page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

সেই ঢাকা

murad hai1

২৫ বছর আগের ঢাকা। আংশিক রঙিন হলেও বেশির ভাগই সাদাকালো ছিল। বিশেষ করে ২৫ বছর-এর কথা বলছি এই জন্য যে তারপর আমি পরবাসী হয়ে গেলাম।

পরবাসী হবার আগে সাদাকালো ঢাকা যে কী সুন্দর ছিল, দিনগুলি যে কত মধুর ছিল, মনে করে এখনো জাবর কাটি। ক্যাম্পাস ছেড়ে দিলেও ক্যাম্পাসের মায়া হৃদয়-মন জুড়েই রয়ে গেছে। টিএসসি ছেড়ে তখন শাহবাগের সিনোরিটা, কোহিনুর আর পিজি হসপিটালের পিছনে বসে আড্ডা মারি। কিন্তু চান্স পেলেই টিএসসিতে চলে যাই।

murad hai logo

২ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করি। ১ হাজার টাকা বাসা শেয়ার করার জন্য বোনকে ভাড়া দেই। বাকি ১ হাজার টাকা সপ্তাহ শেষ হবার আগেই খতম হয়ে যেত।

১ হাজার টাকায় রিক্সা ভাড়া, লাঞ্চ খাওয়া, সিগারেট খাওয়া, বিকেলে শাহবাগের আড্ডার খরচ কুলাত না। কোনোই সমস্যা ছিল না। অফিসের ক্যাশে স্লিপ দিয়ে যা দরকার হতো নিয়ে নিতাম। বেতন পেয়ে পুরনো স্লিপ অ্যাডজাস্ট করে আবার নতুন করে স্লিপ লেখা হত। ম্যানেজার ভ্রু কুচকাতো, কিন্তু কাজ ভালো করতাম তাই কিছু বলত না।

মগবাজার থেকে শাহবাগের রিক্সা ভাড়া ছিল দুই টাকা। কোহিনুরে যেতাম ক্যাম্পাসে থাকতেই। ওইটার মালিক পুরান ঢাকার ছেলে হাশেম ভাই ছিল দরাজ দিলের মানুষ। আমরা গেলে খুব খুশি হত। পয়সা না থাকলেও সমস্যা হত না, বাকির খাতা ছিল। কোহিনুরের কলিজার সিঙ্গারা তখন খুব বিখ্যাত ছিল। ১ টাকা করে দাম নিত, সাথে তেতুলেব্র চাটনি। শুধু ওই সিঙ্গারার লোভেই যেতাম ওখানে। কিন্তু জায়গাটা খুব ছোট, বেশিক্ষণ বসে আড্ডা দিলে বেচারার ক্ষতি হয়ে যায়, তাই আমরা ওখানে লম্বা আড্ডা না দিয়ে সিনোরিটাতে চলে যেতাম।

hallget

হল গেটে, ১৯৮১

সিনোরিটাতে বাইরে বসার ব্যবস্থা ছিল। সিনোরিটায় এক প্লেট গরু মাংস ভুনা, দুইটা পরোটা আর একটা ঠাণ্ডা স্প্রাইট লবণ দিয়ে খেতাম দশ টাকায়।

আমার প্রতিদিনের সঙ্গী ছিল প্রিয় বন্ধু সোহেল। মহাখালীর আইসিডিডিআরবি থেকে অফিস শেষ করে মগবাজারে আমার অফিসে আসত। তারপর শাহবাগে লম্বা আড্ডা দিয়ে মাঝরাতে রিক্সায় চড়ে মোহাম্মদপুরে আমাকে জাকির হোসেন রোডে নামিয়ে সোহেল তার ইকবাল রোডের বাসায় যেত। সোহেল তার পাড়ায় বিহারী ক্যাম্পের পাশে দারুণ এক কাবাবের দোকান আবিষ্কার করল। দুই টাকায় এক প্লেট গরুর শিক কাবাব, একটা নান রুটি আর পুদিনা পাতার চাটনি। বিহারীদের ছাপড়ার হোটেলে এই কাবাব ছিল আমাদের অনেক প্রিয় খাবার।

বাংলা মোটর থেকে ফার্মগেটের দিকে গেলে এখন যেখানে হোটেল সোনারগাও, ঠিক তার উল্টা দিকে জায়গাটা ছিল একেবারে ঢালু। ওখানে ছিল ঢাকার সবচেয়ে বিখ্যাত কাবাবের দোকান দারুল কাবাব।

