page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

সাই-ফাই মুভি ‘ইন্টারস্টেলার’-এর গল্প

ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে, প্রাকৃতিক রিসোর্স সংকট এতো তীব্র হয়ে আসে যে, মানবসমাজ আবার কৃষিভিত্তিক ব্যবস্থায় ফিরে যায়। নাসার প্রাক্তন টেস্ট পাইলট কুপারও কৃষক হিসেবে কাজ শুরু করে। শ্বশুর, ছেলে এবং দশ বছরের মেয়ে মার্ফিকে নিয়ে তার পরিবার। মার্ফির মনে হত তার ঘরে ভূতের উপদ্রপ আছে। আর ভূতটা তার সাথে যোগাযোগ করতে চাচ্ছে।

আসলে সেটা ছিল অজানা এক ইন্টেলিজেন্স। যেটা “মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গের” মাধ্যমে সংকেত পাঠানোর চেষ্টা করছিল। ধূলোর ভেতরে পাওয়া এই সংকেত তারা বাইনারি কোর্ডিনেট এর মাধ্যমে বের করে। যার সূত্র ধরে তারা নাসার একটি গোপন প্রকল্পের কথা জানতে পারে। প্রকল্পটির প্রধান ব্যক্তির নাম প্রফেসর ব্র্যান্ড।

ব্র্যান্ড জানান, অজানা কোন বুদ্ধিমত্তা একটা মহাজাগতিক সুরঙ্গের মাধ্যমে মানবজাতিকে রক্ষা করতে চাইছে। তারা মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার সুযোগ হিসেবে, মানুষকে অন্য একটি গ্রহে যাবার প্রস্তাব দিচ্ছে।

মহাজাগতিক ঐ সুরঙ্গের মাধ্যমে নাসা ইতোমধ্যেই মানুষের বসবাসযোগ্য তিনটি গ্রহের সন্ধান পেয়েছে। গার্গেন্টুয়া নামের একটি ব্ল্যাকহোলের অর্বিটালে গ্রহ তিনটি হচ্ছে মিলার, অ্যাডমান্ডস এবং মান। গ্রহ তিনটির নাম নেয়া হয়েছে যারা গ্রহ তিনটিকে সার্ভে করেছেন তাদের নামে। ব্র্যান্ড কুপারের নাসার টেস্ট পাইলট হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতার কারণে এই “লেজারাস মিশনে” তাকে একজন মহাকাশযাত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। ঐ টিমের অন্য সদস্যরা হলেন ব্র্যান্ডের কন্যা বায়োলজিস্ট অ্যামেলিয়া, পদার্থবিদ রোমেলি, ভূগোলবিদ ডয়েল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন দুটি রোবট টারস ও কেস।

কুপারের অ্যান্ডুয়ারেন্স মিশনে যোগদানের সিদ্ধান্ত মার্ফিকে মর্মাহত করে।

অ্যান্ডুয়ারেন্স মহাজাগতিক সুরঙ্গের ভেতর দিয়ে মিলারে অবতরণ করে, কিন্তু অনুসন্ধান টিম লক্ষ্য করে মিলার ব্ল্যাকহোল গার্গেন্টুয়ার খুব কাছে থাকায় সময় সংকোচনের মাত্রা অনেক বেশি। সেখানের এক ঘণ্টা সমান পৃথিবীর সাত বছর। কুপার, অ্যামেলিয়া, ডয়েল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রোবট কেস মিলারে পতিত হয়।

ক্রিস্টোফার নোলান (জন্ম. ১৯৭০, ইংল্যান্ড)

সেখানকার পরিবেশ বসবাসের পক্ষে সুবিধাজনক নয়। গ্রহটা উত্তাল সাগরে ঢাকা। যখন অ্যামেলিয়া মিলারের তথ্য উদ্ধার করার চেষ্টা করছিল, তখন একটা সামুদ্রিক স্রোত ডয়েলের উপর আছড়ে পরে, এবং সে মারা যায়।  মহাকাশযানে ফিরতে ফিরতে, পৃথিবীর হিসাবে ২৩ বছর সময় পার করে ফেলে মিলারে!

