page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

লোকাল বাসে একজন

আমি কলেজে যখন পড়তাম তখন বেশ ভীতু ছিলাম। কিন্তু ক্লাস টেন থেকে প্রেম করি। ২০১০ সাল। কলেজে ২য় বর্ষে পড়ছি। বাইরে একা চলাচল করতে খুব ভয় লাগত। প্রেমিক ছাড়া একা একা কলেজ থেকে বাসায় ফিরতেও অসহায় লাগত।

আমার প্রেমিক খারুজ টাইপের ছেলে ছিল। প্রতিদিন বাসায় দিয়ে আসতে চাইত না। আর আমি কান্নাকাটি শুরু করলে বলত, “আচ্ছা আজই শেষ। কাল থেকে বাসে উঠিয়ে দিব।”

nawazfa1logo

কলেজ ছিল ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ঠিক মিডেলে। লে: শহীদ অনোয়ার গার্লস কলেজ। মা ফার্স্ট ইয়ার থেকেই কলেজ বাস ঠিক করে দিয়েছিলেন। কিন্তু কলেজ বাসে আসা যাওয়ার ফলে আমার প্রেমিকের সাথে দেখাসাক্ষাৎ একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল। একটা বছর কলেজ বাসে এভাবে বিনা দেখাসাক্ষাতে চলছিলাম। শুধু সপ্তাহে দুদিন, কলেজ বাসের সামনে সে দাঁড়িয়ে থাকত। আমরা দূর থেকে টাটা দিতাম। কিন্তু মাত্র এক ঝলক দেখা আর টাটাতে মন আরো খারাপ হয়ে যেত। এরপর, এরপর বুদ্ধি উপায় কিছুতেই কিছু বের করতে পারি নি। আমার প্রেমিক যুবক একদিন রাতে ফোনে কথা বলার সময় আমাকে এক জটিল বুদ্ধি দিল। সেই থেকেই আমার এই দশা। তার বুদ্ধিতে প্ল্যান করে কলেজ বাস ছেড়ে দিলাম।

মায়ের সাইন নকল করে বাস ছাড়ার দরখাস্ত তাফসিরই লিখে দিয়েছিল। আর মায়ের ফোন নাম্বার হিসেবে দিয়েছিলাম তাফসিরের খালাত বোনের স্বামীর খালার নাম্বার। তার সাথে তাফসিরের কেন জানি খুব খাতির ছিল। খাতির থাকাটা স্বাভাবিকের বাইরে লাগত কারণ তাফসিরের খালাত বোনের স্বামী আর ওই খালাত আপুর সাথে তেমন ভাবে কোন সম্পর্ক ছিল না তাদের খালার। সেই ব্যাপার নিয়ে আমার তেমন আগানোও হয় নি সেই সময়। ওই খালার একটা পাঁচ বছরের মেয়ে ছিল। স্বামী থাকতেন কুয়েত কিংবা সৌদিতে। মাঝে মাঝে আমার জন্য তাফসিরের হাতে লিপগ্লোস পাঠাতেন। উনার স্বামী বিদেশ থেকে পাঠালে। কিন্তু তাফসিরকে কী দিতেন জানতাম না। ওই খালা খুব বেগুনি কালারের লিপস্টিক ঠোঁটে পরতেন।

antara march blog 2

কলেজে বাতিল চেয়ারের ওপরে, ২০১০

তো যথারীতি ওই খালার কাছে ফোন যায়। উনিও বলে দেন যে, আমরা বাসা চেনজ করার কারণে আমার মেয়েকে বাস ছাড়তে হচ্ছে।

