page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

সমসাময়িক আড্ডাবাজি

(উপরে বাংলামটরের পরটার দোকানে, ছবি. রেজাউল করিম। )

সেদিন এক লেখকের লগে আড্ডা দিতেছিলাম। পাপড়ি রহমান আর জাকির তালুকদারের তুলনামূলক আলাপ পূর্বসূত্রিতা কিম্বা পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই হাজির হইল আলাপে। বিষয় তাদের উপন্যাস।

আমরা উভয়ে তাদের উপন্যাস পড়েছি এবং একটা মতামত ধারণ করি। সঙ্গী লেখক বলতে চাইলেন পাপড়ির চাইতে জাকিরের উপন্যাস ভালো। আমি নাকচ করলাম। আমি বললাম, জাকির তো উপন্যাস লেখাই শিখল না। আপনের মতো কইরা ভালো না হইলেও জাকিরের চাইতে পাপড়ির উপন্যাস ভালো। তিনি অন্তত চেষ্টা করেন। আর জাকির করে কপি-পেস্ট। উদাহরণ হিসাবে জাকিরের পুরস্কার পাওয়া ‘পিতৃগণ’ নিয়া আলাপ হইতেছিল।

“সঙ্গী লেখক বলতে চাইলেন পাপড়ির চাইতে জাকিরের উপন্যাস ভালো। আমি নাকচ করলাম।” ছবিতে জাকির তালুকদার

“সঙ্গী লেখক বলতে চাইলেন পাপড়ির চাইতে জাকিরের উপন্যাস ভালো। আমি নাকচ করলাম।” ছবিতে জাকির তালুকদার

এসব কথা কইতে কইতে আজিজ থিকা হাঁটতে হাঁটতে সোহরাওয়ার্দি হয়া টিএসসি গেলাম। কী কী সব গণ্ডগোলের কারণে সোহরাওয়ার্দির সব চায়ের দোকান বন্ধ। অন্ধকারে পরিচিত লোকজনেরেও দেখা যায় না। কিন্তু খোশগল্প সাঙ্গ হইতেছিল না দেইখা আমরা টিএসসি গিয়া বসলাম। সেখানে খবর পাইলাম অমি পিয়াল বিডি নিউজে জয়েন করছে, কপি এডিটর হিসাবে। আমি জানতে চাইলাম এত অল্প প্রতিদানে তিনি কতটা সন্তুষ্ট? ইনফরমেশনদাতা জবাব দিতে পারলেন না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার তরে তার অবদান কপি এডিটিং-এ থাইমা থাকবে তাইলে–এই প্রশ্ন ঝুলায়া রাইখা চা-বিড়ি খাইলাম। তারপর হাঁটতে হাঁটতে ব্যাক করলাম। খুব গরমে কোথাও শান্তি পাইতেছিলাম না সেদিন।

ঢাকায় আড্ডার জায়গা কইমা আসতেছে। এমনকি মানুষজনেরাও। একটা সময়ে কাওরান বাজারের চায়ের দোকানে আমাদের আড্ডা হইত। ঢাকায় লাগাতার আড্ডা দেয়ার অভিজ্ঞতা আমার খুব বেশিদিনের না। বছর ছয়েক হবে এর মেয়াদকাল। আড্ডার গণ্ডি মিরপুর থিকা পুরান ঢাকা পর্যন্ত বিস্তৃত।salahuddins1

 

আড্ডায় সাংবাদিক, লেখক, সাহিত্যিক, ফিল্ম মেকার, জনা দুই আর্টিস্ট, ভেগাবন্ড কিছু লোক, গাজা এবং মদপ্রিয় পারসোনালিটিরা হাজির ছিলেন। আরও এমন পরিচিতি দেয়া যায় অথবা যায় না লোকেদের সঙ্গেও আমি চা-বিড়ি, পরটা-ভাজি, চিকেন, বিফ, মাটন এবং নানাবিধ পানীয় সমভিব্যহারে সময় কাটাইছি। পকেটে টাকা এবং দিলে খুশ থাক বা না-থাক আড্ডাবাজি একটা নিয়মিত ব্যাপার হিসাবে এখনও আমার জীবন-যাপনে টিকে আছে। সমাজে প্রশাসনিকভাবে ক্ষমতাধর, রাজনীতিবিদ লোকেদের লগেও খিস্তি-খেউর হয় মাঝে মাঝে। পয়সাওয়ালা কিম্বা অস্ত্রওয়ালা লোকেদের সঙ্গে আমি আড্ডা দিতে পারি না। স্কুলজীবনে আমার কিছু খুব অস্ত্রবাজ আর মারামারিপ্রিয় বন্ধু আছিল। তাদের সঙ্গে সময় কাটানো বিষয়ক আলাপ এখানে একটা জাবর কাটা হিসাবে সাব্যস্ত হবে। চলমান আড্ডায় ঘুরেফিরে তাদের কথা অবশ্য এসেছে। আড্ডা আসলে এমনই, চাকার মতো এর একটা চক্রাকার ব্যাপার আছে।

