page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

সঙ্গীত: বড়লোকের, ছোটলোকের, মিডলক্লাসের

salahuddins77

ইংরেজ উপনিবেশ ভারত জামানার আর সব কিছুতে ভেজাল মিশায়ে দিলেও একটা জিনিসে পারে নাই। তা হইল সঙ্গীত। পণ্ডিতেরা এমন কথা বলছেন নানা ইতিহাসের বইয়ে। ভারতে সঙ্গীত মানে গান,বাদ্য,নাটক,নৃত্য এসব কিছুকে বুঝায়। আমরা এখন যেমন থিয়েটারকে আলাদা করি। আগের জামানার ভারতে সেটা আলাদা কোনো ব্যাপার ছিল না। এ নিয়েও পণ্ডিতেরা লেখালেখি করেছেন বিস্তর।

salahuddins1

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীও বলছিলেন থিয়েটার ব্যাপারটা ইউরোপীয়। যেহেতু যাত্রাপালায় যাওয়াটা জমিদার-অভিজাতদের সাজে না,ফলে তারা ঘরে ঘরে থিয়েটার বানাইলেন। যে কারণে নাটক বলতে আমরা এখন যা বুঝি তাতে খাঁদ আছে। দুই ধারার গান বা বাদ্যে এই দূষণ ঘটে নাই। এর একটা বড়লোকেদের শাস্ত্রীয় সঙ্গীত আর গরীবদের গান। মধ্যবিত্ত একটা ‘আধুনিক গান’ বানাইতে চাইছে সময় সময়। তা কতটা কী হইছে এ নিয়াও আলাপ চালানো যাইতে পারে। তবে এই শ্রেণী বাকি দুই পক্ষের সঙ্গীতেরও ভোক্তা এবেং ইউরোপ-দূষিত।

bengal-foundation_2

বেঙ্গল ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক ফেস্টিভ্যাল ২০১৪, ‘পল্লীকবি’ জসিম উদ্‌দীনকে উৎসর্গ করা হয়েছে।

শাস্ত্রীয় বা ক্ল্যাসিক্যালের ইতিহাস অনেক পুরানা। এ বিষয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটা লেখা আছে। তিনি বলছিলেন,এই রাগ নির্ভর সঙ্গীত মূলত দেবতাদের তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে গাওয়া হয়। দেবতার অনুকম্পা পাওয়ার আশায় শুদ্ধ চিত্তে,পরম ভক্তিতে এই গান গাওয়ার রেওয়াজ আছে।
ঢাকার বেঙ্গল ব্যাপারটারে যেমন এজমালি করে ফেলছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এতে অশুদ্ধ হয়। আমজাদ আলি খান ঢাকা ট্রিবিউনরে দেয়া এক ইন্টারভিউতে বিষয়টা বলছিলেন যে, বেঙ্গল পণ্ডিতদের পারদর্শীতার একটা ঝলক দর্শকদের দেখাইতে চাইছে। তবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মূল উদ্দেশ্য কিন্তু আরাধনা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাজায়ে বা গেয়ে যাওয়া। আলাপ থেকে বিস্তার তারপর আরো নানা স্তর পেরিয়ে দেবতার সান্নিধ্য মেলে। অনেকে এখন মেডিটেশনেও এই সঙ্গীত কাজে লাগায়।

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আদি রূপ পাওয়া যায় ‘দেবদাসী’ রীতিতে। কুমারী নারীকে মন্দিরে রেখে দেয়া হয় দেবতাকে তুষ্ট করার আশায়। দেবতার সামনে সে নাচে,গায়,সাধনা করে। জবাই না করে বলি দেয়ার এই ধর্ম পালন করত মূলত জমিদারেরা,যারা মন্দিরের মালিক ছিল। এতে তার পূণ্য হইত। ধীরে ধীরে এই রীতি ভাঙতে থাকে। রাগনির্ভর সঙ্গীত এরপর আশ্রয় নেয় জমিদারদের নাচমহলে।

বিভিন্ন সময়ে উপনিবেশে আসা শাসকদের এই ‘ভারতীয় সুধা’য় মনোরঞ্জন করা হইত। তখনকার ভারত আর এখনকার ইন্ডিয়া কিন্তু এই ব্র্যান্ড ব্যবহার জারি রেখেছে। ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক তাদের সম্পদ,ঐতিহ্য,পরিচিতি।

