page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

শর্ট ফিল্মের আদলে বিজ্ঞাপন — বিএমডব্লিউ’র ‘দ্য হায়ার’

bmw-34

বিখ্যাত জার্মান অটোমোবাইল কোম্পানি বিএমডব্লিউ তাদের পণ্যের প্রচারণার জন্য ২০০১ সালে অভিনব এক বিজ্ঞাপন কৌশলে হাত দেয়। বিশ্বের সুপরিচিত কিছু পরিচালকের কাছ থেকে কয়েকটা শর্ট ফিল্ম তৈরি করে নেয় তারা। তারপর সেগুলি অনলাইনে মুক্তি দেওয়া হয় ‘বিএমডব্লিউ ফিল্মস’ এর ব্যানারে।

এই স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবিগুলি কোনো দিক দিয়েই সাধারণ মানের বিজ্ঞাপনের মত নয়। প্রতিটা সিনেমায় বিএমডব্লিউ’র কিছু নির্দিষ্ট মডেলের গাড়ির ব্যবহার ছাড়া গৎবাঁধা বিজ্ঞাপনী ধারার আর কিছুই ব্যবহার করা হয় নাই। বরং একেকটি ছবি পরিচালকদের স্বাতন্ত্র্য দিয়ে মোড়া।shadhin-ahmed-logo

পরিচালকদের এই তালিকায় আমেরিকান থেকে শুরু করে মেক্সিকান আর হংকং-এর নির্মাতারাও আছেন। নামগুলি শুনলে বরং যে কোনো সিনেমাপ্রেমীই চমকে উঠবেন— কেননা শুধু বিজ্ঞাপনের খাতিরে নিজেদের সৃজনীশক্তি ক্ষয় করার জন্য এসব পরিচালকদের মোটেও সুখ্যাতি নাই। তবে সিনেমাগুলি দেখা হলে সবাই ইতিবাচ্যে মাথা নাড়তে বাধ্য হবেন।

ছবিগুলির কাহিনিতে কোনো মিল না থাকলেও সব ছবিতেই ব্রিটিশ অভিনেতা ক্লাইভ ওয়েন ‘ড্রাইভার’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই ড্রাইভার তার বিএমডব্লিউ গাড়ি নিয়ে ভাড়া খাটে। তার একেকজন কাস্টমারকে নিয়ে যাত্রাই একেকটি ছবির গল্প।

bmw-346

বলা বাহুল্য, প্রতিটি ‘যাত্রা’ই ড্রাইভারের জন্য ‘অভিযানে’ রূপ নেয়। অ্যাকশন হিরো জ্যাসন স্ট্যাথাম-এর বিখ্যাত ‘ট্রান্সপোর্টার’ সিরিজের মূল চরিত্রটি নির্মাতা লুক বেসোঁ এখান থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করেছিলেন।

‘দ্য হায়ার’ নামক এই সিরিজের প্রযোজক হিসাবে ছিলেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ডেভিড ফিন্চার।

২০০১ এর এপ্রিল মাসে বিএমডব্লিউ ফিল্মস ওয়েবসাইটে প্রথম শর্ট ফিল্মটি মুক্তি দেওয়া হয়।

জন ফ্র্যাংকেনহাইমার পরিচালিত ছবিটার নাম ‘অ্যামবুশ’। ফ্র্যাংকেনহাইমার আশির দশক থেকেই হলিউডে অ্যাকশন থ্রিলার বানিয়ে এসেছেন। বিশেষ করে ‘চেজ সিন’ আয়োজনে তার সুনাম ছিল বেশ। এখানেও সে রকমটাই করেছেন, সাথে ছিল হিউমার। মৃত্যুর আগে করে যাওয়া এটা তার শেষ তিন সিনেমার একটি।

এরপর মুক্তি পায় তাইওয়ানিজ পরিচালক অ্যাং লি’র ‘চোজেন’। নিজের এশিয়ান সংস্কৃতির সাথে পশ্চিমা অ্যাকশন-অ্যাডভেন্চার মিশিয়ে বানানো ছবিটাতে লি কিছুটা প্রচারণা করেছেন নিজেরও। তার পরিচালিত সুপারহিরো মুভি ‘হাল্ক (২০০৩)’ তখনও নির্মাণের অপেক্ষায় ছিল। সেই ছবির আগাম বার্তা দিতে তিনি খানিকটা ব্যঙ্গের সাহায্যেই ব্যবহার করেন এই শর্ট ফিল্ম।