বারোয়াড়ি আড্ডাই আসলে আমার বেশি দেয়া হইছে। পাঠচক্র মার্কা আড্ডা এভয়েড করছি। ফলে নানা কিছিমের মানুষের লগে মোলাকাত হইছে। এক কথা বার বার বলে এমন লোকের সঙ্গেও আমি আড্ডা দিছি। আবার কথাই বলে না এমন লোকও আড্ডায় নিয়মিত থাকে। শাহবাগ আর হেফাজত আন্দোলনের সময় আড্ডা অপরিহার্য ব্যাপারে পরিণত হইছিল। একটা রিলিফের দাওয়াই আছিল সেটা। সারাদিনের টেনশনের কোনো কূলকিনারা হয়ত হইত কাওরান বাজারের আড্ডায় গেলে। সেই আড্ডায় হাজির ছিলেন বিস্তর লোকে। তাদের সবার নাম এখানে বাতুলতা হবে। গুরুতর ডিসিশান মেক করার একটা ভঙ্গি ছিল সেখানে। হাতি-ঘোড়া মারার চাইতে অধিক বাস্তববাদী ছিল সেই আড্ডা। ফরহাদ মজহার কিম্বা সলিমুল্লাহ খান মারতাম। সেই আড্ডা এখন আর নাই। হুট করে এক বিপ্লবীর ডাকে সেদিন আবার যাওয়া হইছিল। সেটা ছিল আমার এ পর্যন্ত শেষ আড্ডা। একজনের ডাকে আড্ডায় গেলে দেখা হয় অন্যের সঙ্গে।

সাহিত্য, রাজনীতি, ফিল্ম, আর্ট এসবের বাইরেও বিয়া-শাদি, প্রেম, খানা-পিনা, সেক্স, স্বভাব, গীবত–আড্ডার বিষয় হিসাবে লম্বা লিস্টি বানাইলে আমার সঙ্গীরা গোস্বা করতে পারেন কিছু কিছু বাদ গেছে বইলা। ফন্দিবাজ, চোগলখোর পারসোনালিটিরাও আমাদের আড্ডায় নৈতিক বাধা পাইত না। তবে পছন্দ-অপছন্দ থাকত। খায়-খাতির বিনে সামান্য পরিচিত কিম্বা সদ্য পরিচিতের লগেও আড্ডা জমতে নিষেধ নাই। জায়গা পুরান হইলে যে কারুর লগেই আড্ডা থই পায়। একটা ইনসিকিউরিটি ফিলিঙের কারণে নতুন জায়গার আড্ডা অস্বস্তিতে থাকে। জায়গা পুরান হইলে আড্ডার সকলের হয়ত নাম জানাজানিও হয় না। জায়গা আড্ডার জন্য একটা ইম্পর্ট্যান্ট ব্যপার।

কিছু কিছু লোক আছে নিজের কথা বার বার কইতে পছন্দ করেন খুব। আসলে ব্যক্তি যখন খুব একটা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়া না-যান তাইলে তার কথা বার বার শুনতে ভাল্লাগে না। স্টুডিয়াস যারা আছে তাদের আলাপও বিরক্তি উৎপাদক হয়। তারা একটা সহজ বিষয়ে বুইঝা উঠতে পারেন না। অন্যের না-পড়া নিয়া টিটকারিমূলক চিন্তা তাদের মধ্যে কাজ করে। না-পড়াদের চাইতে তাড়া পড়ুয়াদের অধিক গুরুত্ব দেয় আর দিন-দুনিয়ার লগে একটা গোপন সম্পর্ক বজায় রাখে। তাদের ধারণা যে বই যেহেতু পড়ে নাই ওরা তাইলে আমার ঠকবাজি, চালাকি বা বুজরুকি এরা ধরতে পারবে না। অথবা বই বেশি পড়ার কারণে তাদের সকল ছহবত ছহি।

পাঠচক্রমূলক আড্ডাবাজও আছেন। কোনো একটা সুনির্দিষ্ট বিষয় নিয়া আড্ডা দিতে তারা পছন্দ করেন। ‘বাল-ছাল’ আলাপে তাদের খুব আপত্তি। এইটা আমি দেখছি চিন্তা পাঠচক্র কিম্বা কাকের মেম্বারদের মধ্যে। বামপন্থীদের মতো একটা বিপ্লবের বাসনা এদের মনে সুপ্ত থাকে। কিছু একটা করার তাড়না খুব কাজ করে। ফাও আলাপে অংশ নিতে পারে না এমন লোক এদের বাইরে যদিও আছে। ইসলামিস্টদেরও এমন কিছু দোষ আমার অভিজ্ঞতায় ধরা দিছে।

