page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

লাকড়ির বর্গক্ষেত্র

লাকড়িওয়ালারা আসত ভ্যান বা ঠেলাগাড়ি নিয়া। গাড়িভর্তি কাটা গাছ, মোটা-পাতলা নানান কিসিমের। লাকড়িওয়ালার কাঁধে ঝুলত কুড়াল। বিক্রি কইরা আবার কাইট্টাও দিয়া যাইত।

দুই-এক টাকা বাড়তি দেয়া লাগত। যদিও সেটা আমার চাপ্টার না, বাপজানই দেখত। তবে আমাদেরও একটা কুড়াল ছিল। সেই কুড়াল দিয়া যখন গাছের বড় টুকরা থেকে কাইটা কাইটা ছোট ছোট পিস করত তখন সেইটা লাকড়ি হইত। অসাধারণ লাগত আমার কাছে লাকড়ি কাটার দৃশ্য।

তখন কাঠুরেদের গল্পও বেশ চালু ছিল। কুড়াল কান্ধে কাঠুরে যায় জঙ্গলে এই দৃশ্যের বর্ননা অনেক শোনা। “এক ছিলো এক কাঠুরে। একদিন সে জঙ্গলে গেল গাছ কাটতে।” এভাবেই সেসব গল্প বলা হইত। তারপরে রাজকন্যা বা দুষ্ট বুড়ি বা কোনো জাদুকর আইসা সেই গল্পের মধ্যে আমাদের মোহাবিষ্ট কইরা রাখত।

kowshiklogo

শুনতে শুনতে আমার কুঠার দিয়ে গাছ কাটতে মন চাইত। কিন্তু সেটা না পাইরা লাকড়ি কাটার ধান্ধায় থাকতাম। লাকড়িওয়ালারে ম্যানেজ কইরাও ফেলছিলাম। কুড়াল দিয়া কীভাবে পা বাঁচাইয়া গাছের গুড়িতে কোপ দিতে হয় শিখাইয়া দিতো, “হেইয়া বুঝছো মনু, খুবই শক্ত কইরা বাটলের মাঝখানে একটা হাত দিয়া ধরো, আরেকটা হাত দেও সামনে! এক্কেরে আগা ধরবা না কোলোম, কুড়াল ছুইট্টা কিন্তু ঘেডি ছেওয়াইয়া দেবে!”

বরিশালের সরকারি কোয়ার্টারে আমার বাবা চান্স পাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা একটা সুন্দরী টিনের ঘরে বাস করতাম। নিচের ফ্লোর ছিল পাকা। রান্নাঘরটা ছিল বাইরে। আলাদা একটা ছোট্ট ঘর। সেইখানে লাকড়ি দিয়া মা রান্না করত। চুলার পাশে গিয়া আমরা বইসা থাকতাম। কীভাবে লাকড়ি চুলায় দেয়া হইত সেটা একটা বিশাল আর্ট। আমরা দিলে কখনই জ্বলতো না—কী জানি কী রহস্য ছিল।

টিনের ঘরের সামনে খালি জায়গায় ফাড়া লাকড়ি শুকানো হইত। গ্রীষ্মে মচ মচ কইরা শুকাইয়া যাইত দুই/তিন দিনেই কিন্তু বৃষ্টিকালে খুবই বিপদ হইত। বৃষ্টি নামলেই মা ডাক দিয়া কইত, “ঐ পোলাপাইনেরা জলদি যা দৌড়াইয়া… লাকড়িগুলা দেওইতে ভিইজা গেল! লাকড়ি যদি ভেজে তাইলে কিন্তু রাইতে খাওন বন্ধ!”

দৌড়াইয়া নামতাম লাকড়ি তুলতে। ঘরের বারান্দায় দুইটা লাকড়ি সমান্তরাল রাইখা তার উপরে আড়াআড়ি আরো দুইটা ফেইলা একটা বর্গক্ষেত্রের মতন তৈয়ারি করতাম—তারপর সেইটা পিলারের মত বাড়তে থাকতো। মাঝখানটা ফাঁকা। লাকড়ি তোলা শেষ হইলে আমরা সেই ফাঁকা জায়গার মধ্যে লুকাতাম। কখনও কাউরে মাঝখানে রাইখা লাকড়ি দিয়া পিরামিডও বানাইতাম। কী যে চমৎকার লাগত দেখতে! তখন প্রত্যেকটা বাসার বারান্দায় এমন লাকড়ি-বর্গক্ষেত্র দেখা যাইত। কোন লাকড়ি ঠিকমত ফাড়া হইছে আর কোনটা হয় নাই সেই বর্গক্ষেত্র দেখলে বোঝা যাইত। দৃশ্যটা চোখে ভাসে এখনও।