বাংলাদেশের সেই পরিচিতি নাই। যে কারণে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতরে অভিন্ন ভারত বাসনার আকাঙ্ক্ষা বলা যায়। এই সূক্ষ রাজনৈতিক চনায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দুধ নষ্ট করাটা হয়ত আনসাইকোলজিক্যাল হয়। শুদ্ধ মনে সঙ্গীত শ্রবণের কালে কেউ যখন তাল নষ্ট করতে যাবে তখন বিরক্তি জাগাই স্বাভাবিক। বাট,আমাদের একটু সজাগ থাকার দরকার আছে বলেই বলা।

গিরিজা দেবী গান করছেন বেঙ্গলের উৎসবে, ২০১৩

গিরিজা দেবী গান করছেন বেঙ্গলের উৎসবে, ২০১৩

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ইন্ডিয়ার একটা প্রোডাক্ট। যতই বিনা পয়সায় তা মিলুক না কেন। ইন্ডিয়ার বা বড়লোকের প্রোডাক্ট গেলা যাবে না এমন কোনো দিব্যি নাই। কিন্তু নির্মল বিনোদনের মোড়কে এর মালিকানা,শ্রেণীচরিত্র,পরিচিতি আড়াল করা বোকামি।

কেউ অভিন্ন ভারত চায়া সেই আসরে যাইতে পারেন,সেটা তার পলিটিক্যাল অবস্থান। তার তাতে নিজেরে আরও একাত্ম করার সুবিধা ঘটে।

আমাদের দেশে এই ‘অভিন্ন ভারত বাসনা’ তেমন সক্রিয় না। যে কারণে আসরের পাঁচ দিন হাজারে হাজার শ্রোতা রাত জেগে এসব উপভোগ করলেও বছরের বাকি সময় তারা বেশিরভাগেই আর তা শোনেন না। বাউল গান কিন্তু শোনেন। এই দেশে আধুনিক গাইয়েরাও লালনের ফিউশন করে বাজার ধরে রেখেছেন।

আসরের প্রথম সারি, যেখানে সবাই বসতে পায় না

আসরের প্রথম সারি, যেখানে সবাই বসতে পায় না – লেখক

শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ইতিহাসে ব্রাহ্মণপনা থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টায় ছিল। মুসলমানদের যারাও এই সঙ্গীতের শিল্পী ছিলেন তারাও আভিজাত্য বা কৌলিন্য ভাঙতে চাইতেন না। যার যার ঘর তার তার ছিল। এটা বাউল গানেও আছে। কিন্তু বাউলরা যেমন বাহাসের মধ্য দিয়ে গেছেন শাস্ত্রীয়রা এমনি এমনি,রাগের ভিত্তিতে,এলাকার ভিত্তিতে নিজেদের আলাদা রেখেছেন। গুরুর কাছ থেকে শিষ্যের গান শেখা সহজ ছিল না। নিজের গুপ্ত ধন গুরু শিষ্যের হাতে এমনি এমনি ছেড়ে দিতে চাইতেন না। যে কারণে অনেকটা পারিবারিক সম্পত্তির মতো শাস্ত্রীয় সঙ্গীত দেখা যেত পরিবারেই আবদ্ধ আছে। ফকিরদের ঘরানায়ও কম বেশি এমন পারিবারিক দখল বজায় রাখার ঘটনা আছে। তবে শাস্ত্রীয়ের বেলায় কিন্তু এটা চোখে পড়ার মতো। শুদ্ধতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকে এমনটা ঘটতে পারে।

ছোটলোকি রুচির প্রতিও তো এর একটা অবজ্ঞা আছে। সেটা মুখে বলবে না হয়ত, বাট বুঝা যাবে। আচরণে, রেওয়াজে, তারা কত পবিত্র সেইটা বুঝায়া দিতে চাইবে। ফলে এই সঙ্গীতরে যতটা প্রগতিশীল মনে হয় ততটা সে আসলে না। বরং গোঁড়া অনেক।

এমনিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক অস্থিরতা থিকা রেহাই পাওয়ার উপায় হিসাবে ক্ল্যাসিক্যালের জুড়ি হয়ত অনেকে পান না। যে যা পান বা না-পান, বড়লোকেদের এই আসর অবাণিজ্যিক, অরাজনৈতিক ভাবাটা কি খুব একটা ঠিক কাজ হইল?

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।