page contents
সমকালীন বিশ্ব, শিল্প-সংস্কৃতি ও লাইফস্টাইল
ব্লগ

‘সেক্স’ এর বাংলা কী হইতে পারে

আমাদের এখানে দেখি লোকে ইংরেজি ‘সেক্স’ এর বাংলা করে ‘যৌন’ বা ‘যৌনতা’। কিন্তু এ দিয়ে তো কিছু বোঝা গেল না, ‘যৌন’ কী? ‘যৌনতা’ কী? কাকে বা কীসেকে আমরা এসব শব্দ দিয়ে বুঝব বা চিনব? কারণ আমরা যখন বলতে শুনি ‘সেক্স উঠেছে’, এর অর্থ কি আমরা এমনটা করব যে যৌনতা উঠেছে? মনে হয় না। আমার কাছে যৌন বা যৌনতা সেক্স-এর মতোই ভিনদেশী ঠেকে।

আবার কোথাও কোথাও দেখলাম এটা লিঙ্গ অর্থও ধারণ করে। বিদ্যায়তনে এমনভাবে সেক্স পড়ানো হয় বলে শুনেছি। আমি কখনো ‘সেক্স’ পড়ি নাই। ফলে ভালো বলতে পারব না। কিন্তু বাংলায় একে আমরা কীভাবে অনুবাদ করব সে নিয়ে মুশকিল তৈরি হয়ে গেছে। মুশকিলের কথাগুলি তাহলে আগে সেরে ফেলি।

salahuddins1

দিন কয়েক আগে সাংবাদিক-লেখক ফারুক ওয়াসিফ একটা লেখায় আড়ঙের ছবিতে ‘যৌনতা’র উপস্থিতি টের করেছেন। অন্যান্য কিছু বিজ্ঞাপন নিয়েও তিনি একটা গড় সমালোচনা হাজির করেছেন আমাদের সামনে। তার লেখায় আমাদের বিজ্ঞাপনে যৌনতার উপস্থিতি এবং যৌনতা শব্দের ব্যাখ্যাও পাওয়া যাবে কিছু কিছু। তার রাজনৈতিক অভিমুখ বিষয়ে যদিও আমি এখানে তেমন কিছু বলব না। আমি বরং তার এই ‘সেক্স’কে অনুবাদের যে চেষ্টা তাতে সীমিত থাকার চেষ্টা করব। তার আগে ওনার লেখার একটা অংশ পড়া যাক।

“বাংলাদেশের অ্যাড ফার্মগুলোর মনে হয় আরস ইরটিকার ধারণা নাই। যৌনতা তাদের বস্তু সহযোগে পরিবেশন করতে হয়। ঘরভর্তি পানিতে নৌকায় সিক্ত জিরো ফিগারের নারীর জলকেলিময় বাসরের অপেক্ষা, শুভ্র তাগা পরিহিত দুই কিশোরীর দিকে একটি পুরুষ বকের দীর্ঘ শক্ত চঞ্চু নারী দুজনের মধ্যাঙ্গের দিকে বাড়িয়ে রাখায় সতীচ্ছেদের মোটিভ [মোটিফ], কে বোঝে না? (গ্রিক ও ভারতীয় মিথে মর্তের নারীদের ভোগের জন্য দেবতারা বিভিন্ন প্রাণীর বেশ ধরে তাদের অগোচরে বা জোর করে ভোগ করতেন। এটা সেটাই মনে করিয়ে দেয়।) গরুর গাড়ির বাঁশমহলে মেলে ধরা দুই তরুণী, কিংবা পানির লাইনের ফিটিং মিস্ত্রির ফিটিংয়ের কারিগরি হলো তাদের কল্পনার দৌড়। আড়ংয়ের দুধের বিলবোর্ডে বিশালবক্ষা টিশার্ট ঘেঁষা ফুটবলের ছবিও আমরা দেখেছি। পথের ঝালমুড়িঅলার চোঙা ফুকে দুই তরুণী কী বলছে এই ছবিতে? যে তারা হট এবং স্পাইসি, নয় কি? সজ্ঞানে না বুঝেন, আপনার পুরুষালী অচেতনে এর ছাপ পড়ে, আর আপনি অবলোকনকাম চরিতার্থতার প্লেজার পান।” (‘যৌনবিপ্লবী করপোরেট জগতের খেলারামদের খেলা’, ফারুক ওয়াসিফ, প্রিয় ডটকম, ২৫/৯/২০১৪)

