page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

লাকসাম রেলকলোনিতে টিটিই’র বাসায় একরাত

ছোটবেলায় ঘর পালানোয় অভ্যস্ত কিছু পোলাপান থাকে, আমি ছিলাম তাদের একজন। রাগ কইরা ঘর পালানোর চাইতে রোমাঞ্চকর কিছু আর হয় না। ভাবতে ভালো লাগতো আমার না-থাকায় প্রত্যেকেই তাদের নিজনিজ ভুলগুলা বুঝতে পারবে। আমার প্রতি সংগঠিত সকল প্রকার অন্যায় অবিচারের টনক নড়ে উঠবে বিপুল বেগে। এরকম ভাইবা; একটা দুখি দুখি ও ‘কেউ আমারে বুঝলো না’ সুলভ অভিমানকে পাথেয় কইরা আমি ন্যূনতম টাকা পয়সা সাথে নিয়া লালমনিরহাটের উদ্দেশ্যে রওনা করতাম।

এক্ষেত্রে লালমনিরহাট আমার প্রধান গন্তব্য ছিল এ-কারণে যে, মানচিত্র ঘাইটা দেখা গেছে ওইখানেই বাংলাদেশ রেলপথের সমাপ্তি। তখন সময় আমি কবি-সাহিত্যিক ছিলাম না সত্ত্বেও ওই সমাপ্তি আমারে টানতো। থাইকা তেমন কিছু করতে বা নিজের গুরুত্ব বাড়াইতে না পাইরা না থাকার মধ্যদিয়া সেটা ঘটানোর একটা শর্টকাট রাস্তা আমি খুঁজতাম অলওয়েজ। পাইলে পাইতাম, না পাইলেও বানাইয়া নিতাম। যে, ‘নাহ! এরা বোঝে না আসলে, যাই গা!’

tanimlogo2

তো যাওয়ার আগে প্রতিবারই আপন ভাইবা ও বিশ্বস্ত মনে কইরা ছোটবোনরে শুধু ছলছল-নেত্রে জানাইয়া রাখতাম যে, ‘ভাইয়া কিন্তু অনেকদূরে চইলা গেলাম এবার!’ আর তাতেই বাঁধতো বিপত্তি। ঘর থেইকা বাইর হইয়া খুব বেশিদূর যাওয়ার আগেই সে ‘ভাইয়া ভাইয়া’ কইরা কানতে শুরু করতো। আর, বাসার বাকিরা এতে বুইঝা ফেলতো যে আবারও লালমনিরহাট রওনা করছি আমি। চারদিকে তখন আমারে খুঁইজা আনার জন্য লোক পাঠানো হইতো, বিশেষত রেলস্টেশন এবং বাসস্টান্ডগুলাতে।

অবধারিতভাবে ধরা পড়তাম আমি, আর যেই টিম আমারে ধইরা ফেলতে পারতো অত্যন্ত গর্বের সাথে তারা ধরা-পড়া বিমর্ষ আমারে নিয়া আইসা বাসায় হস্তান্তর কইরা দিত। লজ্জিত ভঙ্গিতে বাসার এককোণে বইসা থাকতাম আমি। আর ছোটবোনরে বলতাম— ‘এই দিলি তুই বিশ্বাসের দাম? বিশ্বাসঘাতক!’ আর সে তখন নিজেরে প্রুভ করতো আমারে এটা বিশ্বাস করতে বইলা যে, (খোদার কসম) সে কিছু বলে নাই, শুধু কানছে, আর তাতেই সবাই যা বোঝার বুইঝা নিছে। কিন্তু আমি ছিলাম এই ক্ষেত্রে সৎ যে, একবার পালাইতে গিয়া ধরা পড়লে পরবর্তী অন্তত দুয়েকমাস আর পালানোর চেষ্টা করতাম না।

পাতালি সিটের বগি, ছবি: লেখক ২০০৯

তবে সব চেষ্টাই যে ধরা-পড়ায় পর্যবসিত হইতো—তেমন না। বরং বেশকিছু সফল পলায়ন অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ আমার শিশুকাল। আমার এমন স্বভাবের কারণে বাসায় আব্বু-আম্মু ও বোনদের জীবন প্রায় ঝালাপালা হইয়া উঠছিল বলা যায়। এমনকি এমনও হইছে, আমি আসলে পালাইয়া যাওয়ার নিয়ত ছাড়াই বাইর হইছি; ফিরতে হয়তো দেরি হইতেছে, কিন্তু আবার পলায় গেছি আশঙ্কায় বিভিন্ন জায়গায় লোক পাঠানো হইয়া গেছে ততক্ষণে। ফিরা আইসা দেখি বাসার সামনে লোকজন, আব্বু-আম্মুর উদ্বিগ্ন চেহারা।

