page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

সেই কবেকার লক্ষ্মীয়ারার রাদিয়ার দাদীবাড়ি

Tanim Kabi ‡5

ঘরপলায়নগুলি আমার কাছে অনেকটা শিক্ষা সফরের মত ছিল। এমন তো হইতই যে, সবাই আমার সাথে এমনকি আমি যতটা চাই—তারচেয়েও ভালো ব্যবহার করতেছে, যখন যেরকমভাবে যা চাইতেছি—তখনই তা সেরকমভাবেই দিতেছে। তবু ওই পালাইয়া যাওয়ার ইচ্ছাটার গোপনে বাড়তে থাকা আমি ঠেকাইতে পারতাম কই? ফলে উৎসবঘন পরিবেশে ফুফাত বোনের বিয়া বাড়ি থেইকাও আমারে পালাইয়া যাইতে হইছে। পরিবার পরিজন সহকারে ট্রেনে করে কোথাও বেড়াইতে যাওয়ার সময়ে মধ্যবর্তী কোনও স্টেশন থেকেও পলাইতে হইছে আমারে।

কিন্তু একবার তো এমন হইল যে, পাড়া ছাইড়া আমি আর কোথাও যাই না! ঘটনা কী? ঘটনা হইল ব্যাপার ছিল। হঠাৎই নাজির রোডে আইসা জায়গা কিইনা বিল্ডিং বানাইয়া সেই বিল্ডিংয়ের দ্বিতীয় তলায় থাকতে শুরু করল রাদিয়ারা। মানে কিনা অর্থাৎ রাদিয়াদের ফ্যামিলি। রাদিয়াদের ফ্যামিলিতে ছিল রাদিয়া, রাদিয়ার আম্মা, রাদিয়ার আব্বা ও রাদিয়ার ছোটবোন নাদিয়া। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এ ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই বহুদিন ধইরা থাকতে থাকা এত পরিচিত নাজির রোডের বাসা ছাইড়া আমরা চইলা যাই আরেক এলাকা—গাজী ক্রস রোডে।

tanimlogo2

গাজী ক্রস রোড থেকে প্রতিদিন বিকালে হাঁটাপথে আমি নাজির রোডে আইসা উপস্থিত হই। আর, রাদিয়াদের বাসার সামনের ছোট টাইপের একটা মাঠে পোলাপান সংগঠিত কইরা ক্রিকেট খেলি। সেইসব খেলায় বল যদি বা ছক্কা হয়ে রাদিয়াদের বাউন্ডারিতে ঢুকে—দৌড়াইয়া গিয়া সবার আগে আমি বল আনতে চইলা যাই। কেননা মাথায় হাজী গামছা বাইন্ধা জানালার কিনারে বইসা রাদিয়া ততক্ষণে কোরআন শরীফ পড়তে বসে। এই এক দৃশ্য, বলা যায় প্রায় চব্বিশ ঘণ্টাই আমার মাথায় ঘুরপাক খায়। বলা যায়, প্রফেশনালি সেটাই আমার প্রথম প্রেমে পড়া। মূলত ওই দৃশ্যটার প্রেমে পড়ি—সাদার মধ্যে লাল গুঁটি গুঁটি হাজী গামছার ভিতর একটা গোলগাল মুখের আয়াতানুসারে দুলতে থাকার দৃশ্য।

ব্যাপারটা আমার মধ্যে সাংঘাতিক পবিত্রতাবোধের জন্ম দিল। আমি বুঝতে পারলাম, রাদিয়াকে ছাড়া এ জীবনের কোনও মূল্য নাই। যেকোন উপায়েই হোক, রাদিয়াকে আমি ভালোবাসি। সুতরাং তার পর্যন্ত আমাকে পৌঁছাইতেই হবে। কিন্তু কীভাবে সেটা?