বাসায় আমার মা বাবা এর কিছুই জানতেন না। বাসে উঠতে হলে আমাকে মেইন রোডে আসতে হত। অবশ্য আমার পরিবারের কেউই সকালে ঘুম বরবাদ করে কলেজ বাসের খোঁজ নিতে আসত না। এই দিক থেকে সেফ ছিল ব্যাপারটা।
সেই দিন থেকে আমি একা বাসে যাই আর বাসে আসি। তবে লোকাল বাসে। মানে শতাব্দী অথবা নিসর্গতে চেপে। আসার সময় সাথে থাকে তাফসির। বাসে খুব চাপাচাপি করে আমরা দাঁড়াতাম। বসার সুযোগ পেতামই না তেমন। তাও ভাল লাগত। কারণ বাসের সেই চাপাচাপিতে আমরা অনেকটা কাছাকাছি মানে গায়ে গায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতাম।

একদিন বাস ঠিকমত পেলাম না। আমি আর তাফসির হাঁটতে হাঁটতে জাহাঙ্গীর গেট এসে একটা লোকাল বাসে চেপে আসাদগেট নামলাম। বাসা কল্যাণপুরের উদ্দেশ্যে আবার বাসে উঠতে হবে। খুব মানুষের ভিড় ওখানে। আমাদের কারো পকেটে রিকশা ভাড়ার টাকাও নেই। বাসেই যেতে হবে। পিঁপড়ার মত মানুষ জমাট বেঁধে কিলবিল করে ছুটাছুটি করছে বাস ধরার জন্য। একটা করে বাস আসছে আর মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এদিকে তাফসির আমার দোষ দিচ্ছে, “উফ তোমার জন্য এত দূর আসতে হল, এখন এত ঝামেলায় আমাকে পড়তে হচ্ছে।”

মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল আমার। চিল্লাতে থাকলাম আমিও। ওর কানে আমার চিল্লানি গেলই না। সে পাত্তা না দিয়ে বাসের দিকে তাকিয়ে আছে। অনেকটা লোক কমে আসছে আমাদের আশেপাশে। তবু অনেক ভিড়। আমি সাহস করে এতগুলি মানুষের সাথে বাসের গেটের সামনে জড়ো হতে ভয় পাচ্ছিলাম। কিন্তু তাফসির ক্যাটক্যাট করছে। রীতিমত ধমকাচ্ছিল। তাই মন খারাপ করে শক্ত করে ওর হাতটা ধরে একটা শতাব্দী বাসের গেটের সামনে যাওয়ার ট্রাই করলাম। কোনো ভাবেই দাঁড়াতে পারলাম না।

মানুষের ধস্তাধস্তিতে ছিটকে পড়লাম রাস্তার ধারে। কাঁধের কলেজের ব্যাগটা নিচে পড়ে গেল। তাফসির ছুটে এসে ধরে ওঠালো। উঠেই আবার আমি আর তাফসির ধস্তাধস্তিতে যোগ দিলাম। কোন সহৃদয়বান মানুষ আমি মেয়ে বলে কিঞ্চিৎ পরিমাণ জায়গাও ছাড়ার নাম নিল না।

পেছন থেকে তাফসির আমার আশেপাশের মানুষদের সামনের দিকে ঠেলছে তো ঠেলছে। যাতে আমি গেটের সামনে যেতে পারি। আমার কলেজ ড্রেসের ক্রস বেল্টটা চাপাচাপি আর ধস্তাধস্তিতে এক পাশ থেকে খুলে গেল। কলেজ ড্রেসের সাথে কোন এক্সট্রা ওড়না ছিল না। অবস্থা গুরুতর দেখে কাঁধের ব্যাগটা সামনে নিলাম। তারপর আমিও সজোরে ধাক্কাতে থাকলাম বাসের গেটে জমাট বাঁধা মানুষজনকে। পিছনে তাফসির। কোনোমতে বাসের পাদানিতে পা রাখার মত স্পেস পেলাম। কিন্তু আগাতে পারছিলাম না। খুব কসরৎ করছিলাম একটু সামনে ফাঁক থাকা সত্ত্বেও পাটা রাখতে পারছিলাম না।

ওই হাউকাউ ঠেলাঠেলির মধ্যে কোনো একটা মাথা বাসের ভিতর থেকে গেটের বাইরে ঝুঁকে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। বাসের ভিতর থেকেই চিকন-চাকন লিকলিকে একটা ছেলে ঝুঁকে হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। সেই হাতের ছেলেটা বলল, “ওঠো ওঠো। তাড়াতাড়ি করো। বাস ছেড়ে দিবে তো!”

