page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

শিশুদের প্রতি যৌন-নিপীড়ন নিয়ে আর নীরবতা নয়

একটা ছোট্ট অবস্থা দিয়ে শুরু করি। “মামনি আঙ্কেলের কাছে আসো, দেখো তোমার জন্য চকলেট এনেছি।” অহনা যেতে চাইছে না। আপনি জোর করলেন। সারাদিন বাচ্চা সামলে আপনি ভারি ক্লান্ত। অহনা কিছুক্ষণ চাচ্চুর সাথে থাকলে আপনিও স্বস্তি পান। নিশ্চিত মনে মেয়েকে চাচ্চুর কাছে রেখে চা দেখে আসতে গেলেন।

মা লিভিং রুম থেকে বের হবার পরেই চাচ্চু আর চাচ্চু থাকে না। মুখ চেপে ধরে ‘আদর’ দেয় আপনার ছোট্ট আদরের অহনাকে। চুপ হয়ে যায় অহনা। কারো সাথে কথা বলে না।

বড় হয়ে তাকেই জোর করা হলো সেই চাচ্চুর সাথে স্বাভাবিক ব্যাবহার করার জন্য! আইরনি!

taspia raka logo


আমার এক পরিচিতা তার মেয়েকে নিয়ে বাসে উঠেছিল। তার মেয়ে দেখতে ছোট্ট পরীর মত। যেই দেখে আদর করতে চায়। বাসে উঠবার পর এক ভদ্রলোক মহিলার কোলে বাচ্চা নিতে অসুবিধা হচ্ছে তাই নিজে থেকেই বলে যে মেয়েটি তার কোলে বসতে পারে। ভদ্রমহিলা হাঁপ ছেড়ে বাঁচেন। বাচ্চাকে সেই অপরিচিত লোকের কোলে দিয়ে নিজে আরাম করে বসেন। কিছুক্ষণ পরে মেয়ে কান্না শুরু করে বার বার মায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে আসতে চায়। মহিলা ক্ষেপে উঠে মেয়েকে বকাঝকা দিয়ে “চুপ করে আঙ্কেলের কোলে” বসতে বলেন।

বাস থেকে নামার পর মেয়ে মার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। তার প্রায় ৩ দিন পরে মাকে সে বলে কোলে থাকা অবস্থায় সেই ভদ্রলোক তার জামার ভেতর হাত দিয়েছিল। মাকে তখন সে বলতে পারে নাই বকা দেবার কারণে।

এ রকম ঘটনার বাইরেও শোনা যায় নিজের বাসায় কাজের লোকের দ্বারা নির্যাতন, তারও চাইতে ভয়ঙ্কর যখন আপন দাদা, ভাইয়ের ব্যাপারে কিছু শোনা যায়। শুধু মেয়েশিশু নয়। ছেলে এবং মেয়েশিশু যে কেউই এই ধরনের নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। আপন চাচা, মামা, খালাতো ভাই, চাচাতো ভাই, বাসার কাজের মহিলা কিংবা লোক, ড্রাইভার, আপন ভাই, দাদা — দা লিস্ট উইল গো অন।

আপনি চুপ করে আছেন, ভাবছেন, হচ্ছে অ্যাবিউজ কিন্তু আপনার বাচ্চা তো নিরাপদ! কিন্তু আসলেই কি নিরাপদ?

শিশুরা কি কারো কাছে নিরাপদ? ধরে নিই, বাবা-মার কাছেই শিশুরা নিরাপদ। তাহলে আপনার শিশুকে আপনারই বুঝিয়ে বলতে হবে। কোন ধরনের আচরণ ঝুঁকিপূর্ণ এবং কখন শিশুদের তা পিতা-মাতাকে জানাতে হবে।


কিছুদিন আগে একটা মুভি দেখা হলো দা পার্কস অফ বিং অ্যা ওয়ালফ্লাওয়ার  (The Perks of Being a Wallflower)। মুভির স্টোরিলাইনে আপন খালা দ্বারা শিশুটি নিপীড়িত হয় এবং বড় হবার পর এক সময় মানসিক স্থিতি হারিয়ে ফেলে।

মুভি দেখবার শেষ ৩০ মিনিট চোখের পানি ধরে রাখা সম্ভব হয় নাই। একটা শিশুর মানসিক বিকাশের সময়ে যখন এমন কিছু হয় তা চিরদিনের মত স্কারের সৃষ্টি করে।

তাছাড়া সাধারণ জরিপে বলে, অধিকাংশ সেক্স অফেন্ডাররা শিশুকালে নিজেও নিপীড়নের শিকার ছিল। চেইন রি-অ্যাকশনের মত চলতে থাকে ব্যাপারটা।