রাদিয়ারা ছিল হুজুর ফ্যামিলি। ওর আব্বা জেলা জামায়াতে ইসলামের উপদেষ্টা গোত্রীয়। চাকরি করত ইসলামী ব্যাংকে। মাও রাজনীতি করত, আছরের ওয়াক্তে নাজির রোডের বিভিন্ন ফ্যামিলি বাসায় গিয়া মহিলাদেরকে জামায়াতে ইসলাম করার দাওয়াত দিত রাদিয়ার আম্মা। আর পাঠানবাড়ী মহিলা মাদ্রাসায় ক্লাস সেভেনের ছাত্রী ছিল রাদিয়া, আমি তখন জিএ একাডেমি স্কুলে—ক্লাস সিক্সে পড়ি। কার থেকে যেন জানতে পারি, সকাল নয়টার দিকে সে ছাই কালারের একটা বোরকা পইরা মাদ্রাসায় যায়।

মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে প্রথমবারের মত একদিন জিলানী ভাইয়ের দোকান থেকে সাইকেল ধার কইরা রাদিয়ার পিছু নিই আমি। রিকশার পিছু পিছু সাইকেল চালাইয়া চইলা যাই মাদ্রাসা পর্যন্ত। রিকশা থামার পরে ভাড়া মিটায় সে। সাইকেল নিয়া দাঁড়াইয়া থাকি আমি। তারপর মূল রাস্তা থেকে নাইমা মাটির রাস্তা দিয়া মাদ্রাসার দিকে আগাইয়া যাইতে শুরু করলে সাইকেল নিয়া আবার জিলানী ভাইয়ের দোকানে ফেরত আসি আমি। আর, পাতালি রাস্তা দিয়া দ্রুত হাঁইটা নিজের স্কুলে গিয়া ক্লাস ধরি। বিনা বাক্যব্যয়ে দিনের পর দিন এভাবেই চলতে থাকে আমাদের।

বিকালবেলার ক্রিকেট খেলাও চলতে থাকে সমান তালে। একদিন তো এমন ছক্কা মারলাম যে বল গিয়া পড়ল রাদিয়াদের বাসার ছাদে। সেই বল আনতে ছাদে উইঠা দেখি দড়ির মধ্যে রাদিয়ার জামা শুকাইতে দেওয়া। রাদিয়ারই জামা—পরতে দেখছি বহুবার। আবেগে, কী আর করব বুঝতে না পাইরা টাঙ্গাইয়া রাখা ওই জামাটারেই জড়াইয়া ধরলাম আমি। কিছুক্ষণ ধইরা থাইকা সেই জামা ছাড়া মাত্রই গলা খাকারি দিয়া ছাদে উঠল রাদিয়ার আব্বা।

কী ব্যাপার?

কই আঙ্কেল! কই?

কী কই, ব্যাপার কী—এখানে?

বল আসছে আঙ্কেল, ছক্কা মারছি তো—সে কারণে।

ও। বল পাওয়া যায় নাই?

এই যে? এই যে বল! পাইছি তো।

তাইলে?

বল আইসা জামার মধ্যে পড়ছিল। ধূলা ছিল একটু, মুছে দিলাম।

ও। কী নাম?

টেপ টেনিস বল তো আঙ্কেল, নাম টেপের নিচে পইড়া গেছে।

বলের নাম না, তোমার নাম।

ও!—তানিম তানিম।

শুধু তানিম?

না আঙ্কেল, মোহাম্মদ তানিম, তানিম কবির। আমরা ওই যে ক্রিকেট খেলি আর কি।

কোন ক্লাস?

না না, ওই যে ওই মাঠে। ও! ক্লাস সিক্সে।

সিক্সেও পড়ো, ছক্কাও মারো—অ্যা!

জ্বী আঙ্কেল। আমি যাই, স্লামালিকুম।—বইলা দৌড়াইয়া সিঁড়ি ভাইঙ্গা নামি।

এরপর প্রায়ই বল আনতে গেটের ভিতর ঢুকলে রাদিয়ার আব্বার সঙ্গে আমার দেখা হয়। আমার চেহারাটা তার চেনা হইয়া যায়। দেখলেই, বিড় বিড় কইরা বলতে থাকে—‘পড়েও ক্লাস সিক্সে, মারেও শুধু ছক্কা! অদ্ভুত!’ আমি সালাম দিয়া পার হইয়া আসি।

আরেকদিন, রিকশার পিছু পিছু সাইকেল চালাইয়া যাচ্ছি যখন—পাঠানবাড়ী রোডের পুকুরঘাটায় রিকশা দাঁড় করায় সে। সঙ্গে সঙ্গে আমিও দাঁড়াইয়া পড়ি। থুতনি উঁচাইয়া চোখ বড় কইরা ইশারায় জানতে চাই যে—‘কী?’ জবাবে ভুয়া দীর্ঘশ্বাস ফেইলা রিকশাওয়ালারে আবার চলতে বলে রাদিয়া। সেদিন থেকে আর পিছু পিছু না, রিকশার পাশাপাশি সাইকেল চালাইতে আরম্ভ করি আমি। আর মধ্যপথে এমনভাবে তার রিকশা দাঁড় করানোরে আমার উপস্থিতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন ভাইবা সুখী থাকি।