আমি একটু তাকালাম ছেলেটার দিকে। পরিচিত লাগল না ছেলেটাকে দেখে। এত ভিড়ের মাঝে চেনার খুব একটা চেষ্টাও করতে পারলাম না। কিন্তু খুব পরিচিতের টোনে ছেলেটা তার হাতটা বাড়িয়ে আমাকে বাসে উঠতে বলছে। আমি হাতটা ধরলাম না। আমার প্রেমিককে খুব ভয়ই পেতাম আমি। পিছনে ফিরে ওর মুখের দিকে তাকালাম একবার। তাফসির পিছন থেকেই বলল, “আচ্ছা ওঠো ওঠো, সমস্যা নাই। আমি তো উঠবো।”

antara march blog 1

কলেজে ফুলগাছের সামনে, ২০১০

তাফসিরের অভয় পেয়ে ছেলেটার হাতটা ধরলাম। ছেলেটা আমাকে বেশ জোরে টেনে ওঠালো কোনোমতে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ও আমাকে টেনে ইনজিনের ওপরের বসার জায়গার পাশে দাঁড় করিয়ে দিল। ইনজিনের ওপর ওই ছেলেটাই বসে ছিল আমাকে ওঠানোর আগে। ওর জায়গায় আমাকে বসালো হাত ধরেই। আমাকে বসানোর পরও আমার হাতটা ধরেই, আমার একদম পাশে ও দাঁড়িয়ে থাকল। আমি একটু ভাল করে বসার পর তাফসিরকে খুঁজলাম মানুষের ভিড়ে। তাফসির হাত ইশারা করে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে আমাকে বসতে বলল।

তাফসির বাসের গেটের সামনের রডটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের ভিড়ে শুধু ওর হাত আর চেহারাটা দেখা না দেখার মধ্যে দেখছিলাম। না দেখাটা একটা অপরাধের মত মনে হচ্ছিল। একদিকে অন্য অপরিচিত ছেলের হাত অনেকক্ষণ ধরে ধরে বাসে উঠলাম। আবার ছেলেটা আমার একদম কাছাকাছি কিন্তু তাফসির তো কাছে নাই! সেটা আমার ইচ্ছাকৃত না হলেও দোষের মতই। কিন্তু সেই ‍মুহূর্তে আমার একটুও খারাপ লাগছিল না। এই অপরিচিত ছেলের হাত ধরতে আর এখন ওর গা ঘেষে বসে থাকাটা কেমন যেন অবাক লাগছিল নিজেরই।

কিন্তু কোনো একটা ঘোরে ছিলাম। উইয়ার্ড এই ব্যাপারটা এতটাই স্বাভাবিক আর সহজ লাগল যে আমার অপরিচিত মনে হচ্ছিল না ছেলেটাকে। ছেলেটার ব্যবহারের জন্যই এমনটা লাগছিল হয়ত। এই অল্প সময়ের মধ্যেই ছেলেটা আমার সাথে একটু বেশি স্বাভাবিক। ও প্রায় আমাকে ঘিরে আছে যাতে আশেপাশের কোনো ধাক্কা অথবা কারো গা যেন আমার গায়ে না লাগে এমন ভাবে। তাতে আমার কেন জানি বেশ ভালই লাগছিল। একবার মনে হচ্ছে ওকে চিনি হয়ত। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছি না কীভাবে চিনি, কোথায় পরিচয় হয়েছিল অথবা আগে কোথাও দেখেছি কিনা। আবার অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ওর সাথে কোন রকম পরিচয় ছিল বলে মনে পড়ল না।