২০০১ এর কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ওং কার ওয়াই পরিচালিত তৃতীয় ফিল্মটির প্রিমিয়ার হয়। বিশ্বনন্দিত এই পরিচালকের স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবিটিও স্বাভাবিকভাবেই সমালোচকদের প্রশংসা পায় প্রচুর। সম্ভাব্য একটা একমুখী অ্যাকশন মুভিকে পুরোদমে মানবিকতার দ্বন্দ্বের কাহিনিতে নামিয়ে আনা হয়েছে শুধুই পরিচালনা আর চিত্রনাট্যের জোরে। অভিনয়ে ছিলেন মিকি রোর্ক, ফরেস্ট হুইটেকার এবং ব্রাজিলিয়ান সুপারমডেল আদ্রিয়ানা লিমা।

এরপরে একে একে মুক্তি দেওয়া হয় ‘স্টার’ ও ‘পাউডার কেগ’। ব্রিটিশ পরিচালক গাই রিচি’র ‘স্টার’—জঁনরার হিসাবে কমেডি। তারকাদের তারকাসুলভ আচরণের স্যাটায়ারও বলা যায়। তবে গাই রিচি’র পরিচালনায় ক্যামেরাওয়ার্ক থেকে অভিনেতাদের অভিব্যক্তি— প্রায় সবই অতিরঞ্জিত। আর এই অতিরঞ্জন রিচির নির্মাণকৌশলেরই প্রতিনিধিত্ব করে। অভিনয়ে ছিলেন রিচি’র সে সময়ের স্ত্রী পপতারকা ম্যাডোনা।

‘পাউডার কেগ’ এর পরিচালক আলেহান্দ্রো গনজালেস ইনারিতু। পর পর দুই বছর সেরা পরিচালনার অস্কার পাওয়া এই নির্মাতার ক্যারিয়ারের শুরুর সব সিগনেচারই এই ছবিতেও ছিল। কলহরত রাষ্ট্রের প্রতি রাজনৈতিক অবস্থান, ব্যক্তিকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতায় গল্পের গ্রন্থিমোচন, হ্যান্ড-হেল্ড ক্যামেরার কাজ—এ সব নিয়ে ইনারিতু নিজের প্রথম দিকের সব কয়টি ছবিতেই ঘাটাঘাটি করতেন; এখানেও করেছেন। সিনেমাটোগ্রাফির দায়িত্বে ছিলেন কিংবদন্তী চিত্রগ্রাহক রবার্ট রিচার্ডসন। লিখেছেন আলেহান্দ্রো নিজেই, সাথে ছিলেন তখনকার নিয়মিত সঙ্গী গিয়ের্মো আরিয়াগা। অভিনয় করেছেন স্টেলান স্কার্সগার্ড।

এই ৫ টি ছবির জনপ্রিয়তার খাতিরে বিএমডব্লিউ তাদের শো-রুমগুলিতে কাস্টমারদের জন্য ফ্রি ডিভিডির আয়োজন করে—যার স্টক ফুরিয়ে যায় অল্প সময়েই। দর্শকদের চাহিদায় ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’ ম্যাগাজিনের স্টলে আরেক দফা ডিভিডি সরবরাহ করা হয়, যা আবারও তাড়াতাড়িই বিক্রি হয়ে যায়। ২০০১ এর শেষে বিএমডব্লিউ গাড়ির সেলস নাম্বার আগের বছরের চাইতে ১২% বৃদ্ধি পাওয়ায় আবার কিছু শর্ট ফিল্ম করার উদ্যোগ নেয় তারা।

২.
দ্বিতীয় সিজনে প্রযোজক হিসাবে থাকেন দুই ভাই রিডলে এবং টনি স্কট। ২০০২ এর অক্টোবরে সিজন টু’র প্রথম ছবি ‘বিট দ্য ডেভিল’ মুক্তি দেওয়া হয়।

টনি স্কট পরিচালিত ছবিটিতে ফাংক মিউজিকের পথিকৃৎ গায়ক জেমস ব্রাউন নিজের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। স্কটের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যময় চলচিত্ত আবহ আর ছোট ছোট সব শটে ধারণ করা মুভিটি সুপারন্যাচারাল আর ডার্ক কমেডি ঘরানার। আরো অভিনয় করেন গ্যারি ওল্ডম্যান।