এগুলা মেক্সিমামই নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা। সবাই ভাবতো আমার সাথে খারাপ জ্বীনের আছর আছে, আর সেকারণেই শিশুকালেই এমন বাউলিয়ানায় পাইছে আমারে। সুতরাং পারিবারিক উদ্যোগে নানান জায়গার নানান পীর হুজুরদের কাছেও যাইতে হইতে হইছে তখন। আর তাদের দেওয়া বিভিন্ন তাবিজ তুমায় আচ্ছাদিত ছিলাম আমি। কিন্তু জ্বীন যেহেতু খারাপ, ফলে তারে বাইন্ধা রাখাটা ছিল টাফ। সকল প্রকার জাদুমন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন কইরা সেই জ্বীন আমারে আবারও এই মর্মে নক করতো যে, ‘লালমনিরহাট যাবি না পাগল!’

ভিতরে ভিতরে আবারও প্ল্যানিং চলতে থাকে, চিরতরে লালমনিরহাট চলে যাবো; আরো একদফায় এই সিদ্ধান্ত ফাইনাল কইরা ফেলছি। সোনিয়ারেও আর জানাই না। শুধু অপেক্ষা করতে থাকি—কখন কে আমার প্রতি ঘর ছাড়ার মতো পর্যাপ্ত একটা অবজ্ঞা প্রদর্শন কইরা বসে। ঠিক করি, আঘাতপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই একটা রিকশা নিয়া স্টেশনে চইলা যাবো, আর চোখের সামনে যে ট্রেনই পড়বে—একবার আগে উইঠা যাবো। পরের কোনো স্টেশন থেইকা না হয় লালমনিরহাট যাওয়ার সঠিক ট্রেন বাছাই কইরা নেওয়া যাবে।

tanim1b

আব্বু-আম্মু (১৯৮৫, স্টুডিওতে তোলা) — লেখক

দেখতে দেখতে সেরকম একটা উপলক্ষও তৈরি হইলো, বড়বোন তানিয়ার জন্মদিনরে কেন্দ্র কইরা। পাড়ার বন্ধুবান্ধবদের উপস্থিতিতে সেইবার আপুর জন্মদিনের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। সন্ধ্যার পর থেইকা নাজির রোডে (ফেনী জেলায়) আমাদের ভাড়া বাসায় লোকজন আসতে শুরু করে। একে একে সবাই চইলা আসার কারণে মুহূর্তেই ঘরের মধ্যে একটা উৎসব উৎসব আমেজ তৈরি হইয়া যায়। আর আমি দেখি এলাকার যারা বড়ভাই— খেলার মাঠে যারা আমারে কোনো দলেই নেয় না বইলা আমার ক্রিকেট খেলা হয় না; তারাই আপুর ভালো বন্ধু। বিভিন্ন ধরনের গিফট নিয়া তারা বাসায় হাজির হইছে। আপু সবাইরে তুই তোকারি কইরা কথাবার্তা বলতেছে, আর তারাও তাই। যেহেতু ওইসব বড়ভাইরা আমারে কখনোই পাত্তা দেয় নাই, আমাদেরই ঘরে আইসাও তারা আমার প্রতি একইরকম আচরণ করতে থাকে; অর্থাৎ তারা সর্বতভাবেই আমার উপস্থিতিরে সম্পূর্ণ ইগনোর কইরা চলমান উৎসবযজ্ঞে মিইশা থাকে। কেক কাটা ও মোমবাতি নেভানো সংক্রান্ত নানা ধরনের আদিখ্যেতায় তারা তারাই এত জমজমাট হইয়া থাকে যে আমার মনে হয়; এই উৎসবে আসলে আমার কোনো এক্সেস নাই। আপুর ওপর প্রচণ্ড রাগ হয়, মনে হয় আমার যারা শত্রু; কীভাবে তারা তার বন্ধু হয়! আপু কি বোঝে না এগুলা! ফলে আমি আঘাতপ্রাপ্ত হই, আর ভিড়ের মধ্যেই সংকুচিত হইয়া নীরবে কান্নাকাটি কইরা একপর্যায়ে লালমনিরহাটের উদ্দেশ্যে বাইর হইয়া যাই।

tanim-1c

ছোটবোন সোনিয়া, নাজির রোডে তার বান্ধবীর বাসায় (১৯৯৮, ছবি: লেখক)