এরমধ্যে দুয়েক মাস পার হয়। কিন্তু আমাদের মধ্যে কোনও প্রকার কথাবার্তা হয় না—কেবল ওই তাকাইয়া থাকা আর দুয়েকটা ইস্যুতে থুতনি উঁচানি হয়।

এক দুপুরের ঘটনা সেটা। কমন কোনও ছুটির দিন—দুপুরের দিকেই পোলাপান নিয়া মাঠের মধ্যে ক্রিকেট খেলতেছি। কিন্তু খেললে কী হবে, রাদিয়া তো আর সারাক্ষণ জানালার পাশে থাকে না। সে আসে শুধু বিকাল টাইমে, কোরআন শরীফ পড়ার সময়ে। তাই ওর আশা বাদ দিয়া সিরিয়াসলি ক্রিকেটটাই খেলতেছিলাম। ছুটির দিন হৈ হৈ কইরা ম্যাচ জইমা যায়। উত্তেজনাপূর্ণ বিভিন্ন মুহূর্ত ঘন ঘন আসতে থাকে ম্যাচে। কিন্তু হঠাৎই বৃষ্টি আইসা সব ভণ্ডুল কইরা দেয়। ব্যাট স্ট্যাম্প ইত্যাদি নিয়া সবাই যার যার মত নিরাপদ স্থানে চইলা যায়। থাইকা যাই শুধু আমি। বৃষ্টিতে ভিজতে থাকি আর জানালার দিকে তাকাইয়া বারবার আল্লাহরে বলি যে—‘প্লিজ আল্লাহ, রাদিয়ারে একবার একটু জানালার পাশে আইনা বসাও!’

আশ্চর্য যে, আল্লাহ আমার কথা শুনলো। হাজী গামছা পরা অবস্থাতেই আল্লাহ আইনা তারে জানালার পাশে বসাইল। আমিও ভিজা মাঠের মধ্যে বইসা পড়লাম। আর তাকাইয়া থাকলাম রাদিয়ার দিকে। রাদিয়া হচ্ছে, আমার উপস্থিতিরে বেইল না দিয়া নিজের এই-সেই নিয়া ব্যস্ত থাকার অভিনয় করল। কিন্তু একটুই যখন দুই সেকেন্ডের জন্য আমার দিকে তাকাইল—তখনই তার চোখ পইড়া গেল আমার চোখে। এতে সে শরম পাইয়া আবারও নিজের কাজে ব্যস্ত হইল। আর, আমি তো তাকাইয়াই থাকি—পলকও ফেলি না। অনেকক্ষণ পর আবার আমার দিকে তাকাইলে তখনও তার চোখ আমার চোখে আইসা পড়ে। সইরা যাইতে যাইতেও সেই চোখ ফিইরা আইসা আবার আমার চোখেই স্থির হয়। অবশ্য অল্প কিছুক্ষণের জন্যই। এরপর সে উইঠা চইলা যায়।

আর এই চইলা যাওয়া যখন আমার বুকের মধ্যে পেরেক মারতে শুরু করে, তখনই আবার ফেরত আসে সে। হাতে কিছু একটা সাদা। আমারে দেখায়, তারপর ছুইড়া মারে। কিন্তু সেই ছুইড়া মারা নরমালি যত দূরত্ব পাড়ি দেওয়ার কথা—তত দূরত্ব পাড়ি দিতে পারে না মূলত জানালার গ্রিলের মধ্যেই হালকা আঁচে একবার বাধাপ্রাপ্ত হবার কারণে। তাও বাইর হয়, আর অত্যন্ত বেকায়দা অবস্থায় সেটা তাদের দোতলার কার্ণিশে আটকা পড়ে।

