page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

শিস

mchy2010

গত দু’মাস জাপানে থাকতে গিয়ে নানান কিছু নিয়ে সতর্ক থাকতেই হয়েছে। বাসে উঠতে গিয়ে ভুল করে কাউকে ডিঙিয়ে না-যাই যেন! ফুস করে পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট বের করে ধরিয়ে না-ফেলি যেন! এরকম আর কি। আমি ভেবেছিলাম যে আমার সবচেয়ে কসরৎ করতে হবে সিগ্রেট নিয়ে। কিন্তু বাস্তবে করতে হচ্ছে শিস বাজানো নিয়ে।

জাপানে আমি কাউকেই শিস বাজাতে শুনি না। এর আগে যখন আড়াই বছর ছিলাম, ২০০৪ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত, তখনও নিশ্চয়ই কাউকে শিস বাজাতে শুনি নি মনে হয়। কিন্তু সেবারের চেয়ে এবারে বিষয়টা লাগল বেশি। অথবা সেবারে কেমন লেগেছিল তা আর এখন মনে নেই।

manosh chy logo

জাপানে কাউকেই আমি শিস বাজাতে শুনি নি। আরও বিশেষ করে বললে হিরোশিমাতে আমি কাউকে শিস বাজাতে শুনি নি। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে হিরোশিমা শহরের অদূরে সাইজোতে আমি কাউকে শিস বাজাতে শুনি নি। আমি প্রায় নিশ্চিত কেউই বাজায় না আশপাশে কোথাও, পাবলিক পরিসরে। প্রথম দিন থেকেই কীভাবে যেন এই পরিস্থিতি আমার মাথাকে মহাসতর্ক করে রেখেছে।

শিস বাজিয়ে মনুষ্যজাতির শিশুদের, বিশেষত ছেলে শিশুদের হিসি করানোর প্রচলন কবে থেকে শুরু হয়েছিল আমার জানা নেই। তবে এখনও পূর্ণবয়স্ক কিছু মানুষকে শিস শুনে চঞ্চল হতে দেখি; এবং তাঁরা নিভৃতে দাবি করেন শিস শুনলে হিসিপ্রণালী সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।

আমার এরকম কোনো সমস্যা কোনোদিন ছিল না। বরং আমার শিস শুনলে বেশ হিংসা হতো। কোনোরকম কাজ চালানোর মতো শিসও আমি দিতে পারতাম না প্রায় ১৮ বছর পর্যন্ত। পরিচিত ছেলেরা তখন অনেকেই শিস ও সিটি বাজাতে পুরোদস্তুর ওস্তাদ। আমি লাগাতার, একা একা, সকলের অলখে, চেষ্টা চালিয়ে গেলাম।

একদা ১৯৮৭ সালের কোনো এক দুপুরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আমার শিস বের হলো। এরপর লাগাতার আমি এই নবলব্ধ বিদ্যা স্থানে-অস্থানে চর্চা করতে থাকি। সিটি আমি বাজাতে পারি না এখনো, আর সেই বেদনা আমার পুরাপুরি বজায় আছে। কিন্তু একা-হাঁটার প্রায় প্রতিটা মুহূর্ত আমি শিস বাজাতে থাকি, বা বাজানোর উৎসাহ বোধ করি। এখনো।

তিন-চার দিন আগে সন্ধ্যাবেলা জাপানি যে মেয়েটির সঙ্গে হিরোশিমা শহরের রাস্তায় হাঁটছিলাম, তাকেই জিজ্ঞেস করে বসলাম ‘এখানে কেউ শিস বাজায় না? বাজালে কী দাঁড়াবে বিষয়টা?’

মেয়েটির আমার সঙ্গে ইংরেজিতে কথাবার্তা চালাতে এমনিতেই অনেক কসরৎ করতে হয়। আমি ভেবেছিলাম এই প্রশ্নটাও অনেক কষ্ট করাবে ওকে। কিন্তু এটার উত্তর খুব সহজেই দিয়ে দিল। আমাকে বোঝাল যে আমি যদি এখন শিস বাজাতে থাকি তাহলে গুরুতর কিছুই হবে না। তবে লোকজন আমাকে ‘স্ট্রেঞ্জ’ ভাববে।

আমি প্রায় নিশ্চিত যে ও আসলে ‘উইয়ার্ড’ শব্দটা তখন হাতড়ে পায় নি, বা কখনো ব্যবহার করে নি। আমি ওকে বললাম ‘সেটা কি আমাকে এমনিতেই ভাবছে না?’ এই কথাটা অবশ্য পরে খানিকক্ষণ ওকে বুঝিয়ে বলতে হলো। হিরোশিমাতে, অনেক পথচলতি লোকের মাঝে, ভরসন্ধ্যার দারুণ শহুরে আলোতে, আমার একপেট ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও, শিস বাজানো আর হলো না।