বাস একটু চলতেই জ্যামে আটকালো। আর তাতেই আরো ৭-১০জন লোক জোর করে উঠে পড়ল বাসে। আমি তো আরো আটোসাটো হয়ে গেলাম। এক ফোটাও জায়গা নেই বাসে। দম নেয়ার মত সামান্য ফাঁকও নেই। মানুষজনের নিঃশ্বাস সব মিলেমিশে জগাখিচুড়ি অবস্থা।

অপরিচিত ছেলেটা আমাকে প্রায় আগলে আছে। ওর হাতে একটা খাতা ছিল, ওইটা ঠিকভাবে ধরে আমাকে গার্ড দিয়ে দাঁড়াতে পারছিল না সে। আমি দেখছিলাম, বারবার ওর হাত থেকে খাতাটা ফসকে যাচ্ছে। আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ছেলেটা বলল, “উফফ, এইটা একটু ধরো না! দেখতেছ না আমি ধরে রাখতে পারছি না। আর তুমি আমাকে ধরে রাখ, নয়ত মানুষের ঠেলা সামলাতে পারবা না।”

ওর খাতাটা আমার ব্যাগের উপরে রেখে অন্যদিকে উদাসীনের মত তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ তাফসিরকে খেয়াল পড়ল। অনেকক্ষণ হল ওর দিকে লক্ষ্য নাই আমার। তাই একটু চোখ এপাশ-ওপাশ ঘুরিয়ে তাফসিরকে দেখার চেষ্টা করলাম। ওর মুখটা একটু দেখা যাচ্ছিল ভিড়ের মধ্যে। আমার প্রেমিক তাফসির হাত ইশারা করে বসতে বলল, সাথে সেই মিষ্টি হাসি। এই হাসিটা আমার আগে থেকেই দারুণ লাগত। প্রেমটা সে জন্যই হয়েছিল।
আমি বসে থেকেও ঠেলাঠেলি আর বাসের ব্রেকের ধাক্কায় এপাশ-ওপাশ দোলাদুলি করছিলাম। সামনে কিছু ধরারও নেই। ভাগ্যিস ছেলেটা গার্ড করে আছে নয়ত মানুষের চাপ সবটা সামলানো কষ্টের ছিল। ব্যাগটা বুকের সামনে থেকে সরিয়ে কোলে নিয়ে একটু আড়াল করে খুলে যাওয়া ক্রস বেল্টটা লাগানোর ট্রাই করলাম। ছেলেটা ঠিক আমার মাথার উপরে দাঁড়িয়ে। একবার করে আমার দিকে তাকাচ্ছে আমিও তাকাচ্ছি। ও ডোন্ট ওরি ধাচে চোখ ইশারা করল। একটু নিচের দিকে ঝুকল আমার কানের পাশে। প্রায় ফিশ ফিশ করে আমার কানে কানে বলল “তুমি ঠিক করো। আমি আছি। কিচ্ছু হবে না। কেউ দেখবে না।”

আমিও অভয় পেয়ে ঠিকঠাক করে নিচ্ছিলাম। কিন্তু ব্যালেন্স রাখতে পারছিলাম না। তখন ছেলেটার শার্টটা একহাতে চেপে ধরে আরেক হাতে ঠিক করে নিলাম। আমার ডানপাশের কিছুটা অংশ ওই ছেলেটার গার্ডের বাইরে ছিল। ওই পাশ থেকে একটা মধ্যবয়সী লোক তার হাতটা আমার গায়ে লাগানোর চেষ্টা করছিল। এক্সট্রা বল প্রয়োগের ট্রাইও করছে। আর আমি বাম পাশে ওই অপরিচিত ছেলেটার দিকে আরো বেশি ঝুঁকে যাচ্ছি।

খুব বিরক্ত লাগল লোকটাকে। তাই ছেলেটার দিকে ঝুঁকে বসে ওর শার্টের একটা কোনা হাতে পেচিয়ে ধরে আরেক হাতে ওর হাত শক্ত করে ধরে বসলাম। পাশের লোকটা ভাবল ছেলেটা আমার সাথেরই তাই তার চাপাচাপি হালকা করে ঠিক হয়ে বসল। ও দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল, “শার্টটা যেন ছিঁড়ে না যায় দেইখো।”

এই প্রথম আমি ওর সাথে কথা বললাম, “ওহ সরি, অনেক টাইট করে ধরেছি?”