কিন্তু আমারে তো আর পায় কে! ভিজতেই ভিজতেই—আর, ততক্ষণে আরও বাইড়া যাওয়া বৃষ্টির মধ্যে—বলতে গেলে উইড়া উইড়া গিয়া সেই কার্ণিশে উঠি আমি। কুঁচকানো এবং ভিইজা প্রায় ন্যাতাইয়া যাওয়া সেই কাগজটা খুইলা দেখি তাতে লেখা: ‘বৃষ্টিতে জ্বর হবে। বাসায় যাও। ৬-**** এটা আমাদের টেলিফোন। বিকালে আম্মু বের হবে। আব্বু থাকবে না। তখন ফোন দিও।’

আনন্দ ও উত্তেজনায় আমার মাথা ঘুইরা যায়। কার্ণিশ থেকে নাইমা আসি দ্রুত। কিন্তু জানালায় আর তারে তো পাই না! ভিজতে ভিজতে এবং কানতে কানতে বাসায় ফিরা আসি।

হ্যালো কে?

কে, নাদিয়া?

হ্যাঁ।

রাদিয়া আছে?

তানিম ভাই?

হ্যাঁ।

হা হা, দেই দেই…

তানিম?

রাদিয়া!

হি হি—কোত্থেকে ফোন করলা?

আনোয়ার ডাক্তারের চেম্বারের অপজিটে যে ফোন ফ্যাক্সের দোকান? সেখান থেকে।

আচ্ছা।

কিন্তু তুমি আমার নাম জানো ক্যামনে?

অন্য খেলোয়াড়রা তোমার নাম ধরে ডাকে না? ওমনে। তুমি কীভাবে জানলা আমারটা?

জানি।

শোন, রাদিয়া কিন্তু আমার ভালো নাম। ডাকনাম সোনিয়া।

সেটাও জানি। কিন্তু সোনিয়া নামে ডাকা যাবে না।

কেন!

আমার আপন ছোটবোনের নামও সোনিয়া—তাই।

তুমি আমাদের মাদ্রাসায় ঢুকার সময়ে কারেন্টের যে খাম্বাটা পড়ে, সেইখানে আমার নাম লিখছো।

হু, লিখছি।

কেন?

এমনেই। আরও অনেকখানে লিখছি তো!

আরও কোনকোনখানে?

পাঠানবাড়ী রোডের পুকুরঘাটে। জিলানী ভাইয়ের দোকানে। এমনকি তোমাদের বাসার ছাদে।

ছাদে! ছাদে কোথায় লিখছো?

সিঁড়ির ঘরটা না? ওইখানে একটা পাটা দাঁড় করানো থাকে সবসময়।

হু হু?

পাটা সরাইলে দেখতে পাবে।

বাব্বাহ! দাঁড়াও, দেইখা আসি?

যাও। আমি লাইনে থাকব?

না, তুমিও পাড়ায় আইসা পড়ো। আমি ছাদে হাঁটাহাঁটি করব। আমারে আইসা দেখ।

আচ্ছা!

তৃষা ভবনের ছাদ থেকে রাদিয়ারে দেখলাম সন্ধ্যা পর্যন্ত। এরপর এরকমভাবে দিন যাইতে থাকে। দুই ছাদে আলাদা আলাদাভাবে আমরা হাঁটাহাঁটি করি। ক্রিকেট খেলি, জানালায় বইসা সে কোরআন পড়ে। তার আম্মা যখন বাইর হয়। আর আব্বাও যখন থাকে না—তখন আনোয়ার ডাক্তারের চেম্বারের অপজিটের ফোন ফ্যাক্সের দোকান থেকে তারে আমি কল দিই।

তুমি কোরআন খতম দিছো?

এখনও না, সাত পারায় আছি।

মাত্র!

হ্যাঁ, তুমি?

আমি তো প্রায়ই দেই। প্রতি মাসেই এক খতম দিতাম আগে। যখন আমরা চট্টগ্রামে ছিলাম।

আর এখন?

এখন একমাসে হয় না। দেড় দুই মাস লেগে যায়।

তোমারে কোরআন পড়তে দেখতে দেখতেই তো…

কী?

না কিছু না।

বলো তানিম!

মানে ভালোবাসছি!

তওবা তওবা—হি হি! তুমি কি বিয়ে করবা আমাকে?

জানি না। আমরা তো এখনও অনেক ছোট।

হুম। বিয়ের পর আমরা কী করব?

আমরা পাহাড়ে চলে যাব।

পাহাড়ে! কেন?

এমনেই। পাহাড়ে গিয়া ছোট্ট একটা ঘর বানাব, ছন দিয়া।

তারপর?