এখনকার মত সেই দিনগুলিতে মানুষ ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাবে যেত না। ঢাকা ক্লাব ছিল শুধুই লিমিটেড আপস্কেইল শ্রেণীর মেম্বারদের জন্য। কিন্তু দারুল কাবাবে যেত সব অভিজাত, মিডল ক্লাস, সেলিব্রিটি মানুষেরা।

রাস্তার ঢালে নিজেদের গাড়ি পার্ক করে সবাই ওখানে খেতে যেত। ঢালের এখানে-সেখানে কাঠের চেয়ার-টেবিল পাতা থাকত। আমরা ওখানে শুধুই খেতে যেতাম না। যেতাম সুন্দর গাড়ি দেখার জন্য। সিনেমার নায়কদের দেখার জন্য। ঢাকা শহরের বড় বড় রথী-মহারথীরা সন্ধ্যার পর ওখানেই জমা হতো।

উজ্জ্বল, ফারুক, জাফর ইকবাল রেগুলার ছিল ওখানে। কাছেই ছিল শ্যালে বার। ওখান থেকে নিয়ে আসত যার যার পছন্দের ড্রিঙ্কস। আমরা গন্ধ শুঁকেই বুঝতাম কে হুইস্কি খাচ্ছে, কে বিয়ার খাচ্ছে।

ভার্সিটির বড় ভাইদের দেখতাম সবাই বিভিন্ন দল করলেও সন্ধ্যার পর ওখানে আড্ডা দিচ্ছে একসাথে। আমাদের দেখে ফেললে হাত উঠিয়ে কথা বলত। আমরা সিগারেট লুকাতে গেলে বলত, “আর লুকাইয়ো না, খাও খাও, তোমরাও বড় হইছো।” আজকের মত এত বিমাতাসুলভ আচরণ ছিল না।

অভিজাত বাঙালি খাবারের রেস্টুরেন্ট বলতে ছিল কালী মন্দিরের কাছে ‘স্টার’ হোটেল। আমার কলেজের সহপাঠী দুলালদের পারিবারিক ব্যবসা। মমতাজ ব্রেড আর স্টার হোটেল। খুব ভাল বিরিয়ানি খেতে চাইলে আমরা স্টারে যেতাম। কিন্তু দীর্ঘদিনের বন্ধু হলেও আমরা জানতেই পারি নাই ওটা দুলালদের হোটেল, হাতেনাতে ধরা না পড়া পর্যন্ত। সেই সাদাকালো দিনগুলিতে আমাদের বন্ধুরা কেউ কাউকে শো অফ করত না।

মনে আছে সাদা সার্ট সাদা বেলবটম প্যান্ট পরা পুরান ঢাকার ছেলে দুলাল এত সাধারণভাবে চলত বন্ধুদের সাথে কেউ বুঝতেই পারত না দুলাল অনেক অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলে। একদিন কেউ দেখে ফেলল বাংলা একাডেমির কাছে দুলাল একটা বড় মিতসুবিসি গাড়ি থেকে নেমে রিক্সা নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকছে। সবাই ধরে বসলো, “কীরে, তুই গাড়ি করে এসে আবার রিকশা নিলি কেন, ঘটনা কী?” কাচুমাচু করে বলে, “দোস্ত, লজ্জা লাগে গাড়ি নিয়ে ক্যাম্পাসে আসতে।”

২.
আমার আগেই হলের কয়েক বন্ধু আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছে। প্রায়ই অফিসে ফোন করে বলে, ধুর, কী চাকরি করছ বেটা, চলে আয় এখানে, অনেক মজা।

ভূত চেপে গেল বিদেশ যাওয়ার। কিন্তু আমাকে ভিসা দিবে নাকি, আজব! এক বন্ধু বুদ্ধি দিল, কী কী করতে হবে।

অফিসে নিজের পজিশন নবিশ অফিসার। কিন্তু কার্ড ছাপালাম ‘ম্যানেজার’ হয়ে। ক্লায়েন্টদের বলে ওদের টাকা নিজের একাউন্টে ট্রান্সফার করে ভাল ব্যালেন্সের ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বিদেশ থেকে পাঠানো বন্ধুর বেড়াতে যাবার নিমন্ত্রণ চিঠি আর নিজের অফিসের ছুটির চিঠি নিয়ে চলে গেলাম একদিন বারিধারার আমেরিকার অ্যামবেসিতে।

