page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

সুশীল তোমরা দুর্নীতি বুঝলা, মানুষ বুঝলা না

shuvra cover janu15

আমাদের সমাজের সুশীলরা খুব দুর্নীতির কথা বলেন। চোর কে চোর, ভাল কে ভাল বলার যে বাল্যশিক্ষা ওনারা রপ্ত করেছিলেন জীবনের কোনো সময়, সেটা জারি রাখেন, বারে বারে আওড়ান, সেসব করে-কেটে খান। দেশের অবস্থা যত খারাপ হোক, ওনারা ভাল থাকেন, জেল হয় না, জরিমানা হয় না। টাকার বিপরীতে সম্মান তাদের পুঁজি।

এই সম্মান নিয়েও যে দুর্নীতি হয়, তাদের বিদ্যা-শিক্ষায় যেন সেসব লেখা নাই।

তাদের সমালোচনা করার মতো প্রতিষ্ঠান সমাজে খুঁজে পাওয়া দুস্কর। যদি না পাওয়ারের কাছাকাছি বা পাওয়ারে থাকা যায়। অল্টারনেটিভ মিডিয়ায় যে কারণে তরুণদের খুব ভিড় থাকে। পাওয়ারি লোকেদের খোঁটা শোনার পরেও সুশীলরা মুখ বেজার করার সুযোগ পান, তাদের রিপ্লাইয়ের জায়গা থাকে। এতটুকু হলেও থাকে। সমাজের বাদবাকি বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়ত যে অপমান, গঞ্জনা, মিথ্যাচারের তলায় অবদমিত তাদের বলার এতটুকু জায়গা কোথাও নাই।

salahuddins1

বলা বাহুল্য সুশীলরা সেটা রাখেন নাই। তারা যেসব গণমাধ্যম নামের প্রতিষ্ঠানে লেখেন সেসব জায়গা তাদের কব্জাধীন। গরীবদের কথা বাদ দেয়া যাক, উচ্চশিক্ষিত তরুণরা সামান্য ভিন্নমত পোষণ করলে, তাদের লেখা আর ছাপানোর যোগ্য থাকে না।

অপ্রমিত গ্রহণযোগ্য না এসব প্রতিষ্ঠানে। সেটা হাসান ফেরদৌস স্বীকার করবেন না। যে কারণে বিএনপি প্রধানের পরিবারের একজন সন্তানের জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতির কারণ তার ‘মাথায় আসে না।’ বরং উপস্থিতদের তিনি হেয় করতে চান, ‘আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাতি’ না, এই বলে।

একজন মুসলমান মরলে তার জানাজা পড়ানোর নিয়ম আছে। তিনি দুর্বৃত্ত হলেও দাফন এবং জানাজা পড়াতে হয়। আল্লায় বিশ্বাস যার থাকবে, ইসলামি কায়দায় তার জানাজা পড়ানো হবে। সেখানে জাগতিক আদালতের রায়ে জানাজা বাতিলযোগ্য হবে না। আর জানাজাই যদি হলো তো লোকসংখ্যার উপস্থিতি নিয়ে মাথাব্যথা কেন?

মানে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে, রাজনৈতিক পরিবারের গ্ল্যামার বাড়াতে পাবলিককে পার্টিসিপেশনে বাধা দিচ্ছেন। আবার সেটাও একটা ধর্মের নামে। এর নাম যদি দেয়া যায় সেক্যুলার ধর্ম তো ভালো হয়। নিজের অভিসন্ধি তিনি আড়াল করছেন ‘দুর্নীতির বিচার’ নামে, ‘আত্মমর্যাদা নাই’ এসব নামে। আদালত তার এই আচরণকে দুর্নীতি সাব্যস্ত করবে না। যিনি যত ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলতে পারবেন তিনি তত সুশীল, হোক আদালতের কিম্বা রাজনৈতিক দলের, চোরের, ফকিরের।

এখানে হাসান ফেরদৌসের চিন্তাভাবনা একজন প্রিমেটিভ মডার্নিস্টের মত। বিলাতি বুদ্ধিজীবী হ্যারল্ড লাস্কি যে লিবারালিজমের আলাপ করেছিলেন তিরিশের দশকে, তাদের চাইতেও এনারা পিছায়ে আছেন। অথচ এতদিনে টেমসের জল গড়িয়েও ক্ষান্তি দেয় নি, বাংলার বুড়িগঙ্গাও হেঁদে-পঁচে গেছে। দেশী সুশীলরা তার পাড়ে এক ‘নিউ চার্চ’ গড়ে তুলেছেন। তাদের ‘নভেলটি’ কেবল আচরণে না—ভাষায়, পোশাকে, সাহিত্যে আরোপ করেছেন। তাদের চার্চে গিয়ে ব্যাপটাইজ না-হলে গোত্রভুক্ত হওয়া যায় না।