১৯৮৭-তে সেই দারুণ এক দুপুরে বিদ্যাটা মুখস্থ হবার পর আমি আসলেই থেমে থাকি নি। আমার দুর্নিবার শিসাগ্রহ দেখে তখনকার ‘বন্ধু’ (পরে সহকর্মীও বটে) আইনুন জার্মানি থেকে না কোত্থেকে যেন একটা অ্যালবাম এনে দিয়েছিল। রজার হুইটেকার-এর। গানেরই অ্যালবাম। কিন্তু তিনি গানের মাঝে-মাঝে শিস বাজান। তিনি আসলে শিসের জন্যই পরিচিত। হুইটেকারের এই ক্যাসেটখানা বহু বছর ধরে ভীষণ এক উত্তেজনার বিষয় ছিল আমার।

১৯৯৩ বা এরকম সময়ে আরেক ‘বন্ধু’ চঞ্চল ওর নির্মিতব্য নাটকের জন্য আমাকে বাছাই করল। আমার সামান্য বিদ্যায় চঞ্চলকে এখনো মঞ্চ-পরিচালনার গুরু মনে হয়। ফলে ওর ওই বাছাইয়ে আমি খুশিতে আটখানা। তখন আমি বেকার, আশু চাকরির কোনো লক্ষণ দেখি না, ট্যুইশনি করি। ট্যুইশনি একটা ছেড়ে দিয়ে আমি জাহাঙ্গীরনগর গিয়ে উঠলাম নাটকের রিহার্সালের জন্য। আমার ক’দিন পরেই মনে হলো আমাকে বাছাই করবার একটা কারণ আমার শিস। তার কিছুকাল আগে রড স্টুয়ার্ট-এর রিদম অব মাই হার্ট গানটা আত্মপ্রকাশ করে। নিশ্চয়ই অসিতের সংগ্রহ থেকে শুনেছিলাম। আমি গানটার শুরুর লাইনগুলোর সুর শিস বাজাতাম।

চঞ্চল নির্দেশনা দিতে শুরু করল থ্রি কমরেডস এর একাংশ, বলা চলে কয়েক পাতা। আমি ছিলাম লুদভিগ। আর আমাদের গল্পপ্রবাহ তখন একটা সেনা-বাঙ্কারে, যুদ্ধকালীন সময়ে। লুদভিগ মাঝেমধ্যে মাউথ-অর্গান বাজায়। চঞ্চলের নাছোড়বান্দামিতে আমি মাউথ অর্গানে ফুঁ দেয়া শুরু করলাম। অত্যন্ত কাঁচা মুখে আমি বাজালাম ‘ও রিদম অব মাই হার্ট’ এর শুরুর লাইনগুলোর সুর।

পরিচালকের মুগুর না-থাকলে হয়তো যেটা শিস দিয়েই চালাতাম। আমাদের নাটকে আমরা অভিভূত-বুঁদ হয়ে রইলাম এর পরের অনেকগুলো দিন। আর চঞ্চল তার এই নির্দেশনার জন্য ওর নাট্যতত্ত্ব বিভাগে সবচেয়ে কম নম্বর পেল। এটা ওর পরীক্ষা ছিল। চঞ্চল তখন পরীক্ষার নম্বর নিয়ে কীভাবে যেন নির্বিকার থেকে গেল। অথবা কিছু একটা। পরস্পরকে প্রতিশ্রুতি দিলাম যে একত্রে থিয়েটার আমরা করতে থাকব। যুদ্ধে লুদভিগদের দশার মতোই আমাদের আর নাটক করা হয় নি।


Rod Stewart – Rhythm Of My Heart (Official Music Video)

ক’দিন ধরেই নানান সুরের মধ্যে এই ‘রিদম অব হার্ট’ও ঘুরছে। ইন্টারনেট ঘেঁটে ক’দিন ধরে নানান গান শুনছিও বটে। তার মধ্যে রড স্টুয়ার্ট-এর স্টুডিওরূপ ওই গানখানাও আছে।

রাত্রি ৮টার দিকে খেতে বের হয়েছি। আমি যে রেস্তোঁরাতে রাত্রিবেলা সাধারণত খাই সেটা অনেক আমরেস্তোঁরা এখানকার। কাজফিরতি অনেক মানুষ অনেক রাত অবধি আসেন। এমনিতেই এটা ছোট গ্রামপ্রায় শহর। তারপর এদিকের রাস্তাটা প্রায় খালি। রাস্তায় নেমে কয়েক কদম গিয়েই আমি শিস বাজালাম:

 শিস, মানস চৌধুরী ২০১৪

“ও রিদম অব মাই হার্ট ইজ বিটিং লাইক আ ড্রাম/উইদ দ্য ওয়ার্ডস আই লাভ ইউ রোলিং অফ মাই টাঙ/নো নেভার উইল আই রোম/ফর আই নো মাই প্লেস ইজ হোম/হোয়ের ওশেন মিটস দ্য স্কাই আ’ইল বী সেইলিং”।

ওয়েব লিংক
মানস চৌধুরীর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত (ইউটিউব ভিডিও)

 

About Author

মানস চৌধুরী
মানস চৌধুরী

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগে মাস্টারি করে নির্বাহ করি। গল্প, কলাম ইত্যাদি লিখি। সুযোগ পেলে পর্দায় অভিনয়ও করি।