সাংবাদিকদের কাজ হইল কী ঘটছে আইজ, কোথায় গেছিল সে, কোনো এক নেতার আলাপ। শুনতে ভালই লাগে। কাজেরও আছে। কিন্তু এরা অন্য আলাপে থাকে না। আসল কিম্বা আগাম খবরটা এদের কাছ থেকে আড্ডায় গেলে পাওয়া যায়। ফিল্ম মেকারেরা এদেশে মোর ডেমোক্র্যাটিক দেন আর্টিস্ট। আর্টিস্টরা কথা কইতে পারে না মনে হয়। সারাক্ষণ কী আঁকবেন তা নিয়া বোধহয় মগ্ন থাকেন। খুব গম্ভীর প্রজাতির লোক এরা। ফিল্মমেকারের চটুল, মুখরা। ফটোগ্রাফারেরা অলটাইম একটা নাখোশ পরিস্থিতির মধ্যে থাকেন। তারা আর্টিস্ট না জার্নালিস্ট তা আজিও বুঝতে পারেন নাই। কিছু কিছু পরমুখাপেক্ষী বুদ্ধিজীবী আছেন যারা অন্যের সমর্থন বিনে অচল থাকেন। কবিরা আর গল্পকারেরা সব কিছুতে নিজেদের জুড়ে দিতে পারেন। এদের আলুর দোষ প্রবল।

তো সেই কাওরানবাজারে শেষ আড্ডায় সেইরাম এক কবির লগে এ পর্যন্ত আমার শেষ দেখা। কথায় কথায় ফরহাদ মজহারের লোক বইলা সে আমার নিন্দা করল। আড্ডায় আমাদের এই এক কমন পরিচিতি দাঁড়াইছে। কনশাসলি এরে আমি নাকচ করি নাই। পলিটিক্যাল জোট হইতেই পারে, সমস্যা কী। আমি বললাম আপনেও তো মজহারের লোক, তারে নিয়া লেখেন। ফরহাদ ভাইয়ের কবিতা নিয়া সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের স্তূতির প্রসঙ্গও আসল তখন।

“ফরহাদ ভাইয়ের কবিতা নিয়া সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের স্তূতির প্রসঙ্গও আসল তখন।” ছবিতে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

“ফরহাদ ভাইয়ের কবিতা নিয়া সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের স্তূতির প্রসঙ্গও আসল তখন।”
ছবিতে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ

তার মতে ফরহাদ ভাই যেন সুব্রতদারে নিয়া লেখেন সেজন্য সুব্রত দা আগের কোন এক আলোচনা নতুন কইরা জনগণমাঝে হাজির করছেন। এটা একটা কোরামের বিষয়। রাইসুর পরে বলে ফরহাদ ভাই মাসুদ খান আর গোমেজেরে নিয়া লেখবেন। আমি বললাম আপনিও তো মজহারের প্রশংসা কইরা লেখেন বা নিন্দা করেন, তারে নিয়াই তো লেখেন। তারে নিয়া ছাড়া তো লেখার আর কাউরে দেখি না। সুব্রত দা-ও ফরহাদ ভাইরে কবির চাইতে বেশি কিছু কী যেন একটা কইতে চাইলেন, মানে মজহার সুব্রতর মতো নিখাদ কবি না, খাদ আছে–এমন কিছু লেখাটায় কইতে চাইলেন। লেখাটা ভালো কইরা পড়লে একটা ক্রিটিক লেখমু হয়ত।

এমন অনেক ‘হয়ত লেখুম’ প্রকল্প আড্ডায় থাইমা থাকে। খুব কম আছে যে আড্ডার বাইরে তা লেখালেখিতে উইঠা আসে। আড্ডা নিয়া লেখালেখি তাই জরুরি। আড্ডা হইল লেখালেখির এক্সটেনশন। নিয়মিত আড্ডার আলাপগুলা লেইখা রাখলে সমাজের অনেক উপকার হইত বোধ করি। আড্ডা একটা কারখানার মতো বিষয়। এ থিকা অনেক প্রোডাক্ট, বাই-প্রোডাক্ট তৈরি হয়। কিছু কিছু বিষয় হয়তো হারায়েই যায়। অমীমাংসাই আসলে আড্ডার প্রাণ।

লিংক: ফরহাদ মজহারের বই ‘কবিতার বোনের সঙ্গে আবার’ নিয়ে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের আলোচনা >>

 

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।