স্টেশনে পৌঁছানো মাত্রই কিংবা অল্প অপেক্ষার পর একটা আধোন্ধকার ট্রেন আইসা দাঁড়ায়। এ ট্রেন সিলেট যাবে (সম্ভবত জালালাবাদ এক্সপ্রেস)। খুব বেশি প্যাসেনজার ছিল না, আমি পাতালি সিটের একটা বগিতে উইঠা বসি। পাতালি সিট বলতে এখন যেরকম গন্তব্য বা ছাইড়া আসা অভিমুখে সিট থাকে; এর বাইরেও সারা বগিময় টানা লম্বাকৃতির একধরনের সিট ছিল তখন। এখনো আর আছে কিনা জানি না, দেখি নাই ম্যালাদিন হয়।

ট্রেন ছাড়ার পর জানালার বাইরে তাকাইয়া গগনবিদারী এক কান্নায় আক্রান্ত হই আমি। কার প্রতি, কীসের প্রতি এই অভিমান, কেন আমারে ঘর ছাড়তে হইলো এসব ভাবি। আর ভাবি এতক্ষণে নিশ্চয়ই জানাজানি হইয়া গেছে; কিন্তু কেউই আর পাবে না আমারে, কোনোদিনও না। এ সফলতায় আমার ফোঁপানি বাড়ে, আব্বু-আম্মু আর বোনদের সাথে এ জীবনে আর দেখা হবে না; এ কথাটা নিজেরে মনে করাইয়া দিতে দিতে অর্থহীন এক বিষাদের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছাইতে চাই যেন, যেন নিজেরেই ব্যথা দেওয়ার এক বিপদজনক নেশায় পাইয়া বসে আমারে।

কিন্তু বয়স ছিল কম, এত ভার সহ্য করা যাচ্ছিল না। ফলে ঠিক করি; বড় হইয়া আবার ফিরা আসবো এদের কাছে। যথাযথভাবে, অনেক টাকা পয়সা আর প্রতিষ্ঠা নিয়া। এমন না যে বাসার কেউ আমার আর্থিক স্বনির্ভরতা নিয়া তখন সময়ই উদ্বিগ্ন হইয়া উঠছিল, তবু আমি ভাবি যে সমূহ অবজ্ঞা ও অবমূল্যায়নের পেছনে আসলে এই আর্থিক পরনির্ভরতা আর আমার বড় না হইয়া ওঠাই দায়ী। ফলে বড় হওয়ার (বয়সে) স্বপ্ন নিয়া আমি লালমনিরহাটের দিকেই নিজের কেবলা স্থির রাখি। আর টিটিই আইসা আমার টিকেট চাইলে বা আমি কাদের সাথে (মানে কোনো ফ্যামিলির সাথে কিনা) আছি জানতে চাইলে আমি তারে জিজ্ঞেস করি, ‘লালমনিরহাটে যাওয়ার ট্রেন কোনখান থেকে পাবো?’ সরাসরি আমার চোখে টর্চের আলো ফেলে সে, এভাবে সারা শরীরে। পাশে বইসা আমারে সত্যি কইরা বলতে বলে যে, ঘটনা কী? কোথায় আমার বাড়ি, কই যাইতেছি ইত্যাদি। পাশের যাত্রীরাও তখন এই বইলা উস্কানি দেয়, ‘ভালো কইরা জিগান, ট্রেনে ওঠার পর থেকে অনবরত কানতেছে ছেলেটা!’

তখন সবাই আমারে ভালো কইরা জিগাইতে থাকে—কী সমাচার। আমি বলি আমি লালমনিরহাট যাবো, ওইখানে আমার পরিবার পরিজন আছে, দয়া কইরা আমারে লালমনিরহাট পৌঁছানোর ব্যবস্থা কইরা দেন। তখন তারা লালমনিরহাটের কোথায় আমার পরিবার, কোন গ্রামে, কোন থানায় নাকি সদরেই—ইত্যাদি প্রশ্ন করতে থাকে আর সম্যক ধারণা না থাকার কারণে কোনো প্রশ্নেরই আমি সন্তোষজনক জবাব দিতে পারি না।

ফলে তারা বুইঝা ফেলে যে, আমি মিথ্যা বলতেছি। কেউ কেউ এ সাক্ষ্যও দেয়, তারা আমারে ফেনী থেইকা ট্রেনে উঠতে দেখছে, আর আমার মুখের ভাষায়ও নাকি নোয়াখালি-কুমিল্লা অঞ্চলের টান পাওয়া যায়; মানে লালমনিরহাট একটা ফল্‌স স্টোরি। ঘর-পালাইয়া এধরনের পরিস্থিতিতে যে পড়তে হবে এটা ছিল কল্পনাতীত, ফলে ঘাবড়াইয়া যাই আর তারস্বরে কানতে শুরু করি। এবং একপর্যায়ে বইপত্রের ভাষায় ‘আমাকে আমার মতো (!) থাকতে দিতে’ রিক্যুয়েস্ট কইরা এ সত্য স্বীকার করি যে, ‘হ, আমি বাসা থেইকা পালাইয়া আসছি। আমি লালমনিরহাট যাবো। কিন্তু আমি আর বাসায় ফেরত যাবো না।’

লালমনিরহাটে কে আছে তোমার?