লাস্কি ইউরোপীয় লিবারালিজমের চরিত্র বিচার করেছিলেন যেই বলে যে, সেখানে মানুষের উৎপাদনমুখী এক নতুন সম্পর্ক তৈরির কথা বলা হয়েছে। কর্তা-সত্ত্বার পরিবর্তন ঘটবে, গুড গভর্ন্যান্স গড়ে উঠবে, সে-ই হবে প্রতিপালক। হাসান ফেরদৌস সেসব মাথায় নিয়ে আজো বসে আছেন এই বিচিত্র দুনিয়ায়।

আমাদের দেশে মানুষে-মানুষে পুঁজি বা প্রশাসনিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে নাই, এখানে এক গায়েবি কর্তাসত্ত্বা জিন্দা আছেন, সামাজিকতা আছে, এটাকে কে দুর্নীতি করল, কে করল না দিয়ে বোঝা যায় না। শেখ হাসিনার জন্য খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের গেট খুলে না-দেয়ায় একদিকে অসামাজিক আচরণ নিয়ে ঢি ঢি পড়ে গেল। আবার যখন আরাফাত রহমান কোকোর জানাজায় মানুষ গেল তখন সেই সামাজিকতাকে নিন্দা করা হল ‘দুর্নীতিকে আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি আবশ্যকীয় অনুষঙ্গ হিসেবে মেনে নিয়েছি’ বলে। কত বেসামাল থিওরি করেন আমাদের সুশীলেরা।

হাসান ফেরদৌসরা এই দেশে একটা ‘নিউ সামন্তবাদ’ গড়ে তুলেছেন। বিলাতি রাজার আজ্ঞা তারা বহন তো করেনই, তবে সেটা বুঝে আবার না-বুঝেও করেন। ওনার ‘কোকো কাহিনী‘ লেখা একদেশদর্শী যে কারণে। উনি দুর্নীতিবাজ কোকোর জানাজারে অপবিত্র বলতে চাইছেন। মানে মামলাখোর মানুষের এই জানাজা তো না-জায়েজ। নিও চার্চ এমন অনেক ধর্ম আরোপ করে।

হাসান ফেরদৌস

হাসান ফেরদৌস

একটু খেয়াল করলে বুঝবেন, লেখায় তিনি অনেকবার খালেদা জিয়াকে ‘মা’ বলে উল্লেখ করছেন। মানে মা-ছেলের যে পবিত্র সম্পর্ক সেটাও তো এখানে খেলাপ হয়ে গেল। কী প্রগতিশীলতা! মা না বললেও কিন্তু লেখায় উনি যা বলতে চান তা বোঝাতে তেমন সমস্যা হতো না। ওনার যুক্তিতে বিএনপি দুর্নীতিপ্রবণ দল, সেখানে কোকো ছেলে না-হলেও তো এসব অপকর্ম করতে পারতেন স্রেফ বিএনপি বলে। তাহলে কেন হাসান বারে বারে ‘মা’ ‘মা’ করলেন?

ওনাদের এই পবিত্রতা-প্রধান ধর্ম যেভাবে সামন্তবাদ বহাল রেখেছে আধুনিক বাংলাদেশে এগুলো তার নজির মাত্র। ওনারা প্রবীণদের পর ইয়ংদের মর্যাদা দেন। বেয়াদপি বরদাস্ত করেন না। হাসান যেমন এখানে বারে বারে বলেছেন—বাংলাদেশ বা ক্রিকেটবোর্ড, মানে এগুলো সব প্রতিষ্ঠান। সেখানে কোকো একজন ব্যক্তি।

সুশীলদের এরকম ধর্ম আছে, রাষ্ট্রকে অস্বীকার না-করার, গোটা প্রতিষ্ঠানকে নাকচ না-করার।

ওনারা শুধু খারাপকে বিতাড়ন করবেন। খারাপকে ভালদের থেকে বাছাই করবেন। এটা ওনাদের ধর্ম।