ছেলেটা বলল, “না। কিন্তু ধরো ভাল করে। তুমি পড়ে না গেলেই হয়।”

দেখতে মোটেও আকর্ষণীয় না। চেহারার দিকে একবারও ভাল করে তাকাই নি আমি। যতবারই ছেলেটাকে একটু ভাল করে দেখার চেষ্টা করলাম অটোমেটিক চোখ নামিয়ে ফেললাম। তাই প্রতিবারই এত অস্পষ্ট ভাবে ওকে দেখেছি যে পরক্ষণেই ছেলেটার চেহারাটা মনে করতে পারছিলাম না। আবার তাকালাম কিন্তু ওর চোখে চোখ পড়তেই চোখ নামিয়ে ফেললাম। তাফসিরের ভয়ে না কি অপরিচিত একটা ছেলের দিকে তাকিয়ে থাকার অনভ্যস্ততার কারণে এমনটা করছিলাম বুঝতে পারি নি।

আমি ছেলে বা লোকদের গায়ের গন্ধ অথবা ঘ্রাণ কোনোটাই একদম সহ্য করতে পারি না। এই ছেলেটার গায়ের ঘামের গন্ধটাও অসহ্য লাগল কিন্তু নাক সিটকালাম না। বরং কয়েক মিনিটের মধ্যে সহ্য হয়ে গেল। ছেলেটাকে আরো শক্ত করে প্রায় জাপটে ধরে বসেছি। এত ভিড় যে অন্য মানুষ দেখতে পাচ্ছে কিন্তু পাচ্ছে না অবস্থা। আমার খুব আপনের মতই লাগছিল ওকে। তাফসিরকেও আর খোঁজাখুঁজি করছি না। তবে একটু লক্ষ্য রাখলাম তাফসির কী পজিশনে আছে। আমাকে কীভাবে দেখছে। সবটা খারাপ লাগার অনুভূতি বুঝতেও পারছিলাম না। আমি হঠাৎ এমন সহজ ভাবে অপরিচিত ছেলেটার সাথে পরিচিত ব্যবহার করছি কেন তার কারণটা পরেও টের পাই নি।

ওই অপরিচিত ছেলেটার সাথে আর একটা কথাও বললাম না। ছেলেটাও বলছে না। শুধু একটু পর পর আমরা তাকিয়ে তাকিয়ে মৃদু হাসি বিনিময় করছিলাম। আমার এভাবে একটা অপরিচিত ছেলের শার্ট ধরে ঝুলে বসতে, আরেক হাত দিয়ে ওর হাত শক্ত করে ধরে বসে থাকতে মোটেও খারাপ লাগছিল না। বরং বার বার বাস জ্যামে আটকে যাওয়ার সময়টা ভাল লাগছিল।

আমি সবসময় সব ব্যাপারে খারাপ ভাল জ্ঞান করে চলতাম। খুব সাবধানি ছিলাম বই কি তাই ভেবেচিন্তে নিজের প্রেম বাঁচিয়ে ছেলেদের সাথে মিশতাম। মিশতাম ব্যাপারটাও পুরোপুরি ঠিক না, আসলে সাবধানে কথাবার্তা বলতাম। তাফসিরের একদম পছন্দ না কোনো ছেলের সাথে কথা বলা। এমনকি পরিচিত কারো সাথে রাস্তায় দেখা হয়ে গেলেও খুব রাগ দেখাত। তাই খুব বুঝেশুনে চলতে হয় আমাকে অন্তত যতক্ষণ তাফসির আমার সাথে থাকে। কিন্তু আজ এইসব তেমন একটা পাত্তা দিচ্ছি না মনে হচ্ছে। আর সেই মুহূর্তে ভেবে ভাল লাগাটা নষ্ট করতেও ইচ্ছে হল না।