জানি না। তবে কেউ আছে। গিয়া খুঁজতে হবে।

বাসার লোকজন কি তোমারে মাইরধর করে? অত্যাচার নির্যাতন করে?

না না! বাসার সবাই খুব ভালো। অনেক আদর করে।

বড়বোন তানিয়া, নাজির রোডের ভাড়া বাসার উঠানে (১৯৯৮, ছবি: লেখক)

বড়বোন তানিয়া, নাজির রোডের ভাড়া বাসার উঠানে (১৯৯৮, ছবি: লেখক)

তাইলে চইলা যাইতেছো কেন? তারা তোমারে খুঁজবে না? খুঁইনা না পাইলে তাদের কত কষ্ট হবে এগুলা বুঝো? … বগির প্রায় সব যাত্রীরা এইভাবে আমারে ইমোশনালি দুর্বল করার চেষ্টায় নিয়োজিত হয়। সিদ্ধান্ত হয় টিটিইর সাথে সামনে লাকসাম স্টেশনে নাইমা যাবো আমি। আজকের রাতটা টিটিইর সাথে থাইকা কালকে আবার যখন লাকসাম থেইকা চট্টগ্রাম পর্যন্ত কোনো একটা ট্রেনে সে ডিউটি করতে বাইর হবে, তখন সে আমারে ফেনী স্টেশনে নামাইয়া দিবে। (এখানে বইলা রাখা ভালো, মেইল ও লোকাল ট্রেনে ফিক্সড একজনই কোনো টিটিই থাকে না। এরকম থাকে যে, চট্টগ্রাম থেকে লাকসাম পর্যন্ত একজনের ডিউটি, পরে লাকসাম থেকে আখাউড়া পর্যন্ত হয়তো আরেকজনের, এভাবে যতদূর যায়)

আমি তখন বুঝতে পারলাম যে, আবারও আমি ধরা পইড়া গেছি। এরা কোনোভাবেই লালমনিরহাট পর্যন্ত পৌঁছাইতে দিবে না আমারে। লাকসামের আগে, ছোটখাটো কোনো একটা স্টেশনে ট্রেন থামলে টিকেট চেক করতে ওই টিটিই আরেক বগিতে (অভ্যন্তরীণ যোগাযোগবিহীন বগি ছিল সেগুলা) চইলা যায়। তবে একটা প্যাসেনজার ফ্যামিলির জিম্মায় রাইখা যায় সে আমারে। ফ্যামিলিটা ছিল একজন আঙ্কেল, একজন আন্টি ও তাদের ছেলে-মেয়েদের নিয়া। আন্টি আমারে পটেটো চিপস আর সেজান জুস খাইতে দিলো, শরম পাইয়া প্রথমে আমি নিতে চাই নাই সেগুলা। কিন্তু পরে নিতেই হইছিল, আর খাইতে গিয়া মনে হইলো; বাসায় আব্বু-আম্মুরা কি কিছু খাইলো? আপুর বার্থডে অনুষ্ঠানেরই বা কী হইলো! কিন্তু তবু খাইলাম সেগুলা, আর পালাইয়া যাওয়ার উত্তেজনাটা ধরা পইড়া যাওয়াজনিত কর্মহীনতায় পর্যবসিত হওয়ার কারণে আমার ঘুম আসলো।

এরপর নিজেরে আমি টের পাই চারপাশে পলেস্তারা খইসা পড়তেছে—এমন একটা রুমের ভিতরে। ফ্লোরের মধ্যে বইসা কয়েকজন খাওয়া দাওয়া করতেছে, খাটের মধ্যে শোওয়া অবস্থায় এ দৃশ্য দেখি। ইউনিফর্ম ছাড়া ট্রেনের টিটিইদের যে কী পরিমাণ নিরীহ আর হাবাগোবা লাগে, সেদিন বুঝলাম। মনে হইলো ট্রেনে ট্রেনে যাদের চাকরি, তাদেরও ঘর সংসার ইত্যাদি থাকে!

