।