সে সময় পৃথিবীতে—বড় মার্ফি নাসার একজন বিজ্ঞানী। সে পদার্থবিদ্যার একটা জটিল সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করতে থাকে। যে সমস্যাটা ব্র্যান্ড বহুদিন ধরে সমাধানের চেষ্টা করছিলেন—একটা বিশাল স্পেস স্টেশন, যা সাধারণ কোন রকেটে বহন করা সম্ভব নয় সেটাকে কীভাবে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এড়িয়ে মহাশূন্যে নিয়ে যাওয়া সম্ভব?

মৃত্যুপথযাত্রী ব্র্যান্ড জানান তিনি সমস্যাটা সমাধান করেছেন। ব্ল্যাকহোলের সিঙ্গুলারিটি থেকে আর কোন তথ্য না এলে তাদের মিশন বাস্তবায়ন সম্ভব না। তার মতে মানবপ্রজাতির পক্ষে পৃথিবী থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।  সমাধান হল “হিউম্যান বম্ব”। পৃথিবীর মানুষের যাত্রা আবার নতুন করে শুরু করতে হবে, পৃথিবীর সব মানুষের জীবনের বিনিময়ে এই প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।  .

এ দিকে মহাকাশযান অ্যান্ডুয়ার্সের জ্বালানি ফুরিয়ে আসছে। তারা যেকোন একটা গ্রহে যেতে পারবে। অ্যামেলিয়া অ্যাডমন্ডস গ্রহে যাবার পক্ষে মত দেয়, তার মতে ওখানে বসতি স্থাপনের সুযোগ বেশি। কিন্তু কুপার আর রোমেলি এর বিপক্ষে মত দেয়। তারা যখন “মানে” অবতরণ করেন তখন তাদের কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে অন্যত্র বসতি স্থাপনের ধারণাটা আসলে একটা ধাপ্পা। মান কুপারকে হত্যা করার চেষ্টা চালায়, কিন্তু মানের নিজের পেতে রাখা বোমা বিস্ফোরণে সে নিজেই আহত হয়। কুপার পালিয়ে অ্যান্ডুয়ার্সে চলে যায়। সেখানে রোমেলি মারা যায়।


Interstellar Final Supercut Trailer HD: All 4 Trailers

স্বল্প জ্বালানি নিয়ে কুপার এবং অ্যামেলিয়া একটা শেষ চেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ব্ল্যাকহোল গার্গেন্টুয়ার চারপাশে তারা অ্যাডমন্ডসের কক্ষপথ অনুসরণ করে ঘুরতে থাকে। টারস এবং কুপার ব্ল্যাকহোল থেকে দূরে থেকে আরো বেশি উপাত্ত সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে।

তারা ভর কমিয়ে ফেলে টিকে থাকার চেষ্টা করে। সিঙ্গুলারিটি সম্পর্কে বেশি তথ্য জানার জন্য টারস এবং কুপার অতিরিক্ত ডাইমেনশনের “টেসার‍্যাক্ট” চালু করে, যেই ডাইমেনশনে সময় স্পেসের বিশেষ অবস্থা হিসেবে প্রকাশিত হয়। ঐ ডাইমেনশন থেকে মার্ফির ছেলেবেলার শোবার ঘরে তথ্য পাঠানো যায় বিভিন্ন সময়।

কুপার বুঝতে পারে অতিরিক্ত ডাইমেনশনের বুদ্ধিমত্তা আসলে ভবিষ্যতের মানুষ, যারা এই স্পেসটা তৈরি করেছিল মূলত মানব প্রজাতিকে বাঁচাবার জন্যেই। মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গের মাধ্যমে টারস এবং কুপার মার্ফির কাছে মোর্স কোডের মাধ্যমে সিঙ্গুলারিটি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ডাটা পাঠাতে থাকে যাতে করে মার্ফি ব্র্যান্ডের বাকি কাজ শেষ করতে পারে।

শেষ দৃশ্যে দেখা যায় মার্ফি মানব জাতিকে পৃথিবী থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়। মৃত্যুপথযাত্রী মার্ফি তার বাবা কুপারকে অনুরোধ করে অ্যামেলিয়াকে উদ্ধার করতে, যে এখনো অ্যাডমন্ডসের গ্রহে আটকা পড়ে আছে, এবং প্ল্যান বি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। (প্ল্যান বি—পপুলেশন বম্ব)