aarong2

দুই একটা বিজ্ঞাপন যেমন, “ঘরভর্তি পানিতে নৌকায় সিক্ত জিরো ফিগারের নারীর জলকেলিময় বাসরের অপেক্ষা”—এখানে বাসরকে ওনার বাড়তি কল্পনা বলা যায়। বা “শুভ্র তাগা পরিহিত দুই কিশোরীর দিকে একটি পুরুষ বকের দীর্ঘ শক্ত চঞ্চু নারী দুজনের মধ্যাঙ্গের দিকে বাড়িয়ে রাখায় সতীচ্ছেদের মোটিভ [মোটিফ]”—এটাও জরুরি কোনো সমালোচনা না। অতিশয়োক্তি বরং। সেক্সকে বাংলায় ধরতে না পারার সমস্যা এখানে আছে।

aarong1আমাদের দেশের অধুনিক তরুণী বা কিশোরীরা মুগ্ধতা নিয়ে বক দেখে। এখানে সেই মুগ্ধতা নিয়ে বক তাদের দেখছে। বক আগে কিশোরীদের (ওয়াসিফ এদের কিশোরীই বলেছেন) সিডিউস করত। আর এ ছবিতে বক সিডিউসড ওই কিশোরীদের দ্বারা। বকের গা শুধু সাদা। আর এরা তো সাদা বটেই, তার মধ্যে রঙ করা। বকের মনে মানুষ আছর করালেন এখানে বিজ্ঞাপন নির্মাতা। আর মানুষ হয়ে গেল ‘বক’। তা এই ক্ষমতা তো আল্লার ওয়াস্তে তার আছেই। এখানে বকের মুগ্ধ নয়নে ‘যৌনাকাঙ্ক্ষা ’ খুঁজে পাওয়াটা জোর কল্পনার দাবি রাখে। এ রকমটা ঘটল বিজ্ঞাপন থেকে সাহিত্যকে নাই করে দেয়ার ফলে।

ইংরেজিতে আর্টিস্টিক ভিউ বললে এ দেশে বুঝতে সুবিধা হয় বেশি। এভাবে বিজ্ঞাপনেরও যে সাহিত্যিক গুরুত্ব থাকতে পারে তা নিয়ে আলোচনাটা বাদ দিয়ে দিলে তো আমদের হাতে কেবল আঁটি জমা হবে।

aarong3এবার আরেকটা বিজ্ঞাপনের কথায় আসি। ওয়াসিফ যার সম্পর্কে লিখেছেন, ‍”পথের ঝালমুড়িঅলার চোঙা ফুকে দুই তরুণী কী বলছে এই ছবিতে? যে তারা হট এবং স্পাইসি, নয় কি?” আমি বলব তাই। ওরা এমনটাই বলতে চাইছে। ওয়াসিফের গলায় এ নিয়ে যে অভিযোগ তাতে আমার আপত্তি আছে। চানাচুরের ‘হট’ আর ‘স্পাইসি’ গুণ এই দুই তরুণীতে জমা আছে—এমনটা অনুমান করার যথেষ্ট উপাদান এ বিজ্ঞাপনে হাজির। এই দুই সিডাকট্রেস নিজেদের বিষয়ে এমন খোলামেলা (বলার অর্থে) বলতে পারছেন। এ তো একটা ভালো গণতান্ত্রিক ব্যাপার হলো। অন্যে তাদের বিষয়ে কিছু বলার এখতিয়ারকে গ্রাহ্য না করে নিজেরাই নিজেদের বিষয়ে বলার স্বাধীনতাটা যে ভোগ করতে শুরু করল—এখানে তো একটা বিপ্লব ঘটে গেল। এবং চানাচুর থেকেও নিজেদের আলাদা করে ফেলল। চানাচুরের ‘গুণাবলি’ তাদের থাকল ঠিকই কিন্তু তারা আর পুরুষ বিক্রেতার অধীন থাকল না। তার বয়াম থেকে বেরিয়ে এল। বলল, “এই দেখো আমারে।” আমি ‘হট’ অ্যান্ড ‘স্পাইসি’। এই শব্দযুগল লুঙ্গিপরা চানাচুরওয়ালা কখনও বলতেন কিনা তা নিয়ে বাস্তবের কাছাকাছি চলে যাওয়া যায় এমন তীব্র সন্দেহ জাগে। বা এই দুই তরুণীও চানাচুরওয়ালার ভাষা বাদ দিয়ে হট এবং স্পাইসির মতো দুটো ইংরেজি শব্দ বলছেন কিনা তার আলামত কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ওয়াসিফের বরাতে আমাদের ধরে নিতে হচ্ছে যদিও। বরং চানাচুরওয়ালার ‘বাঙালপনা’য় মনে হয় এই দুই তরুণীও ‘চানাচুরররর’ কিম্বা ‘ঝাল’, ‘তাজা’, ‘গরম’—এসব বলছে। আর যদি নাও বলে তো এই শ্রেণিব্যবধানকে তীব্র করে তোলার, গরীবকে অনেক বেশি গরীব দেখানোর এথিকসের নিন্দা না করে তাকে ‘যৌনতা’য় পর্যবসিত করার খেয়াল কেন হলো?