১১ বৎসর কিংবা তার নিচের বয়সের শিশুদের প্রতি যৌন আকর্ষণ ‘পিডোফিলিয়া’ হিসেবে পরিচিত। ইউরোপ-আমেরিকায় তালিকাভুক্ত ‘সেক্স অফেন্ডার’ থাকলেও কোনো অজ্ঞাত কারণে আমাদের দেশে এই বিষয়টাকে অগ্রাহ্য করা হয়, কিংবা লজ্জার বিষয় ভেবে এড়িয়ে যাওয়া হয়।

মনে রাখতে হবে, শিশু তার নিজের বাসাতেও নিকট আত্মীয় দ্বারাও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে পারে। তাই খেয়াল করা দরকার কার সাথে মিশছে। বাবা-মার সাথে শেয়ার করলে চুপ করিয়ে না দিয়ে সাহস দিতে হবে। বরং সাহস দেয়া যেতে পারে কেউ অন্যায় করলে তা প্রকাশ করার জন্য।

যৌনতা বা যৌন আচরণকে মোটামুটি একটা অস্পৃশ্য ব্যাপারের তালিকায় নামিয়ে দেয়া বকধার্মিক লোকজনের প্রতি এই কারণে বিতৃষ্ণা আসে। রক্ষক যখন ভক্ষকের আসনে চড়ে বসে তখন উপায় কী? বাইরের দেশে কমিউনিটিতে থাকলে বাবা-মারা রেজিস্টার্ড সেক্স অফেন্ডারদের ব্যাপারে খোঁজ রাখতে পারেন এবং তাদের সন্তানের নিরাপত্তার বিষয়টা কিছুটা হলেও নিশ্চিত করতে সক্ষম হন।

আমাদের দেশে যৌনশিক্ষারই যেখানে প্রচলন নাই সেখানে এই ধরনের তালিকার আশা করা হলে সেই আশা নিরাশাতেই যাবে। তাই দরকার সচেতনতার।

চোখ মুঁদে রেখে, দেখেও না দেখার ভান করে, আমাদের সন্তানদের যৌন-নিপীড়ন বিষয়ে সচেতন না করে আমরা খুব অল্প বয়সেই তাদের মানসিক বিকাশ হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছি। কাছাকাছি বন্ধুদেরও যখন এমন গল্প শোনা যায় তখন কেমন গা গুলিয়ে ওঠে। সমাজকে অসুস্থ বলে লাভ নেই, নিজেদেরই সচেতন হতে হবে।

অনেক বাবা-মাই হয়তো বুঝে উঠতে পারেন না ঠিক কীভাবে এই বিষয়গুলি নিয়ে আলাপ করবেন। শুধু বাবা মা নয়, আপনার ছোট ভাই কিংবা বোন কিংবা ভাগ্নে/ভাগ্নির নিরাপত্তার বিষয়টি খেয়াল করুন। তাদের জন্য ভিডিও লিঙ্ক দিলাম। প্রাথমিক একটা ধারণা করা যেতে পারে এখান থেকে।

abuse2

যৌন নিপীড়ন সচেতনতার ইউটিউব ভিডিও লিংক


মাদ্রাসার শিশু নিপীড়ন নিয়ে সকলের মাথাব্যাথা দেখা গেলেও সমাজের এই রোগের মূল উৎপাটনে উৎসাহ দেখা যাইতেছে না। কিছু ক্ষেত্রে বাবা-মার কাছে প্রকাশ করলেও শিশুদের চুপ করিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তীতে নিপীড়নকারীদের সাথেই সাধারণ সম্পর্ক রাখতে বাধ্য করা হয় অত্মীয়তার খাতিরে। এতে সেন্স অফ সিকিউরিটি একেবারেই হারিয়ে ফেলে বাচ্চারা। বড় হবার পরেও ভীতি, ভয়ে ভুগতে থাকে। ছোটবেলা থেকে কার্টেসির নামে ভণ্ডামি শিক্ষা পাইতেছে ওরা।

অসুস্থ যৌনাচারি লোকজনের সাথে হাওয়া-বাতাস শেয়ার করি ভাবতেও অশান্তি লাগে। লিখে যে খুব উপকার হবে তাও না। কেউ কেউ এই লেখা পড়ে সুড়সুড়ি অনুভব করলেও অবাক হবো না। অসুস্থ লোকের তো আর অভাব কম নয়। কিন্তু একজনেও সচেতন হলে কম কী?

 

About Author

তাসপিয়া রাকা
তাসপিয়া রাকা

জন্ম. ঢাকা, নভেম্বর ১৯৮৯। পরিবেশ প্রকৌশলী (এনভারমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং) ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিটিশ কলাম্বিয়া (ইউ বি সি), ভ্যাঙ্কুভার, কানাডা ল্যাবরেটরি অ্যানালিস্ট, ম্যাক্সাম অ্যানালেটিকস, ক্যালগরি ফ্রি ল্যান্সার অনুবাদক/ কনসালট্যান্ট। লিংক: পার্সোনাল ব্লগ