গাছের গুড়ি কাইটা লাকড়ি বানানোটা নিশ্চয়ই কম খরচের ছিল। মানে সরাসরি গুড়ি কেনা। তবে কখনও যখন লাকড়ি শেষ হইয়া যাইত তখন বাজার থেকে লাকড়ি কিনা আনতে হইত। কয়েকটা দোকান ছিল লাকড়ির। সেখানে শুকনা লাকড়ি বিক্রি হইত। দাম একটু বেশি নিত। আম, তেতুল, বাবলা ইত্যাদি গাছের লাকড়ি সম্ভবত বেশি থাকত। এর মধ্যে আমগাছের লাকড়ির দাম কম আছিল। একদম শুকায় নি তেমন লাকড়ি দিয়াও রান্না করা যাইতো, তবে প্রচুর ধুয়া হইত। খাবারের স্বাদও নাকি পাল্টাইয়া যাইত। আমরা টের না পাইলেও বাবা ঠিকই ধইরা ফেলতেন যে ভেজা লাকড়ি দিয়া রান্নাবান্না হইছে।

অবশ্য নানাবাড়িতে লাকড়ির চাইতে ধানের নাড়া বা কুটা, গাছের ডাল-পাতা দিয়ে বেশি রান্না হইত। রান্নাঘরের বাইরে একটা উন্মুক্ত রান্নাঘর ছিল যেইখানে মূলত বর্ষাকালটা ছাড়া অন্যান্য সময়ে রান্না হইত। হোগল পাতা দিয়া ঘেরা সেই রান্নাঘরের এক পাশে পাহাড়ের মত স্তূপ কইরা রাখত জ্বালানি—ডালপালা, নাড়াকুটা। আর থাকত তুষ। আমাদের শহরের বাসাতেও তুষ আছিল। লাকড়ির আগুন নিভু নিভু হইলে তুষ ছিটাইয়া দিতে হইত। নানি আমাদের চুলার পাশে বওয়াইয়া দিয়া কইত, “আগুন নেভতে দেখলে তুষ ছিটাইয়া দিবি—বেশি দিবি না, তাইলে কিন্তু জ্বাল নিব্‌ভা যাইব।” একটু তুষ ছিটাইয়া দিলে আগুন আবার দপ কইরা জ্বইলা উঠত। বেশ আনন্দের সাথেই তুষ ছিটাইতাম আমরা।

আমাদের শৈশবে লাকড়ি ছাড়া কোনো রান্নাঘর দেখি নাই। কখনও আমরা পাড়ার ছেলেমেয়েরা পাশের জঙ্গলে লাকড়ি কুড়াইতে যাইতাম। মায়েরাই পাঠাইত: “যা তো, কিছু লাকড়ি কুড়াইয়া লইয়া আয়!”

খেজুর বাগান ছিল একটা, তারপরেই ঘন জঙ্গল। পথেই খুঁইজা পাওয়া যাইত বিভিন্ন গাছের শুকনা পাতা। পাড়াত বন্ধুদের কারো হাতে থাকতো দা-কাচি। সেইসব দিয়া হাতের নাগাল পাওয়া বৃক্ষের ডাল কাটতাম। তারপরে স্তূপ করে রাখা হইত প্রত্যেকের স্টেক একেকটা আলাদা জায়গায়। বিভিন্ন বাসার কাজের বুয়ারাও থাকত আমাদের দলে। আঁটি বাইধা সেই জ্বালানি নিয়া ফিরত তারা।

লাকড়িতে আমাদের বাসায় রান্না হইছে ৮৫/৮৬ সাল পর্যন্ত। তারপরে বাসায় কারেন্টের হিটার আইল। সেইখানে যে কয়েল থাকত সেইটা কাইটা গেলে আমার দায়িত্ব পড়ত জোড়া দেওয়ার। একসময় হিটারের কয়েল জোড়া দিতে দিতে বেশ নামডাক হইয়া গেল। আশপাশের বাড়ি থাইকা ডাক পড়ত। আমার জোড়া দেয়া কয়েল নাকি অনেকদিন টিকত। কেউ কেউ কইত: “পোলাডা বড় হইলে নামকরা ইলেক্ট্রিশিয়ান হইবে মনে লয়।”

তবে হিটার আসার আগ পর্যন্ত মায়ের করা মাসের বাজারের লিস্টে ‘চাল’-এর পরেই ‘লাকড়ি’ থাকত মনে আছে। বাবার সাথে বাজারে যাওয়া বেশ মজার ছিল। লাকড়ি বোঝাই ভ্যানের উপরে চইড়া ঘরে ফেরা দিনগুলি সহসা যেন নাই হইয়া গেল।

 

কৌশিক আহমেদের আরো লেখা

About Author

কৌশিক আহমেদ
কৌশিক আহমেদ

চুয়াত্তরে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে জন্ম। ইংরেজি সাহিত্য ও ব্যবসা প্রশাসনে পড়াশুনা। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত। বাংলাদেশের ব্লগ, সামাজিক গণমাধ্যম, নতুন মিডিয়া এবং এর সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত ও প্রভাব নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত। ব্লগ: বিপদজনক ব্লগ