নইলে যে এনার্কি হয়ে যাবে। যে কারণে উনি এত কিছুর মধ্য থেকে কোকোর খারাপিটা তুলে আনতে পারলেন। প্রতিষ্ঠানের দোষ দেখতে পেলেন না। যে জন্য তাকে বারে বারে ‘মা’ বলতে হল? তার এই ধর্ম কোন পাপ থেকে মুক্তি চায়? “আমরা ধরেই নিয়েছি, যাঁরা ক্ষমতায় বসেন, তাঁরা ও তাঁদের বশংবদেরা ইচ্ছেমতো গৌরী সেনের মাল পকেটে ঢালবেন, আমরা দেশের মানুষ স্মিত হেসে তা দেখেও না দেখার ভান করব।”

মানে তিনি চোখ ফোটাতে চান সকলের, আলোকময়তা চান, মসজিদে মসজিদে সৎ লোকেদের জানাজায় মানুষের উপস্থিতিতে তার তখন আক্ষেপ থাকবে না আর। একেই বলে সভ্যতা?

এখন ধরেন, কোকোর জানাজায় অল্পসংখ্যক মানুষ থাকলে হাসান ফেরদৌস কি এই লেখা লিখতেন? মনে হয় না। বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি তার ‘সততার ধর্ম’কে শংকায় ফেলে দিয়েছে। একজন প্রিচারের মতো ফলে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে বয়ান দিতে নেমে গেলেন। ‘দুর্নীতি করো না’ নামের একটা ডিম কত সাবধানে এই দেশের সুশীলরা যে তাঁ দিয়েই যাচ্ছেন, তা থেকে কিছু বেরুচ্ছে না, বরং দুর্নীতিবাজের জানাজায় মানুষে মানুষে সয়লাব!

সামাজিক বিচারে আমাদের সুশীলদের অভ্যাস নাই। কারণ তারা ‘পশ’ লোক। গ্রাম ছেড়ে আসছেন সেই কবে। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ফাইট করতে করতে তারা আজ সুশীল। বিদ্যাশিক্ষা করেছেন খুব কষ্টে। যৌবনে ছিলেন বাম। এখন ভালোয় থাকেন, ভাল বলেন। আধুনিকতা রেওয়াজ করেন।

তারা কোনোদিন কফিন নিয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটবেন না। তাদের সঙ্গে দেশের মানুষের রুটি-রুজি বাঁধা না। বাঁধা কিছু প্রতিষ্ঠানের। কেউ কেউ দেশের বাইরে থাকেন। মাঝে মাঝে দেশে এসে প্রেম দেখান। সব পত্রিকায় এরা লিখবেন না। সবার সঙ্গে কথা বলবেন না। সব পাতে খাবেন না। তাদের কথা থোড়াই কেয়ার করবে সরকার। তবু তারাই তো সুশীল আমাদের দেশে? তাইলে, কোকোর সঙ্গে যাদের পেট বাঁধা তাদের জানাজায় যাওয়া নিয়ে আপত্তি কেন?

এতটা পুঁজিবাদীও কি হতে পারলেন না হাসান ফেরদৌসরা? বরং তারা কিছু হাস্যকর মার্ক্সিস্ট রয়ে গেলেন কেন যে আজও?

ওনাদের আসলে গ্যাপটা কোথায়? সেটা ডিপলিটিসাইজেশনে। খালেদা জিয়া এবং তার দলকে এখনকার সরকার যে চাপের মধ্যে রেখেছেন, তার নীরব প্রতিবাদ এই জানাজা। এই রাজনীতি হারিয়ে ফেলা দুর্নীতির চাইতে বড় পাপ।

এটা হাসানেরা বুঝবেন না। তারা বিলাতি কেতায় অভ্যস্ত। এক চোখ বন্ধ রাখেন। তারা ভাবেন বিএনপি মানে কেবল বিএনপি, এদের সঙ্গে এই দেশের ‘সাধারণ’ মানুষের যোগ নাই। অবশ্য এই ভাষায় তাদের কথা বলতেই হবে, নইলে সুশীলতা করবেন কাদের নিয়ে, কাদের সঙ্গে?

বিলাতি মেজাজ এই বাংলায় আরোপ করতে গেলে যে মুশকিল, সেটাও বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী—হাসান ফেরদৌসরা নিজেদের এসব থেকে কত উচ্চতায় কল্পনা করতে পারেন, হাসের পালকের মতো অঝোর বৃষ্টিতেও অসিক্ত থাকেন কীভাবে যে তারা, দারুণ সুশীলপনা রপ্ত না করতে পারলে কিন্তু এটা সম্ভব হতো না।

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।