ম্যানেজারকে বলে গেছিলাম আসল ঘটনা। রিকোয়েস্ট করেছিলাম, “স্যার, আপনি আমি না আসা পর্যন্ত অফিসে থাইকেন, ওরা ফোন করলে বইলেন আমি ম্যানেজার।” ভদ্রলোক চোখ বড় করে তাকিয়ে দেখল আমাকে। তারপর বলে, “আচ্ছা যাও, গুডলাক।”

স্বপ্নেও ভাবি নাই কাজ হবে। কিন্তু মিরাকুলাসলি ভিসা পেয়ে গেলাম। অফিস থেকে ছয় মাসের ছুটি নিলাম। বড়ভাই, বন্ধু আর বন্ধুর মা’র কাছ থেকে টাকা ধার করে টিকেট কাটলাম। অ্যামবেসি থেকে অফিসে এসে কাজ করে আমি আর সোহেল যথারীতি শাহবাগের আড্ডায় হাজির হলাম। বন্ধুরা সেলিব্রেট করল। রাত বারোটায় বাসায় রওয়ানা দিলাম আমি আর সোহেল।

বই পড়ছেন লেখক, ১৯৮৩

লেখক, ১৯৮৩

সেদিন রিক্সা না নিয়ে একটা বেবি টেক্সি নিলাম। সাথে ভিসাসহ পাসপোর্ট, টিকেট, ট্রাভেলার্স চেক আছে ব্যাগের ভিতর। বেবিটেক্সি মিরপুর রোড ধরে তুফান বেগে ছুটে লালমাটিয়ার আড়ং-এর পাশে ফায়ার ব্রিগেডের কাছে রেড সিগনালে দাঁড়াল। হঠাৎ এক লোক হাত তুলে বেবিওয়ালাকে সাইড করতে বলল, নিজেকে পুলিশের পরিচয় দিয়ে। বেবির ড্রাইভার সাইডে গেল। পাশে একটা নতুন বিল্ডিং হচ্ছে, রাতের বেলায় কোন আলো নাই। লোকটা আমাদের নামতে বলল। আমরাও পুলিশ মনে করে অন্য কিছু না ভেবে নেমে এলাম। তারপর বলে, “আপনারা দুইজন আমার সাথে আসেন। আপনাদের সার্চ করতে হবে।”

এই বলে সেই অন্ধকার বিল্ডিংয়ের দিকে হাঁটা শুরু করল। আমরাও বোকার মত লোকটার পিছু পিছু রওনা দিলাম। প্রায় বিল্ডিংয়ের কাছে চলে গেছি, এমন সময় অন্য আরেক লোক এগিয়ে এসে পুলিশ লোকটাকে বলল, “এই বেটা, তুই এদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস?” তারপর আমার দিকে ফিরে বলে, “আপনার কি মাথা খারাপ নাকি? আপনি এই নেশাখোরের সাথে কই যাইতেছেন? সব খোয়াবেন তো!”

এই কথা শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। দ্বিতীয় লোকটার দিকে তাকিয়ে দেখি চেহারাটা চেনা লাগছে। লোকটা বলে, “আমাকে চিনেন নাই? আমি আপনাদের বাসার উল্টাদিকের বিল্ডিংয়ে থাকি।” ওই লোকটা সম্পর্কে সাবধান করলো। সে নাকি নিজেকে পুলিশ পরিচয় দিয়ে অনেকের সর্বনাশ করেছে।

ক্যাম্পাসের সাহসী ছেলে সেদিন একেবারে বোকা হয়ে গিয়ে বিদেশ যাবার চাবিকাঠি হাতের মুঠোয় পেয়েও হারাতে বসেছিলাম সামান্য ভুলের জন্য। সাথে থাকা বন্ধু সোহেল আমার দেখা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ভদ্রলোক। সেও কিছুই বুঝতে পারে নাই। কিন্তু সেদিন বেঁচে গিয়েছিলাম হাইজ্যাকারের হাত থেকে। ভাগ্যিস তখনকার হাইজ্যাকাররা এখনকার মত ছুরি মারা, চোখে মলম লাগিয়ে কাবু করে ফেলা এসব করত না।

পরের সপ্তাহে আমি উড়াল দিলাম।

১৭/১২/২০১৪

About Author

মুরাদ হাই
মুরাদ হাই

জন্ম হাতিয়ায়। ১৯৬০ সালের ৯ অক্টোবর। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। পড়তেন মার্কেটিং বিভাগে। থাকতেন সূর্যসেন হলে। ১৯৮৯ সালে পাড়ি জমান নিউইয়র্কে। সে অবধি সেখানেই আছেন। দুই ছেলে রেশাদ ও রায়ান ছাত্র, স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা স্কুলের শিক্ষিকা।