কারণ আধুনিকতায় আপত্তি না থাকা। পুঁজিবাদের ‘ভোগ’ মানসিকতার নিন্দা করলেও আধুনিকতার ঈমান তো হারানো যাবে না। যথেচ্ছ, অজাচারিক, বেসামাল, বেহুঁশের মতো যৌনতায় হারায়ে যাওয়ার যে মচ্ছব পুঁজিবাদ শুরু করল তাতে আপত্তি কেবল। আধুনিকতায় আপত্তি নাই। নারী সেক্স ইমেজ না কেবল, তার সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্তব্য আছে, মানবিক দিক আছে—এরকম কিছু রাজনীতি আঁচ করা যায়। কিন্তু প্রতগিশীলতা বা আধুনিকতায় তেমন আপত্তি নাই। দ্বিতীয় আরেকটা কারণের কথা আগেই বলেছিলাম, এসব কাজকে সাহিত্যিক মর্যাদা না দেয়া।

তিন নম্বর সমস্যা সেক্সকে বাংলায় বুঝতে না পারা। বিষয়টাকে একেবারে রতিক্রিয়া দিয়ে বোঝার একটা মানসিকতা যেমন আছে। আবার একে এনজিওবাদের তৈরি করা শব্দ ‘যৌনতা’ দিয়েও বোঝেন অনেকে। কিন্তু ইংরেজিতে সেক্স কথাটার অনেক রকম মানে তৈরি হয়। আমরা যদি একে মিলন বা নারী-পুরুষের দৈহিক মিলন দিয়ে বুঝতে চাই, তাহলেও হবে না। এমন ধরাবাধা কোনো সংজ্ঞা দিয়ে ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না। বিদেশী বিজ্ঞাপনে যে মাত্রায় ‘সেক্স’ থাকে আমাদের এখানে এর ধারেকাছে বিষয়টা থাকে না। অনেক রেখে-ঢেকে মেয়েদের শরীর হাজির করানো হয়। ওয়াসিফ যেমনটা লিখেছেন, “আড়ংয়ের দুধের বিলবোর্ডে বিশালবক্ষা টিশার্ট ঘেঁষা ফুটবলের ছবিও আমরা দেখেছি।” তো এখানে বিশালবক্ষার পক্ষে টিশার্ট পরাটা কি অন্যায্য হয়ে গেল? নাকি আড়ঙের বাড়াবাড়ি হয়ে গেল? আরেকটু কম মাইয়ের মেয়ের ছবি দিলেই পারত তারা?

আজ এ পর্যন্ত থাক, পরের পর্বে পরেরটা লিখব। এখানে সিডাকট্রেস, সিডিউসড এমন কিছু শব্দ ইংরেজিতেই লিখলাম। সব বাংলা করার দায় আমি নিয়ে নিলে কেমনে হবে?

(দ্বিতীয় পর্ব)

সালাহ উদ্দিন শুভ্রের আরো লেখা » 

About Author

সালাহ উদ্দিন শুভ্র
সালাহ উদ্দিন শুভ্র

লেখক, সাংবাদিক, সমালোচক ও ঔপন্যাসিক। 'নতুনধারা' পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস 'গায়ে গায়ে জ্বর'। ধারাবাহিক উপন্যাস 'নেশা' ছাপা হচ্ছে atnewsbd.com-এ।