তারপর সেখানে থাকব। তুমি কোরআন পড়বা।

বিয়া করেও কোরআনই পড়ব শুধু!

না না, আরও কিছুও করবা নিশ্চয়ই।

কিন্তু পাহাড়ে?

নইলে সাগরে?

সাগরে তো আমরা ডুবে যাব তানিম!

তা অবশ্য ঠিকই বলছো…

লোকাল টিএন্ডটিতে দুই টাকায় পাঁচ মিনিট হিসেবে কথা বলতাম তখন। বিশ তিরিশ টাকা তখন যেকোনভাবেই হোক নিজের সঙ্গে রাখার ব্যবস্থা করতাম আমি। বাসায় পত্রিকা রাখত, জইমা যাওয়া পুরানা পত্রিকা বেইচাও অনেক কথা হইত রাদিয়ার সাথে।

আমাদের যোগাযোগটা ছিল খুবই অনিশ্চিত। আজকে হয়ত কথা হইল, এরপর আবার কবে হবে তার কোনও ঠিক ঠিকানা ছিল না। আর আমাদের বাসায় যেহেতু কোনও টেলিফোন ছিল না, সেহেতু নাদিয়াসহ সপ্তাহ দুয়েকের জন্য সে যখন তার দাদীর বাড়ি—লক্ষ্মীয়ারাতে চইলা গেল; আমি সে খবর জানতেই পারলাম না। বেশ কয়েকদিন জানালায়, ছাদে কিংবা মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে—কোনওখানেই ওর দেখা না পাইয়া আমি খুবই অস্থির হয়ে গেলাম।

রাদিয়ার এক বান্ধবী ছিল, পাড়ায়। ভাগ্যক্রমে তার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় রাস্তায়। জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা আপনার বান্ধবী রাদিয়া-নাদিয়ারা কই? ওদেরকে যে দেখি না? জানা গেল, দুই বোন মিলে দাদীর বাড়িতে—ফেনীর মধ্যেই লক্ষ্মীয়ারা বইলা এক গ্রাম আছে—সেই গ্রামে বেড়াইতে গেছে। লক্ষ্মীয়ারায় ওদের দাদীর বাড়ির ঠিকানা জানেন? কিন্তু সেটা ওই বান্ধবীর জানা ছিল না। যাই হোক।

পরের শুক্রবারে জুম্মা নামাজ পইড়া মহিপাল থেকে মুড়ির টিন মার্কা একধরনের বাসে উইঠা লক্ষ্মীয়ারার উদ্দেশ্যে রওনা দিই। রাদিয়াদের দাদী বাড়ির কোনও ঠিকানাই আমার কাছে ছিল না। ছিল সামান্য ইনফর্মেশন। রাদিয়ার আব্বার পুরা নাম, এবং ইসলামী ব্যাংকে তার পদবী ও রাজনৈতিক পরিচয়। এটুক সম্বলে শুরু করা সেই যাত্রা যে কত ভয়ঙ্কর হইতে পারে—তা মূল হাইওয়ে থেকে বাসটা শাখা রাস্তায় নামার পর বুঝতে পারি। বন্যা প্লাবিত বিভিন্ন গ্রামের উপর দিয়া বিকট শব্দে সেই বাস চলতে থাকে। খানিক আগাইয়া প্রথম থেকেই ভাঙাচোরা ওই শাখা রাস্তা একটা নির্মল মাটির রাস্তায় পরিণত হয়। বহমান বন্যায় সেই রাস্তার বিভিন্ন অংশ আবার এতই নরম হইয়া গেছে যে, সেসব জায়গা পার হওয়ার সময় বাসভরতি যাত্রীদের প্রত্যেককেই নাইমা পড়তে হয়। ভাঙা মাটিতে বাসের চাকা আটকাইয়া যায় আর সবাইরে মিল্যা ধাক্কা দিয়া সেই চাকা ছুটাইতে হয়।

