page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

রুটিপিঠা ও চিংড়ির হুরররা

kowshik a 2015 d

রুটিকে বরিশালের বাইরে কাউরে বলতে শুনি নাই পিঠা, বরঞ্চ শুনলে নাকমুখ কুচকাইতে দেখছি। খ্যাত কইতে শুনছি। কী বিচিত্র! ‘মোগো দ্যাশে মোরা কোলারে (জমিন) কই খ্যাত আর ওইসব লোকজন মোগো কয় খ্যাত।’

অথচ বরিশালে রুটিপিঠা হইল সবচাইতে অভিজাত ও টেস্টি পিঠা। অবশ্য সেই টেস্ট পাওয়ার জন্য বরিশাইল্লা মুখ হইতে হইবে। চাচা-মামাদের কাছে শুনছি তারা কেনুই মাইপ্পা রুটিপিঠা খাইতে বসত। মানে এক কনুই জমিনে রাইখা হাত উর্ধ্বে তুললে যতটুকু লম্বা হইত সেই পরিমাণ রুটির স্তূপ একজন খাইয়া ফেলত। আমি অবশ্য নিজের চউক্ষে এই গল্পের সিনেমা দেখি নাই, তবে এক বিঘৎ পর্যন্ত নিজে তো সেদিনও খাইলাম। এক বিঘাতে ত্রিশ/চল্লিশটা রুটি তো হবেই। তবে এইটা অত্যন্ত মিহি এবং ছোট ছোট আকারে হইত।

kowshiklogo

এই রুটিটা মূলত চাউলের রুটি। চাউল আবার যেই-সেই চাউল না। আমার নানিরে দেখছি রুটিপিঠার জন্য আলাদা কইরা চাউল রাখত যেইটাকে বলত আল্যা চাউল। মানে আতপ চাউল। ধান সেদ্ধ না কইরা যে চাউলটা করা হয় সেইটা মূলত এই রুটিপিঠার জন্য বরাদ্দকৃত আল্যা চাউল।

আমার নানা মায়ের ছোটবেলায়ই মারা গেছে বইলা নানি নিজেই ছিলেন নানার স্থাবর সম্পত্তির নিয়ন্ত্রক। এবং আমাদের যেহেতু গ্রামে কোনো বাড়ি ছিল না তাই গ্রামের বাড়ি বলতে নানিবাড়িই বুঝতাম। এবং সেইখানের একছত্র অধিপতি নানি আবার দারোগা বাড়ির ঝি হওয়ায় শাসন চালাইতেনও তেমন। তিনি তার ধানি জমির একটা অংশ রাখতেন স্রেফ রুটিপিঠা ধানের জন্য—এর একটা বিশেষ নামও ছিল। এবং আমরা যখন যাইতাম তখন রুটিপিঠা বেশ আয়োজন কইরা বানানো হইত।

kowshik a 2015 b

মাটির চুলায় রুটি ভাজার জন্য বাড়ির ছাদে আমার মা এই রান্নাঘরটি বানিয়েছেন। – লেখক


৫/৬জন খালাম্মা-মামিরা মিইল্লা রুটির কাই বানাইত, তারপরে রুটি বেলতে বসত। কাই বানানোর আগে ঠেঁকি ছাটা চাউলের গুড়া গরম পানিতে ফুটাইয়া যে মণ্ড বানানো হইত সেইটা আটার রুটির মণ্ড হইতে ডিফারেন্ট। ৪/৫ ইঞ্চি ডায়ার ফিটখানেক লম্বা একটা মণ্ডের পিলার তৈরি হইত। তারপরে মিহি সুতা দিয়া চাকতির মত গোল গোল কইরা কাটা হইত। এই কাজটা আমি বিশেষ আগ্রহ নিয়া করতে চাইতাম।

সেই একটা চাকতি দিয়া একটা রুটি হইত। এরপর অন্যান্য রুটি বানানোর মতই জেনারেল প্রযুক্তি। কিন্তু বরিশাইল্লা ওই রুটির বিশেষত্ব হচ্ছে ওইটা অনেক মিহি এবং পার্ফেক্ট গোল হইতে হইবে। এই নিয়া সম্ভবত মা-খালাদের মধ্যে স্পেশাল ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা থাকত অথবা প্রতিযোগিতা হইত।

লেখক, বরিশাল বিএম কলেজের মসজিদ গেটে।

লেখক, বরিশাল বিএম কলেজের মসজিদ গেটে।

এই রুটি সাধারণত খাওয়া হয় নারিকেল ও চিংড়ি দিয়া তৈরি একটা ঝোল দিয়া। যেটাকে ‘চিংড়ির হুরররা’ বলে—সবচেয়ে পপুলার এইটাই। তারপরে হাসের মাংস বা মুরগী অথবা গরুর মাংশ তো আছেই। আমরা তখন মাংসই বলতাম। তবে আমাদের পরিবারের কোনো মুরুব্বি কোনো ধর্মীয় মজলিশ হইতে মাংসের অর্থ হিসাবে ‘মায়ের অংশ’ জাইন্না আসার পর থাইক্কা মাংসকে আমাদের গোশত বলতে হইত বাধ্যতামূলকভাবে। এবং সেই মায়ের অংশ নাকি আবার কোনো দেব/দেবীর—সুতরাং মাংস তো আমরা খাইতে পারি না—আমাদের খাইতে হইত গোশত। অবশ্য আমার নারকেল-চিংড়িই ছিলো বেশি পছন্দের।

বরিশালের প্রত্যন্ত দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামগুলিতে অতিথিদের সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন হিসাবে এখনও রুটিপিঠা খাওয়ানো হইছে কিনা জিজ্ঞেস করা হয়। জামাইদের রুটিপিঠা না খাওয়ানোকে অসম্মানজনক ধরা হইতে পারে।

About Author

কৌশিক আহমেদ
কৌশিক আহমেদ

চুয়াত্তরে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে জন্ম। ইংরেজি সাহিত্য ও ব্যবসা প্রশাসনে পড়াশুনা। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত। বাংলাদেশের ব্লগ, সামাজিক গণমাধ্যম, নতুন মিডিয়া এবং এর সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত ও প্রভাব নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত। ব্লগ: বিপদজনক ব্লগ