২.
তত্ত্বীয় পদার্থবিদ কিপ থ্রোন এই সিনেমার একজন কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন, যাতে করে ওয়ার্মহোল এবং আপেক্ষিকতার যে ধারণা নিয়ে সিনেমাটি কাজ করেছে তা যথাসম্ভব নিখুঁত হয়। তিনি জানান ছবিটিতে ওয়ার্মহোলস এবং ব্ল্যাকহোলের চিত্রায়নে তারা আলোচনা করে নিয়েছিলেন কীভাবে এটা ঠিক মত উপস্থাপন করা যায়। এর জন্য তারা আলাদা আলোক রশ্মি ব্যবহার করেছিলেন, যেটা আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটির সমীকরণ থেকে নেয়া হয়েছিল।

ওয়ার্মহোল এবং বিশাল ভরের ঘূর্ণায়মান ব্ল্যাকহোল ভর ও শক্তিবলয় তৈরি করে। ডক্টর থ্রোন ভিজুয়াল এফেক্ট সুপারভাইজার পল ফ্রাঙ্কলিন ত্রিশজন কম্পিউটার আর্টিস্টের একটা টিম নিয়ে এটা চিত্রায়নের চেষ্টা করেন।

থ্রোনের দেয়া সমীকরণগুলোকে সিজিআই উপস্থাপনের সফটওয়্যার বানাতে ব্যবহার করেন কম্পিউটার আর্টিস্টরা। যার ফলে ঘূর্ণায়মান ব্ল্যাকহোলের কারণে মাধ্যাকর্ষন লেন্সিং-এর ব্যাপারটাকে নিখুঁত উপস্থাপন সম্ভব হয়। কিছু কিছু ফ্রেম প্রায় ১০০ ঘণ্টা সময় নিয়েছে, এবং ৮০০ টেরাবাইটের ডাটা স্পেস নিয়েছে। ডক্টর থ্রোন এই গোটা কাজটা করতে গিয়ে দুটি সায়েন্টিফিক পেপার তৈরি করেছেন। যার একটা মহাকাশ বিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট, অন্যটা কম্পিউটার গ্রাফিক্সের উপর।

পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলান প্রথমদিকে তাত্ত্বিকভাবে নিখুঁত ব্ল্যাকহোলের ব্যাপারে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি ভেবেছিলেন এটা একজন দর্শকের বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়, তাই তিনি চাইছিলেন অন্য কোন ভাবে এটাকে উপস্থাপন করতে। পরে কাজ শেষ হবার পর নোলান এটা নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন, তার মনে হয়েছিল এটা ক্যামেরা বাস্তবতার সাথেও যথেষ্ট সঙ্গতিপূর্ণ।

Like shamprotik on Facebook

স্বাভাবিকভাবে ব্ল্যাকহোল থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়, তত্ত্বীয় ভাবে পাঁচ মাত্রার মহাবিশ্ব ধারণায় এটা সম্ভব, সেটাই উপস্থাপন করা হয়েছে।

ওয়ার্মহোলের চিত্রায়ণ নিখুঁত হয়েছে। দ্বিমাত্রিক কোন গহ্বর না দেখিয়ে এটাকে আলোকোজ্জ্বল গোলক হিসেবে দেখানো হয়েছে।

কুপারের অতীতের সাথে যোগাযোগের একমাত্র উপায় ছিল গ্র্যাভিটেশনাল তরঙ্গ। যেটা তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞানের স্পেসটাইম ধারণার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

একবারই শুরুতে থ্রোন কিছু গাইডলাইন দিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে করে ফিজিক্সের প্রতিষ্ঠিত সত্যের কোনরকম হেরফের না ঘটে। সুতরাং এ ছবিতে কল্পনার উৎস আসলে বিজ্ঞান, স্ক্রিন রাইটারের নিজস্ব কল্পনাজগৎ থেকে উৎসারিত কিছু নয়। তবে তারা যে গ্রহগুলোর চিত্রায়ণ করেছেন সেখানে শিল্প কল্পনার চূড়ান্ত প্রয়োগ ঘটেছে।

About Author

সাম্প্রতিক ডেস্ক
সাম্প্রতিক ডেস্ক