এমনই সব অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়া একপর্যায়ে লক্ষ্মীয়ারা গ্রামে গিয়া পৌঁছাই। লক্ষ্মীয়ারা গ্রামেও বন্যা চলতেছিল। বাজারের উপর দিয়াই ঢলের স্রোত বয়ে যাইতেছে। সেই স্রোতে ভাইসা যাচ্ছে মরা মাছের ঝাঁক, গলিত কলমির ডাল, ছেঁড়া স্যান্ডেলের ফিতা—আরও কত কী। এসব দেইখা আমার বিষণ্ন লাগল। একটা দোকানে গরম জিলাপি ভাজতেছিল। গিয়া বসলাম ওই দোকানে—জিলাপি, আঙ্গুলগজা ইত্যাদি খাইলাম। সেসময় সিগারেট খাইতাম না জন্য সিগারেট না খাইতে খাইতেই এলোমেলো পায়ে হাঁটতে হাঁটতে স্থানীয় এক মসজিদের সামনে আইসা দাঁড়াই। রাদিয়ার আব্বার নাম পরিচয় উল্লেখ কইরা বাড়ির ঠিকানা জানতে চাইলাম কয়েকজন মুসুল্লীর কাছে। সহজেই জানা গেল সেটা। আর সেইমত আগাইতে থাকলাম আমি। আরেকটা ঢলের স্রোত পড়ল সামনে। স্রোতের মধ্যে পা ডুবাইয়া দাঁড়াইয়া থাকি কিছুক্ষণ। তারপর সেই স্রোতে জুতা জোড়া ভাসাইয়া দিয়া রাদিয়াদের দাদীর বাড়িতে গিয়া উপস্থিত হই।

শ্যাওলাপড়া উঠান আর পাশে একটা পুকুর, পুকুরে একদল হাঁস ঘুইরা বেড়াইতেছে। গাছগাছালিতে ঘেরা—ভিজা ও ঠাণ্ডা ওই বাড়ির দরজায় নক করি ভয়ে ভয়ে। দরজা খোলে রাদিয়ার দাদী।

কী ব্যাপার?

পানি খাব। পিপাসা লাগছে। এদিক দিয়াই যাইতেছিলাম। ভাবলাম…

ও। আসো, ভিতরে আইসা বসো—পানি দেই।

আমি ভিতরে গিয়া বসলাম। ভিতর বলতে মূল ঘর না। মূল ঘরে ঢুকার আগের গ্রিল দেওয়া বারান্দামতন জায়গা—বসার সোফা ছিল সেখানে। পানি, চানাচুর আর বিস্কুটের ট্রে নিয়া নাদিয়া আইসা তো আমারে দেখল। আর, তাৎক্ষণিকভাবে সে বেতবা হইয়া গেল। ফিঁস ফিঁস কইরা বলল—আব্বু আম্মুও কিন্তু ভিতরে আছে!

‘অ্যাঁ!’—এ কথা শুইনা উল্টা আমিই বেতবা হইয়া যাই।

ওরা কবে আসলো?

আজকেই!

রাদিয়া কই?

আছে, ভিতরে।

ইশ, তুমি না আইসা যদি রাদিয়া আসত!

আচ্ছা! আর, আমি না আইসা যদি আমার বাপ আসত? তখন!

ফলে আর রিস্ক নিলাম না। দরজা খোলাই ছিল—হালকা দৌড়ের উপর ডাইরেক্ট লক্ষ্মীয়ারা বাজারে পৌঁছায় গেলাম। কিন্তু বাসে ওঠার আগেই ঘটল ব্যাপারটা। আমার তো ছিল খালি পা—আর সেই সুযোগে একটা কাঁটা বিনলো পায়ে। সেই কাঁটা জীবনেও আর খুলছিল কিনা—কে জানে!

 

তানিম কবিরের আরো লেখা

About Author

তানিম কবির
তানিম কবির

জন্ম ফেনী জেলার পরশুরাম-বিলোনীয়া এলাকায়। কবিতা ও গল্প লেখেন। প্রকাশিত কবিতার বই তিনটি, ‘ওই অর্থে’ (শুদ্ধস্বর ২০১৪), ‘সকলই সকল’ (শুদ্ধস্বর ২০১৫) ও 'মাই আমব্রেলা' (আদর্শ ২০১৬) এবং একটি গল্পের বই 'ইয়োলো ক্যাব' (ঐতিহ্য ২০১৬)। সম্পাদনা করেন দৈনিক ভোরের পাতার সাপ্তাহিক সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘চারুপাতা’। এর আগে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজ ও প্রিয়.কমে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রকাশিতব্য বই, ‘ঘরপলায়নসমূহ’ (ফেব্রুয়ারি ২০১৭) ফেসবুক পেজ: Tanim Kabir (Writer)