আমারে জাগতে দেইখা ফ্লোরে নাইমা খাওয়া করতে তাগিদ দেয় তারা। আরো কী কী-সবের সাথে যেন কচুর লতিও ছিল সেদিনের ডিনার আইটেমে, ওইটা খাইয়া আমার গলায় চুলকানি ওঠে। টিটিইর কয়েকটা পোলা মাইয়া ছিল, আর তারা আমার ব্যাপার অতি উৎসাহী মনোভাব দেখায়, বলে, লেবু খাইলে চুলকানি কমবে। আর টিটিইর বৌটা খালি ‘হায় রে কার মায়ের পোলা আইজ কই আইসা রইলো’—এগুলা বলতে থাকে। এবং সে এইমর্মে সন্দেহ পোষণ করে যে, পরেরদিন ফেনী স্টেশনে আমারে নামাইয়া দেওয়াটাই যথেষ্ট কিনা। কী নিশ্চয়তা আছে যে, ওইখান থেইকাই আবারো আমি পালাইয়া যাবো না! টিটিইরে সে বলে যেন আমারে বাসা পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দেওয়া হয়।

লাকসাম স্টেশনের নামফলক। ছবি: লেখক ২০০৯

লাকসাম স্টেশনের নামফলক। ছবি: লেখক ২০০৯

সেইরাতে আবারো ঘুমাইয়া যাওয়ার আগপর্যন্ত তারা আমারে ঘর পালানোর নেগেটিভ দিকগুলো সম্পর্কে বলতে থাকে। ‘ঘর পালাইয়া মা বাবার মনে দুঃখ দেওয়ার কারণে আমারে দোজখে যাইতে হইতে পারে’, ‘বাইরে বাইরে ঘুরতে দেইখা ছেলেধরারা আমারে নিয়া যাইতে পারে এবং তারপর কিডনি লিভার ইত্যাদি বিক্রি কইরা দিতে পারে’ সহ তাদের বর্ণনায় হেন ভয়ঙ্কর দিক বাদ থাকে নাই—এই এক ঘর পালানোর কারণে যেগুলো কিনা ঘটতে না-পারে।

পরদিন সকালে কোন একটা ট্রেনে কইরা ওই টিটিই আর তার এক ইয়ং আত্মীয়সহ (বা পরিচিত) ফেনী রওনা করি। ইয়ং ওই আত্মীয় ছিল টিটিইর বৌয়ের বুদ্ধির ফসল! ঠিক হয় ট্রেন নিয়া টিটিই যথারীতি চট্টগ্রাম চইলা যাবে, আর এই ইয়ং আমারে বাসা পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিবে। ফলে, সেইমতো ট্রেনের চাকা ঘুরে। আর সেই ট্রেন যতই ফেনী সংলগ্ন হয়—দুশ্চিন্তা বাড়তে থাকে আমার। মনে হয়, বাসার সবাই ঠিকঠাক আছে তো? আব্বু বা আম্মু, শোকে দুঃখে কেউ আবার স্ট্রোক কইরা বসে নাই তো! আশঙ্কাটারে পাত্তা না-দেওয়ার চেষ্টা করি। ভাবি, আরে ধুর হুদাই আমি অলক্ষ্মী টাইপ চিন্তাধারা করতেছি, নিশ্চয়ই সবাই ভালো আছে। আমি তো চাই সবাই ভালো থাকুক। কিন্তু আবার এটাও মনে হয়, একেবারে যদি ঠিকঠাকই থাকে সবাই—তাইলে আমার থাকা না-থাকায় কি তাদের কিছুই যায় আসে না!

About Author

তানিম কবির
তানিম কবির

জন্ম ফেনী জেলার পরশুরাম-বিলোনীয়া এলাকায়। কবিতা ও গল্প লেখেন। প্রকাশিত কবিতার বই তিনটি, ‘ওই অর্থে’ (শুদ্ধস্বর ২০১৪), ‘সকলই সকল’ (শুদ্ধস্বর ২০১৫) ও 'মাই আমব্রেলা' (আদর্শ ২০১৬) এবং একটি গল্পের বই 'ইয়োলো ক্যাব' (ঐতিহ্য ২০১৬)। সম্পাদনা করেন দৈনিক ভোরের পাতার সাপ্তাহিক সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘চারুপাতা’। এর আগে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজ ও প্রিয়.কমে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রকাশিতব্য বই, ‘ঘরপলায়নসমূহ’ (ফেব্রুয়ারি ২০১৭) ফেসবুক পেজ: Tanim Kabir (Writer)