আমার যে, ওই অপরিচিত ছেলেটার সাথে থাকা সেই সময়টা ভাল লাগছিল, আর পুরো ব্যাপারটাতে আমি অবাক হয়েছি সেটা বুঝতে পারলাম ছেলেটা বাস থেকে নেমে যাওয়ার পর। শ্যামলীর কাছাকাছি যেতেই বাস মোটামুটি খালি হয়ে গেল। আমিও আস্তে আস্তে ছেলেটার শার্ট আর হাত ছেড়ে দিয়ে বসলাম। তাফসির আমার কাছে এসে দাঁড়ালো। আমি তাফসিরের দিকে তাকিয়ে হাসি বিনিময় করলাম। ও বলল, “কীগো কষ্ট হচ্ছে অনেক?

আমি বললাম, “না ঠিক আছে। একটু ভিড় ছিল এই আর কি।”

অপরিচিত ছেলেটা আমার পাশ থেকে সরে গেটের পাশের লম্বা রোডটা ধরে দাঁড়ালো। যেখানটায় তাফসির দাঁড়িয়ে ছিল। বসার কোনো সিট এখনো খালি না হলেও বাসের গেটের সামনের ভিড় কেটে গেছে। ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে নেই আমিও স্পষ্ট ভাবে ওর দিকে তাকাচ্ছি না। মাঝে মাঝে ও আমার দিকে আমি ওর দিকে তাকাচ্ছি কিন্তু আমি হাসছি না। ছেলেটা একাই মৃদু একটা হাসি দিচ্ছে। তাফসির আমার একটু গা ঘেষে বসে বলল, “কী চেনো নাকি ছেলেটাকে আগে থেকে?”

আমি ভ্রূ কুচকে বললাম, “ওমা চিনলে তো কথাই বলতাম। থোরাই কি চুপ করে বসে থাকতাম?”

তাফসির রহস্য মার্কা হাসি দিয়ে বলল, “আরে রাগ কেন করছো? পরিচয় তো থাকতেই পারে। তোমার তো আগের জনমে অনেকেই পরিচিত ছিল। তাতে সমস্যাটা কী? আমি কি কিছু বলব না কি?”

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, “ফাউ কথা বন্ধ করো তোমার। ভাল্লাগে না প্যানপ্যানানি।”

তাফসির আবার সেই রহস্যময় হাসি দিয়ে ছেলেটার দিকে তাকালো।

ছেলেটাকে মোটেও তাফসিরের তাকানিতে বিব্রত লাগল না। ও সাবলীল ভাবে আগের মতই আমার দিকে হাসি হাসি মুখে তাকাচ্ছে।

শ্যামলী শিশুমেলার সামনে বাস থামতেই ছেলেটা আমার দিকে একবারো না তাকিয়ে লাফ দিয়ে বাস থেকে নেমে গেল। বাস থেমে আছে লোক ওঠানোর জন্য। ছেলেটা বাস থেকে নেমে আমাকে ডাকলো, “এই এই শোনো না একটু, খাতাটা দাও।”

আমি প্রথমে বুঝতে পারি নি আমাকে কেউ ‘এই’ ‘এই’ বলে ডাকছে। তাফসির বলল, “এই তোমাকে ডাকছে মনে হয় ওই ছেলেটা।”