এরপর হংকং-এর অ্যাকশন মুভির বিখ্যাত পরিচালক জন উ আসেন দ্বিতীয় ছবি ‘হস্টেজ’ নিয়ে। মাত্র ১০ মিনিটের গল্পে অ্যাকশনের সাথে উত্তেজনা, বহুমুখী প্রতারণা আর টুইস্ট ঢুকিয়ে দেওয়ায় ছবিটি নিশ্চিতভাবেই গোটা সিরিজের সবচাইতে কাহিনিবহুল ছবি।

নির্মাতা জো কার্নাহান পরিচালনা করেন দ্বিতীয় সিজনের তৃতীয় এবং শেষ মুভি ‘টিকার’। এই শর্টফিল্ম যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ঔদার্যের সরল প্রদর্শনীর পক্ষপাতদুষ্ট। অভিনয়ে আছেন ডন চিয়াডল ও রে লিওটা।

ছবিগুলি আমেরিকান সমালোচকদের নজরে ছিল শুরু থেকেই। মাত্র ১০ মিনিটেই পরিচালকদের নিজস্বতা ও প্রভাবশালী নির্মাণকৌশলের নিদারুণ প্রকাশ স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমার ক্ষেত্রকে বড় করে দেখার সুযোগ দিয়েছিল তাদের।

৩.
২০০৫ সালে বিএমডব্লিউ তাদের ওয়েবসাইট থেকে আটটি ছবিই তুলে নেয়। নির্মাণ খরচ প্রাথমিক পরিকল্পনার চাইতে অত্যধিক বেড়ে যাওয়াতেই এ রকম সিদ্ধান্ত নেয় তারা। যদিও একই কনসেপ্টে পরবর্তীতে কিছু অডিওবুক আর কমিক বের করা হয়, কিন্তু ছবির ব্যাপারে আর কোনো উদ্যোগ দেখা যায় নি।

বিএমডব্লিউ’র এই বিজ্ঞাপন কৌশল অবশ্য অন্যান্য অটোমোবাইল কোম্পানিগুলিকে প্রভাবিত করে। ‘নিশান’ এবং ‘মার্সিডিজ-বেন্জ’ও শর্ট ফিল্মের আদলে মুক্তি দেয় তাদের গাড়ির নতুন মডেলের বিজ্ঞাপন।

২০১৬ সালের অক্টোবরে ‘ফোর্ড মোটর কোম্পানি’ প্রথমবারের মত নির্মাণ করে একটি শর্ট ফিল্ম, যেখানে তাদের ২০১৫ সালের ‘ফোর্ড এজ’ মডেলের গাড়ির প্রচারণা চালানো হয়। ‘লে ফান্তোম’ নামের ছবিটির পরিচালক ছিলেন রিডলে স্কটের ছেলে জেক স্কট, অভিনয় করেছেন ডাচ অভিনেতা ম্যাডস মিকেলসেন এবং ইতালিয়ান হরর মুভির প্রখ্যাত অভিনেত্রী বারবারা স্টীল।

ঠিক একই সময়ে বিএমডব্লিউ তাদের ‘দ্য হায়ার’ সিরিজ নিয়ে প্রত্যাবর্তন করে। প্রায় পনেরো বছর পর ‘ড্রাইভার’ চরিত্রে ফিরে আসেন ক্লাইভ ওয়েন। এবারের প্রথম ছবির নাম ‘দ্য এস্কেপ’।

পরিচালক ‘ডিস্ট্রিক্ট নাইন’ খ্যাত সাউথ আফ্রিকান ‘নীল ব্লমক্যাম্প’; ব্যবহার করা হয়েছে বিএমডব্লিউ ফাইভ সিরিজের জি৩০ কোডনেমড গাড়ি। সায়েন্স ফিকশন ঘরানার ছবিটিতে অভিনয় করেছেন ড্যাকোটা ফ্যানিং, ভেরা ফারমিগা এবং জন বার্নথ্যাল। সামনে এই সিজনের আরও কিছু ছবি মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে।

About Author

আয়মান আসিব স্বাধীন
আয়মান আসিব স্বাধীন