আমি একটু অবাক এবং প্রথম বারের মত বিব্রত হয়ে বাসের গেটের দিকে মুখ বাড়িয়ে দেখলাম ওই ছেলেটা ওর খাতাটা দিতে বলছে। গেটের কাছে গিয়ে খাতাটা দিলাম ওর হাতে। লিকলিকে মুখের সেই ছেলেটা আবার মৃদু হাসল। ও আর দাঁড়ালো না, চলে গেল হেঁটে হেঁটে। আমি এসে তাফসিরের পাশে বসলাম। তাফসির আমার হাতটা ধরল। আমিও শক্ত করে ধরে বসলাম। আমি তাফসিরের গায়ের ঘ্রাণ পাচ্ছি, কিন্তু সেই অপরিচিত ছেলাটার ঘ্রাণ না। আমার খুব কাছের মানুষটার পাশে বসে আছি কিন্তু পাশে আমার মাথার কাছে ওই ঠেংরাকাঠি ছেলেটা নেই। আমি তাফসিরের দিকে তাকাচ্ছি হাসছি, কিন্তু ওই অপরিচিত ছেলেটার চেহারাটা মনে পড়ছে না। একটু একটু মনে পড়ছে। হাসিটা কেমন ক্লান্ত ক্লান্ত ছিল ছেলেটার, কিন্তু আমার ভাল লাগছিল।

বাস থামল কল্যাণপুর। নেমে গেলাম আমরা। বাস থেকে নেমে কিছুটা হেঁটে গলির ভিতর দিয়ে বাসায় যেতে হত। কেউ যদি দেখে ফেলে তাই এই সময়টা আমরা হাত ধরাধরি করি না। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তাফসির আমাকে বলল, “তুমি ছেলেটার সাথে ফ্লার্ট কেন করছিলা? এটা কিন্তু ঠিক না।”

আমি তাফসিরের দিকে তাকিয়ে থাকলাম কথাটা শুনে। উত্তর খুঁজে পেলাম না কী বলব। তবে আমি তো মোটেও ফ্লার্ট করছিলাম না। কিন্তু, না বললে তাফসিরের সন্দেহ অস্বাভাবিক কাল্পনিক পর্যায়ে চলে যাবে। তাই কোনো উত্তর না দিয়ে নিরাপদ পজিশনে থাকলাম। কথা বলতে বলতে বাসার সামনে চলে আসলাম। তাফসির বলল, “যাও বাসায়, পরে ফোনে কথা হবে। টেক কেয়ার।”

তখন প্রায় সন্ধ্যা। ঘরে ঢুকে দেখলাম মা জানলার সামনে দাঁড়িয়ে। বুঝলাম না তাফসিরকে মা দেখেছেন কি না। কিছুই বললেন না। দেরি হওয়ার কারণও জিজ্ঞেস করলেন। আমি চুপচাপ নিজের ঘরে চলে গেলাম।

আমি ওই অপরিচিত ছেলেটার নাম জানি না। ও নিজেও আমার নাম জানতে চায় নি। এমনকি বাসায় এসে ওর চেহারাটাও মনে করতে পারলাম না। কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করলে শুধু ওর হাসিটা মনে পড়ছে। আমার মাথা থেকে ওর চেহারাটা টোটালি গায়েব হয়ে গেছে। কিছুতেই মনে করতে পারছি না।

এরপর যতবার বাসে উঠেছি বিশেষ করে শতাব্দী বাসে ছেলেটাকে খুঁজি। কিন্তু কিছুতেই চেহারা খেয়াল পড়ে না। আর ওকে আর খুঁজেও পাওয়া হয় নি। অনেকবার ভেবেছিলাম ছুটির দিনে ঘটনাটা লিখে ছাপাবো, আর লেখার নিচে লিখব—তুমিই যদি সেই ছেলেটি হয়ে থাকো তবে তার উপযুক্ত প্রমাণ দিয়ে আমার সাথে প্লিজ একবার দেখা করো…।

Tagged with:

About Author

নওয়াজ ফারহিন অন্তরা
নওয়াজ ফারহিন অন্তরা

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গনযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ছেন। জন্ম- ঢাকা, মে ১৯৯৩।